Sarat Chandra Das (18 July 1849 – 5 January 1917) was an Indian scholar of Tibetan language and culture most noted for his two journeys to Tibet in 1879 and in 1881–1882.
শরৎচন্দ্র দাসের তিব্বত অভিযানের কাহিনি যেমন রোমাঞ্চকর, তাঁর লিখে যাওয়া বিবরণীটির ঐতিহাসিক গুরুত্বও তেমনধারা। অথচ এযাবৎ তাঁর সেই কাজটির বঙ্গানুবাদের যেক'টি চেষ্টা পড়ার চেষ্টা করছি, তার সবগুলোই ভারি শুষ্কং-কাষ্ঠং ঠেকেছে। এযাবৎ, মানে এই বইটি পড়ার আগে অবধি। রাজীব কুমার সাহা'র অনুবাদ আমার মন-প্রাণ এক্কেবারে ভরিয়ে দিল। তাঁর অনুবাদের ভাষা যেমন সজীব ও সরস, তেমনই মূল ভাষা ও ভাবের প্রতি নিষ্ঠাবান। তাতে আজ থেকে অতদিন আগের প্রকৃতি, সমাজ, ধর্ম, আচার, জীবনযাপন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব— এ-সবই চোখের সামনে ফুটে উঠেছে রীতিমতো জীবন্ত হয়ে। লেখাটিকে সমৃদ্ধ করেছে অজস্র টীকা এবং আলোকচিত্র। আর হ্যাঁ, বানানের শুদ্ধতা ও মুদ্রণসৌকর্যের দিক দিয়ে বইটি অনেক প্রকাশনার কাছেই দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। শরৎচন্দ্রের লেখাটি তাঁর জীবদ্দশাতেই কিংবদন্তির বিষয় হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে বহু সাহিত্য ও অ্যাডভেঞ্চারের রসদ হিসেবে ব্যবহৃত সেই অমূল্য কাজটি যদি পড়তে চান, তাহলে শুধুমাত্র এই বিশেষ অনুবাদ তথা সংস্করণটিকে বেছে নিতে ভুলবেন না। অনুবাদক ও প্রকাশককে আবারও সেলাম জানাই।
রবিঠাকুরের জন্মের এক যুগ আগে, সন ১৮৪৯ খ্রি চট্টগ্রামে যখন এক বৈদ্যসন্তানের জন্ম হয়েছিল কেউ ভাবেনি যে তার জন্মস্থান থেকে বহুদূরে সম্পূর্ণ অন্য এক দেশে অন্য এক সংস্কৃতি ও ধর্মের চর্চা তাকে বিখ্যাত করে দেবে। মেধাবী ছাত্র শ্রীশরৎচন্দ্র দাশ শহর কলকেতার প্রেসিডেন্সি কলেজে সিভিল এঞ্জিনিয়রিং পড়তে এলেন। ভূগোল পাঠে তাঁর উৎসাহ ও জ্ঞান দেখে তৎকালীন বঙ্গসরকারের ডিপিআই ক্রফট সাহেব তাকে দার্জিলিঙের এক ইস্কুলের প্রধানশিক্ষক করে পাঠিয়ে দিলেন। লক্ষ্যটা যদিও গভীরতর ছিল।
***
সুদীর্ঘকাল থেকেই মধ্য-এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ‘নিষিদ্ধ দেশ’ তিব্বত একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে ছিল, ক্রমে যেটা মধ্য-এশিয়ায় রুশ-বৃটিশ দ্বন্দ্বের রূপ নেয়ঃ কিপলিং-বর্ণিত ‘দ্য গ্রেট গেম’ । উত্তরে তার চীনদেশ, উত্তর-পশ্চিম থেকে রুশ সাম্রাজ্য ও দক্ষিণদিক থেকে ব্রিটিশ ভারতবর্ষ শ্যেনদৃষ্টি ফেলে ছিল তিব্বতের দিকে। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে জর্জ বোগলে, টমাস ম্যানিং ও বটানিস্ট জোসেফ হুকারের মতো ইংরেজরা তিব্বত নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে গেছেন, তুখোড় ভ্রমণও করেছেন সেখানে। মেধাবী প্রেসিডেন্সিয়ান শরৎচন্দ্র দার্জিলিঙে বসে বসে সে-সব কেতাব পাঠ করে নিয়ে নিজেকে তৈরি করে নিয়েছিলেন তাঁর স্বপ্নের দেশ তিব্বতে যাবার জন্যে। এর আগে অবিশ্যি ব্রিটিশ ‘সার্ভে অব্ ইন্ডিয়া’-র গুপ্তচর হিসেবে কুমায়ুনী পণ্ডিত নৈন সিংহ্ রাওয়াত (১৮৬৬-এ’) ও তাঁর তুতোভাই কিষণ সিংহ্ (১৮৭২ খ্রি) লাসা ও তিব্বত ঘুরে এসেছেন ও তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট পেশ করেছেন।
শরৎচন্দ্রের ঐ দার্জিলিঙের স্কুলের শিক্ষক লামা উগ্যেন গ্যাৎসো হয়েছিলেন শরতের অগ্রদূত, পরে তাঁকেই সঙ্গী করে উনি ১৮৭৯ ও ১৮৮১তে দুইবার তিব্বত ভ্রমণ করেন। স্বয়ং (ত্রয়োদশ) দলাই লামা লাসা-তে শরতকে সাক্ষাৎকার দেন (আজকের চতুর্দশ দলাইলামা নোবেলজয়ী তেনজিং গ্যাৎসো-র ঠিক পূর্বতন জন)। সংস্কৃত ও তিব্বতী ভাষায় লিখিত প্রাচীন বৌদ্ধশাস্ত্রের যে বিপুল জ্ঞানভাণ্ডার শরৎ সঙ্গে নিয়ে ভারতে ফিরে আসেন তার তুলনা মেলা ভার। তিব্বত ও তার ভাষা-সংস্কৃতিকে সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছিলেন চট্টগ্রামী বঙ্গসন্তান শরৎচন্দ্র দাশ, যাতে তাঁর তুলনা একমাত্র আলেক্সান্দার শোমা-র সঙ্গে হতে পারে।
পরে, অবশ্য, যখন কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি শরতের ভ্রমণকাহিনী গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে, এবং তিনি যে আসলে তথ্য ‘চুরি’ করে আনবার জন্যে ব্রিটিশভারত নিয়োজিত এক ‘গুপ্তচর’ মাত্র ছিলেন এইটে জানাজানি হয়ে যায়, তাঁর সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে তিব্বতের আধুনিকমনস্ক লামা সেঞ্চেন দর্জিচেনের# মতো শরতের তিব্বতী বন্ধুগণকে সরকারি আদেশে বীভৎস মৃত্যদণ্ড দেওয়া হয়।
সে সব, অবশ্য, ধর্মীয় মৌলবাদিতার প্রকাশ, যেটা যে-কোনো ধর্মের ক্ষেত্রেই সমান।
(# সেঞ্চেনের দোষ ছিল যে তিনি স্মলপক্সের ভ্যাক্সিন ও প্রিন্টিং প্রেসের মতো যোজনাকে সমর্থন করেছিলেন!)
***
এহ বাহ্য। এ’সব তথ্য প্রায় পুরোটাই আজ পাবলিক ডোমেইনে রয়েছে, যে কেহ চাইলে খুঁজে দেখে পড়ে নিতে পারেন। যেটা সেখানে নেই সেটা হলো এক ত্রিপুরানিবাসী সাহিত্যপ্রেমী বঙ্গসন্তান-কৃত শরৎচন্দ্রের ঐ যুগান্তকারী বইটির বঙ্গানুবাদ, যেটির মূল নাম জার্নি টু লাসা এণ্ড সেন্ট্রাল টিবেট অবিকল রেখে দিয়েছেন রাজীব। নিঃসংকোচ জানাই, এমন সুপ্রযুক্ত-তথা-স্বচ্ছগতি-তথা-মূলানুগ বঙ্গানুবাদ বেশি পড়তে পাওয়া যায় না।
যেমন, ষষ্ঠ অধ্যায়ে শরৎ লিখেছিলেন, ‘Preceded by Pador carrying his long lance…’ রাজীব তার বঙ্গানুবাদ করলেন, ‘পাদোর তার ইয়া লম্বা বর্শা হাতে এগিয়ে চলেছে…’।
দীর্ঘ দীর্ঘ ইংরিজি বাক্যকে অনায়াসে বাঙালির উপযুক্ত ছোট ছোট বাক্যে ভেঙে নিয়েছেন অনুবাদক, যে স্বাধীনতাটুকু না নিলে বাংলায় পাঠসুখ বজায় থাকত না।
অষ্টম অধ্যায়ে শরতের দিনানুগ ডায়েরিকে রাজীব ছোট ছোট সাব-হেডিং দিয়ে দিয়ে পাঠ এগিয়ে নিয়ে যান। তেসরা সেপ্টেম্বরে শরৎ লিখেছিলেন, ‘…it was reported that the Chinese commander of Shigatse flogged several of the Grand Lama’s servants….’ ; রাজীব অনুবাদ করলেন, ‘শিগাৎসের চিনা সেনাপতি মহালামার ক’জন সেবককে চাবকে লাল করে দিয়েছে।’
ঐ ‘লাল’-টুকু না থাকলে বাঙালি পাঠক চাবকানির তীব্রতাটা বুঝত কি?
অনুবাদগ্রন্থ ঠিক কী রকম হওয়া উচিত এ’ বই পড়ে শিখতে হবে তা।
***
শরৎচন্দ্র দাশের প্রায় পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে সুদূর হাঙ্গেরি থেকে এক জ্ঞানতাপস প্রায় পায়ে হেঁটে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন নিষিদ্ধ দেশ তিব্বতের দ্বারপ্রান্তে। লাদাখের বৌদ্ধ মঠে বসে তিনি রচনা করেছিলেন প্রথম তিব্বতী অভিধান (শ্রীরামপুরের কেরী সাহেবের মিশন প্রেস থেকে প্রকাশিত (১৮৩৪) । আধুনিক তিব্বতীবিদ্যার জনক মানা হয় হাঙ্গেরীয় সন্ত আলেক্সান্দার শোমা দ্য কোরস-কে।
উদিতসূর্যের দেশ জাপান তাঁকে দ্বিতীয় মহাবোধির সম্মান দিয়েছে!
মহাপ্রয়াণ ও সমাধি তাঁর আমাদের দার্জিলিং শহরেই, যেখান থেকে শরৎ দাশ তাঁর তিব্বতযাত্রা শুরু করেছিলেন।
আমাদের বঙ্গসন্তান শরৎচন্দ্র দাশের নামে আজ পর্যন্ত একটা ডাকটিকিটও ছাপা হলো না গো (নৈন সিংহ্ রাওয়াতের নামে হয়েছে)!
দার্জিলিঙে তাঁর আবাস ‘লাসা ভিলা’ আজ ভগ্নস্তূপ!
এ’ দুঃখ আমরা রাখব কোথায়?
(সকৃতজ্ঞ স্বীকারোক্তিঃ ইঙ্গরাজী ই-পত্রিকা scroll.in-এ প্রকাশিত শ্রদ্ধেয় শ্রী পরিমল ভট্টাচার্য মহাশয়ের ‘Meet Sarat Chandra Das: The spy who came in from the cold of Tibet’ (October, 2017) নিবন্ধটি থেকে এই গ্রন্থ-সমালোচনায় বেশ কিছু ইনপুট নিয়েছি । )