ওয়াও, দুর্দান্ত একটা কিশোর রোমাঞ্চোপন্যাস! যেমন অভিনব অনানুমেয় প্লট তেমনি টানটান মেদহীন মসৃণ গল্পকথন, একেকরকম বৈচিত্রময় চরিত্রের অনেকগুলি রঙিন কিশোর-কিশোরীরা, গল্পবলায় পরিমাণ মতো হালকা হাস্যরস (মাঝেমধ্যে হা হা করে হেসে ওঠা) আর ঝড়ের গতিতে ঘটা দমবন্ধ করা উত্তেজনার একের পর এক ঘটনাবলি! মোস্তফা তানিমের আর কোন বই আগে পড়িনি, এই বইটাও হুট করে কেনা গত বইমেলায়, কিন্তু প্রায় দেড়শ পৃষ্ঠার কিশোরোপন্যাসটা শুরু করে কয়েক পাতা এগিয়েই একেবারে জমে গেলাম গল্পের ভেতর। আর যথার্থই নাটকীয়তায় পূর্ণ রোমাঞ্চকর সব ঘটনাময়তায় শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত মনোযোগ পূর্ণমাত্রায় আটকে রেখে বইটা শেষ করে তবেই ছাড়তে পারলাম। একটু সন্দেহ ছিল শেষের দিকে গিয়ে হয়ত জোড়াতালি দিতে গিয়ে কিঞ্চিৎ লেজেগোবরে হয়ে যাবে, তবে থ্যাঙ্কফুলি তা অমূলকই প্রমাণিত হলো। মোটামুটি ঠিকঠাক মতো সুন্দর একটা সমাপ্তি তৃপ্ততা দিতে পেরেছে, সবমিলিয়ে খুব ভালোই লেগেছে। অনেকবছর বাংলাদেশি কিশোরোপন্যাস মুজাই ও ইসমাইল আরমানের বাইরে আর কারো পড়া হয় না, একেবারে আচমকাই তাদের দুজনের সঙ্গে রীতিমতো পাল্লা দেয়ার মতো আরেক সুলেখকের দারুণ সুখপাঠ্য একটি নতুন মৌলিক কিশোর অ্যাডভেঞ্চার রোমাঞ্চ উপন্যাস পড়ে যথেষ্ট চমকিত হয়েছি, সত্যিকারের আনন্দ পেয়েছি। এতদিনের অচেনা কিন্তু ভাল একজন নতুন প্রিয় লেখক আবিষ্কারের আনন্দ। মোস্তফা তানিমের অন্যান্য সব সায়েন্সফিকশন আর কিশোরোপন্যাসগুলোও অচিরেই পড়ে ফেলার ইচ্ছা আছে।
সাতক্ষীরার কাবলার খাল গ্রামটা কাবলার খাল জঙ্গলের পাশে। অষ্টমশ্রেনীর ছাত্র সবুজ একদিন জঙ্গলের এক মাটিভরাট পুরনো কুয়ার কাছে পেল একটা অদ্ভুত স্বর্ণমুদ্রা। তার বন্ধু ঊর্মি, জুলু, ডাবলু, বদরুদের সেটা দেখাতে ওরা ভাবলো সেখানে মনে হয় গুপ্তধন লুকানো আছে। গুপ্তধন খোঁজার লোভে বিকেলেই তারা জঙ্গলের সেই জায়গাটা আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে গেলো, কিছু পেলো না যদিও তবে কুয়াটার পাশে দেখতে পেলো অদ্ভুতদর্শন বিশাল বটগাছের মতো কিন্তু অজানা একটা গাছ, গাছের কাণ্ড সিলিন্ডারের মতো মসৃণ পাতা বড় বড় অনেকটা ফ্যানের মতো। তারা প্রথমে তা নিয়ে মাথা না ঘামালেও বদরু অহেতুক গাছটার একটা ডাল ভাঙতেই সেটা যেন হিসহিস করে কথা বলে ওঠল, আর একটা ডাল নেমে এসে বদরুকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো। ছেলেমেয়েরা ভয় পেয়ে দৌড়ে জঙ্গল থেকে পালিয়ে এলো। পরদিন সকালে জানতে পারল রাতে জঙ্গলে কেউ খুন হয়েছে, কৌতুহলী হয়ে গুপ্তধনের চিন্তা নিয়ে (গুপ্তধন পেয়ে সেটা নিয়ে খুনাখুনি হলো নাকি?) আরেকবার জঙ্গলে যেতেই তারা বুঝল গুপ্তধন হয়ত পাওয়া যায়নি তবে তার চেয়েও অনেক বড় ও অদ্ভুত একটা রহস্য তাদের সামনে চলে এসেছে: সেই বিশাল গাছটা সেখান থেকে বেমালুম উধাও হয়ে গেছে। একটা জলজ্যান্ত বিশাল গাছ কীভাবে বাতাসে মিলিয়ে যেতে পারে? পুলিশকে ও বড়দের সেটা নিয়ে বলায় তারা কেউ বিশ্বাসই করে না ঐখানে আদৌ কখনো কোন গাছ ছিল বলে। অথচ তারা সকলেই সেটা দেখেছে, গাছটা অনেকটা মানুষের স্বরে আওয়াজও করেছে তার ডাল নাড়িয়ে রীতিমতো বদরুকে ধাক্কাও দিয়েছে! গাছটা কি আকাশে উড়ে গেলো? কোন গাছ কখনো নাড়াচাড়া করতে পারে, উড়তে পারে??
ঊর্মির কাজিন জিতু থাকে কাবলার খালের কিছু দূরে খুলনার পাশে পাতাখালী গ্রামে, সেখানের বিশাল ভাঙাচোরা পুরনো জমিদারবাড়ির একটা অংশে তাদের বাসা। জমিদারবাড়ির কয়েক একর জুড়ে আমবাগান আর গাছগাছালি, সে মানুষের চেয়ে গাছপালা আর পাখিদের সঙ্গই বেশি পছন্দ করে। একশোটা সূর্যমুখী ফুলের চারা লাগিয়েছে, প্রতিদিনের মতো সেদিন সকালেও গাছে পানি দিতে গিয়ে এক অদ্ভুত ব্যাপার দেখে জিতু হতভম্ব: চারাগুলোর পাশে অনেকটা ফাঁকা জায়গা ছিল, রোদ আসতো, এখন সেখানটা ছায়াময়। কারণ অতিকায় একটা আজব গাছ জায়গাটা দখল করে আছে। এই গাছটা কোত্থেকে এলো এখানে?
কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়.....কয়েকটা ছেলেমেয়ের আবোলতাবোল থেকে দেখতে দেখতে এই গাছরহস্য নিয়ে গ্রাম থেকে ঢাকায়, ঢাকা থেকে বিদেশে তোলপাড়। বড় বড় বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা, পুলিশ, সেনাবাহিনী, হেলিকপ্টার, ড্রোন, স্যাটালাইট ইমেজ, কামানের গোলাগুলি, ওদিকে আসন্ন ঘূর্ণিঝড়ের বিপদসঙ্কেত। একেবারে ব্যাড়াছ্যাড়া অবস্থা! আর সবকিছুর কেন্দ্রে খানিকটা ছেলেমানুষ খানিকটা ভীত অনেকটা সাহসি আর অসম্ভব দৃঢ় মনোবলের স্বঘোষিত "বৃক্ষরহস্য সমাধান বাহিনী"র আটজন ক্ষুদে অভিযাত্রী।
আহা বইটা শেষ করে তৃপ্তির একটা নি:শ্বাস ছাড়লাম। ঠোঁটের কোনে হালকা হাসি লেগে রইলো অনেকক্ষণ।
১০ এ ৯।