⚈ স্পয়লার-ফ্রি রিভিউ⚊ ❛সসেমিরা❜
❝রঘুর স্বীকারোক্তি, আহত হওয়া, কাগজে লেখা ক্লু, হীরামন্ড, লায়লা লায়লা লায়লা...লায়লা, নিশা বসুনিয়া আর আলিয়ার অন্তর্ধান, ঝোপের ভেতরে রক্তমাখা গাড়ি, ধরা না-দেয়া গানের কলি, রইসের ধমক, আসলামের বন্ধুত্বের হাসি...❞
পুরো এক ঝাঁক সসেমিরা। আচ্ছা, সসেমিরা কী? সহজ ভাষায়—কিংকর্তব্যবিমূঢ় অথবা সংকটাপন্ন অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার সময়কে বোঝায়। কখন আসে এই সসেমিরা? সেটার উত্তর অন্তত আমার জানা নেই৷ তবে অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, হুট করে এইরকম এক বাহ্যজ্ঞানশূন্য অবস্থায় আমরা সকলেই হাবুডুবু খেতে থাকি। সেটা হোক সময়ে অথবা অসময়ে। হোক একটি অথবা কয়েকটি। তবে এই ❛সসেমিরা❜ বইটি পড়ার পর—সেই বিমূঢ় অনুভূতি ক্ষণিকের জন্য হলেও জাগ্রত হওয়াটা দোষের কিছু নয়। লেখক পুরো গল্পটি লিখেছেন ঠিক সেইভাবে। পছন্দ করার এবং পছন্দ না করার দুই কারণ-ই বেশ পোক্ত। তবে আমার নিক্তিতে পছন্দের দিকটি ভারী থাকবে এই অভয় দিতে পারি। লেখক শব্দ আর বাক্যের গভীরতা নিয়ে যে খেলা খেলেছেন, তা বেশ প্রলুব্ধ করেছে বটে।
❛সসেমিরা❜ বইয়ের প্লট গতানুগতিক ডিটেকটিভ থ্রিলার হলেও, টেস্ট বা ফ্লেভার পুরোপুরি ভিন্ন। সেই ভিন্নতার মূল কারণ লেখনশৈলী। আঞ্চলিক শক্ত সাহিত্য ও কাব্যিক মনোহারিতা এই কাহিনির আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। আপনি যদি সোজা-সাপটা গল্প রেখার পথে চলতে পছন্দ করেন তাহলে হতাশ হতে পারেন। এই কথাটা আমি আরও কয়েকবার রিপিট করব। বলব না এইটা আপনার জ্ঞানের ঘাটতি; তবে পছন্দের কমতি। লেখকের লেখনশৈলী সম্পর্কে কিছুটাও ধারণা যদি থাকে; তবেই বইটি হাতে তুলে নিন। এর পরে হারিয়ে যান উত্তরবঙ্গের হিমালয়...
➲ আখ্যান—
উত্তরবঙ্গের হিমালয়ঘেঁষা জেলা শহর কীর্তিমারীতে ছুটি কাটাবার কথা ভাবছেন? চা বাগান আর পাহাড় দেখবার, বা বনে একটু শিকার করবার, বা শহরের রেড লাইট এরিয়ায় একটু মৌজ করবার ইচ্ছা?
আসতে পারেন, খাসা জায়গা। তবে, ইয়ে, জানিয়ে রাখি--এক পলাতক দাগী আসামি ছুরির ঘা খেয়ে মরতে মরতে ফিরে এসেছে শহরে। এক ভয়ানক অপরাধ নাকি করেছে সে, জীবনের শেষ অপরাধ : যেটার সূত্র রেখে গেছে একটা হেঁয়ালিতে। এদিকে শহরের সবচেয়ে বনেদি আর বড়লোক পরিবার বসুনিয়াদের বাড়ির বউ নিখোঁজ, সাথে করে নিয়ে গেছে বাচ্চা মেয়েকে। আর ইন্সপেক্টর রইস এমন সব আলামত পাচ্ছে যাতে হাড় হিম হয়ে যাচ্ছে তার মতো ঝানু অফিসারেরও।
দুটো ঘটনার মাঝে কুৎসিত একটা যোগসূত্র খোঁজার জন্য চালচুলোহীন চেহারার একটা লোক চষে বেড়াচ্ছে পুরো শহর। বিখ্যাত নেহালের পুরি বা সালামের চা খাবার সময় তাকে দেখলে ভড়কাবেন না--'টিকটিকি' কামালের কাজই হচ্ছে গন্ধ শুঁকে বেড়ানো। কিন্তু একেবারে উড়িয়েও দেবেন না তাকে, শহরকে এই সসেমিরা অবস্থা থেকে হয়তো বের করতে পারবে সে-ই।
যাকগে। তো এবারের শরতে চলে আসুন কীর্তিমারীতে--ভুলতে পারবেন না এই জায়গাকে, কথা দিচ্ছি।
➤ পাঠ প্রতিক্রিয়া ও পর্যালোচনা—
❛সসেমিরা❜ নিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া অদ্ভুত সুন্দর। অদ্ভুত বলার কারণ, আমি গল্পের মধ্যে না যতটা ডুবেছি তার চেয়েও কাব্যিক আর বিস্তারিত লেখনশৈলীর আবহে হারিয়েছি। ঠিক যেন আপন পটভূমির অবয়বের সাথে অনুরূপতা রাখতে এইরকম লেখনশৈলীর অবতারণা। লেখকের বিচক্ষণ চিন্তাশক্তিকে সাধুবাদ জানাতে হয়। আমি বলি, যদি আপনাদের একই রকম বা একঘেয়েমি গল্প আর লেখনশৈলী পড়তে পড়তে ভ্রুকুঞ্চন হওয়ার অবস্থা, তখনই ডিফারেন্ট টেস্টের জন্য এই বইটি হাতে তুলে নিতে পারেন। যদি আপনি সর্বভুক অথবা বাছবিচারের থোড়াই কেয়ার করা পাঠক হয়ে থাকেন তবেই৷ আপনি ❛সসেমিরা❜ উপন্যাসে একটি সাসপেন্স ও টুইস্টে পূর্ণ গল্প পাবেন, চরিত্রের সাথে খাপ খাওয়ানোর যথোপযুক্ত সময় এবং গল্পের অন্দরমহলে প্রবেশের জন্য পাবেন খোদ লেখকের সহযোগিতা। আশা করছি এর চেয়ে বেশি কিছুর পাঠক হিসেবে আপনার প্রয়োজন হবে না।
● সূত্রপাত—
গল্পের শুরুটা আসামের পাহাড় থেকে কুড়িগ্রামে নেমে আসা হাতির মতো পাছা দুলিয়ে খানাখন্দে ভরা কাদায় মাখামাখি রাস্তায় ধরে চলা পুলিশ ভ্যানের ভেতরে থাকা একজন ড্রাইভার, একজন ইন্সপেক্টর ও একজন ম্যাজিস্ট্রেটের কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে। তাদের যাতায়াতের উদ্দেশ্য—রঘু নামের এক দাগি আসামির জীবনের শেষ অপরাধের বয়ান শোনা। কী সেই বয়ান? অন্যদিকে শহরের সম্ভ্রান্ত বসুনিয়া পরিবারের কুলবধূ তার বাচ্চা মেয়ে নিয়ে নিখোঁজ! গেল কোথায়? একসাথে একই সময়ে জট পাকানো দুইটি সত্য অন্বেষণের গুরু দায়িত্ব মাথায় তুলে নিয়েছে ইন্সপেক্টর রইসের ডান হাত টিকটিকি কামাল! এখন প্রশ্ন কে এই কামাল? সব প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে ডুব দিতে ❛সসেমিরা❜র জগতে।
● গল্প বুনট • লেখনশৈলী • বর্ণবিন্যাস—
❛সসেমিরা❜ উপন্যাসের প্রতি পাতায় মুগ্ধতার একটা রেশ সারাক্ষণ বজায় ছিল আগ্রহব্যঞ্জক লেখনশৈলী জন্য। বিস্তারিত বর্ণনার নিখুঁত প্রদর্শনের মাধ্যমে গল্প সাজানোর দক্ষতা বেশ সুবিন্যস্ত। ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে সাবলীল বাক্য প্রয়োগ—এক অন্য রকম আবহের সৃষ্টি করেছে। শর্টকাটে গল্প পড়া অথবা অল্পতে কাহিনি বর্ণনার স্বাদ গ্রহণ করা পাঠক শ্রেণি এই দিকটা হয়তো কম পছন্দ করতে পারেন। যদি পরিশুদ্ধ লেখনশৈলীর পারফেক্ট একটা মঞ্চায়ন দেখতে চান, তাহলে এই বই আদর্শ বলে বিবেচিত হবে। লেখকের তীক্ষ্ণ বর্ণবিন্যাস পাঠক মনে পারিপার্শ্বিক আবহ ও সংলাপের প্যাঁচানো সরল স্বাদের ছোঁয়া দিবে। দিক নির্ণয়ের মধ্যে ধাঁধা পূরণ, বৃহৎ বর্ণনার সংক্ষিপ্ত রূপ ও হালকা হিউমারের স্পর্শ থেকে বঞ্চিত করবে না লেখক মোটেও। পুরো তিনটে দিক বিবেচনা করে, বইটি অন্য লেভেলের বলব না তবে অন্য রকম স্বাদের।
● চরিত্রায়ন—
চরিত্র গঠন হয়েছে ধীর লয়ে। একেবারে চারা গাছ রোপণ হতে বেড়ে ওঠা আগ পর্যন্ত নির্ভুল পরিচর্যায় গড়া। প্রত্যকটি চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ, কাজের উদাহরণ টানলে; পাকা কারিগরের নিপুণ হাতে কাঠ কুঁদে বানানো কোনো নিখুঁত মূর্তির মতো। তবে সেই বিশেষ আর্কষণ ধরে রাখা পুরো গল্পের প্রধান মূর্তি অনেকে হলেও, টিকটিকি কামাল আলাদাভাবে নজর কেড়েছে। এই গল্পের কামাল চরিত্রটি বেশ আপন মনে হবে। বিষাদে পূর্ণ আর ভবঘুরের এক সত্তার বলয় যেন কামালের চারপাশে ঘুরছে অনবরত। নিজের সাথে রিলেট করার কয়েকটি দিকও পেয়ে যাবেন। বাকি চরিত্রের ক্রিয়াকলাপ নিয়ে কিছু বলছি না, বইয়ের জন্য তুলে রেখে দিলাম।
● অবসান—
গল্পটার সমাপ্তি যে-ভাবে চেয়েছি; হয়েছেও ঠিক সেইভাবে। শেষ পৃষ্ঠার সংলাপ আর কবিতাটা ছিল বেশ অর্থবহ। নির্দিষ্ট দুইটি সম্পর্কের উল্লেখ আছে এই গল্পে, সাসপেন্স আর টুইস্ট হিসেবে তা না-হয় আপনাদের জন্য তোলা থাক।
● খুচরা আলাপ—
লেখক উত্তরবঙ্গের আবহাওয়া পুরোটাই যেন এই ❛সসেমিরা❜ উপন্যাসে বন্দি করেছেন। যখন যে সংলাপ আর শব্দ ব্যবহার করা প্রয়োজন সেটা করেছেন। শুরুতে ভেবেছি এই বই নিয়ে ছোটো প্রতিক্রিয়া জানাব, কিন্তু তা আর হলো কই? তা-ও কতটা ব্যক্ত করতে পেরেছি জানি না। তবে বই শেষে তৃপ্তিকর অনুভূতি ঠিকই পেয়েছি।
➣ লেখক নিয়ে কিছু কথা—
লেখক নাবিল মুহতাসিম ভাইয়ের লেখার সাথে পরিচয় ওনার একটা ছোটো গল্প দিয়ে। যেটা ‘সতীর্থ গল্প সংকলন ২’ গল্প সংকলনে রয়েছে। ওনার ‘বাজি’ ট্রিলজি কালেক্ট করেছি অনেক আগেই কিন্তু এখনো পড়া শুরু করিনি। তবে এখন আর দেরি করাটা ঠিক হবে না। পাশাপাশি ‘বিভং’ আর কেপি ভাইয়ের সাথে কম্বো ‘যুগলবন্দি’ বইটাও আছে।
● সম্পাদনা ও বানান—
সম্পাদনা ভালো হয়েছে, তবে প্রচলিত অনেক বানানের ভুল খুঁজে পেয়েছি। তাতে অবশ্য বিরক্তিকর কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি।
● প্রচ্ছদ • নামলিপি—
প্রচ্ছদ ভালো লেগেছে, বিশেষ করে কালার গ্রেডিং আর ❛সসেমিরা❜ নামের ওপর সাদা আর বেগুনি জলবিম্ব ও মানুষ অবয়বের প্রতীকটি আলাদাভাবে দৃষ্টি কাড়ে।
● মলাট, বাঁধাই, পৃষ্ঠা—
প্রোডাকশন ভালো। শক্ত বাঁধাই, উন্নত মলাট আর ক্রিম কালারের পৃষ্ঠা। তবে দামটা একটু বেশি মনে হয়েছে।
⛃ বই : সসেমিরা • নাবিল মুহতাসিম
⛁ জনরা : ডিটেকটিভ থ্রিলার
⛃ প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২১
⛁ প্রচ্ছদ : পার্থপ্রতিম দাস
⛃ প্রকাশনা : অবসর প্রকাশনা সংস্থা
⛁ মুদ্রিত মূল্য : ৩০০ টাকা মাত্র
⛃ পৃষ্ঠা : ১৬০