প্রবল প্রতিবাদ-উৎসাহ-গোলযোগের মাঝে এক শ্যামাঙ্গ যুবক নির্বিকারে লক্ষ্যভেদ করে জয় করে নিলেন পরমাসুন্দরী রাজকন্যাকে। মহাভারতের সবচেয়ে নাটকীয় দৃশ্য সম্ভবত এটাই। একের পর এক নাটকীয়তা তখন। কে এই ব্রাহ্মণ যুবক? পরিচয় জানা গেলো, ভাগও হলেন যাজ্ঞসেনী।
এর মধ্য দিয়েই মনের অবস্থারও একের পর এক পরিবর্তন ঘটে চলেছে অর্জুন-দ্রৌপদী দুজনেরই।
সেই কৃষ্ণা দ্রৌপদী পাঞ্চালী। যাঁর প্রতিটা নামই বহন করে এক একটি পরিচয়। যাঁর উদ্ভব থেকে পতন প্রায় সবই এক অত্যাশ্চর্যে মোড়া ব্যঞ্জনায় গাঁথা।
বাণী বসু আলোকপাত করেছেন তাঁর অনার্য জন্মের সম্ভাবনার দিকে। দ্রৌপদীর সাথে সাথেই আলোচিত হয়েছেন পরাক্রমশালী অথচ পিতৃতান্ত্রিক ভীষ্ম, প্রায় ক্লীব এবং নিষ্কর্মা যুধিষ্ঠির, সম্ভাবনাময় অথচ ঈর্ষাকাতর দুর্যোধন, বুদ্ধিমান কৌশলী কৃষ্ণ এবং মানসিক এবং শারীরিক উভয়ক্ষেত্রেই অসামান্য শক্তির অধিকারী পার্থ।
আজো আমাকে দুঃখ দেয় অর্জুন-দ্রৌপদীর বিচ্ছেদ, দুঃখ দেয় দুজনের মনের না বলা গহীন অভিমান, দুঃখ দেয় দূরে দূরে থেকে গড়ে ওঠা এক অব্যক্ত ভালোবাসা, যা ঈর্ষাকাতর করেছিল জৈষ্ঠ পাণ্ডবকেও।
পুরো মহাভারতে কৃষ্ণ আর দ্রৌপদীর মতো চমৎকার সম্পর্ক আর দেখা যায় না। এই অংশটি সবচেয়ে স্মার্ট, ব্যাসদেবের তীক্ষ্ণ, বিচক্ষণ লেখনী এত যুগ আগেও এই মনোরম সম্পর্কটি কীভাবে আবিষ্কার করেছিল ভাবতে অবাক লাগে।
একই সাথে সুকৌশলে সকল প্রধান চরিত্র, তিনি নিজে, সত্যবতী, কৃষ্ণ, দ্রৌপদী, অর্জুন সকলকে তিনি কিন্তু অনার্যই হওয়ার ইঙ্গিত রেখেছিলেন, এক ধরনের দ্রোহ বটে!
মহাভারতের প্রাসঙ্গিকতা এই সমাজে সম্ভবত কখনো ফুরাবে না। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সময় তাঁর সকল স্বামীসহ প্রবল পুরুষদের নিশ্চেষ্ট দাঁড়িয়ে থাকা কী আজো আমাদের সমাজের এক বিশেষ দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দেয় না?