গ্রন্থভুক্ত দশটি গল্পের চরিত্র বিন্যাসে সিরাজুল ইসলামে মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। গল্পগুলো গতানুগতিক নয় যে এক বসাতেই পড়ে শেষ করা যায়। বরং গল্পের কাহিনী ও চরিত্র পাঠকের গভীর মনোযোগ দাবি করে। গল্পে ইতিহাস ও সময়ের বাস্তবতা নির্মাণে লেখক যেন ইতিহাসবিদ কিংবা প্রত্নতত্ত্ববিদ্যার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। বিশেষ করে পুরোনো ঢাকার নিজস্ব সংস্কৃতি লেখক নিবিড় মমতা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। মানবসম্পর্কের জটিল ও রহস্যময় জগৎ তাঁর গল্পে বিশেষ অনুসন্ধানের বিষয়।
৩.৫/৫ খুব ভালো লেগেছে দাবি করবো না। মাঝেমধ্যে লেখকের চিন্তাবীজ উপযুক্ত ভাব ও ভাষা খুঁজে পায়নি, মাঝেমধ্যেই আস্ত একটা নিটোল গল্পের সম্ভাবনা বিনষ্ট হয়েছে শেষপ্রান্তে এসে। তারপরও সিরাজুল ইসলাম আমার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারলেন, জোরালোভাবে। স্মৃতিকাতরতা, যৌনতা, অনুশোচনা, পুরুষতান্ত্রিকতার ফাঁদ, ট্রমা লেপ্টে আছে গল্পগুলোর শরীরে যা আমাদের মগ্নচৈতন্যে দোলা দিতে সক্ষম। গল্পের অন্তর্গত চাপা বিষণ্ণতা পাঠককে আক্রান্ত করে সহজেই। লেখকের অন্তত আরেকটি বই পড়ে দেখবো। পছন্দের গল্প - চোস্ত পায়জামা, গন্তব্যে, শরীর, দেখা, আফসানা ইত্যাদি।
আমার ধারণা, উপন্যাস যতটা ব্যক্তিগত কিংবা আত্মজৈবনিক উপাদানে নির্মিত হতে পারে, ছোটগল্পে সেই সুযোগটা কম। ছোটগল্পের একটা খন্ড বিখন্ড, কখনও বদ্ধ, এবং বুদ্ধিবৃত্তিক টেনশন থাকে - যা আমাদের ধারাবাহিক ক্লান্তিকর যাপন থেকে কিছুটা বিপরীতমূখী। এই ক্রমাগত চক্র কাটতে থাকা ব্যক্তিজীবন কোনো তীক্ষ্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাসপেন্সনির্ভর ঘটনার সমষ্টি তো নয় - এটা সেন্টিমেন্টাল, প্রায় পাশবিক, স্থূল, ক্ষেত্রবিশেষে অর্থহীন ও দীশাহীন একটা যাত্রা - যেই বন্যতাকে ধারণ করতে সবচেয়ে উপযোগী ক্যানভাস মনে হয় উপন্যাসকেই।
সিরাজুল ইসলাম-এর গল্পের বই ‘চোস্ত পায়জামা’ পড়তে পড়তে উপন্যাস ও গল্প প্রসঙ্গে এই নিজস্ব বোধ থেকে সরে আসতে হয়নি আমাকে। তবে আবিষ্কার করতে পারলাম, এ বইয়ের গল্পগুলো ঠিকই লেখকের আত্মজৈবনিক উপাদান থেকে কেটে কেটে নিয়ে এমন কিছু নির্মাণ করেছে, যা প্রচলিত ছোটগল্পের ধারণাকে পাশ কাটিয়ে নিজের মতো একটা অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে চায়।
কৌশলের টনটনে ব্যবহারের চেয়ে এসব গল্প খাঁটি অনুভূতিজাত, যার ভরকেন্দ্রে আছে মূলত পুরুষ মানুষ - তার নষ্টালজিয়া, কনফেশন, গ্লানি এবং যৌনতা। যেখানে এমনকি নারী চরিত্রপ্রধান গল্পেও আমরা দেখি তার সুতো কাটা হচ্ছে কোনো না কোনো পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই। আর এসব গল্পের প্রেক্ষাপট হিসেবে আমরা পাই ষাটের দশকের পুরনো ঢাকার এক হারানো জগত। বাড়তি পাওয়া নিঃসন্দেহে।
চোস্ত পায়জামায় নাম গল্পটিসহ মোট দশটি গল্প আছে। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে - গন্তব্যে, দেখা, এবং আফসানা।
সিরাজুল ইসলামের গদ্যও আমার ভালো লাগল, কখনও সাবলীল, কখনও ঘোরে আক্রান্ত ফেরারি মানুষের চিন্তার উত্থানপতনের লয়ে তাল মিলিয়ে চলা ড্রামের বিটের মতো। সবকটি গল্প এমনকি গল্প হয়ে উঠতেও অস্বীকার করে, সেই জায়গাগুলোও একটা আলাদা আবেদন তৈরি করে মনোযোগ দিয়ে পড়তে পারলে।