ঊনবিংশ শতাব্দীর দুই উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক-মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। দুজনেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে আলোকিত করে গেছেন। অথচ তাঁদের চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত প্রকৃতির।
বিদ্যাসাগর ছিলেন অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ মানুষ, অন্যদিকে মাইকেল নিজের বেপরোয়া উচ্ছৃঙ্খল জীবনের ব্যয়ভার বহন করতে বারবার ব্যর্থ হয়েছেন, নিরুপায় হয়ে হাত পেতেছেন ঈশ্বরচন্দ্রের কাছে। বিদ্যাসাগরও অকৃপণ দরাজ হয়ে যতদিন পেরেছেন অকুণ্ঠ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
এই দুই ভিন্ন চরিত্রের নক্ষত্রের বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার কাহিনি-'মাইকেল ও বিদ্যাসাগর : দুই মেরুর দুই বন্ধু'।
দুই মেরুর দুই বন্ধু: এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ও এক দয়ার সাগরের বিরল সখ্য
ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলায়—যেখানে সমাজভবনে চলছে প্রবল টানাপোড়েন, সাহিত্যের আঙিনায় জাগছে নবচেতনা, আর জাতির নকশা রচনার প্রয়াসে চিন্তার উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে চিন্তাশীল মানুষের অন্তরে—ঠিক সেই সময়ের দুই বিপরীত প্রান্তে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
একজন নীতির সংহিতা, অন্যজন বিদ্রোহের মহাকাব্য। একজন স্থিতধী সমাজসংস্কারক, অন্যজন ছন্দবদলের শাসক।
রাজা ভট্টাচার্যের মাইকেল ও বিদ্যাসাগর: দুই মেরুর দুই বন্ধু কেবল একটি যুগল জীবনী নয়—এ যেন এক জ্বলন্ত ঐতিহাসিক দলিল, যেখানে ভাষা, প্রজ্ঞা ও সহানুভূতির আলোয় উদ্ভাসিত হয় দুই বিপরীত চরিত্রের এক অপূর্ব সখ্য। এই গ্রন্থ যেন হাতে তুলে দেয় সেই অনুপম সত্য—বিপরীত প্রকৃতিও কখনও কখনও একে অপরের সম্পূর্ণতা হয়ে ওঠে।
বিদ্যাসাগরের শৃঙ্খলার কঠোর ব্যাকরণ যেখানে কঠিন অথচ ন্যায্য, সেখানে মাইকেলের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ উদ্দামতা যেন নিয়তির অপরিহার্য বিপরীতছায়া—দুই সুর, দুই স্বর, কিন্তু এক ঐক্যতান। এই সম্পর্কের টানাপোড়েনেই ফুটে ওঠে ঊনবিংশ শতকের বাংলার অন্তরসত্য—যেখানে ছিল দ্বৈততা, কিন্তু সংঘাত নয়; ভিন্নতা, কিন্তু বৈরিতা নয়; বরং ছিল এক অপরকে ধারণ করার পরিণত উদারতা।
এই উপন্যাসটি কেবল পাঠ নয় — এক অনন্য অভিজ্ঞতা, যেখানে জৈবিক সংবেদন ও মননশীল পাঠ এক আত্মিক সেতুবন্ধনে যুক্ত হয়েছে। লেখকের শিল্পীসুলভ মুন্সিয়ানা এখানেই—তিনি মাইকেলকে শুধুই বিক্ষিপ্ত প্রতিভার প্রতীক করে তোলেননি, আবার বিদ্যাসাগরকে অতিমানবিক দেবত্বে বসিয়ে কল্পনার মেঘে ভাসিয়ে দেননি। বরং, ২৩২ পৃষ্ঠার পরিসরে তিনি এক অপূর্ব ভারসাম্যে তুলে ধরেছেন মাইকেলের উদ্দাম, বেপরোয়া প্রতিভার আগুন আর বিদ্যাসাগরের ধীর, স্থিত, নীতিবদ্ধ প্রজ্ঞার মানবিক অভিযাত্রা। এই ভারসাম্যই উপন্যাসটিকে করে তোলে এক মননচর্চার অভিজ্ঞান, এক অন্তরঙ্গ সময়যাত্রা।
মাইকেল: এক অসমাপ্ত সন্ধ্যারাগ
সাহিত্যিক পরিসরে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছিলেন এক নবজাগরণের ঝড়। বাংলা ভাষায় প্রথম সনেট, প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ, প্রথম ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি—সবকিছুরই বীজ তিনি বপন করেছিলেন নিজের কলমে, নিজের রক্তে। মেঘনাদবধ কাব্য কেবল একটি মহাকাব্য নয়; এটি বাংলা সাহিত্যের এক আত্মঘোষণা, এক আত্মপ্রতিষ্ঠা, যেখানে পুরাণে আচ্ছন্ন এক জাতির কণ্ঠে প্রথম ধ্বনিত হয় ট্র্যাজিক সাহসের দ্রোহী সুর।
তবু, এই মেধার বিস্ফোরণসঙ্গেই চলেছে এক জীবনের ক্রমাবনমন। ব্যয়বিলাস, দুঃসাহসিক বিদেশযাত্রা, ধর্মান্তরজনিত পারিবারিক বিচ্ছেদ, আর একের পর এক ঋণের ভারে ন্যুব্জ হওয়া—মাইকেলের জীবন যেন নিজেই এক ট্র্যাজেডি, যেটির শেষ অঙ্কে থাকে না মুক্তি, কেবল এক বিষণ্ণ নীরবতা। প্রতিভা যেখানে চূড়ান্ত, সেখানেই তার আত্মবিনাশও যেন ততটাই তীব্র। এক সন্ধ্যারাগ—যেখানে রঙ ও রক্ত একাকার হয়ে যায়, কিন্তু সন্ধ্যার পূর্ণতা আর কখনও আসে না।
রাজা ভট্টাচার্য তাঁর বইটির গড়ন এমন সূক্ষ্মভাবে নির্মাণ করেছেন, যাতে পাঠক কেবল মাইকেলের সাহিত্যিক কৃতিতেই মুগ্ধ না হন—তাঁরা ধরা পড়ে যান এক ভঙ্গুর আত্মার প্রতিধ্বনিতে, এক প্রতিভার বিপন্ন পরিণতিতে। বিদ্যাসাগরের প্রতি মাইকেলের সেই নিঃশর্ত নির্ভরতাও যেন বইটির প্রতিটি পাতায় ছায়ার মতো লেগে থাকে—নীরব, কিন্তু গভীর। লেখক যেন পাঠকের হৃদয়ে রেখে দেন এক দীর্ঘস্থায়ী রেশ—যেখানে মুগ্ধতা আর মায়া পাশাপাশি হাঁটে, অনুরণিত হয় এক প্রশ্ন: প্রতিভার পরিণতি কি সর্বদাই ট্র্যাজিক?
বিদ্যাসাগর: এক ভোরের ভৈরব
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন শুধুমাত্র সংস্কারের অভিধান নয়, বরং একটি গভীর নৈতিক মহাকাব্য—যেখানে প্রতিটি অধ্যায়ে ত্যাগ, দায়িত্ব, ও অন্তর্জ্বালার অনুরণন। বর্ণপরিচয় আর বিধবাবিবাহ তাঁর বাহ্যজীবনের চূড়ান্ত ঘোষণা হলেও, এই বইটি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় এক অন্য বিদ্যাসাগরের সঙ্গে—যিনি ছিলেন শুধু সমাজসংস্কারক নন, এক কোমল হৃদয়ের, নীরব সহানুভূতির প্রস্তরপ্রতিম মানুষ।
তিনি যখন লিখছেন—“একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ পাঠাইলাম, দেখিও যেন বাতাসে উড়িয়া না যায়”—সে কেবল পাণ্ডিত্যের হালকা তির্যক নয়, বরং এক সারল্যভরা মানবিক প্রার্থনা। আর যার গর্ভে লুকোনো আছে—“আমি তো আর তোমার সঙ্গে থাকতে পারব না, কিন্তু আমি চাই তুমি থাকো।” এই একটি বাক্য, যেন এক অপার দয়ার সমুদ্র, যার ঢেউয়ের গুনগুনে শব্দ আজও ভোরবেলা ভৈরবের সুর হয়ে কানে বাজে।
এই বইয়ের সবচেয়ে অসামান্য দিক হল, এটি বিদ্যাসাগরের ‘দূরের’ মানুষদের প্রতি তাঁর কর্তব্যবোধের পাশাপাশি তাঁর ‘ঘরের’ মানুষদের প্রতি দুঃখ-বঞ্চনা আর পরাজয়ের চিত্রও তুলে ধরে। শ্বশুর, জামাতা, ভাই, এমনকি একমাত্র পুত্রের কাছ থেকেও এসেছে তীব্র আঘাত—কিন্তু কখনও কর্তব্যচ্যুতি ঘটেনি, কখনও ভালোবাসার রেশ শুকিয়ে যায়নি।
ছেলে নারায়ণের প্রতি যে বেদনামাখা বিচ্ছেদ, স্ত্রী দিনময়ীর প্রতি দেরিতে আসা দয়ার আকুতি, এমনকি মৃতদেহ ঘিরে স্ত্রীর শেষ ইচ্ছেপূরণ—সবটাই যেন ভোরের কুয়াশায় ঢেকে থাকা এক চিরস্থায়ী দুঃখ, যেখানে আলো ফোটে, কিন্তু রোদ্দুর ঢোকে না।
বিদ্যাসাগর এই সমাজের প্রতি অভিমানে যখন বলেন, “তোমরা আমাকে দেশত্যাগী করালে,” তখন সেই বাক্যে শুধু প্রতিবাদ নেই—আছে এক অন্তর্জ্বালার নীরব গুঞ্জন। এই আঘাত শুধু বাইরের সমাজ দেয়নি, দিয়েছে কাছের আত্মীয়স্বজনও। কিন্তু এইসব ক্ষতের মাঝেই বিদ্যাসাগর রেখে গেছেন কিছু অমোঘ অনুরণন—মাসে মাসে ভাইয়ের স্ত্রীর আঁচলে গোপনে টাকা বেঁধে দেওয়া, নিজেকে ‘ডিউটি অফিসার’ হিসেবে দেখা, ছেলেকে পরিত্যাগ করলেও পুত্রবধূর প্রতি একবিন্দু বিরাগ না রাখা—সবই যেন তাঁর চরিত্রের অতিমানবীয় নির্মাণ।
আর মাইকেলের প্রতি তাঁর নিঃস্বার্থ সহানুভূতি—সে তো একেবারে ভোরের অন্ধকারে দীপশিখা। যখন সবাই কবিকে বিস্মৃত, বিদ্যাসাগর তখন আট হাজার টাকা ঋণ নিয়ে, নিজের প্রেস বন্ধক রেখে কবির জীবন বাঁচাচ্ছেন—কোনও প্রত্যাশা নেই, নেই কোনও সম্মাননা বা প্রতিদান। কেবল একটি হৃদয়ের স্বর, যা বলে: “এই মানুষটাকে বাঁচতে হবে, কারণ ওর কলম আমাদের প্রয়োজন।”
এখানেই এই বইটি একটি বিপরীত নায়ক গড়ে তোলে—যিনি যুগের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, পরিবারে অপমানিত হয়েও, বারবার মাথা উঁচু রাখেন, এবং শেষাবধি একা হয়ে যান। তাঁর মৃত্যু কেবল একটি দেহের বিলয় নয়—তা ছিল একটি মূল্যবোধের যুগের অন্তিম প্রহর।
এই বিদ্যাসাগর, এই ভোরের ভৈরব, যাঁর বুক জুড়ে ছড়িয়ে থাকে কান্নার স্তব্ধতা, কিন্তু মুখে কখনও প্রতিবাদের বাজনা শোনা যায় না।
বিদ্যাসাগর ও মধুসূদন: শ্রদ্ধা, শ্লেষ, আর এক অনন্য সখ্যের ছায়ারেখা
এই বইয়ের অন্যতম উজ্জ্বল দিক নিঃসন্দেহে বিদ্যাসাগর ও মধুসূদনের সম্পর্কের আবেগপ্রবণ, অথচ পরিমিত বিশ্লেষণ। তাঁদের সম্পর্ক শুধু ‘দান-গ্রহণ’-এর বৃত্তে সীমাবদ্ধ ছিল না—এ ছিল এমন এক সম্বন্ধ, যেখানে শ্রদ্ধা আর শ্লেষ, দূরত্ব আর দায়, স্বাধীনতা আর সংবেদন, সব একসঙ্গে হাত ধরাধরি করে হেঁটেছে। একদিকে মধুসূদনের ব্যঙ্গ—বিদ্যাসাগর ‘টুলো পণ্ডিত’; অন্যদিকে বিদ্যাসাগরের হালকা হাসি—“এই ছেলেই অমিত্রাক্ষর লিখছে?”—তবু এই খোঁচা-কাটাছেঁড়ার মধ্যেও যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অটুট ছিল, তা ছিল নিখাদ, নির্মল ও ব্যক্তিত্বসম্মত।
মাইকেলের জীবনে বিদ্যাসাগর ছিলেন এ��� আশ্চর্য বিরল উপস্থিতি—ত্রাতা, পৃষ্ঠপোষক, প্রয়োজনে পিতার চেয়েও বেশি কিছু। যখন মধুসূদন ব্যারিস্টার হতে চাইলেন, তখন বিদ্যাসাগরের প্রতিক্রিয়া ছিল বিস্ময়মিশ্রিত উৎসাহের আগুন—একটা মুহূর্তেই চোখদুটো দীপ্তিমান হয়ে উঠল, গলার স্বর ভারী হয়ে উঠল আশীর্বাদে। বললেন, “বেরিয়ে পড়ো! পৃথিবী কত বড়ো, কত তার ঐশ্বর্য! কবিতার সঙ্গে কোনো কিছুই সাংঘর্ষিক নয়—বরং যত অভিজ্ঞতা বাড়বে, ততই কবিতা হবে তীব্র, বৈচিত্র্যময়।”
এই আশীর্বাদ ছিল শুধু মুখের বুলি নয়—এ ছিল পথচলার জন্য পাথেয়। মধুসূদন বলেছিলেন, “আপনার আশীর্বাদ পেলে আমি সব কিছুই করতে পারব।” আর সত্যিই, আর কেউ তাঁকে বেঁধে রাখতে পারেনি।
সাত হাজার টাকায় খিদিরপুরের বাড়ি বেচে, পত্তনী দিলেন তালুক, আর শুরু হল মহাকাব্যিক যাত্রা—লন্ডন অভিমুখে। কিন্তু বিশ্বজয়ী পথ কখনওই মসৃণ হয় না। লন্ডনের রোদে শুরু হল নতুন দিন, কিন্তু সেই রোদের ছায়ায় ধীরে ধীরে ঘনাল অভাবের মেঘ। মধুসূদনকে লন্ডন থেকে সরতে হল প্যারিসে, যেখানে খালি পকেট আর খালি প্লেট মিলিয়ে তৈরি করল নতুন কবিতা, নতুন লজ্জা, নতুন দুর্দশা।
টাকার অভাবে পড়া বন্ধ হল, জেলের হুমকি ঘনিয়ে এল মাথার উপর, আর ঠিক সেইখানে বিদ্যাসাগর হয়ে উঠলেন সেই পাহাড়, যার গায়ে হেলান দিলে ঝড়ও শান্ত হয়। অষ্টম চিঠির উত্তরে এল ১৫০০ টাকা, নবম চিঠির পরে আরও ২৪৯০ ফ্রাঁ—যেন প্রেরকের ঠিকানা লিখে দেওয়া হয়নি, কারণ বিদ্যাসাগরের ভালোবাসায় ঠিকানার প্রয়োজন পড়ে না।
তিনি শুধু টাকা দেননি, আত্মবিশ্বাস দিয়েছিলেন, আশ্রয় দিয়েছিলেন, ছায়া দিয়েছিলেন—এমনকি নিজের প্রেস বন্ধক রেখেও বন্ধুর ঋণ শোধ করেছেন। অথচ চিঠিতে শ্লেষ রাখেননি, প্রতিদানে অভিমান রাখেননি, শুধু শেষ চিঠিতে ভগ্ন হৃদয়ে লিখলেন— “I am sadly convinced that your case is an utterly hopeless one.”
এমন বাক্য একজন গুরুর নয়, এক পরাজিত আশাবাদীর—যিনি জানেন, যাকে তিনি বাঁচাতে চেয়েছেন, সে হয়তো এই সংসারের জন্যই তৈরি নয়।
অথচ মধুসূদনের কাছে বিদ্যাসাগর ছিলেন চিরঋণ। নিজের কবিতায়, নিজের জীবনের ভাষ্যে, এমনকি নিজের পতনের বেদনাতেও তিনি জানতেন—ঈশ্বরচন্দ্র ছিলেন সেই একমাত্র মানুষ, যাঁর ছায়া ছিল অরণ্যে পথ হারানো যাত্রীর পাথেয়।
এই সম্পর্ক, যার শুরু হয়েছিল ব্যারিস্টার হওয়ার স্বপ্ন দিয়ে, তার শেষাংশটি হয়তো হতাশায় রঞ্জিত, কিন্তু আদি ও অন্তে ছিল এক আভিজাত্যের ছোঁয়া—যেখানে সম্পর্ক ভাঙেনি, মিইয়েও যায়নি, শুধু রূপান্তরিত হয়েছিল অভিমানের ভাষায়।
এই বই সেই সম্পর্কের প্রতিটি সুর বাঁধে কণ্ঠে—ভালোবাসার, বেদনার, বন্ধুত্বের, আর এক অসম্ভব সম্মানের।
পাঠান্তের পর অনুভব: বিদ্যাসাগরের করুণা ও মাইকেলের অপূর্ণতা: এক মানবিক জীবনীশিল্পের সাক্ষ্য
এই বইটি পড়ে পাঠক হৃদয়ের অন্তঃস্থলে কিছু অনিবার্য প্রশ্ন জন্ম নেয়—প্রশ্ন, যা শুধু মাইকেল বা বিদ্যাসাগরকে ঘিরে নয়, বরং আমাদের নিজেদের জীবন, বন্ধুত্ব, ক্ষমাশীলতা ও দায়বোধের কেন্দ্রবিন্দুতে। কীভাবে একজন লোক, যিনি নিজের সন্তানদেরও ফেলে এসেছেন, সেই লোকের পাশে কেউ এত অবিচল থাকেন? কী সেই আত্মিক দৃঢ়তা, যা বিদ্যাসাগরকে কেবল এক সংস্কারক নয়—এক যুগান্তকারী সহানুভূতির চূড়ান্ত প্রতীক করে তোলে?
ঈশ্বরচন্দ্র জানতেন, মানুষ মাত্রেই ত্রুটিপূর্ণ। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন, ত্রুটির ভেতরেও প্রতিভা থাকে, আর প্রতিভা যদি সমাজকে আলো দিতে পারে, তবে তাকে বাঁচিয়ে রাখা নৈতিক কর্তব্য।
এখানেই ঈশ্বরচন্দ্র থেকে 'বিদ্যাসাগর' হয়ে ওঠার পথ রচিত হয়। তাঁর সহানুভূতি ছিল বিচারহীন নয়, বরং এক ধরনের মর্মজ উপলব্ধির ফসল—যে উপলব্ধি আমাদের মনে করিয়ে দেয় Julian Barnes-এর লাইনটি: “Our life is not our life, merely the story we have told about our life.”
এখানেই জীবনী সাহিত্যের আসল কাব্য লুকিয়ে থাকে—কেননা জীবনী শুধু অন্যের গল্প নয়, কখনও কখনও সেটাই হয় আমাদের নিজের আয়না।
রাজা ভট্টাচার্যের ভাষা সহজ, কিন্তু হৃদয় গভীর। ইতিহাস ও সাহিত্য যখন একে অপরকে পরিপূরক করে, তখন তা রূপ নেয় জীবন্ত ন্যারেটিভে, যেখানে তথ্য থাকে, কিন্তু তথ্যের ওপরে থাকে ছায়া, আলো, দীর্ঘশ্বাস, আর প্রশ্ন। Carlyle-এর কথাতেই যেন মূর্ত হয়ে ওঠে বইটির কাঠামো:
“Biography is the only true history.”
এই বই পাঠকের সামনে ইতিহাসের ‘কঙ্কাল’ হাজির করে না, পেশ করে না ঠান্ডা ডকুমেন্টেশন; বরং রাজা আমাদের নিয়ে যান বিদ্যাসাগরের স্টাডি টেবিলের পাশে, মাইকেলের অপমানের চিঠিগুলোর কাগজের কালির গন্ধে, অথবা সেই নৈঃশব্দ্য মুহূর্তে, যেখানে দুজনের বন্ধুত্ব টিকে থাকে উক্তির অনুপস্থিতিতেও।
Richard Holmes-এর মতে, “a good biographer needs the soul of a novelist.” এই বই ঠিক তাই—রক্তমাংসের মানুষদের এমনভাবে উপস্থাপন করে, যে পাঠকের চোখে জল আসে, তবু হাত থেকে বই ফেলা যায় না।
মাইকেলের ব্যর্থতা পাঠককে রাগিয়ে দেবে, বিদ্যাসাগরের নিঃশর্ত ভালোবাসা চোখ ভিজিয়ে দেবে, আর যখন বিদ্যাসাগর শেষ চিঠিতে লেখেন “I am sadly convinced that your case is an utterly hopeless one,” তখন পাঠকের হৃদয়ে শুধু বিষাদ নয়, এক ধাক্কা এসে পড়ে—মানবিকতার শেষ সীমান্তে এসে দাঁড়ানো এক আত্মিক ক্লান্তির স্বীকারোক্তি।
তবু বইটি পক্ষপাতহীন। James Atlas যেমন বলেন, “to write a good biography, you must be in love with your subject—but never blinded by love.” লেখক রাজা ভট্টাচার্য মাইকেলের প্রতিভার প্রতি মুগ্ধ, কিন্তু তাঁর দম্ভ আর দায়িত্বহীনতাকেও গোপন করেন না। বিদ্যাসাগরকেও তিনি নিখুঁত দেবতা বানিয়ে রাখেন না; বরং পাঠক বুঝতে পারেন তাঁর ক্লান্তি, একাকীত্ব, অভিমান, আর আত্মত্যাগের মূল।
এই বই সেই জীবনী যেখানে Janet Malcolm-এর বক্তব্য নিখুঁতভাবে খাটে: “Biography is a form of confession—not by the subject, but by the biographer.”
এ বই শুধুমাত্র দুই মহামানবের কাহিনি নয়—এ এক জিজ্ঞাসা: আমরা কীভাবে ভালোবাসি? আমরা কীভাবে ক্ষমা করি? আর আমাদের গল্প আমরা আসলে কার জন্য বলি—নিজের জন্য, না অন্যের জন্য?
শেষে পাঠকের মনে একটি কথাই ওঠে—এ বই একবার পড়লে আর ভোলা যায় না। কারণ, এটি কেবল একটি বই নয়—এ এক দর্পণ, যেখানে অন্যের জীবনে আমরা নিজের প্রতিবিম্ব দেখি।
“The best biographies are not only portraits of a life, but mirrors for our own.” — Nigel Hamilton
মাইকেল ও বিদ্যাসাগর: দুই মেরুর দুই বন্ধু কেবল মাত্র একটি সাহিত্যিক বায়োগ্রাফি নয়—এ এক যুগপৎ আত্মচর্চার মহাকাব্য। এটি পড়তে গিয়ে মনে হয়, যেন ঈশ্বরচন্দ্রের নিঃশব্দ মানবিকতা আর মাইকেলের ঝড়বাউল কবিসত্তা হাতে হাত রেখে হেঁটে যাচ্ছেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসপথে।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন ছিল এক রাগ ভৈরব—সাহস ও সংযমের অলঙ্ঘ্য ধ্রুপদ, যা শুরু হয় বর্ণপরিচয়ের শিশুধ্বনি দিয়ে, আর পরিণত হয় বিধবাবিবাহ, নারীশিক্ষা ও মানবতাবোধের এক জ্বলন্ত রূপকে। কিন্তু রাজপথের বিপ্লবী ছায়ায় আমরা প্রায়শই ভুলে যাই—এই মানুষটিই মাইকেলের জন্য নিজের ভাঙা সংসার, ক্লান্ত কাঁধ আর ঋণগ্রস্ত জীবন নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন অবিচল।
“একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ পাঠাইলাম, দেখিও যেন বাতাসে উড়িয়া না যায়”—এই একটি লাইন শুধু সুপারিশ নয়, এটি ছিল এক আধ্যাত্মিক আস্থা, এক মানবিক বিনিয়োগ। তাঁর হৃদয়ের গভীরে যে জায়গা তৈরি হয়েছিল মাইকেলের জন্য, তা কেবল মায়া নয়, তা ছিল আত্মত্যাগে ভেজা মাটি।
যে মানুষটি পুত্র, ভাই, স্ত্রী, এমনকি নিজের সমাজ ও সময়ের কাছ থেকে অবিচার পেয়েছেন বারবার, সেই মানুষই অসংখ্যবার ফিরিয়ে এনেছেন মাইকেলকে এক নতুন সকাল দেয়ার জন্য। সম্পত্তি বন্ধক রেখে, ধার করে, আবারও লিখেছেন চিঠি, পাঠিয়েছেন টাকা—এই বিশ্বাস নিয়ে, যে একজন কবিকে হারানো মানে, একটা সম্ভাবনার মহাবিস্ফোরণ থামিয়ে দেয়া।
এই বই আমাদের শেখায়—বিদ্যাসাগর কেবল পাণ্ডিত্যপ্রবাহী এক স্থির চরিত্র নন, তিনি ছিলেন এক অন্তর্যামী মেলোডি, যিনি বিপরীতের মধ্যেও হারমনি খুঁজেছেন। মাইকেল যেন সেই বহতা নদী, যার দিকচ্যুত ধারাকে শান্তভাবে বাঁধতে চেয়েছিলেন এক দয়ার সাগর। তাই রাজা ভট্টাচার্যের কলম—সে যেন বিদ্যাসাগরের আত্মার জলের কালি দিয়ে লেখা।
এ বই আজকের পাঠকের কাছে প্রাসঙ্গিক—কারণ আজও আমরা খুঁজি সেই একজনকে, যিনি ক্লান্ত প্রতিভার পাশে দাঁড়াতে জানেন, যিনি শুধুই নায়ক নন, পথপ্রদর্শক।
সত্যি বলতে কি, এ বই শুধুই “দুই বন্ধু”-র গল্প নয়—এ বই হলো এক বাঙালি হবার দায়, এক মনের প্রতিমা গড়া মহাপুরুষকে বুঝে ওঠার নিরব কান্না।
বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছে এটি রেফারেন্স নয়—এটি উত্তরাধিকার।
রাজা দা', আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি বলেই বলছি না — এই কথাটা হৃদয় থেকে আসছে: আপনার অন্তর্দৃষ্টির যে ঝলক দেখি, আপনার লেখনীর যে সরস রসবোধ, আর আপনার সেই স্থিতধী প্রজ্ঞার যে মৃদু দীপ্তি — তা আমার মনের মন্দিরে কোথাও যেন অদৃশয কল্পচিত্র হয়ে থেকে যায়। মনে হয়, "Some are born great, some achieve greatness, and some have greatness thrust upon them"—আপনি যেন এই তিনটিতেই অগ্রগামী।
গত তিনদিনে যতটুকু অবসর সময় পেয়েছি, গোগ্রাসে পড়েছি রাজা ভট্টাচার্যের মাইকেল ও বিদ্যাসাগর : দুই মেরুর দুই বন্ধু। লেখক বইটার কৈফিয়তে লিখেছেন যে ওটা লিখতে গিয়ে ওঁনার বুকে অনেকটা রক্তক্ষরণ হয়েছে। তবে বইটা পড়তে গিয়ে যেটা আমার হয়েছে, সেটা হলো প্রচুর প্রচুর অভিমান, খানিকটা চাপা রাগও। তবে এই রাগ হলো ভালবাসার রাগ, শ্রদ্ধার অভিমান। এই বইটা পড়ার আগে মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন কাহিনী সম্পর্কে খুব একটা কিছু জানতাম না। তবে প্রাতঃস্মরণীয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবন সম্পর্কে যতটা জানি তাতে ওঁনার নাম শুনলেই শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে আসে। তাই এমন একজন বিজ্ঞ, বিচক্ষণ এবং গুণী পুরুষ কী করে একজন অহংকারী, লোভী এবং মাতাল লোকের জন্য নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিচ্ছিলেন সেখানেই আমার ব্যাথা! অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক এবং অখণ্ড ভারতের হবু মহাকবি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও মধুসূদন দত্ত ছিলেন একজন পাশ্চাত্যের পূজারী। অন্যদিকে বিদ্যাসাগর মহাশয় ছিলেন একজন মহান সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত যাঁর শিরায় উপশিরায় বইছিল স্বদেশীয় চিন্তার স্রোত। হ্যাঁ, ঈশ্বরচন্দ্র মহান ছিলেন বলেই হয়তো সব জেনে বুঝেও মধুসূদনকে কখনও বিমুখ করেননি।
অপরিমিত ব্যয় এবং বেহিসেবী খরচের গায়ে বিলেতফেরত ব্যারিস্টারের সোনালী তকমা লাগিয়ে মিস্টার এম এম ডাট সাহেব যখন বাজারের সবচেয়ে দামি চুরুটের আনন্দ নিচ্ছিলেন, তখন তাঁর সেই চুরুটে ধরানো আগুনের সাকিন ছিলেন স্বয়ং করুণার সাগরই। কিন্তু আফসোস, যে সম্ভাবনার আগুন ঈশ্বরচন্দ্র মধুসূদনের ভেতরে খুঁজে পেয়েছিলেন তার হদিস মধুসূদন নিজেই কখনও পাননি বা হয়তো পেয়েও আগলে রাখতে পারেননি। এর জন্যই হয়তো কালের কলতানে মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাম রয়ে গেছে একটা অসম্পূর্ণ সন্ধ্যারাগের মতো যার ছন্দে ছন্দে লেগে আছে বিষাদ, বিলাপ ও যন্ত্রণার সুর। অপরদিকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম গুঞ্জিত হচ্ছে ভোরের রাগ ভৈরবের কল্লোলধ্বনির মতো যার কণায় কণায় অমৃতের উচ্ছ্বাস!
সহজ সরল ভাষার ডিঙ্গিতে চোখ ভাসিয়ে বিদ্যাসাগরের করুণার সাগর হয়ে ওঠার অভিযানের শেষে পৌঁছে প্রচণ্ডভাবে আহত হয়েছিলাম মধুসূদনের শেষ পরিণতি পড়ে। যাঁর কলমের আঁচড়ে ক্ষমতা ছিল সারাটা বঙ্গদেশ কাঁপিয়ে তোলার, তাঁর এই করুণ দশা? উফ্! সত্যিই নিয়তির কাঠগড়ায় বিলেত ফেরত ব্যারিস্টারের ওকালতিও অসহায়। এই বই থেকে প্রচুর শিখেছি। তবে যদি একটা উল্লেখনীয় শিক্ষার কথা বলি তবে বলবো কর্মফলের বিচার। সে আপনি যেই হোন না কেনো – উদীয়মান মহাকবি, জ্বলন্ত মহাতারকা কিংবা প্রতাপশালী নেতা; হিসেব মধুসূদন দত্তেরও হয়েছিল এবং হিসেব আমার-আপনারও হবে!
এসব ছাড়াও তৎকালীন বঙ্গদেশের অনেক অজানা তথ্য, বিদ্যাসাগরের সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠার যাত্রা এবং তাঁর শেষ জীবনের কিঞ্চিৎ আভাসের সাথে চমৎকার লাগলো বইটি। হামেশার মতই পত্রভারতীর ঝকঝকে নির্ভুল হরফ এবং মার্জিত বাইন্ডিংয়ের সমাহারে সজ্জিত রাজা ভট্টাচার্য স্যারের কলম ও কালির শৃঙ্গার রসে পরিবেশিত বই "মাইকেল ও বিদ্যাসাগর" এক আকর্ষণীয় সৃষ্টি। আশা করি ভালো লাগবে, পড়ে ফেলুন দেখি চটজলদি! হ্যাপী রিডিং। 😊 ***/*****