কৃষণ চন্দরকে শুধু ভারতীয় উপমহাদেশের নয়, সারা বিশ্বের সেরা কথাশিল্পীদের কাতারে ফেলা যায়। তাঁর সাহিত্য পাঠ করা মানে স্বপ্নীল রোম্যান্টিকতা ও রক্তাক্ত বাস্তবতার এক আশ্চর্য পৃথিবীর মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাওয়া। বইয়ের গল্পগুলো পাঠককে সেই আশ্চর্য পৃথিবীতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। তাঁর রচনায় ১৯৪৭-এর ভারত বিভাগ, বিশেষ করে পাঞ্জাব-বিভক্তির যন্ত্রণা সবচেয়ে গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর রচনাবলির একটি বড় অংশ ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভারতবাসীর অংশগ্রহণ, রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা, ভারতীয় মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র পাকিস্তানের সৃষ্টি প্রভৃতি বিষয়ের প্রামাণ্য দলিল হয়ে আছে।
हिंदी : कृश्न चन्दर Urdu Profile:کرشن چندر Krishan Chander was an Urdu and Hindi writer of short stories and novels. He also worked on English.
He was a prolific writer, penning over 20 novels, 30 collections of short stories and scores of radio plays in Urdu, and later, after partition of the country, took to writing in Hindi as well.
He also wrote screen-plays for Bollywood movies to supplement his meagre income as an author of satirical stories. Krishan Chander's novels (including the classic : Ek Gadhe Ki Sarguzasht, trans. Autobiography of a Donkey) have been translated into over 16 Indian languages and some foreign languages, including English.
His short story "Annadata" (trans: The Giver of Grain – an obsequious appellation used by Indian peasants for their feudal land-owners), was made into the film Dharti Ke Lal (1946) by Khwaja Ahmad Abbas – which led to his being offered work regularly as a screenwriter by Bollywood, including such populist hits as Mamta (1966) and Sharafat (1970). He wrote his film scripts in Urdu
কৃষণ চন্দরের পেশাওয়ার এক্সপ্রেস ও অন্যান্য গল্প দেশভাগের ট্র্যাজেডিকে গভীরভাবে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে, পাঞ্জাবের বিভক্তি, হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, আর মানুষের দুর্ভোগকে তিনি তীক্ষ্ণ বাস্তবতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘পেশাওয়ার এক্সপ্রেস’ গল্পটি এক মর্মান্তিক যাত্রার প্রতিচ্ছবি, যেখানে দেশভাগ কেবল ভূখণ্ডের নয়, মানুষের মনোজগতেরও বিভক্তি ঘটিয়েছে। বইটির প্রতিটি গল্পেই ব্যথা, বেদনাবোধ আর সহিংসতার নির্মম চিত্র পাওয়া যায়। জ্যোতির্ময় নন্দীর অনুবাদ গল্পগুলোর তীব্র আবেগকে এমনভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে, যেন পাঠক কেবল একটি গল্প পড়ছেন না, বরং সেই সময়ের এক জীবন্ত সাক্ষী হয়ে উঠছেন। বইটি শুধু দেশভাগের ইতিহাস নয়, মানবতার জয়গানও বটে, যা পাঠককে চিন্তা করতে বাধ্য করবে কীভাবে বিভাজন শুধুই শারীরিক নয়, মানুষের আত্মাও বিভক্ত করে দেয়।
"...হাম এক থে, জবান এক থি, তাহজীব এক থি। ফির না জানে কৌন সি লাকীর দিলোঁ কে বিচ খিঞ্চ গই। ১৯৪৭ আয়া, ঔর সাথ লায়া আঁখোঁ মেঁ আঁসু, দিলোঁ মেঁ নফরত, ঔর জমীন পর খুন কি নদীয়াঁ। কভি সোচতে হ্যায়ঁ, কিয়া ইয়ে তকসীম জমীন কি থি, ইয়া ইনসানিয়াত কি?"
সাতচল্লিশে দেশ বিভাজিত হয়ে ভিন্ন সংস্কৃতির, ভিন্ন ধর্মের দুটি দেশ স্বাধীন হলো ঠিকই। কিন্তু লাহোর জ্বলতে লাগলো আর অমৃতসরে হিন্দু, মুসলমান, শিখ জনগণ পড়ে গেল ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার থাবার নিচে। একটা নকশাকে সামনে রেখে পাঞ্জাবকে তারা কলমের এক খোঁচায় দুই টুকরো করে দিল। ফলাফলস্বরূপ পাঞ্জাব ছিল দেশভাগ-পরবর্তী সবচেয়ে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক এ দাঙ্গার কেন্দ্রবিন্দু—যেখানে বহু নারী ধর্ষণের স্বীকার হলো, লোকেরা পরিবার হারিয়ে বাস্তুহারা হয়ে পড়ছিল আর বাতাসে কিলবিল করছিল লাশের বোটকা গন্ধ।
সাদাত হাসান মণ্টো তাই হয়তো লিখেছিলেন – “রেলগাড়িতে শুধু মৃতদেহ আসে। বোঝা যায় না কোনটা হিন্দু, কোনটা মুসলমান, কোনটা শিখ — সবাই লাশ।”
ঠিক এমন একটা লাশ বোঝাই রেলগাড়ী হঠাৎ গল্প বলতে শুরু করলে আধুনিক হিন্দি-উর্দু সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কথাশিল্পী 'কৃষণ চন্দর' তাকে নিছক একটা উপাখ্যান বলেই চালিয়ে দিলেন এবং নাম দিলেন 'পেশাওয়ার এক্সপ্রেস'।
পাকিস্তানের সীমান্তের কাছাকাছি আর ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম অংশের এক শহর — অমৃতসর। অমৃতসরে স্বাধীনতার আগে সহিংসতা ছিল তুলনামূলক কম এবং রাজনৈতিক-উপনিবেশবিরোধী ছিল (যেমন জালিয়ানওয়ালাবাগ)। সাতচল্লিশের সময় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় হাজারো মানুষ নিহত হয় ও বাস্তুচ্যুত হয়। স্বাধীনতার পর (বিশেষ করে ১৯৮০-র দশকে) সহিংসতা ফের বাড়ে। 'অমৃতসর স্বাধীনতার আগে, অমৃতসর স্বাধীনতার পর'-এ গল্পদুটি সে সহিংসতার কেন্দ্রবিন্দুতে গাঁথা।
'এক বাইজির চিঠি' তে একজন বাইজির খোলা চিঠিতে উচ্চারিত হয়- 'শৈশবের কোন ধর্ম থাকে না, ওটা সারা মানবজাতির আমানত, সারা বিশ্বের উত্তরাধিকার। যে এই শৈশবকে বরবাদ করে, তাকে দুনিয়ার কোন ধর্মের কোন ঈশ্বর ক্ষমা করতে পারে না।'
প্রেম-কাম-রোমাঞ্চ-রক্ত। নিরব বিশ্বাসঘাতকতার নাম 'আধঘন্টার খোদা'। 'ইরানি পোলাও'-নামটাতেই একটা আশ্চর্য সুবাস! ক্ষুধাকে হেসে-খেলে উড়িয়ে দেওয়ার মত একটা গল্প। এছাড়া মানুষের মূল্যের চরম অধঃপতনের এক নির্মম রুপক 'জামগাছ' এ বইয়ের অন্যতম পছন্দের গল্প।
এবং বড় গল্প - অন্নদাতা। আলাদা করে অন্নদাতার একটা পাঠ প্রতিক্রিয়া আছে। কমেন্ট বক্সে লিংক জুড়ে দিচ্ছি।
প্রত্যেকটা গল্পের প্রাণ আছে। প্রতিটা গল্প জীবন্ত এবং সত্য। এমন সাবলীল বর্ণনা অথচ রূঢ় উপলব্ধি — পড়া শেষে বুক ভার হয়ে আসে। ধর্মকে জিম্মি করে যে যুদ্ধে নিরীহ প্রাণ বলি দিতে হয়, যেখানে ঘৃণা রাজত্ব করে, যেখানে ঈশ্বর নিরব — ধর্ম সেখানে নিরব দর্শক মাত্র। এমনটাই জানান দিচ্ছিল গল্পগুলো...
'কৃষণ চন্দর' এর এ গল্পগুলোকে বাংলা ভাষায় প্রাণ দেওয়ার জন্য অনুবাদক 'জ্যোতির্ময় নন্দী' কে কৃতজ্ঞতা জানাই। এ বইয়ের একটাই কমতি, মাত্র অল্প কয়েকটা গল্প এতে। প্রোডাকশন কোয়ালিটি খুব ভালো হলেও মাত্র ১৪৪ পাতার একটা বইয়ের মলাট মূল্য ৪০০ টাকা! মেনে নেওয়া কঠিন কিনা?