একই বইয়ে কোনো লেখককে চাররকম ভাবে খুঁজে পাওয়া যেমন দুষ্কর, তার চেয়েও দুষ্কর বোধহয় ওই চাররকমের লেখনীতেই পাঠকের মন জয় করে নেওয়া । ডার্ক ফ্যান্টাসি, অলৌকিক, থ্রিলার, আর ডিটেক্টিভ— চারটে ঘরানাতেই কোনো লেখকের পক্ষে সিদ্ধহস্ত হওয়া মুখের কথা নয় । বিশেষতঃ যদি সেই চারটে ঘরানাকেই একই বইতে পাঠকের কাছে উপস্থাপনার মতো প্রয়াস করা হয়, তখন একটা বাড়তি সংশয় দেখা দেয় যে এরা একে-অপরের সাথে যাবে তো? বস্তুতঃ বইয়ের সূচিপত্রে চোখ রেখেই এই প্রশ্নটাই সবার আগে আমার মাথায় এসেছিলো । ডার্ক ফ্যান্টাসির স্বাদ নেওয়ার পর অলৌকিক যদিও বা উৎরে যায়, ডিটেক্টিভ গল্প কি ম্যাড়মেড়ে হয়ে যাবে না?
কিন্তু না, হয়ে যায়নি । চারটে ঘরানার গল্পই উৎরে গিয়েছে শুধু নয়, একেবারে বিয়েবাড়ির ভোজের মতোই মানিয়ে গিয়েছে । শুরুতে "বাবাই হরবোলার লাস্ট শো" দিয়ে লেখক পাঠকের আশাকে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, শেষ গল্প "বিষদৃষ্টি"ও সেই উচ্চাশা পূরণে সফল হয়েছে । যদিও মাঝের কিছু গল্প সামান্য ঝুলে গিয়েছে, সেগুলোকে উপেক্ষা করতে খুব কষ্ট করতে হয়নি ।
বইয়ে আছে মোট ১৮টি গল্প, যার মধ্যে ৭টি ডার্ক ফ্যান্টাসি ঘরানার, ৫টি অলৌকিক, আর ৩ টি করে থ্রিলার ও ডিটেক্টিভ । ডার্ক ফ্যান্টাসির মধ্যে "বাবাই হরবোলার লাস্ট শো"র কথা আগেই বলেছি, এছাড়া উল্লেখযোগ্য গল্পের মধ্যে আছে "একটি খারাপ মেয়ের মৃত্যু", "লোলুপ" উপন্যাসটি এবং "পলাতক আর বেবিপিসি" । বাকিগুলো মন্দ না হলেও মন কাঁড়েনি এগুলোর মতো । যারা লেখকের "নোনা বালি, চোরা টান" কিংবা "মাংস-লতার কৃষ্ণকলি" পড়েছেন তাঁরা ডার্ক ফ্যান্টাসিতে লেখকের মুন্সিয়ানার সাথে ইতিমধ্যেই পরিচিত । এই বইতেও লেখক তাঁর স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন । আর যদি না পড়ে থাকেন, তবে এই বই পড়বার পর পাঠক নিজেই লেখকের অন্যান্য ডার্ক ফ্যান্টাসি গল্পের প্রতি যে চোরা টান অনুভব করবেন সে আশ্বাস দিতে পারি ।
অলৌকিক ঘরানার মধ্যে "একটা শূন্য অ্যাকোয়ারিয়াম", "পলাতক লাশ", আর "রক্তের ব্যবস্থা" আলাদাভাবে উল্লেখ্য । "একটা শূন্য অ্যাকোয়ারিয়াম"কে অবশ্য ডার্ক ফ্যান্টাসির দলেও রাখা যেতে পারত কারণ গল্পে যা কিছুকে "অলৌকিক" বলে ভাবা যেতে পারে তা আদতেই অলৌকিক না গল্পের চরিত্র কণার অপরাধবোধে বিকৃত হয়ে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে ।
তবে পাঠক হিসেবে আমার নিজের সবচেয়ে বড় চমক লেগেছে থ্রিলার এবং ডিটেক্টিভ ঘরানার শেষ ৬টা গল্পে । প্রতিটা গল্পই টানটান উত্তেজনায় জমজমাট এবং রুদ্ধশ্বাসে পড়ে ফেলার মতো । যদিও স্বীকার করছি যে "বোবা রাজপুত্র" গল্পটা শুরুতে কোথায় যাচ্ছিলো বুঝতে পারিনি । তবে লেখক সেই সংশয় অচিরেই দূর করেছেন । আর ডিটেক্টিভ তিনটি গল্পের চরিত্র জয়দেব সরকার যেভাবে রহস্যের জট ছাড়িয়ে অপরাধীকে সনাক্ত করেছেন তাতে একটা আলাদা "জয়দেব সরকার সিরিজ"এর কথা লেখক অনায়াসে ভাবতে পারেন (যদি না ইতিমধ্যেই তিনি এই কাজটি সমাধা করে থাকেন)। রহস্যপ্রিয় বাঙালি পাঠক যে নাট্যকার-কাম-গোয়েন্দা এই চরিত্রটিকে সাদরেই বরণ করে নেবেন, এমনটা আশা করায় এই মুহূর্তে কোনো সংশয়ের কারণ দেখছি না ।