১৭৯৪ সালে আয়ারল্যান্ডের কর্ক শহর থেকে Travels of Dean Mahomet শিরোনামের একটি ভ্রমণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। লেখক শেখ দীন মোহাম্মদ নামের এক বাঙালি। দুশো বছর পর বিস্মৃত ইতিহাস থেকে ঘটনাটি খুঁজে পান মার্কিন ইতিহাস গবেষক প্রফেসর মাইকেল এইচ ফিশার। বিস্ময়ের সাথে তিনি আবিষ্কার করেন সেটি ছিল ইংরেজি ভাষায় কোনো ভারতীয়ের লেখা প্রথম বই। বিশদ অনুসন্ধানে জানা যায়, দীন মোহাম্মদই ১৮১০ সালে লন্ডনে প্রথম ভারতীয় রেস্তোঁরা প্রতিষ্ঠা করেন। এই বাঙালি ১৮১৪ সালে ব্রাইটন শহরে গড়ে তুলেছিলেন এক বাথ হাউস। সেটি খুব বিখ্যাত ছিল। তাঁর বাথ হাউসের নিয়মিত গ্রাহক ছিলেন ইংল্যান্ডের রাজা চতুর্থ জর্জ। ১৭৮৪ সালে বিলেতে অভিবাসন নেওয়া শেখ দীন মোহাম্মদের বইয়ে তাঁর জীবনের বিচিত্র অধ্যায়ের বিবরণ আছে। সেই বিবরণ, পাশাপাশি বিস্তারিত ভূমিকায় বিলেতে ভারতীয় অভিবাসন এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর ভারতবর্ষের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার উন্মোচন হারুন রশীদের এ বইকে সমৃদ্ধ করেছে।
প্রচ্ছদে ফলাও করে বইয়ের পরিচিতি দেওয়া হয়েছে "ইংরেজি ভাষার প্রথম ভারতীয় লেখক শেখ দীন মোহাম্মদ বৃত্তান্ত"। মানে দীন মোহাম্মদের জীবনী জাতীয় কোনো বই এটা। প্রচারও করা হয়েছে সেভাবে। কিন্তু পড়তে যেয়ে ধাক্কা খেতে হলো।দীন মোহাম্মদ তার ব্রিটেনে অবস্থানকালে ভারতের ধর্ম, কৃষ্টি, প্রথা, ইতিহাস ইংরেজদের কাছে তুলে ধরার জন্য একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনা করেন। এ বইয়ের মূল অংশ সেই লেখার অনুবাদ।কেমন কেমন যেন হয়ে গেলো না ব্যাপারটা? যা হোক, পড়ে আনন্দ পাওয়া গেলো। দীন মোহাম্মদ যুগের তুলনায় যথেষ্ট প্রাগ্রসর ও অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। এজন্য ব্রিটিশ আমলের শুরুতে হিন্দু, মুসলিম সবার নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, বিবাহ প্রথাসহ তৎকালীন সমাজের অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। যুদ্ধে তার নিজস্ব অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। বইয়ের ভূমিকা ও পরিশিষ্ট অংশে দীন মোহাম্মদের জীবনী রয়েছে সংক্ষেপে, সেটাও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক।
৩.৫/৫ প্রথমবার দীন মোহাম্মদ এর সন্ধান পাই গতবারের সিল্করুটের ঈদসংখ্যার কল্যাণে। হারুন রশীদের ওই নিবন্ধটা আলাদা করে আমার নজর কেড়েছিল। তার বর্ণাঢ্য এবং কৌতুহলী জীবনধারাই আগ্রহ জাগানোর জন্য যথেষ্ট ছিলো।
আঠারো শতকের শেষদিকে একজন সাধারণ ভারতীয় হিসেবে এক ইংরেজ ক্যাপ্টেনের সঙ্গে সেদেশে পাড়ি জমান। সেখানেই বিয়ে করে সংসার শুরু করেন, লন্ডনে খুলে বসেন রেস্তোরাঁ। সেটা ছিলো প্রথম ভারতীয় কোনো রেস্তোরাঁ। শুরুতে ওটা ভালোই সাড়া ফেললেও পার্টনারের সঙ্গে ঝামেলায় পড়ে সেই ব্যবসাতে বিশাল লোকসান খেয়ে একেবারে পথে বসে যাওয়ার অবস্থা হয়। এরপর কিছুটা সময় তার বেশ আর্থিক দৈন্যে কাটে। যেকোনো প্রকার চাকরি পেলেই হবে এমন একটা ইচ্ছা নিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দেন। পরবর্তীতে ব্রাইটনে খুলেন বাথ হাউজ। সেই বাথ হাউজে নিয়মিত আসতেন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রিন্স জর্জ। এর কয়েক বছর পরই অবশ্য জর্জ রাজা হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। দীন মোহাম্মদ জায়গা হয় রাজার ব্যাক্তিগত প্যালেসে। তার সম্মান এবং প্রভাব তখন তুঙ্গে। জর্জ মারা যাওয়ার পর অবশ্য তাতে কিছুটা ভাটা পড়ে। ততোদিনে দীন মোহাম্মদ দুটো বই লিখে ফেলেছেন। প্রথম বইটা তার ভারতে থাকাকালীন সময়ে ঘটনাবলী নিয়ে লেখা। পরেরটাতে তিনি বাথ হাউজের বিভিন্ন ব্যাপার নিয়েন লেখেন যেখানে তিনিই প্রথম "শ্যাম্পু" শব্দটা চালু করেন বলে কথিত আছে।
ভারতে তার নাম-নিশানা মুছে গেলেও ব্রিটেনে তার অস্তিত্ব এখনো রয়ে গেছে। ব্রাইটনে তার নামে বাস এখনো চালু আছে। লন্ডনের যেখানে রেস্তোরাঁ খুলেছিলেন সেখানেও তার নাম লেখা রয়েছে। এমনকি ২০১৯ সালে গুগল পর্যন্ত তার নামে একটি ডুডল তৈরি করেছিল।
এবারে এই বইয়ের কথায় আসা যাক। বইটাকে দুটো অংশে ভাগ করা যায়। প্রথমাংশে ভূমিকা আকারে দীন মোহাম্মদ এর জীবনী বলেছেন হারুন রশীদ। ব্যাক্তিগত ভাবে আমার এই অংশটাই বেশি পছন্দের। পরের অংশে রয়েছে দীন মোহাম্মদ এর প্রথম প্রকাশিত বইয়ের অনুবাদ। ওটাকে তার আত্মজীবনী বলা যায়, লেখা হয়েছে চিঠি আকারে। তার ছোটবেলা এবং পরিবারের কথা শুরুতে এসেছে স্বল্প আকারে। মূল গল্প বলেছেন ক্যাপ্টেনের সাথে যুক্ত হওয়ার পর থেকে। তার সঙ্গে বিভিন্ন কারণে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে গমন করেছিলেন। সেই সুবাদে প্রায় আড়াইশো বছর আগেকার ভারতের একটা চিত্র পাওয়া যায়।
দীন মোহাম্মদের বইটাতে শুধু তার ভারতে থাকাকালীন জীবনপঞ্জিরই উল্লেখ পাওয়া যায়। সেটা পড়তে মন্দ নয় তবে ভূমিকা পড়ে মনে হয়েছিল তার ব্রিটেনের জীবনই বরং বেশি রোমাঞ্চকর। সেই অংশ না পাওয়াটা একপ্রকার আক্ষেপ বা অপূর্ণতার মতো।
তবে এরকম আড়ালের একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কাজটা বাহাবা পাওয়ার মতো। মূল কাজটা অবশ্য করেছেন মাইকেল ফিশার। তিনিই বিভিন্ন নথিপত্র ঘেটে তুলে পাদপ্রদীপে তুলে আনেন দীন মোহাম্মদকে। আর সেই পথ ধরে এই বইয়ের মাধ্যমে হারুন রশীদ তাকে দেশীয় পাঠক এবং গবেষকদের নিকট পরিচিত হতে সাহায্য করলেন।
থমাস হাবার্ট লুইন আর শরৎচন্দ্র দাসের পর আবার এক ঐতিহাসিক চরিত্রের আত্মজীবনীর অনুবাদ করলেন হারুন রশীদ।
শ্যাম্পু শব্দের আবিষ্কর্তা শেখ দীন মোহাম্মদের বৈচিত্র্যময় জীবন উঠে এসেছে এই বইতে। ভারতবর্ষ যখন ক্রমশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে চলে যাচ্ছিল, সেই সময়ের প্রেক্ষিতে দীন মোহাম্মদের সাহেবপ্রীতি পড়তে পীড়াদায়ক, তবে স্বীকার করতেই হয় গড়পরতা ভারতীয়দের মতো 'অলস দেহ ক্লিষ্ট গতি, গৃহের প্রতি টান' তার ছিল না। শেষ জীবনে হয়ে ওঠেন বিলেতে সফল বাঙালি বনিক, লেখেন ভারতীয়দের মাঝে প্রথম ইংরেজিতে আত্মজীবনী।
শ্যাম্পু আবিষ্কর্তা এক ভারতীয় বাঙালি মুসলিম!!! চমকপ্রদ এই তথ্য পেয়েই বইটা পড়তে শুরু করি। পড়তে পড়তে জানলাম, তিনি প্রথম বাঙালি হিসেবে বিলেতে ব্যবসা শুরু করেন। বইটায় খুবই ইন্টারেস্টিং কিছু বিষয় আছে। শেখ দীন মোহাম্মদের জীবনটাই খুব চমকপ্রদ। তার ভবঘুরে জীবন থেকে সেনাবাহিনীতে যোগদান, সেখান থেকে বিশ্ব ভ্রমণে বেরিয়ে পড়া, ইংল্যান্ডে গিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, সাথে জীবনের বিস্তর চড়াই উৎরাই - সব মিলিয়ে ভালো এক অভিজ্ঞতা। শেখ দীন মোহাম্মদের চিন্তাভাবনা তার সময়ের তুলনায় অনেক প্রগ্রেসিভ ও গোঁড়ামিমুক্ত। তবে তিনি তার লেখায় ভারতীয়দের ইংরেজদের তুলনায় খানিকটা অনগ্রসর দেখিয়ে ও অসঙ্গতিগুলো হাইলাইট করে ইংরেজ সমাজে ভ্যালিডেশন পাওয়ার একটা চেষ্টা করেছেন বারবার, যেটা আলাদাভাবে চোখে পড়ে।
বছর তিনেক আগে সিরাজুল ইসলামের "ঐতিহাসিকের নোটবুক" পড়ার সময় দীন মোহাম্মদ সম্পর্কে জানতে পারি। বলাবাহুল্য তার কীর্তিকলাপে অবাক হয়েছিলাম এবং তাকে নিয়ে আরো বিস্তারিত জানার আগ্রহবোধও করেছিলাম। স্বভাবতই এ বই নিয়ে আগ্রহ এবং প্রত্যাশাও ছিল অনেক বেশি। যতটা আশা নিয়ে শুরু করেছিলাম বা বই প্রকাশের আগে যেভাবে বলা হয়েছিল সেসব বইয়ে না পেলেও দীন মোহাম্মদের ঘটনাবহুল বর্ণাঢ্য জীবনের গল্প জানতে পেরে খুব বেশি খারাপ লাগেনি। সময়ের তুলনায় দীন মোহাম্মদের চিন্তাভাবনা ছিল অনেক বেশি আধুনিক ও লিবারেল। ভারতীয় জীবনাচার, সংস্কৃতি, উৎসব, ঐতিহ্য নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি ভালো লাগার মতো।