Mythology and Ancient History of Kashmir through a Travelogue.
মহর্ষি দুর্বাসা উপস্থিত হয়েছেন নাগ সদাঙ্গুলের বাসস্থানে। কিন্তু তিনি কোথায়? তিনি প্রমোদভবনে। সাধারণ রমণীদের কাতর আর্তনাদে কান পাতা দায়। কুপিত হলেন দুর্বাসা। ব্যভিচারী গৃহস্বামী, সেই সঙ্গে অত্যাচারীও। এ স্থান জলমগ্ন হোক, শুদ্ধ হোক। ক্রুদ্ধ দুর্বাসা অভিশাপ দিয়ে স্থানত্যাগ করলেন।
সংবাদ পেলেন নীলনাগ, কশ্যপমীরের নাগপ্রধান। সতীসরে এ কি অনাচার! সতীর দেশে নারীর অবমাননা! সদাঙ্গুলকে বহিষ্কার করলেন তিনি;
কিন্তু ঋষি দুর্বাসার অভিশাপ? তা কি সত্যি হল? আদৌ জলের তলায় চলে গেল কি সদাঙ্গুলের বাসস্থান?
আর সদাঙ্গুলের আগেও বৃন্দাবন থেকে বিতাড়িত কেউ বসবাস করেছিলেন এখানে। কী সেই রহস্য?
কাশ্মীরের স্থাপত্য, পুরাণেতিহাস, স্থানীয় প্রবহমান সংস্কৃতির কোলাজ।
ভ্রমণ কাহিনি ব্যাপারটার সঙ্গে আমাদের পরিচয় অনেকদিনের। সুবোধকুমার চক্রবর্তী, শঙ্কু মহারাজ, নবনীতা দেবসেন— এইসব মহাজনেদের লেখায় সমৃদ্ধ হয়েছে ধারাটি। কিন্তু তাতে ইদানীং কিছুটা ভাঁটার টান এসেছে। বাঙালি আজও বেড়াতে চায় আর বেড়ানো নিয়ে তথা দেশ-বিদেশ নিয়ে গল্প জানতে চায়। তবে তার মাধ্যমটা বদলে গেছে ভ্লগ, রিলস্ ইত্যাদিতে। লেখক কিন্তু সনাতন পদ্ধতিটিই অবলম্বন করেছেন। নিজের সম্পূর্ণ বক্তব্যটুকু তিনি পেশ করেছেন লিখিত আকারে। তাঁর একক কাশ্মীর ভ্রমণ, তারপর সপরিবারে আবার তার অতীত গরিমার ভগ্নাবশেষের সূত্র ধরে ইতিহাসের অন্বেষণ— এই নিয়েই লেখা হয়েছে বইটি। বইটির বিশেষত্ব কী? ১) ভূ-স্বর্গের প্রকৃতি বর্ণনার বিবরণকে একপাশে রেখে এটি এক দুরূহ কাজ করেছে। কাশ্মীরের প্রাক-ইসলামিক ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে যে ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে আছে তার নানা প্রান্তে, একেবারে ধরে-ধরে সেগুলোর ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন লেখক। আজ অবধি কোনো ভ্রমণ কাহিনি তো দূরস্থান, বাংলায় লেখা কোনো ইতিহাস বা পুরাতত্ত্বের বইয়েও এ-জিনিস পাইনি। এই ইতিহাসের সঙ্গে লেখক জুড়েছেন একেবারে প্রত্যক্ষদর্শীর সাম্প্রতিক অনুভূতিমালা আর ফটো। এইরকম ক্ষেত্রসমীক্ষার জন্য তাঁকে আভূমি সেলাম জানাতে হয়। ২) হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির আশাতেই বাংলায় কাশ্মীর নিয়ে লেখালেখির সময় লোকে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের ওপর হয়ে যাওয়া ঘটনাগুলো বেমালুম ভুলে যায়। লেখক বিষয়টিকে উপেক্ষা করেননি, আবার এই নিয়ে রাজনীতিও করেননি। এটা বেশ ভালো এবং সমদর্শী-সুলভ লাগল। ৩) নানা জায়গায় বেড়ানোর সময় শোনা আঞ্চলিক কিংবদন্তি, মনে-করা পুরাকথা এবং ভূতত্ত্ব মিশিয়ে কাশ্মীরের প্রাগিতিহাস 'নির্মাণের' চেষ্টাটি ভালো লেগেছে। ৪) লেখক-পরিচিতি অংশে "লেখকের পরিচয় তাঁর কলমে" পড়ে রীতিমতো আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছি। ধর্মেন্দরের পর এইরকম মাচো ডায়লগ... মা কসম! কিন্তু... (ক) বইটাতে না আছে কোনো সূচিপত্র, না আছে কোনোরকম নির্দেশিকা। ফলে এই বইয়ের কোনো অংশকে যদি আলোচনার খাতিরে তুলে ধরতে হয়, তার আদ্যোপান্ত খুঁজতে হবে। এ ভারি কিম্ভূত জিনিস। (খ) পুরাকথাগুলোকে নিজের ভাষায় লিখতে গিয়ে লেখক বড্ড বেশি আবেগমথিত হয়ে পড়েছেন। (গ) প্রায় শ'খানেক অস্পষ্ট আলোকচিত্র আছে বইটিতে। কিন্তু এতে বেশ কয়েকটি মানচিত্র অত্যাবশ্যক ছিল। লেখক যদি মানচিত্রে এক-একটি দিন তাঁর গন্তব্যকে চিহ্নিত করে সেভাবেই পর্ব-বিন্যাস করতেন, আর তার মাঝে-মাঝে জুড়ে দিতেন যাবতীয় ব্যক্তিগত অনুভূতি ইত্যাদি, তাহলে বইটা সর্বার্থে সুবিন্যস্ত হত। সব মিলিয়ে এই বই পড়াটাও আমার কাছে এক অভিজ্ঞতা হয়ে রইল। কর্মসূত্রে কাশ্মীরে বাস করেছি বেশ কিছুদিন; তবে অত কাছ থেকে দেখলে ব্যাপারটা 'অন্ধের হস্তীদর্শন' হয়ে যায় বলে কিছু লেখার সাহস পাইনি। লেখক কিন্তু একটি নিজস্ব 'পার্সপেক্টিভ' বজায় রেখে ওই অনন্য অঞ্চলটিকে নিয়ে নিজের বক্তব্য সুন্দরভাবে পরিবেশন করতে পেরেছেন। তাঁর শ্রম, মেধা ও আবেগ দিয়ে গড়া এই বইটি বহুলসংখ্যক পাঠকের দ্বারা আদৃত হবে বলেই আশা রাখি।
রিভিউ -- কশ্যপমীর থেকে কাশ্মীর: স্থাপত্য এবং পুরাণেতিহাসের পথে লেখিকা: সুচেতনা সেন কুমার প্রকাশক: প্রজ্ঞা
এক কাশ্যপের ব্যক্তিক ভ্রমণ থেকে এক জাতির সম্মিলিত স্মৃতির দিকে
গত পরশুদিন আমি বইটি শেষ করেছি। আজ, দুপুর দেড়টার নরম আলোয়, কলম হাতে নিয়ে রিভিউ লিখতে বসেছি। কিছু বই আছে, যেগুলো পড়ার পর চোখে-মুখে স্বপ্নের আভা লেগে থাকে, বুকের গভীরে ইতিহাসের ধূলিকণা আর প্রাচীন মন্দিরের ভগ্নস্তূপ মিশে এক নিঃশব্দ কিন্তু তীব্র অভিঘাত জাগায়—এই বইটি ঠিক তেমনই। কশ্যপমীর থেকে কাশ্মীর নিছক ভ্রমণকাহিনি নয়, কিংবা শুধু পুরাণভিত্তিক ইতিহাসের আলেখ্যও নয়। এটি এক কালাতীত যাত্রা, যেন কোনও ঋষিকন্যা আধুনিক অবতারে জন্ম নিয়ে, নিজের পূর্বপুরুষের পবিত্র ভূমিকে নতুন দৃষ্টিতে পুনরাবিষ্কার করছে—এক অপূর্ব আখ্যানের মাধ্যমে, যা হৃদয়ে চিরস্থায়ী দাগ কাটে।
লেখিকা সুচেতনা সেন কুমার এখানে এক ব্যতিক্রমী সাহিত্যিক সাধনা করেছেন। মায়ের উপহার দেওয়া দশ হাজার টাকা সম্বল করে তিনি এককভাবে যাত্রা করেছেন কাশ্মীরের দিকে—শুধু নয়নের আরামে ভ্রমণ করতে নয়, বরং এক আত্মিক অনুসন্ধানের পথ ধরেই। কাশ্মীর, যা আমাদের কল্পনায় 'ভূ-স্বর্গ', এই বইতে এসে রূপ নেয় এক বহুরৈখিক বাস্তবতায়—পুরাণের রূপকথা, ইতিহাসের কালিমা, রাজনৈতিক সংকট, এবং এক নারীর ব্যক্তিগত যন্ত্রণা—সব মিশে যায় এক আশ্চর্য অনুরণনে।
এই গ্রন্থ যেন বাস্তব ও কল্পনার সীমানায় দাঁড়িয়ে নির্মাণ করে এক বিকল্প ইতিহাস। যেমন T. S. Eliot বলেছিলেন, "Time present and time past / Are both perhaps present in time future," — ঠিক তেমনই, এখানে বর্তমানের অভিজ্ঞতা কেবল তথ্যসংগ্রহ নয়, এক সুদূর অতীতের প্রতিধ্বনি।
বইটির গঠনচিত্র একেবারেই নিয়মবহির্ভূত। তবে সেই অনিয়মই এর অন্তর্নিহিত ছন্দ—যা কখনও ট্র্যাভেলগের একান্ত গদ্যে ধরা পড়ে, কখনও আবার কলহনের ‘রাজতরঙ্গিণী’ অবলম্বনে নির্মিত হয় ইতিহাসভিত্তিক কাহিনির মতো। কোথাও প্রত্নতাত্ত্বিক বিবরণ এসে পড়ে, কোথাও এক আধুনিক ‘আজ্জি’—এক ডুঙ্গা হাঞ্জ তরুণীর জীবনবয়ানের মধ্যে প্রতিফলিত হয় কাশ্মীরের অবদমিত কান্না। এইসব স্তর একে অপরকে ছুঁয়ে যায়, ঠোক্কর খায়, আবার ফিরে আসে পাঠকের কাছে—তাঁকে শুধুমাত্র তথ্য নয়, অভিজ্ঞতাও দিয়ে যায়।
আসলে এই বই পড়তে পড়তে মনে হয়, লেখিকা যেন বেড়াতে যাননি, গিয়েছিলেন আত্মা স্পর্শ করতে। যেমন Virginia Woolf বলেছিলেন, “A woman must have money and a room of her own if she is to write fiction”—এখানে লেখিকার সেই 'room of her own' হয়ে উঠেছে কাশ্মীরের উপত্যকা—অত্যন্ত ব্যক্তিগত অথচ ঐতিহাসিকভাবে পরিপূর্ণ।
এই বই পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল যেন কেউ আমার হাত ধরে নিয়ে চলেছেন মাট্টান থেকে শঙ্করগৌরীশ্বর, সুগন্ধেশ্বর থেকে লোলারক—প্রতিটি ধ্বংসস্তূপের ভিতর দিয়ে, ধ্যানমগ্ন কশ্যপের চরণচিহ্ন মাড়িয়ে সেই পুণ্যভূমিতে, যেখানে ইতিহাস আর পুরাণের বিভাজনরেখা ঝাপসা হয়ে যায়। যেন সেই পথে কোনওদিন হেঁটেছেন জেসাস, যেন কোনও পূর্ণিমার রাত্রে নগ্নপদে এসেছেন নাগার্জুন, কিংবা ধূসর অমাবস্যার ছায়ায় শিবনেত্র যুক্ত এক যুবক উচ্চারণ করেছেন—❝Arise, awake, and stop not till the goal is reached.❞ (Swami Vivekananda)। এই যাত্রাপথেই কোনও এক রাতে এক আজ্জি মিলেছে এক অচেনা অতিথির সঙ্গে—ভবিষ্যতের ছায়া ছুঁয়ে গিয়েছে অতীতের দরজায়।
এইসব চিত্রনির্মাণ কেবলমাত্র বাঙালি কল্পনাশক্তির ফসল নয়, এটি এক অন্তরঙ্গ সাহসের সাক্ষ্য। লেখিকার কলমে আমরা পাই সেই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার যার ভাষা কেবল তথ্য নয়—উপলব্ধি।
❝The future is a memory that has not yet been lived, and the past, a future we have already forgotten.❞ এই বই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
আর যখন কোনও স্তব্ধ সন্ধ্যায় মনে হয়, এই ভূমি নিঃশব্দে তার অতীতের ভাষায় কথা বলছে, তখন কানে বাজে ঋগ্বেদের সেই চিরন্তন ধ্বনি:
“त्वं स्तोता सत्यमत्तः पुरा च” — Rigveda, 10.9.1 ("তুমি সেই প্রাচীন স্তোত্রের মূর্তি, যিনি চিরকাল সত্য ও শ্রদ্ধার উপাসক।")
এই বই যেন সেই স্তোত্রের পুনর্জাগরণ—যেখানে কাশ্মীর শুধু ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, এক জীবন্ত মন্দির, এক বহুস্বরিক গাথা।
লেখা এবং অন্বেষণের মধ্যেকার ব্যবধান লেখিকা সুচেতনা সেন কুমার বারবার ভেঙে দিয়েছেন—��য় করেছেন, বলা ভালো। তাঁর প্রতিটি অধ্যায় যেন একেকটি নিখুঁত কারুকার্য, শুধু পাঠযোগ্য নয়—পাঠনীয়; কেবল জ্ঞানের বাহন নয়, বোধের অনুরণনও। এই বই পড়ে পাঠকের মনে হয়, তিনি কেবল কাশ্মীর পড়ছেন না, বরং কাশ্মীর হয়ে উঠছেন—একটি সমবেত স্মৃতিভূমি, একটি স্তব্ধ অতীতের প্রতিধ্বনি।
ভাষার ব্যবহার তাঁর কলমে বহুরৈখিক—চলিতের সহযাত্রায় উঠে আসে তৎসমের ধ্বনি, আর মাঝে মাঝে ঢেউ তোলে আবেগমথিত প্রতিবাদের শব্দ। কোথাও কোনও চটকদার সংলাপ নেই, নেই বিপণন-সুলভ কল্পনার জাল। এই বই যেন লেখিকার ধমনী-নাড়ির ধ্বনির স্বরলিপি—একটি সাহসী আত্মজীবনীর ছদ্মবেশে লেখা গভীর প্রত্নস্মৃতির উপাখ্যান।
Virginia Woolf একবার বলেছিলেন, ❝A woman writing thinks back through her mothers.❞ এই বইতে যেন সেই মাতৃস্মৃতির উত্তরাধিকার সরাসরি প্রবাহিত হয়েছে—মায়ের দেওয়া দশ হাজার টাকার মধ্য দিয়ে নয় শুধু, বরং সেই সাহসে, যে সাহস একজন নারীকে ইতিহাসের ভগ্নমন্দিরে দাঁড়িয়ে বলতে শেখায়, “আমি এসেছি খুঁড়ে তুলতে বিস্মৃত মহিমা, আমি এসেছি নিজগোত্রের পূর্বপুরুষের ধ্বনি শোনাতে।”
এ বই কোনওভাবেই নির্লিপ্ত নয়—বরং প্রতিটি পৃষ্ঠায় মুখোমুখি দাঁড়ায় সাহস এবং সংশয়, বিশ্বাস এবং বিভাজন। লেখিকা স্বীকার করেছেন, বই প্রকাশের পর তাঁকে টার্গেট করা হয়েছে। অবাক হবো না। কারণ, এই ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে কেউ যখন বলেন—“কাশ্মীরি পণ্ডিতেরা ভারতের ফিনিক্স পাখি”—তখন তার প্রত্যুত্তর দিতে হয় না কেবল বিদ্বেষীকে, বরং সেই বিস্মৃত অতীতকেও, যাকে কেউ আর শুনতে চায় না।
তবু সেই টার্গেটিং-ই বইটিকে মূল্যবান করে তোলে। কারণ এ কেবল ইতিহাস নয়—এ ইতিহাসের দখল পুনরায় দাবি করার এক নিঃশব্দ যুদ্ধ। এ স্মৃতির রিভিশন, এ কণ্ঠস্বরে এক রকম আত্মপ্রত্যয়ের সঞ্চার।
❝Until the lions have their own historians, the history of the hunt will always glorify the hunter.❞ — Chinua Achebe
সুচেতনার বই যেন সেই সিংহ-কথকতার সূচনা। যেখানে প্রান্তিক কণ্ঠগুলি ফিরে পায় ভাষা, ফিরে পায় সাহস। আর সেই সাহসই—হিন্দু পুরাণের ভাষায়—ধর্ম। আর সেই ধর্মচ্যুতি, স্মৃতিহীনতাই আসলে আমাদের পশুত্বের উৎস।
“धर्मेण हीनाः पशुभिः समानाः।” — Mahābhārata, Śānti Parva ("ধর্মহীন জীব মাত্র পশুর সমান।")
এই বই সেই ধর্মের ফিরে আসা—এক জ্ঞানতপস্বীর কলমে; এক কাশ্যপকন্যার প্রার্থিত পুনর্জন্ম।
Nelson Mandela যেভাবে বলেছিলেন, ❝There is no future without memory,❞ সুচেতনার কাশ্মীর সেই ভবিষ্যতেরই বীজ বোনে অতীতের স্তব্ধ গুহায়—একটি অতীন্দ্রিয় স্তবগাথা হয়ে।
তবে কিছু অনুযোগ অবশ্য থেকেই যায়। বইটিতে ব্যবহৃত অনেক ছবিই দুর্ভাগ্যজনকভাবে অস্পষ্ট, সূচিপত্রের অনুপস্থিতি পাঠকের অন্বেষণের পথে মাঝে মাঝে ধন্দ তৈরি করে, আর ভাষা কোথাও কোথাও এতটাই ব্যক্তিক যে তা সাধারণ পাঠকের থেকে কিছুটা দূরত্ব তৈরি করে। কিন্তু এইসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, আমি নিঃসন্দেহে বলব—এই বই একবারই লেখা যায়, দ্বিতীয়বার নয়। এটি একজীবনে একবার ঘটে যাওয়া এক সাহিত্যিক সাধনা, এক ধরণের আত্মিক অনলযাত্রা।
ঠিক যেমন রুক্মিণী ছিলেন কৃষ্ণের অদ্বিতীয় সঙ্গিনী—এবং সেই গল্প আর একবার লেখা যায় না—ঠিক তেমনই কশ্যপমীর থেকে কাশ্মীর একটি অনন্য সৃষ্টি, এক ধরণের কাব্যময় তীর্থযাত্রা। এটি পাঠকের কাছে শুধু একটি বই নয়, বরং এক প্রতিশ্রুত জন্মস্মৃতির সন্ধান—যা বারবার ফিরে আসবে না, আর যা একবার পাঠ করলে ভোলা যাবে না।
শেষে বলি—এই বই পড়ে আমি শিখেছি, ইতিহাস শুধু পাণ্ডিত্য নয়। তা কেবল তারিখ আর দলিলের জড় পঙ্ক্তিমালা নয়। বরং তা হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত সাহসের দলিল, এক নারীর একার পথে হেঁটে যাওয়া, একটি লুপ্তপ্রায় জাতির কান্না, আর কাশ্মীর নামক এক ভূখণ্ডের আত্মার মগ্ন বিলাপ। ইতিহাস শুধু যা ছিল তাই নয়—যা হারিয়েছে, যা আর ফিরে আসবে না, এমনকি যা হয়তো কোনওদিন ছিলই না, কেবল কল্পনায় দুলে ওঠে—তাও ইতিহাসেরই অন্তর্গত।
এই বই সেই আত্মার ইতিহাস বলে। এটি এক পরাধীনতায় নির্ভীক ভ্রমণ। এক কশ্যপ-মনস্কা লেখিকার অজানা নিরুদ্দেশে যাত্রা, যেখানে পদচিহ্ন মুছে যেতে যেতে চিহ্ন হয়ে ওঠে, যেখানে প্রতিটি ভগ্নমন্দির আত্মপরিচয়ের প্রতিধ্বনি। এটি এক ‘সন্ধান’ যার শেষে প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে প্রতিজ্ঞা।
আমরা, যারা এই বই পড়েছি, তারাও সেই যাত্রার সঙ্গী। এক একটি পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে যেন হাঁটছি শ্রীনগরের গলি, মাট্টানের সিঁড়ি, বা জ্যেষ্ঠেশ্বরের নীরব ছায়ায়। কোথাও কলহনের ছায়া, কোথাও আজ্জির কান্না, কোথাও ইতিহাস, কোথাও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা।
এটি এক বই নয়—এক প্রস্থান, এক প্রত্যাবর্তন।
And as T.S. Eliot once wrote: ❝We shall not cease from exploration, and the end of all our exploring will be to arrive where we started and know the place for the first time.❞
এই বই সেই চেনা মাটিকে নতুন চোখে চেনার সাধনা।
এই বই এক কাশ্যপের থেকে শুরু হওয়া কাশ্মীর-যাত্রার চূড়ান্ত ‘উত্তর-আলো’।