১৮৭১ সালের এপ্রিল মাস। চাটগাঁ শহরে বদলি হয়ে এসেছেন তরুণ ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নবীনচন্দ্র সেন। জমিদার গোলকচন্দ্র রায়ের কাছ থেকে দশ হাজার টাকা চাঁদা নিয়ে চালু করেছেন অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া চট্টগ্রাম কলেজ। ঘটনাচক্রে সদ্য এন্ট্রান্স পাশ এক তরুণের সঙ্গে পরিচিত হলেন, রক্ষণশীল পরিবারের বাধার কারণে যে কলেজে পড়ার সুযোগ পায়নি। সেই তরুণের জন্য নবীনচন্দ্র খুলে দিলেন স্কটিশ শিক্ষক আরভিন রসের ব্যক্তিগত লাইব্রেরির দরজা। নিজের অজান্তেই জন্ম দিতে চললেন অভূতপূর্ব এক রূপকথার, যার সাক্ষী হবেন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির মেয়ে ঊনিশ শতকের বিস্ময়কর প্রতিভা স্বর্ণকুমারী দেবী। ইতিহাসের কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা ও চরিত্রের ছায়া নিয়ে লেখা রোমাঞ্চকর উপন্যাস ‘টাইগারপাস’।
ইতিহাস কেন্দ্রিক নন ফিকশন লেখক হারুন রশিদকে ঔপন্যাসিক হিসেবে পেলাম এই বইতে। উনার কমফোর্ট জোনেই আছেন, ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা চলে একে। সকল সূত্র মেনে কিছু ঐতিহাসিক সত্য চরিত্রের সাথে কিছু কাল্পনিক চরিত্র মিলিয়ে সুন্দর এগিয়ে নিয়েছেন গল্প। ওজি ঐতিহাসিক উপন্যাস সুনীলের "সেই সময়" এর কথা মনে করে নস্টালজিক হয়ে গেছিলাম। আধুনিক চট্টগ্রাম শহর ওই সময়ে কেমন ছিল, গল্পের ছলে এর একটা ভালো ধারণা পেয়েছি। দেশি ছোকরার সাথে বিদেশি মেমের প্রেমপর্বটা শুরুতে ইন্টারেস্টিং ছিল, তবে মাঝে উনারা যে প্রবল পিনিকে ডেলুলু হয়ে গেছিলেন, ওই পার্টটা ফাস্ট স্কিপ করে গেছি। মূল চরিত্র ফরিদের জীবনের একটা অপ্রত্যাশিত বাঁক গল্পের ক্ষণকালীন একঘেয়েমি কাটিয়ে নতুন করে মনোযোগ দিতে বাধ্য করায়। শেষের পরিণতিটা কষ্টদায়ক হলেও ভালো মনে হয়েছে।
ওভারঅল ভালো একটা ফিল-গুড মুভির মতো উপন্যাস।
প্রথম উপন্যাস হিসেবে লেখককে অভিনন্দন জানাই। পরবর্তী উপন্যাসগুলো নিয়ে উচ্চাশা রাখতেই পারি আমরা।
পাঠকের জন্যে ইম্পর্ট্যান্ট নোটিশ: বইটা পড়ার সময় ভুলেও যেন শেষ পাতাটা আগে চোখে না পড়ে। তাইলেই শ্যাষ। কঠিন স্পয়লার।
ব্রিটিশ শাসনাধীন চট্টগ্রাম, ভারতবর্ষ, মালদ্বীপ ও সুদূর বিলেতের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে ইতিহাসাশ্রয়ী বইটির আখ্যান। হারুন রশীদের নন ফিকশন পড়ে যতটা ভালো লেগেছিল, সেকারণেই উনার প্রথম (জানামতে) ফিকশনটা সম্পর্কে জানতে পেরে পড়ার সিদ্ধান্ত নিতে দু'বার ভাবতে হয়নি।
রবি ঠাকুর, স্বর্ণকুমারী দেবী ও এসেছেন গল্পের চরিত্র হিসেবে। শুরু থেকেই ইতিহাস, প্রেম, পার্বত্য চট্টগ্রামের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের গল্প রোমাঞ্চকর একটি সূচনা প্রাপ্তির পর হঠাৎ করে শেষাংশে করুণ রূপ নেয়। সমুদ্র ও পাহাড়ে ঘেরা পুরো চট্টগ্রাম শহরটিকে যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম। অধ্যায়ের শুরুতে কবিতাগুলি প্রাসঙ্গিক ছিল। বাঙালি যুবক ফরিদের সাথে এমিলিয়ার অসম প্রেম ও এর পরিণতি মন খারাপ করিয়ে দেয়। পোকায় খাওয়া যে পত্রিকার টুকরো খবর পড়ে ফরিদ চট্টগ্রামে ফিরে এসেছিল, সেটির সঠিক ঘটনাও তার জানা হলো না..
“সময়ের নদীতে ভেসে আসে বীরত্ব, হারানো স্বপ্ন আর শিক্ষা।”
সাহিত্যের উৎকর্ষ বা অপকর্ষ বিচার করে যে সম্যক আলোচনা করা হয়, তাকেই সাধারণত সমালোচনা বলা হয়। আমি সেই দায়িত্ব নিতে আসিনি। এতটুকু বোধশক্তিও আমার অদ্যাবধি জন্মায়নি। আমি শুধু একজন পাঠক, পাঠের যে রসটুকু পেয়েছি, সেটুকু ভাগ করে নেওয়ার ছোট্ট চেষ্টা মাত্র।
ঐতিহাসিক প্লটনির্ভর গল্প-উপন্যাস আমার সবচেয়ে প্রিয় পাঠধারাগুলোর একটি। তাই ‘টাইগারপাস’ পড়া যেন একপ্রকার অনিবার্যই ছিল।
চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে লেখকের গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পরিচয় তাঁর আগের বইগুলো পড়েই পেয়েছি। তাই চোখ বন্ধ করেই একই ভরসায় এই বইটি হাতে নিয়েছিলাম। পড়তে পড়তে মনে হলো, বইটি যেন গিলে ফেলিনি, বরং জীর্ণ করছি। যে দুই দিন বইটি পড়েছি এক ধরনের ঘোরের মধ্যে কেটেছে। এখানেই লেখকের মূল শক্তি— তিনি পাঠককে অমনোযোগী হওয়ার সুযোগ দেন না। গল্পের ভেতর এমনভাবে টেনে নেন পাঠক অজান্তেই তার ভেতর ডুবে যায়। ঐতিহাসিক মিশ্র এই উপন্যাসের শেষভাগে এসে বুকের ভেতরের ব্যথাটা যেন আরও তীব্র হয়ে ওঠে, চাপা কষ্ট নিঃশব্দে জেগে ওঠে।
গল্পের কথায় আসি— ইতিহাস থেকে ধার করা কাহিনি হলেও রাঁধুনি হিসেবে হারুন রশিদ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। চট্টগ্রামের গরম মসলায় তিনি গল্পটিকে এক বিশেষ স্বাদে রেঁধেছেন। এমনভাবে পরিবেশন করেছেন যা শেষ না করে উঠা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবে বসার আসন (ভাষা) আর একটু মজবুত হলে পাঠের স্বাচ্ছন্দ্য আরও বাড়ত।
চরিত্রগুলোর বুননও ছিল বেশ চমৎকার। নবীনচন্দ্র, স্বর্ণকুমারী দেবী, উইলিয়াম জোন্স, চট্টগ্রামের অলি-গলি, সমুদ্র— সব মিলিয়ে এক জীবন্ত সমীর তৈরি হয়েছে। অচেনা নায়ক ফরিদ, নায়িকা এমেলিয়া, আর গল্পে আমার ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র মাহানুর। তার দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্ব আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। চরিত্রগুলো যেন ঊর্ণনাভের মতো নিজেদের জাল বুনে ঘটনাপ্রবাহ তৈরি করেছে। কখনো তারা চট্টগ্রাম থেকে সমুদ্রপথে মালদ্বীপে নিয়ে যায়, আবার মালদ্বীপ থেকে বিভিন্ন শহর ঘুরে পুনরায় ফিরিয়ে আনে চট্টগ্রামে।
উপন্যাস লেখা নিজেই কঠিন কাজ, আর ঐতিহাসিক ফিকশন লেখা তার চেয়েও বেশি জটিল। কারণ এখানে লেখককে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। অতীতের ইতিহাস, রীতি-নীতি, প্রচলিত গান, সংস্কার-ব্যবহার, পোশাক-পরিচ্ছদ, সামাজিক ও গার্হস্থ্য জীবনের অবস্থা এসব বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন না হলে সহজেই কালবিরোধী-দোষ দেখা দিতে পারে। লেখক এই বিষয়ে সচেতন থাকার যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন। ভালো লাগার বিষয় হলো, কোথাও অযথা দীর্ঘ বর্ণনা নেই। স্থানীয় আচার-ব্যবহার ও জীবনযাত্রার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতেও লেখক সচেতন ছিলেন। জীবনজিজ্ঞাসার ভেতরেও ছিল এক ধরনের গভীরতা। সব মিলিয়ে এটিকে একটি মহৎ শিল্পকর্মের আন্তরিক প্রয়াস বলেই মনে হয়েছে।
এখন আমি ‘ক্যাসান্দ্রা’ ফুলের সন্ধানে আছি। কোনো একদিন যদি সেই ফুলের দেখা পাই, তবে বাড়ির উঠোনে সেটি রোপণ করে ‘এমেলিয়া’কে উৎসর্গ করব।
লেখকের রাজকীয় জলদস্যু বণিক সমিতি, আর সমুদ্রপথে গ্রিস থেকে বাংলায় বই দুটো শেষ করার পর তৃতীয় বই হিসেবে টাইগারপাস পড়লাম। ইতিহাসের বাইরে এসে ফিকশন বই পড়লে হয়ত এমনেই ভালো লাগে বেশী, এই বইটাও ভালো লাগলো।
বইটার গল্পের সময় ব্রিটিশ আমলের চট্টগ্রাম শহরকে ঘিরে। বইয়ে শহরের জন্মের ঘটনাও, অর্থাৎ বদর পীর কিভাবে চাটগাঁকে মানুষের বসতিতে রুপান্তর করলেন সেই ঘটনাও রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনকালের আবার এক সময় নয়, বেশ কয়েকটা যুগের গল্প রয়েছে। এখানে চট্টগ্রাম শহরের জন্ম, বেড়ে উঠার কথা যেমন রয়েছে। তেমনি আছে এই চাটগাঁর ভূ প্রকৃতি, সাগর নদীর কোলঘেষা জনপদের মানুষদের গল্প। শাসকগোষ্ঠীর কথা ছাড়াও স্থানীয় মানুষদেরদেও কাছ থে��ে দেখতে পারলাম বই থেকে। তবে এই বইয়ে উঠে এসেছে নতুন এক ভূখণ্ডের কথা। ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে মালদ্বীপ কেমন ছিল, তা এতকাল জানা ছিল না, লেখকের মাধ্যমে বেশ খানিকটা ধারণা পাওয়া গেল।
আধুনিক মালদ্বীপ কিংবা ব্রিটিশ আমলের বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশ সম্পর্কে কমবেশী জানি কিন্তু ব্রিটিশ আমলের মালদ্বীপ সম্পর্কে একদম জানাশোনা ছিল না আমার।
ইতিহাসের পথে ঘুরতে বরাবরই ভালো লাগে। সেই ভ্রমণ যদি হয় খুব প্রাণোচ্ছল তবে ত কথাই নেই। এতক্ষণ যা বললাম এগুলো বাড়তি পাওনা, বইয়ের মূল গল্প কিন্তু নয়। গল্পের মূল নায়ক ফরিদ, মূল নায়িকা এমিলিয়া। দারুণ এক ভালবাসার গল্প, দুই বই পড়ুয়ার এক হবার গল্প, কল্পনায় ভেসে বেড়ানোর গল্প, মন ভাংগার গল্প।
লেখকের মোট ৪ টা বই পড়েছি আমার কাছে এটাই সবচেয়ে বেশী ভালো লেগেছে। ২৩,২৪,২৫ বিগত তিনটা বছর চট্টগ্রামে কাটিয়েছি, ঘুরে বেড়িয়েছি এই অঞ্চলের এমাথা থেকে ওমাথা। হয়ত এজন্যই বইটা পড়ার সময় কল্পনায় ঘুরে বেড়াতে সুবিধা হয়েছে আমার, চেনা জানা বলে কথা।
ইতিহাস বিষয়ক নন ফিকশনে হারুন রশীদ একটা উজ্জ্বল নাম সমকালীন বাংলা সাহিত্যে। তাঁর প্রকাশিত সিংহভাগ বইই আমার পড়া। টাইগারপাস ও প্রায় প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই কেনা। তবে আমি আসলে জানতাম না যে এটা উপন্যাস। অবধারিতভাবে ঐতিহাসিক উপন্যাসই লিখবেন হারুন রশীদ, এতো অনুমেয়ই ছিল। তবে শুধু ঐতিহাসিক জনরায় একে ফেললে ভুল হবে, এটি অবশ্যই একটি রোমান্টিক উপন্যাসও। উপন্যাসের মূল চরিত্র ফরিদ। আগাগোড়া তাকে ঘিরেই সমস্ত ঘটনা আবর্তিত হয়েছে। ফরিদের পড়ার নেশা, আরভিন রসের মেয়ে এমেলিয়ার প্রেমে পড়া, এমেলিয়াকে হারিয়ে ফেলা, ফরিদের দেশান্তরী হয়ে মালদ্বীপে পৌঁছানো, মাহানূরের সঙ্গে আলাপ, আবার ফিরে আসা চট্টগ্রামে- মোটামুটি এই হচ্ছে মোটাদাগে গল্প। এরই ভাঁজে ভাঁজে ঐতিহাসিক ঘটনা, চরিত্র এসেছে। নবীনচন্দ্র সেন যেমন এসেছেন, তেমনি এসেছেন স্বর্ণকুমারী দেবী। মালদ্বীপ আর চট্টগ্রামের প্রাচীন সম্পর্কের ইতিহাসও এসেছে। উপন্যাসটি এক বসায় পড়ার মতো। তবে সত্যি বলতে কী, আমি একটু হতাশই৷ হারুন রশীদের কাছে কি জটায়ুমার্কা ভুল আশা করা যায়? এমেলিয়া স্বর্ণকুমারী দেবীকে চিঠিতে লিখছেন রবিঠাকুরের কথা। সাত বছর বয়সে নাকি তাঁর প্রথম লেখা ছড়া, 'জল পড়ে, পাতা নড়ে!' অথচ জীবনস্মৃতির শিক্ষারম্ভ ভাগে রবীন্দ্রনাথ নিজে লিখেছেন এই লাইনটা দ্বারা তিনি প্রথম আদিকবির সঙ্গে পরিচিত হন। এটা বর্ণপরিচয় এর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর। রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষায়, ' এমনি করিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া সেদিন আমার সমস্ত চৈতন্যের মধ্যে জল পড়িতে ও পাতা নড়িতে লাগিল।'