জন্মেই মাতৃপিতৃহীন, অন্যের সংসারে গলগ্রহ হয়ে কোনোরকমে বেঁচে থাকা লীলা চেয়েছিল একটা ছোট্ট সংসার, মাথার ওপর ছাদ, আর দুবেলা দুমুঠো নিশ্চিন্ত খাবার। শুধু এইটুকুর খোঁজে তার ভাগ্য তাকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছে মস্ত এক ভুল,তাকে শেকড় থেকে উপড়ে নিয়ে গিয়ে ফেলেছে সুদূর রাজস্থানের অজ গ্রামে, যেখানে মেয়ে জন্মায় না। জন্মাতে দেওয়া হয় না। কিন্তু ওদেরই মেয়ে ছাড়া চলেও না আবার। তাতে কী? পয়সা ফেললে সব মেলে। মূল্য দিয়ে কেনা হয় ‘মোল কি দুলহন’, সংক্ষেপে মোলকি। ‘হাজার টাকার বউ’। আর টাকা দিয়ে কেনা মেয়ে ক্রীতদাসী ছাড়া আর কী-ই বা, যতই তার নামে দুলহন থাকুক? তাকে তো ইচ্ছেমতো ব্যবহার করা যায় নামমাত্র খাদ্য আর আশ্রয়ের বিনিময়ে। তেমনই আবারও বিক্রি করে দেওয়া যায় প্রয়োজন ফুরোলে। লীলাও তাই বিক্রি হয়ে যায় বার-বার, ব্যবহৃত হয় বার-বার। এই জেলা থেকে ওই জেলা, এই গ্রাম থেকে ওই গ্রামে প্রবল প্রতাপী জাট পুরুষদের কাছে সমানে হাত বদল হতে থাকা লীলা তবুও স্বপ্ন দেখে এই পশুর মতো জীবন থেকে মুক্তির। কিন্তু, আসবে কি সেই মুক্তি কোনওদিন? একদিন সূর্যের ভোর কি আদৌ হবে লীলার অন্ধকারময় জীবনে?
হায় রে নারী ! তোর স্থান আর সম্মান যে কোথায় কেউ জানে না। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে হরিয়ানা তে বিক্রি হয়ে যাওয়া এক মেয়ের গল্প । এই গল্পতে একজনের সাথে সাথে অনেকজনের জীবন ছুঁয়ে যায়। ছুঁয়ে যায় আমাদের সমাজে থাকা নারীজাতির অবস্থান। ছোটো থেকে মামাবাড়িতে অনাদরে মানুষ লীলা চায় একটু ভালোবাসা আর এই ভালোবাসার জন্য কাঙাল লীলা বিশ্বাস করে সানি কে । মেয়েমানুষ ভালোবাসা পেলে সব ভুলে যায় , জীবন দিয়ে দেয় সেই মানুষটার জন্য আর তখনই সুযোগ বুঝে কোপ বসায় সানি। তাকে বিক্রি করে দেয়, হাতবদল হয় লীলার কিন্তু ভাগ্য ? মোলকি , পারো আসলেই কারা । রাজস্থান হরিয়ানার জাট সমাজে নারী কেনাবেচা পদ্ধতি। বাংলা , বিহার , উড়িষ্যা , বাংলাদেশ, নেপাল থেকে নারী পাচার করা হয় মোটা টাকার বিনিময়ে। জাট সমাজে কন্যা জন্মালে মেরে ফেলা হয় কিন্তু ভবিষ্যতে যখন প্রাকৃতিক নিয়মে নারীর দরকার পড়ে তখন টাকার বিনিময়ে কিনে নেয় তারা । তারপর চলে অকথ্য অত্যাচার। দুমুঠো খাওয়া আর থাকার আশ্রয়ে মুখ বুজে সহ্য করে সেসব মেয়েরা । প্রাচীন প্রথা , রীতি ভেবে মেনে নিয়েছে সমাজ থেকে প্রশাসন। মেয়েদের দিকে সহজেই আঙ্গুল তোলা যায় । তাই কালির ছিটে প্রথম নারীর মুখেই লাগে। কিন্তু কোথাও কোথাও প্রকৃত মানুষের জন্ম হয় ওরকম এক সমাজে থাকা সত্ত্বেও। তার জ্বলন্ত উদাহরণ মহীন্দর। বাবলি , কুসুম , বাসন্তী , ললিতা কতজনের গল্প মিশে যায় এক সুতোয় । লীল কি কোনোদিন সুখ খুঁজে পেয়েছিল ? আদৌ কি বেরিয়ে আসা যায় ওই ঘেরাটোপ থেকে ? নারী জাতির সুরক্ষা নিয়ে আর কবে কথা উঠবে ? কবে থামবে এসব জঘন্য প্রথা ? - উত্তর অজানা।
মোলকি, হাজার হাজার টাকার বিনিময়ে মেয়েরা বিক্রি হয়ে যেত এ দেশ থেকে ও দেশ, এক পুরুষ থেকে অন্য পুরুষের কাছে। আসলে বউ হিসেবে গেলেও তাদের ক্রীতদাসী করে রাখা হতো শুধু দু মুঠো খাবার আর মাথার উপরের আশ্রয়টুকুর জন্য। শুধু তাদের শরীর নিয়েই ছেলেখেলা করা হতো এমন নয় মনকেও কেটে ছিন্নভিন্ন করা হতো। 🌀 সেরকমই লীলা যুবতী বয়সে প্রেমে পড়ে। লীলার প্রথম ভুল সেইখানেই। মা বাপ হারা মেয়ের কপালে দুর্ভোগ ছাড়া আর কিছু জোটেনা। মামা বিক্রি করে দেয় তাকে। তার পর থেকেই এই দেশ থেকে ওই দেশ, এই গ্রাম থেকে ওই গ্রাম লীলাকে নিয়ে যেন লোফালুফি খেলছে এই লোভী পুরুষ সমাজ। পাশবিক অত্যাচার তাকে এতটাই কঠিন করেছিল যে দু মুঠো পেট ভরানোর আশায় দাঁতে দাঁত চেপে পড়েছিল সুখবীর ঘরে। কম মার খায়নি কম যন্ত্রণা তাকে সহ্য করতে হয়নি। 🌀 তবে ভাগ্য তাকে একসময় সঠিক মানুষের সন্ধানও দিয়েছিল। মহিন্দর। মহিন্দরকে দেখে তার বিশ্বাস হয়নি কোনো পুরুষ মানুষ এত ভালো হয়। কোনো পুরুষ এক বিছানায় থেকেও তার শরীরের দিকে লোভী দৃষ্টিতে না তাকিয়ে থাকতে পারে। কোনো পুরুষ প্রহার না করেও তাহকতে পারে। মোলকি ও পারোদের যন্ত্রণা সে বুঝেছিল। হয়ত লীলার সারাজীবনের কষ্ট, ক্ষত, দুর্দশা সে কাটিয়ে দিতে পারেনি তবে দুটো মনের কথা বলে লীলাকে আশ্বস্ত করেছিল।
🌀 হাজার টাকার বউ শুধু টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে যাওয়া মোলকি বা পারো দের কথাই বলেনা। পুরুষদের হিংস্র জানোয়ারসম ব্যবহার কিভাবে একচেটিয়া জায়গা জুড়ে আধিপত্য রেখেছিল, কিভাবে নারীদের অত্যাচার ও নারী জাতিকে মানুষ নয় জিনিসপত্রের মতো ব্যবহার করা হতো তার পরিষ্কার দৃশ্য লেখিকা প্রতিটা পাতায় ব্যক্ত করেছেন। মেয়েদের সুপ্ত লড়াই করার ইচ্ছেও দেখিয়েছেন এবং তার ফল যে মৃত্যু তাও দেখিয়েছেন। একটা গোটা সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন লেখিকা।
মোলকি- একবিংশ শতাব্দীর ভারতেও বহাল তবিয়তে রয়েছে এই প্রথা। উত্তর-পশ্চিম রাজ্যে মূল্যের বিনিময়ে কেনা হয়ে মেয়েদের। কারণ? নিচু জাতের, অল্প উপার্জন করা ছেলেদের 'বৌ' জোটে না, বা জুটলেও কোনো কারণে সে মারা যায়। তখন শরীরের খিদে, সংসারের দায়িত্ব মেটাতে কিনে আনা হয় মোলকিদের।
বাঙালি ঘরের মেয়ে দীপাও একজন মোলকি। প্রতিদিন-প্রতিরাতের অত্যাধুনিক ভুলিয়ে দিয়েছে যার অস্তিত্ব। তবুও, দীপা বেঁচে থাকার কথা ভাবে। কেন?
এই উপন্যাস বাস্তবের খুব কাছাকাছি এসে রচিত হয়েছে। ঝরঝরে ভাষায় লেখা এই আখ্যান পাঠককে বারবার হোঁচট খেতে বাধ্য করে, গল্পের নির্মমতার জন্য।