তন্দ্রাবিলাস' হুমায়ূন আহমেদ এর মিসির আলি চরিত্রভিত্তিক ১১ নম্বর উপন্যাসিকা। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে লেখক তার মিসির আলি চরিত্রের মাধ্যমে মানুষের অদ্ভুত আচরণ এবং অস্বাভাবিক ক্ষমতার যৌক্তিক কারণ উপস্থাপন করেছেন। অবচেতন মনের কল্পনার সাথে পরাবাস্তব জগতের গল্প তন্দ্রাবিলাসের মুখ্য বিষয়বস্তু।
তবে যে বয়সে হুমায়ূন আহমেদের এই বই পড়ার কথা না, ঠিক তেমন বয়সেই তন্দ্রাবিলাস পড়া হয়েছিল আমার। ক্লাস টু অথবা থ্রি'তে পড়ি তখন। বড় বোনের হুমায়ূনপ্রীতির কারণে বাসার বুকশেলফে বেশকিছু বই ছিলো। আমি টুকটাক কমিকস, ভূতের গল্প আর রুপকথার বই পড়তাম। কোন এক সন্ধ্যায় গা কেঁপে জ্বর এলো; যতদূর মনে পড়ে রাত দশটার পর আব্বুর কোলে করে ডাক্তারের চেম্বার থেকে বাসায় ফিরেছিলাম। সেই রাতে আবার তুমুল ঝড়বৃষ্টি, অত:পর এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন। তখন আইপিএস,জেনারেটরের যুগ ছিল না। ঘরে ঘরে চার্জার লাইট, মোমবাতি, ল্যাম্প জাতীয় জিনিসই ছিল একমাত্র ভরসা। ঘুম আসছিল না কিছুতেই। পানি খেতে উঠে কী মনে করে যেন শেলফ থেকে তন্দ্রাবিলাস বইটা বের করে পড়তে শুরু করলাম...
আট/দশ বছরের বালকের মাথায় প্যারানরমাল মিস্ট্রি কী বস্তু অথবা হুমায়ূন সাহিত্যের মাহাত্ম্য জাতীয় জটিল বিচার বিশ্লেষণ জ্ঞান থাকার কথা নয়। ওই বয়সের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে আমি বলব, বইটা শুরু করার পর ভালোই লাগছিলো পড়তে। ঝড়বৃষ্টির রাতে চার্জার লাইটের মিটমিটে আলোয় যখন দেয়ালে দীর্ঘ ছায়া পড়ে, তখন আপাতদৃষ্টিতে ভৌতিক একটা বই পড়তে ভালো না লাগাটাই বরং অস্বাভাবিক! একটানা কতক্ষণ পড়েছিলাম মনে নেই, তবে পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম-সে বিষয়ে নিশ্চিত।
জ্বরের কারণে পরেরদিন স্কুলে যাওয়া হলো না। আমার মাথায় ততক্ষণে মিসির আলি জোরেসোরে চেপে বসেছে। একটা মেয়ে হঠাত মিসির আলি সাহেবের বাসায় উপস্থিত হয়ে বড়সড় একটা চিঠি দিয়ে গায়েব হয়ে গেলো। তারপর সেই চিঠিতে তার স্মৃতিচারণের মাধ্যমে একাধিক ভৌতিক ঘটনার বর্ণনা শুরু হলো- অনেক কিছু না বুঝলেও এটুকু ঠিকই বুঝেছিলাম। আর এ-ও বুঝেছিলাম যে, ভয়ের চোটে বারবার ঘেমে যাচ্ছি! (ঘামটা অবশ্য প্যারাসিটামলের প্রতিক্রিয়া হিসেবেও হতে পারে!)। সেই ভয় এতোটাই বিশুদ্ধ ছিল যে, এরপর কয়েকদিন একা একা বাথরুমে যেতেও গা কাপতো! বক্স খাটে শুয়ে মনে হতো, নিচে কুকুরের মতো উবু হয়ে শরীফা বসে নেই তো? বারান্দায় কোন মৃত আত্মা ঘুরে ঘুরে আমার ওপর নজর রাখছে না তো?
তন্দ্রাবিলাস বইটা আমি পরবর্তীতে কম করে হলেও দশ থেকে বারোবার পড়েছি। ততোদিনে বয়স হয়েছে, বুদ্ধি হয়েছে, মিসির আলীকে ভালোভাবে চিনেছি, হুমায়ূন আহমেদকে আরও কাছ থেকে জেনেছি। ছোটবেলার আধো আধো উপলব্ধি আর ধোঁয়াটে কুয়াশাও কেটে গিয়েছে। কিন্তু কাটেনি সেই মুগ্ধতা। অতিপ্রাকৃত সেই গল্পটা পড়ে প্রথমবার যে ভয় পেয়েছিলাম, তাও বিন্দুমাত্র কমেনি।
টিপিকাল প্যারানরমাল মিস্ট্রির সাথে মিসির আলীর বইগুলোর একটা বড় ধরনের পার্থক্য আছে। মিসির আলি অনেক ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত অতিপ্রাকৃত ঘটনাগুলোর বৈজ্ঞানিক অথবা যুক্তিবাদী ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। তবুও রহস্য থেকে যায়... "চিরকাল এইসব রহস্য আছে নীরব, রুদ্ধ ওষ্ঠাধর..."
তন্দ্রাবিলাসের ক্ষেত্রেও সেই একই কথা প্রযোজ্য। তবে একটা অভিযোগ থেকেই যায়। অনেক প্রশ্নের উত্তর না পেলেও মিসির আলীতে আমি বরাবরই সন্তুষ্ট থাকি। তবে তন্দ্রাবিলাসের শেষটায় আমার মন ভরেনি। অতীত থেকে বর্তমানে এসে দুই/তিন পাতায় যবনিকা টানলে কি আর স্বস্তি পাওয়া যায়?