জন্ম নবদ্বীপের কাছে সমুদ্রগড়। কৃষ্ণনগর কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। তারপর চাইল্ড ডেভলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টে চাকরি পান। স্কুল ম্যাগাজিনে লেখা প্রকাশিত হলেও লেখালিখির সূচনা ২০১৬ সালের শেষের দিকে। ফেসবুকে নিজস্ব পেজ 'Arpita Sarkar'-এ নিয়মিত লেখালিখি করেন। এই পেজের অনুসরণকারীর সংখ্যা চার লক্ষের অধিক। প্রথম বই প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালের বইমেলায়। প্রতিটা বইই পাঠকের মনে জায়গা করে নিয়েছে। সামাজিক, প্রেম এবং রহস্য তিনটি ধারায় লেখিকা সমান সাবলীল। ছোটগল্প সংকলন ও উপন্যাস সমানভাবে পাঠক মহলে সমাদৃত। প্রথম শ্রেণীর শারদীয়া সংখ্যায় স্থান পায় লেখিকার লেখা। লেখিকার গল্প নিয়ে হয়েছে বেশ কিছু শর্ট মুভি। তিনটে গল্প নির্বাচিত হয়েছে ফিচারের জন্য। ভারত সরকারের (পূর্বাঞ্চলীয় শাখা) সংস্কৃতি মন্ত্রক কর্তৃক পুরস্কার প্রাপ্ত- ২০২১ সালের সাহিত্য সম্মান পান। জোশটকের মঞ্চ থেকে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে পরিচিত মুখ লেখিকা অর্পিতা সরকার।
উত্তরবঙ্গের নদী, পাহাড়, বন দিয়ে ঘেরা এক কাল্পনিক জনপদ হল নির্ভয়পুর। আদি বাসিন্দা উপজাতিরা আজ সেখানে নিজভূমে পরবাসী হয়ে জমির মালিক বহিরাগতদের কর্মচারী বা কৃপাধন্য। এই পরিবেশে ব্যতিক্রমী চরিত্রও কম নেই। আছে শহর থেকে এসে এই জনপদেই থেকে যাওয়া সেবাব্রতী ডাক্তার শৌনক, আছে ভূমিপত্রদের জন্য লড়ে যাওয়া সুজয়, আছে ভালোবাসাকে মনের কৌটোয় আগলে রেখে লড়ে যাওয়া কিছু মানুষ, আছে লোভী আর ক্ষমতালিপ্সু কিছু নারী-পুরুষ... আর আছে নূপুর। লেখক তাঁর একান্ত নিজস্ব ভঙ্গিতে, ছোটো-ছোটো বাক্যের ন্যারেটিভ, স্মৃতিযাপনের দীর্ঘ মনোলগ, চাপান-উতোরের কাটা-কাটা সংলাপ, চরিত্রের মিছিল, অনেক ছকবন্দি ভাবনা, কিছু রহস্য, খুনখারাপি— এইসব দিয়ে এই ফিল-গুড উপন্যাসটি গড়েছেন। সেটি পড়েও ফেলেছি ঝটপট৷ কিন্তু এই লেখাটা আমার মনে থেকে যাবে নূপুরের জন্যই। যাবতীয় রণ, রক্ত, সফলতার মধ্য দিয়েও এই চরিত্রটি বুঝিয়ে দেয়, ভালোবাসাকে টিকিয়ে রাখার জন্য লড়তে হয়। আর হ্যাঁ, লেখক যে প্রেমের গল্প লেখায় সিদ্ধহস্ত, তা তিনি নূপুরের সংলাপে ও তার সঙ্গের নানা দৃশ্য ও প্রসঙ্গে নিপুণভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। আমি এমনিতে সামাজিক লেখাপত্রের বিশেষ ভক্ত নই; পড়িই না, ইনফ্যাক্ট। কিন্তু দ্রুতগামী গদ্য আর এইরকম কয়েকটি চরিত্রের টানে লেখাটা একবারে পড়ে ফেলে বেশ ভালো লাগল। যদি ঘটনা ও চরিত্রের সমাহারে গড়ে তোলা মনোজ্ঞ উপন্যাস পড়তে চান, তাহলে এই বইটিকে উপেক্ষা করবেন না।
আজ পড়ে শেষ করলাম অর্পিতা সরকার-এর লেখা উপন্যাস ইতি নির্ভয়পুর। পাঠ চলাকালীন ও তার শেষে অনুভূতির যে স্রোত বয়ে চলেছে মনের মধ্যে তার কিছুটা ব্যক্ত করার চেষ্টা করবো এই প্রতিক্রিয়ায়।
নির্ভয়পুর উত্তর বঙ্গের শিলিগুড়ির কাছে অবস্থিত একটি গ্রাম। সেখানের সহজ সরল মানসিকতা কেন্দ্রিক মানুষজনদের মাঝে উপস্থিত হয়েছে কিছু তথাকথিত শিক্ষিত শহরের ব্যক্তিরা ব্যবসা করার অভিপ্রায়ে। তারা সেখানকার অশিক্ষিত সাধারণ মানুষদের থেকে খুবই অল্প টাকায় জমি কিনে স্থাপন করেছে টি এস্টেট এবং হোটেল বিজনেস। এদের মধ্যেই রয়েছে ঘোষাল, সমাদ্দার, মল্লিক ও পামেলা মিত্র এর মত লোকজন। তারা তারপর খুবই স্বল্প বেতনে সেখানকার আদিবাসীদের শ্রমিক হিসেবে নিযুক্ত করেছে নিজেদেরই প্রতিষ্ঠানে। উপন্যাস চলাকালীন আমরা দেখতে পাই সাধারণ মানুষদের প্রতি এই মালিকপক্ষের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য এবং অবজ্ঞা। তারই ফল স্বরূপ জন্ম নেয় সুজয়-এর মত চরিত্র যে শ্রমিক দের হয়ে মালিক পক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়। এইভাবেই এইসব চরিত্রগুলি এবং তাদের সাথে শৌনক, নূপুর, সাহেব, অস্মিতাদের জবানে লেখিকা সুন্দর একটি কাহিনী উপস্থাপন করেছেন। তার মধ্যে নূপুর এর চরিত্রটি বিশাল ভাবে মন কে ছুয়ে যাবে তার ভালবাসার অভিব্যক্তির জন্য। খুব অল্প সময়েই সবথেকে প্রিয় চরিত্র হয়ে ওঠার মতো ক্ষমতা ছিল নূপুরের মধ্যে। বার বার তার সাথে শৌনকের কথপোকথনে কোথাও যেন হারিয়ে গেছি, মুখে যেন এক চিলতে হাসি ফুটে উঠেছে। এই উপন্যাসে আমরা যেমন প্রেমের ছোঁয়া পাই, আবার কিছু পৃষ্ঠা তেমনি প্রতিহিংসা, হিংস্রতায় রক্তাক্ত, যেখানে পড়তে গিয়ে গায়ে কাটা দেবে। আর এসব ছাড়াও উত্তর বঙ্গের চা বাগানের প্রাকৃতিক বর্ণনা শুনতে শুনতে শহরের কোলাহল কে পেছনে ফেলে আপনি যে কখন সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য ও বুনো গন্ধে হারিয়ে যাবেন বুঝতেই পারবেন না। সবমিলিয়ে এটি খুবই সুন্দর একটি সামাজিক প্রেমের উপন্যাস এবং লেখিকা কে অসংখ্য ধন্যবাদ পাঠকদের এত সুন্দর একটি উপন্যাস পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।
লার্জ স্কেলে গল্প শুরু করলে অধিকাংশ লেখকেরই স্টার্ট অনেক বোরিং হয়, অথবা স্লো হয়। এইটাও শুরুটা স্লো ছিল। অন্য দশটা গতানুগতিক রুমান্টিক উপন্যাসের মতো, কিন্তু আস্তে আস্তে গল্প প্রাণবন্ত হয়েছে। শেষের দিকে কয়েকটি খুন হালকা থ্রীলার একটা ভাইভ ক্রিয়েট করেছে। ক্যারেক্টার বিল্ডাপে ততবেশি সময় না নিলেও ক্যারেক্টার গুলোর উপস্থাপন মনমুগ্ধকর ছিল। শব্দচয়নে মুন্সীয়ানা না পেলেও কোন শব্দ খাপছাড়া মনে হয়নি। বাট এই লেখিকা দুইটি বইয়ের গল্পের প্লটে একি ধরণের টুইস্ট রেখেছেন যা বাজে লেগেছে। অনুভবে তুমি _ বইয়ে শেষে দেখা যায় নায়িকার প্রসিদ্ধ বাবা যিনি তিনি তার বায়োলজিক্যাল ফাদার না,সেইম এই বইয়ে প্রধান দুই পুরুষ চরিত্রের বেলায় দেখা যায় তাদের প্রসিদ্ধ বাবা তাদের বায়োলজিক্যাল ফাদার না __ পরপর দুই বইয়ে এক ধরণের প্লট ভালো লাগেনি।