কবি আবুল হাসান ছিলেন ষাট ও সত্তরের দশকে বাংলাদেশের প্রধান কবিদের একজন।
১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ার বর্ণিগ্রামে তাঁর জন্ম। এটি ছিল তাঁর মাতুলালয়। পৈতৃক নিবাস ছিল পিরোজপুর জেলার নাজিরপুরের ঝনঝনিয়া গ্রামে। বাবা ছিলেন পুলিশ অফিসার। নাম আলতাফ হোসেন মিয়া। আবুল হাসানের প্রকৃত নাম ছিল আবুল হোসেন মিয়া। কিন্তু আবুল হাসান নামেই তিনি লেখালেখি করতেন, আর এ নামেই স্মরণীয় হয়ে আছেন।
আবুল হাসান এসএসসি পাস করেন ১৯৬৩ সালে ঢাকার আরমানিটোলা সরকারি বিদ্যালয় থেকে। তারপর বরিশালের বিএম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক। ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইংরেজিতে অনার্স পড়ছেন আর পাশাপাশি চলছে কবিতা লেখা, সাহিত্যসংগ্রাম।
এ সময়ই তাঁর সাহিত্য-চেতনা ও রাজনৈতিক-চেতনা বিকশিত হয়ে ওঠে। গণমানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখেন তিনি। ছাত্র হিসেবে ছিলেন মেধাবী। কিন্তু অনার্স পরীক্ষা দেননি। ১৯৬৯ সালে যোগ দিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তা বিভাগে। সাংবাদিকতায় মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর ছিলেন গণবাংলা (১৯৭২-৭৩) এবং দৈনিক জনপদের (১৯৭৩-৭৪) সহকারী সম্পাদক। মাত্র ২২ বছর বয়স থেকেই তিনি ছিলেন খ্যাতিমান কবি, ঢাকা শহরের আলোচিত তরুণ। ব্যক্তিজীবনেও স্বকীয়তায় ভাস্বর প্রেম, দ্রোহ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে। ১৯৭০ সালে এশীয় কবিতা প্রতিযোগিতায় প্রথম হন তিনি। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর কাব্যগ্রন্থ রাজা যায় রাজা আসে, ১৯৭৪-এ যে তুমি হরণ করো এবং ১৯৭৫-এ সব শেষে পৃথক পালঙ্ক।
কবিতায় বলিষ্ঠ মানুষটি শারীরিকভাবে ছিলেন কিছুটা দুর্বল। হৃদযন্ত্রের সমস্যা ছিল তাঁর। অসুস্থতা তাঁকে ক্রমেই নিয়ে যেতে থাকে মৃত্যুর দিকে। ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর কবিতা ও ভালোবাসা ছেড়ে তাঁর যাত্রা অনন্তলোকের দিকে।
তাঁর কাব্যনাট্য ওরা কয়েকজন (১৯৮৮) এবং আবুল হাসান গল্প সংগ্রহ (১৯৯০) প্রকাশিত হয়েছে মৃত্যুর অনেক পর। কবিতার জন্য তিনি মরণোত্তর বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৭৫) এবং একুশে পদক (১৯৮২) পেয়েছেন। আবুল হাসানের কবিতা আধুনিক বাংলা কবিতায় নিয়ে এসেছিল নতুন সড়ক, নতুন আবহ। আধুনিক নাগরিক, মানুষের নিঃসঙ্গতা, যন্ত্রণা, মৃত্যু চেতনা, বিচ্ছিন্নতা তাঁর কলমে পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
কবি আবুল হাসান অনেক অবিস্মরণীয় কবিতার জনক। তিনি আজও জনপ্রিয়, বহুল পঠিত।
আবুল হাসানের "যে তুমি হরণ করো" কাব্যগ্রন্থটি মূলত এক গভীর বিষাদ, প্রেম এবং আত্মদহনের মহাকাব্য। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত এই বইটিতে কবি তার হৃদয়ের নিভৃত যন্ত্রণা ও একাকিত্বকে অত্যন্ত নিপুণভাবে শব্দবন্দী করেছেন। কাব্যগ্রন্থটির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে বিচ্ছিন্নতাবোধ আর না-পাওয়ার হাহাকার, যা পাঠককে এক মায়াবী বিষণ্ণতার জগতে নিয়ে যায়।
এ ভ্রমন আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া তোমার ওখানে যাবো, তোমার ভিতরে এক অসম্পূর্ণ যাতনা আছেন, তিনি যদি আমাকে বলেন, তুই শুদ্ধ হ', শুদ্ধ হবো কালিমা রাখবো না!
ক্ষণজন্মা আবুল হাসানের প্রকাশিত তিনটি মাত্র কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয়টি এটি, প্রকাশকাল ১৯৭৪। নিঃসঙ্গতা (অতটুকু চায়নি বালিকা), তোমার চিবুক ছোঁবো কালিমা ছোঁবো না- এরকম বিখ্যাত কিছু কবিতা এই কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেন নির্মলেন্দু গুণকে, লিখেছেন এভাবেঃ "আমরাই তো একমাত্র কবি/আমার উদ্বাস্তু-উন্মুল যৌবন সঙ্গী নির্মলেন্দু গুণকে।"
'যে তুমি হরন করো'-র আবুল হাসান একচ্ছত্র 'রাজা যায় রাজা আসে'-র আবুল হাসান নন। রোমান্টিকতার মিশেলে কবিমানসের পরিণতবোধ তথা সার্বজনীন মানবিকতার আকুতি প্রতিধ্বনিত হয়েছে প্রায় সব কবিতাতেই। কিন্তু তারপরেও যে 'তুমি' হরণ করেছে আবুল হাসানকে তার পরিচয় জিজ্ঞাসিত হয়েছে বিভিন্ন মাত্রায়ঃ
"যেমন পথ ভুললে পথিক আর পথিক থাকে না, হয় ক্লান্ত মানুষ! যেমন ভিক্ষুকের পয়সা আমার পয়সার সাথে কখনো মেলে না। ... আজ আমিও কি তাই?... নাকি পাকচক্রে অন্য কিছু অন্য কোনো কিছু?" [দ্বৈতদ্বন্দ]
অথবা,
"তুমি প্রেমহীন পুরুষের ক্লান্তিবোধ নও, ... আমার অরণ্য বিদ্যা তুমি হে বনানী হে আমার আম্রকানন হাটুরে পায়ের চিহ্ন লেগে থাকা হে আমার ঘরে ফেরা পথ তুমি ধান ভানো, গান গাও,আজো কোলে শিশু ডেকে আনো!" [আশ্রয়]
আবুল হাসানের তিনটি কাব্যগ্রন্থ। সবগুলো দারুণ। এই কাব্যগ্রন্থ এই নিয়ে কতবার পড়লাম জানিনা। যতবার ই পড়ি আলাদা আবিস্কার।
নিঃসঙ্গতা
অতটুকু চায়নি বালিকা! অত শোভা, অত স্বাধীনতা! চেয়েছিল আরো কিছু কম,
আয়নার দাঁড়ে দেহ মেলে দিয়ে বসে থাকা সবটা দুপুর, চেয়েছিল মা বকুক, বাবা তার বেদনা দেখুক!
অতটুকু চায়নি বালিকা! অত হৈ রৈ লোক, অত ভীড়, অত সমাগম চেয়েছিল আরো কিছু কম!
একটি জলের খনি তাকে দিক তৃষ্ণা এখনি, চেয়েছিল
একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!
এই কবিতাটা আমি অনেকবার আবৃত্তি করেছি। বালিকার মনের আকুতি ছাপিয়ে বাবা মা এবং কুমারী রসায়ন সর্বকালীন হয়েছে। এই হল আবুল হাসানের কবিতার ম্যাজিক। শব্দচয়ন।
আবুল হাসানের কবিতাকে একটা নির্দিষ্ট ফ্রেমের মধ্যে বন্দি করে রাখা যায় না। এত বিস্তৃতি যে তার মধ্যে, থমকে যেতে হয়। যদিও অনেক কবিতার ভাবগত মিল আছে স্বাভাবিকভাবে, কিন্তু, রচনার প্রকৃতিতে সেগুলোর মাঝে সীমাবদ্ধতা পাওয়া যায় না। কখনোই মনে লাগে না, কবি একই জিনিস একাধিক বার বা বার-বার লিখছেন।
আমার এখন চাঁদ দেখতে খারাপ লাগে পাখির জুলুম, মেঘের জুলুম, খারাপ লাগে কথাবার্তায় দয়ালু আর পোশাকে বেশ ভদ্র মানুষ খারাপ লাগে, এই যে মানুষ মুখে একটা মনে একটা.... খারাপ লাগে খারাপ লাগে....
"এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া/ এখন তোমার কাছে যাবো/ তোমার ভিতরে এক সাবলীল শুশ্রূষা আছেন/ তিনি যদি আমাকে বলেন, তুই ক্ষত মোছ আকাশে তাকা–/ আমি ক্ষত মুছে ফেলবো আকাশে তাকাবো/ আমি আঁধার রাখবো না! [আবুল হাসান/যে তুমি হরণ করো, ১৯৭৪]