বঙ্গদেশে রূপকথার ঐতিহ্য বহু পুরোনো। কালের বিবর্তনে এতে মিশে গেছে আঞ্চলিক লোকগাঁথা এবং ধর্মীয় হিতোপদেশ। অনেক রূপকথার সঙ্গে সংস্কৃত পঞ্চতন্ত্র ও পালি জাতকের গল্পের সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের আরব্য উপন্যাস ও পারস্য উপন্যাস থেকেও বেশ কিছু রূপকথার আগমন ঘটেছে। বাদ যায়নি ইউরোপীয় লোককাহিনির উপাদানও। রাক্ষস-খোক্কস, সন্ন্যাসী-ডাইনি, দৈত্য-দানব, জাদুকর, বীর-পালোয়ান, রাজা-রানি, রাজপুত্র-রাজকন্যা, উজিরপুত্র-কোটালপুত্র, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমি–এরাই হচ্ছে রূপকথার পাত্র-পাত্রী। এদের নানা উদ্ভট, অলৌকিক ও বীরত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড যুগ যুগ ধরে বিমোহিত করে আসছে ছেলে-বুড়ো সবাইকে। বংশপরম্পরায় প্রচলিত রূপকথাগুলো বদলে গিয়েছে অনেকটাই, হারিয়ে গিয়েছে এদের আদি ও অকৃত্রিম রূপ। এ কারণেই যুগে যুগে সাহিত্যবিশারদগণ রূপকথা সংগ্রহে ব্রতী হয়েছেন, সৃষ্টি করেছেন রূপকথাভিত্তিক সাহিত্যকর্ম; বহুল চর্চিত গল্পগুলোকে উপস্থাপন করেছেন নিজস্ব ভঙ্গিমায়, তাঁদের কল্পনার পক্ষীরাজ উড়ে বেরিয়েছে বইয়ের পাতা জুড়ে। বাংলা চিরায়ত রূপকথার বর্ণাঢ্য গল্পগুলোই সম্পাদিত রূপে উপস্থাপন করা হলো আপনাদের সামনে। বাংলা রূপকথার কল্পরাজ্যে হারিয়ে যেতে তৈরি তো?
বেশিরভাগ বাঙালি পাঠকদের মতো আমারও ছেলেবেলায় বই পড়ার শুরুটা হয়েছিলো রূপকথার গল্পের বইগুলো পড়ে। দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে আমার পাঠ্যপুস্তকের বাইরের বই পড়া শুরু। সে সময় বাবার কিনে দেওয়া এবং আত্মীয়দের থেকে উপহার পাওয়া বইগুলোর মধ্যে সিংহভাগই থাকতো রূপকথার গল্পের বই। শুক্রবারের ছুটির দিনের সকাল, গ্রীষ্মের ছুটিতে কিংবা শীতের ছুটিতে লেপের ভেতর ঢুকে রূপকথার বইগুলোর মাঝে মুখ ডুবিয়ে রাখার স্মৃতি এখনো আমাকে নস্টালজিক করে তোলে।
গত বছরের শেষের দিকে যখন ছেলেবেলায় পড়া সেই বাংলার রূপকথা সমগ্র প্রকাশের ঘোষনা পাই বেনজিন প্রকাশন থেকে তখন থেকেই এই বইটির প্রতি আগ্রহ তৈরী হয়। অবশেষে এই বছরের বইমেলায় প্রকাশিত হয় বহুল আলোচিত 'বাংলার রূপকথা সমগ্র ১'। জেবেল খানের সম্পাদনায় বইটিতে সব মিলিয়ে মলাটবন্দী হয়েছে ৫৮টি গল্প। দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ঠাকুরমার ঝুলি, ঠাকুরদার ঝুলি, ঠানদিদির থলে, দাদামশায়ের থলে, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের ঠানদিদির থলে, সিরাজ তরফদারের দাদামশায়ের থলে এভাবে ক্যাটাগরি করে প্রত্যেকের গল্প এক জায়গায় লিপিবদ্ধ হয়েছে। বোনাস হিসেবে আছে দীনেশচন্দ্র সেনের কাজল রেখা এবং জসীমউদ্দীনের ডালিমকুমার গল্পদুটি।
৫৫২ পৃষ্ঠার এই বইটি আমি পড়া শুরু করেছিলাম প্রায় ১ মাস আগে। আস্তে ধীরে রয়ে সয়ে পড়ছিলাম এবং নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছিলাম। সেই রাজা - রানী, রাজকুমার - রাজকন্যা, ব্যঙমা - ব্যঙমী, মৎসকন্যা, ব্রাহ্মণ - ব্রাহ্মণী, রাক্ষস - রাক্ষসীদের কাহিনীগুলো আমাকে ছেলেবেলায় ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো বারংবার। এক মলাটের ভেতর এতগুলো গল্পের সংকলন সত্যিই প্রশংসার দাবীদার।
এত্তগুলো পৃষ্ঠার এত্ত বড় সাইজের একটা বই ঘরে - বাইরে সব জায়গায় নিয়ে পড়েছি। ভয় পাচ্ছিলাম এত টানা হেঁচড়ায় বইয়ের অবস্থার না বারোটা বাজে! কিন্তু বাঁধাই সুন্দর হওয়ায় এবং উপরের ডাস্ট কভার শক্ত হওয়ায় বইখানা এখন অব্দি ঠিকঠাক আছে এত্ত টানা হেঁচড়ার পরও।
সজল চৌধুরী ভাইয়ের প্রচ্ছদ চমৎকার হয়েছে। এত্ত সুন্দর কাঁথা ফোঁড়ের স্টাইলে প্রচ্ছদ হতে পারে এমনটা ভাবিনি আগে। বইয়ের ভেতরের ছবিগুলোও সুন্দর। কিন্তু কিছু কিছু পৃষ্ঠা যেমন ৯, ৭৬, ৮৬ এর ছবিগুলো কিঞ্চিৎ ঝাপসা ঠেকেছে আমার কাছে। তবে সব কিছু মিলিয়ে বাংলার রূপকথা সমগ্র ১ চমৎকার সংগ্রহে রাখার মতো একটি বই। অপেক্ষায় আছি বাংলার রূপকথা সমগ্র ২ এর জন্য!
এক নজরে: বইয়ের নাম: বাংলার রূপকথা সমগ্র ১ লেখক: দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, সিরাজ তরফদার, দীনেশচন্দ্র সেন, জসীমউদ্দীন সম্পাদক: জেবেল খান প্রচ্ছদ: সজল চৌধুরী প্রকাশনী: বেনজিন প্রকাশন পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৫৫২ প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারী, ২০২৫ মূদ্রিত মূল্য: ১১০০ টাকা