তাঁর জন্ম এবং বড় হওয়া হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর উপাধি অর্জনের পরে তিনি রাজ্য সরকারের অধীনে আধিকারিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ দুই-দশকের লেখক-জীবনে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক এবং কিশোর-সাহিত্য, উভয় ধারাতেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তিনি যখন গল্প-উপন্যাস লেখেন, তখন ঘটনার বিবরণের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন মানব-মনের আলোছায়াকে তুলে আনার বিষয়ে। লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি। তাঁর বহু কাহিনি রেডিও-স্টোরি হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে সমাদর পেয়েছে। সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন দীনেশচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার এবং নান্দনিক সাহিত্য সম্মান।
গল্পগুলো ভাল। বিশেষ করে ভাল লেগেছে এজি বেঙ্গলের হেড ক্লার্ক জয়দেব বাবুর গোয়েন্দাগিরি। বাংলা ভাষার ইদানিংকার অনেক ফালতু অহেতুক গোয়েন্দাদের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য এবং আদরণীয় চরিত্র। আশা করা যায় এনাকে নিয়ে ভবিষ্যতে স্বতন্ত্র উপন্যাস পাওয়া যাবে। রেটিং সাড়ে তিন।
এই বইয়ের আসল সম্পদ হচ্ছে এর ডিটেকটিভ আর থ্রিলার গুলি। ডার্ক ফ্যান্টাসি লেখা গুলো এতটা ভালো লাগেনি যতটা সৈকত স্যার এর ' নোনা বালি চোরা টান' আর 'ঈশ্বরের নষ্ট ভ্রূণ' এর লেখা গুলো পড়ে ভালো লেগেছিল।
একই বইয়ে কোনো লেখককে চাররকম ভাবে খুঁজে পাওয়া যেমন দুষ্কর, তার চেয়েও দুষ্কর বোধহয় ওই চাররকমের লেখনীতেই পাঠকের মন জয় করে নেওয়া । ডার্ক ফ্যান্টাসি, অলৌকিক, থ্রিলার, আর ডিটেক্টিভ— চারটে ঘরানাতেই কোনো লেখকের পক্ষে সিদ্ধহস্ত হওয়া মুখের কথা নয় । বিশেষতঃ যদি সেই চারটে ঘরানাকেই একই বইতে পাঠকের কাছে উপস্থাপনার মতো প্রয়াস করা হয়, তখন একটা বাড়তি সংশয় দেখা দেয় যে এরা একে-অপরের সাথে যাবে তো? বস্তুতঃ বইয়ের সূচিপত্রে চোখ রেখেই এই প্রশ্নটাই সবার আগে আমার মাথায় এসেছিলো । ডার্ক ফ্যান্টাসির স্বাদ নেওয়ার পর অলৌকিক যদিও বা উৎরে যায়, ডিটেক্টিভ গল্প কি ম্যাড়মেড়ে হয়ে যাবে না?
কিন্তু না, হয়ে যায়নি । চারটে ঘরানার গল্পই উৎরে গিয়েছে শুধু নয়, একেবারে বিয়েবাড়ির ভোজের মতোই মানিয়ে গিয়েছে । শুরুতে "বাবাই হরবোলার লাস্ট শো" দিয়ে লেখক পাঠকের আশাকে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, শেষ গল্প "বিষদৃষ্টি"ও সেই উচ্চাশা পূরণে সফল হয়েছে । যদিও মাঝের কিছু গল্প সামান্য ঝুলে গিয়েছে, সেগুলোকে উপেক্ষা করতে খুব কষ্ট করতে হয়নি ।
বইয়ে আছে মোট ১৮টি গল্প, যার মধ্যে ৭টি ডার্ক ফ্যান্টাসি ঘরানার, ৫টি অলৌকিক, আর ৩ টি করে থ্রিলার ও ডিটেক্টিভ । ডার্ক ফ্যান্টাসির মধ্যে "বাবাই হরবোলার লাস্ট শো"র কথা আগেই বলেছি, এছাড়া উল্লেখযোগ্য গল্পের মধ্যে আছে "একটি খারাপ মেয়ের মৃত্যু", "লোলুপ" উপন্যাসটি এবং "পলাতক আর বেবিপিসি" । বাকিগুলো মন্দ না হলেও মন কাঁড়েনি এগুলোর মতো । যারা লেখকের "নোনা বালি, চোরা টান" কিংবা "মাংস-লতার কৃষ্ণকলি" পড়েছেন তাঁরা ডার্ক ফ্যান্টাসিতে লেখকের মুন্সিয়ানার সাথে ইতিমধ্যেই পরিচিত । এই বইতেও লেখক তাঁর স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন । আর যদি না পড়ে থাকেন, তবে এই বই পড়বার পর পাঠক নিজেই লেখকের অন্যান্য ডার্ক ফ্যান্টাসি গল্পের প্রতি যে চোরা টান অনুভব করবেন সে আশ্বাস দিতে পারি ।
অলৌকিক ঘরানার মধ্যে "একটা শূন্য অ্যাকোয়ারিয়াম", "পলাতক লাশ", আর "রক্তের ব্যবস্থা" আলাদাভাবে উল্লেখ্য । "একটা শূন্য অ্যাকোয়ারিয়াম"কে অবশ্য ডার্ক ফ্যান্টাসির দলেও রাখা যেতে পারত কারণ গল্পে যা কিছুকে "অলৌকিক" বলে ভাবা যেতে পারে তা আদতেই অলৌকিক না গল্পের চরিত্র কণার অপরাধবোধে বিকৃত হয়ে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে ।
তবে পাঠক হিসেবে আমার নিজের সবচেয়ে বড় চমক লেগেছে থ্রিলার এবং ডিটেক্টিভ ঘরানার শেষ ৬টা গল্পে । প্রতিটা গল্পই টানটান উত্তেজনায় জমজমাট এবং রুদ্ধশ্বাসে পড়ে ফেলার মতো । যদিও স্বীকার করছি যে "বোবা রাজপুত্র" গল্পটা শুরুতে কোথায় যাচ্ছিলো বুঝতে পারিনি । তবে লেখক সেই সংশয় অচিরেই দূর করেছেন । আর ডিটেক্টিভ তিনটি গল্পের চরিত্র জয়দেব সরকার যেভাবে রহস্যের জট ছাড়িয়ে অপরাধীকে সনাক্ত করেছেন তাতে একটা আলাদা "জয়দেব সরকার সিরিজ"এর কথা লেখক অনায়াসে ভাবতে পারেন (যদি না ইতিমধ্যেই তিনি এই কাজটি সমাধা করে থাকেন)। রহস্যপ্রিয় বাঙালি পাঠক যে নাট্যকার-কাম-গোয়েন্দা এই চরিত্রটিকে সাদরেই বরণ করে নেবেন, এমনটা আশা করায় এই মুহূর্তে কোনো সংশয়ের কারণ দেখছি না ।
সভ্যতার প্রাগৈতিহাসিক স্মৃতিতে পশু ও বৃক্ষের সঙ্গে মানুষের আত্মীয়তার ধারণা গভীরভাবে প্রোথিত। সেই আদিম বিশ্বাস থেকেই জন্ম নিয়েছে শক্তি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা এবং অজানার প্রতি এক রহস্যময় আকর্ষণ। সৈকত মুখোপাধ্যায়ের গল্পসংকলন ‘লোলুপ’ পাঠককে সেই আদিম অন্ধকারের দিকেই ফিরিয়ে নিয়ে যায়, যেখানে বাস্তব ও কল্পনার সীমারেখা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসে।
আঠারোটি গল্প ও একটি উপন্যাসিকা নিয়ে গঠিত এই সংকলন একাধিক ঘরানায় বিচরণ করে—থ্রিলার, অলৌকিক, ডার্ক ফ্যান্টাসি ও ডিটেকটিভ। প্রতিটি গল্প যেন এক একটি স্বতন্ত্র প্রবেশদ্বার। কোথাও অতিপ্রাকৃত উপস্থিতি ভয়ের আবহ নির্মাণ করে, কোথাও মানবমনের জটিল স্তরগুলি ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়, আবার কোথাও রহস্যের বুনন পাঠককে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়।
ডার্ক ফ্যান্টাসির পরিসরে বাবাই হরবোলা বা বুল্টি নিছক গল্পের চরিত্র নয়; তারা কল্পনা ও বাস্তবের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা কোনও প্রাচীন স্মৃতির প্রতীক। তাদের ক্ষমতা, উপস্থিতি এবং নীরবতা পাঠককে একাধিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। শিরোনাম গল্প ‘লোলুপ’ ছত্তিশগড়ের এক গ্রামের রাতকে পরিণত করে এক বিভীষিকাময় আচারভূমিতে, যেখানে অন্ধকার শুধু পরিবেশে নয়, মানুষের অন্তরেও বিস্তার লাভ করে। অন্যদিকে ‘মণিরত্নের মন্দির’ পুরাণের অনুষঙ্গকে সমসাময়িক প্রেক্ষিতে নতুনভাবে পাঠযোগ্য করে তোলে।
অলৌকিক গল্পগুলিতে ভয় আসে নিঃশব্দে। ‘একটা শূন্য অ্যাকোয়ারিয়াম’ দৈনন্দিন এক বস্তুর মধ্য থেকেই অস্বাভাবিকতার জন্ম দেয়। ‘রক্তের ব্যবস্থা’ গল্পে রক্তের প্রবাহ যেন শুধু শিরার ভেতরেই নয়, সময় ও নিয়তির মধ্য দিয়েও বয়ে চলে।
থ্রিলার পর্বে ‘পরিষ্কার আত্মহত্যা’ স্বল্প পরিসরের মধ্যেই তীক্ষ্ণ প্রতিশোধের গল্প বলে। ‘বরফ পাহাড়ের আগুন’ নিয়ে যায় হিমাচলের দুর্গম পাহাড়ে এক রুদ্ধশ্বাস অভিযানে, আর ‘বোবা রাজপুত্র’ নামের মধ্যেই বহন করে তার রহস্য ও উত্তেজনার ইঙ্গিত।
ডিটেকটিভ গল্পগুলিতে পরিচয় ঘটে জয়দেব সরকারের সঙ্গে—একজন নাট্যকর্মী, যিনি মানুষের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সূক্ষ্ম অসংগতিগুলি অনায়াসে পড়ে নিতে পারেন। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ভাঁজে ভাঁজেই তিনি খুঁজে পান রহস্যের মূল সূত্র।
লেখকের বর্ণনাশৈলী সংযত অথচ আবহঘন। পরিবেশ নির্মাণে তাঁর দক্ষতা লক্ষণীয়। গল্পের গতি কখনও ধীর, কখনও দ্রুত হলেও প্রতিটি ক্ষেত্রেই পাঠককে ধরে রাখার ক্ষমতা বজায় থাকে।
ডার্ক থ্রিলার, অলৌকিক ও ডিটেকটিভ সাহিত্যের পাঠকদের জন্য ‘লোলুপ’ একটি উল্লেখযোগ্য সংকলন। ভয়, রহস্য ও মানবমনের অন্ধকার প্রবৃত্তিকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই গল্পগুলি পাঠশেষে পাঠককে শুধু রোমাঞ্চিতই করে না, ভাবনার দিকেও ঠেলে দেয়।
LOLUP IS GENRE BENDING ONE OF THE BEST BOOKS OF 2025 BE IT DARK FANTASY THRILLER HORROR AND DETECTIVE THE MASTER STORYTELLER HAS WEAVED HIS MAGIC. একটি খারাপ মেয়ের মৃত্যু ,লোলুপ ,একটা শূন্য অ্যাকোয়ারিয়াম,পরিষ্কার আত্মহত্যা, বিষদৃষ্টি ARE MY FAVORITES