'চিত্রনাট্য লেখা, ক্যামেরায় চোখ রাখা, এডিটিং, লেখালেখি, লিমেরিক তৈরি, সঙ্গীত পরিচালনা করা, ডিজাইনিং, স্কেচ করা, নতুন টাইপফেস তৈরি করা, এবং সবশেষে চলচ্চিত্র পরিচালনা করা―এক কথায় ওয়ান ম্যান আর্মি ছিলেন মানিকদা।’ এই বই সত্যজিতের স্নেহের মানুষ তথা সিনেমার নায়ক বরুণ চন্দ-র অন্তরঙ্গ অভিজ্ঞতায় উজ্জ্বল এমন এক আশ্চর্য দলিল, যা সত্যজিৎ রায়ের জীবন ও কর্মকাণ্ডের ওপর এক নতুন আলো ফেলবে। আমরা নিশ্চিত, দুষ্প্রাপ্য ছবিতে সমৃদ্ধ এই বই সত্যজিৎপ্রেমীদের কাছে এক অমূল্য সংগ্রহ হয়ে থাকবে।
"সম্পূর্ণ নির্দ্বিধায় আমি আমার তৈরি চলচ্চিত্রগুলোকে একান্তভাবে আমারই তৈরি বলে দাবি করতে পারি। এইসব সিনেমায় ভালো-মন্দ যাই থাক, তার জন্য দায়ী একমাত্র আমি... আমার এভাবে ভাবতেই ভালো লাগে।" - সত্যজিৎ রায়।
সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে অসংখ্য লেখা হয়েছে, হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে এবং তাঁর কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘সীমাবদ্ধ’ (১৯৭১)-এর ৫০ বছর পূর্তির আবহে বইটি মূলত তাঁর ইংরেজি গ্রন্থ ‘Satyajit Ray: The Man Who Knew Too Much’-এর অনুসরণে বাংলায় রচিত হওয়া 'সত্যজিৎ কথা’ পড়তে পড়তে একটা জিনিস খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে - এ বই কেবল সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে লেখা নয়, বরং তাঁর কাজ করার ভেতরের মানুষটিকে বুঝে ওঠার এক আন্তরিক প্রচেষ্টা। এটি কোনো প্রচলিত জীবনী নয়, আবার নিছক স্মৃতিচারণাও নয়, বরং একজন শিল্পীর নির্মাণপ্রক্রিয়ার দরজাটা পাঠকের জন্য একটু খুলে দেওয়া।
১৯৭১ সালের বাংলা সিনেমার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা ‘সীমাবদ্ধ'-তে একেবারে নতুন, অনভিজ্ঞ একজন যুবককে শ্যামলেন্দু রূপে কীভাবে সত্যজিৎ রায় ক্যামেরার সামনে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিলেন, সেই বর্ণনাগুলো বইয়ের সবচেয়ে উপভোগ্য অংশ। শ্যামলেন্দুর চশমা কেমন হবে, শার্ট-প্যান্টের রং কেমন, চুল আঁচড়ানোর ধরন কী - এমনকি চরিত্রের হাঁটার ভঙ্গি পর্যন্ত যে পরিচালক নিজে ভেবে দিতেন, তা পড়লে বিস্মিত হতে হয়। আসলে সত্যজিৎ রায় তো শুধু সিনেমা বানাতেন না, চরিত্রের ভেতরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতেন।
বইটির অন্যতম আকর্ষণ এই যে, বরুণ চন্দ অন্ধ ভক্তের মতো লেখেননি, বরং এক গভীর মুগ্ধতা নিয়েও তিনি বিশ্লেষণ করেছেন অত্যন্ত সংযত ও নিরপেক্ষ ভঙ্গিতে। জানিয়েছেন তার ব্যক্তিগত মতপার্থক্যের জায়গাগুলোও; সে মৃণাল সেনের সাথে সত্যজিৎ রায়ের বিতর্কে জড়ানো হোক বা নিজের ইউনিটের সদস্যদের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস। একদিকে নিখুঁত শটের জন্য নির্মম রকমের আপসহীন শিল্পী, অন্যদিকে সহকর্মীদের প্রতি অসাধারণ সংবেদনশীল মানুষ। অনিল চৌধুরীর সেই মন্তব্য - “নিজের সৃষ্টির মধ্যে কোনো মিথ্যা সহ্য করতে পারতেন না” - বইয়ের প্রায় প্রতিটি অধ্যায়ে যেন সত্যি হয়ে ওঠে। বিশেষ করে অভিনেতা পরিচালনার প্রসঙ্গগুলো পড়তে পড়তে বোঝা যায়, সত্যজিৎ প্রত্যেক অভিনেতার জন্য আলাদা পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। তাঁর কোনো বাঁধাধরা নিয়ম ছিল না; বরং মানুষকে বুঝে নেওয়ার আশ্চর্য ক্ষমতাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই এখানে আমরা যেমন পাই শুটিং ফ্লোরের গল্প, তেমনই পাই একজন চলচ্চিত্রকারের চিন্তার ভিতর ঢুকে পড়ার সুযোগ।
বইটির আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো এটি অত্যন্ত সহজভাবে তুলে ধরেছে বইপোকা সত্যজিৎকেও। তাঁর বিশাল লাইব্রেরি, কাজের প্রস্তুতি, দৃশ্য নির্মাণের পদ্ধতি, ডি সিকার ‘বাইসাইকেল থিফ’-এর প্রভাব এবং নিও-রিয়ালিস্ট ধারার প্রতি সত্যজিতের বিশ্বাসের কথা - সব অংশগুলোই চিত্রনাট্যকার সত্যজিৎকে, ক্যামেরার পেছনের সত্যজিৎকে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় করে তোলে।
প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে সত্যজিৎ রায়ের উদ্ধৃতি ব্যবহারের ভাবনাটিও দারুণ। এছাড়া বইয়ে সংযোজিত দুর্লভ ছবিগুলি নিছক অলংকার নয়, বরং সময়ের দলিল। শর্মিলা ঠাকুর, চুনিবালা দেবী, ছবি বিশ্বাস, সন্তোষ দত্ত, কামু মুখার্জিদের উপস্থিতি বাংলা সিনেমার এক সোনালি সময় আরও জীবন্ত করে তোলে।
সবচেয়ে বড় কথা, বরুণ চন্দের ভাষা অত্যন্ত সহজ অথচ মায়াময়, কোথাও অতিনাটকীয়তা নেই। কিছু তথ্য বা প্রসঙ্গ পুনরাবৃত্ত হলেও তা কখনও বিরক্তিকর লাগে না। বইয়ে উল্লিখিত তথ্য, উক্তিগুলো নিয়েই একটা স্বতন্ত্র সিরিজ করে ফেলা সম্ভব, করবোও হয়তো। তবে পড়তে পড়তে বোঝা যায়, শুধুই বাংলা সাহিত্য-সিনেমা জগতে তাঁকে Maestro মানা হয় না!!