২৫০০ বছরেরও আগের ভারতবর্ষ। তিনি বেরিয়ে এসেছেন কপিলাবস্তুর রাজ্যপাট ত্যাগ করে। কাষায়বস্ত্র পরিধান করে, হাতে ভিক্ষাপাত্র, চুলদাড়িতে আবৃত হয়ে হেঁটে চলেছেন। হাঁটছেন দেশের গহন বনাঞ্চল দিয়ে। আলাপ করছেন বনচারী মানুষদের সঙ্গে, যারা অহিংসা আর সত্যপথের উপাসক। তাদের কাছে খুঁজে চলেছেন জরা, ক্ষুধা, ব্যাধি আর মৃত্যুকে দূর করে দেহের অমরত্বের সন্ধান।
তিনি রাজকুমার সিদ্ধার্থ বা গৌতম। চলতে চলতে সাংখ্যের শিক্ষা থেকে তাঁর বোধোদয় হল। তিনি বুঝলেন, নিজের চেতনার নির্বাণই হল আসল মোক্ষ, প্রকৃত অমরত্ব। বনচারী মানুষের জীবনচর্যা থেকে আরও বুঝলেন, অষ্টমার্গের চর্চাই সাধারণ মানুষের মুক্তির পথ, আলোর পথ।...তারপর?...
আড়াই সহস্রাব্দ পরে ঘটে যাচ্ছে অলৌকিক ঘটনা। গৃহত্যাগী এক যুবক, আদিবাসী এক যুবতীকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরছেন ঝাড়খণ্ডের বনে বনে, খুঁজে বের করছেন আলোকপথিক গৌতমের বুদ্ধ হয়ে ওঠার যাত্রাপথ। যা এতকাল সম্পূর্ণ অনাবিষ্কৃত ছিল।
তারপর?... দীর্ঘ এই লেখা কি ফিকশন, না নন-ফিকশন?... সময় নদীর দুই পাড় ধরে এই অভিযাত্রা যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনই পাঠককে করে স্তব্ধ, অভিভূত। শুরু করলে ছুটিয়ে নিয়ে চলে।
“Greater in battle than the man who would conquer a thousand-thousand men, is he who would conquer just one — himself. Better to conquer yourself than others. When you've trained yourself, living in constant self-control, neither a deva nor gandhabba, nor a Mara banded with Brahmas, could turn that triumph back into defeat.” ― Buddha
দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের গ্রন্থটি গৌতম বুদ্ধের পথ ধরে চলা কোনো গতানুগতিক জীবনচরিত নয়—এ যেন সময়, দর্শন ও কল্পনার ত্রিধারা বেয়ে গড়ে ওঠা এক অন্তর্জগতিক যাত্রা। এখানে ইতিহাস শুধু পটভূমি নয়, বরং একটি সজীব চরিত্র—যার সঙ্গে দার্শনিক অনুসন্ধান ও মিথের জটিল স্তরগুলো অনুপমভাবে জড়িয়ে রয়েছে। পাঠক এই যাত্রায় নিছক দর্শক নন; বরং এক বৌদ্ধিক তীর্থযাত্রী, যিনি বুদ্ধ-বোধিসত্ত্বের চেতনার প্রতিটি ধাপে নিজেকেও নতুন করে আবিষ্কার করেন।
এই গ্রন্থে আমরা দেখি কপিলাবস্তুর রাজপুত্র সিদ্ধার্থ কীভাবে রাজ্য, পরিজন, আর আরামের পরিধি ভেঙে বেরিয়ে পড়েন আত্মজ্ঞানের দুরূহ অভিযাত্রায়। পুরোনো সেই গল্পে লেখক ঢেলে দেন এক নতুন আলো, যেখানে কিংবদন্তি নয়, মানুষটি উঠে আসেন—সমস্ত সংশয়, ক্লান্তি, আর প্রশ্নসহ। দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য কেবল বুদ্ধের তপস্যা ও উপসংহারময় উপলব্ধির কথা বলেননি; বরং আমাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন সেই অন্তর্জাগতিক প্রশ্নগুলোর দিকে, যা আজও উত্তর চায়— “No one saves us but ourselves. No one can and no one may. We ourselves must walk the path.”
এই একটি বাণী যেন গোটা বইটির অন্তঃসলিলা—নির্মোহ, অথচ আশ্বাসময়। পাঠকের সামনে উন্মোচিত হয় এক বৌদ্ধিক অন্বেষণের দরজা, যার ঠিকানা বাইরের কোন গাছতলার ধ্যান নয়, বরং আত্মার ভিতরকার নির্জন বোধিবৃক্ষ।
এই বইয়ের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তার দ্বিস্তরী কাঠামো: একদিকে অতীতের বুদ্ধের পদচিহ্ন, অন্যদিকে বর্তমানের এক গৃহত্যাগী যুবকের নিঃশব্দ জঙ্গলযাত্রা—এই দুই সত্তা একে অপরের ছায়াসঙ্গী হয়ে ওঠে, যেন একটি জীবন অন্যটির প্রতিধ্বনি। এই সমান্তরাল পথে হাঁটতে হাঁটতে ইতিহাস কোনোদিন ম্লান হয় না, বরং পাঠকের সামনে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এক অনন্ত বর্তমান।
“Every morning we are born again. What we do today is what matters most.” বুদ্ধের এই বাণী যেন শুধু প্রাচীন এক বোধির নিচের নাড়া নয়, বরং আজকের দিনেও অনুরণিত—যেখানে কাল এক রেখা নয়, এক পরস্পর-সংলগ্ন অভিজ্ঞতা। লেখক দেখান, বুদ্ধের শিক্ষা সময়ের আগে যায়, সময়ের পেছনেও—তার সত্য একইসাথে কালাতীত, আবার ভয়াবহ রকম সময়োপযোগী।
দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের গবেষণার পরিমাণ ও মনোযোগ বইটির প্রতিটি অধ্যায়ে সূক্ষ্মভাবে ছড়িয়ে আছে, ঠিক যেন এক মনঃসংযোগী কারিগর নীরবে নিপুণতা গড়ে তোলেন। তাঁর আলোচনায় উঠে এসেছে বেদ-বিরোধী ভাবধারার অন্তর্নিহিত যুক্তি, সাংখ্য দর্শনের সঙ্গে বৌদ্ধ তত্ত্বের গঠনগত ফারাক, অলার কলম ও উদ্দক রামপুত্তের শিক্ষার তুলনামূলক বিশ্লেষণ—সবই এমন নিখুঁতভাবে বাঁধা যেন আমরা কোনও গবেষণা পত্রিকা পড়ছি।
তবু এই বিশ্লেষণ কখনও শুষ্ক নয়—তাতে রয়েছে সাহিত্যের গন্ধ, ভাষার লাবণ্য, এবং চরিত্রগুলির অন্তর্জগতে প্রবেশের এক ধ্যানসম অভ্যেস। চিন্তার প্রবাহ এখানে চরিত্রের শরীর হয়ে ওঠে। “All that we are is the result of what we have thought...” এই সূত্রধারেই যেন প্রতিটি চরিত্র নিজের বোধ, বিভ্রান্তি ও মুক্তির সন্ধান করে।
একাডেমিক কাঠামোর ভিতরে এই ধরণের আত্মিক অন্বেষণের স্পন্দন খুব কম লেখকের লেখায় এমন ভারসাম্যে মেলে—এই বই সেই বিরল ব্যতিক্রম।
গ্রন্থটির অন্যতম অনন্য শক্তি তার দৃষ্টিভঙ্গি—দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের কাছে ইতিহাস কেবল ‘ঘটনার ধারাবিবরণী’ নয়, বরং এক চলমান চেতনার প্রবাহ, যার আলোয় ব্যক্তি নিজেকে দেখতে পায় নতুন করে। তিনি ইতিহাসকে দেখেন ঠিক সেইভাবে, যেমন বুদ্ধ নিজেই বলেছিলেন: “Three things cannot be long hidden: the sun, the moon, and the truth.” এই সত্য—এই জাগরণ—এই গ্রন্থের আড়ালে মূলসুরের মতো প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
বুদ্ধের জীবনকে দেবজ্যোতি শুধু ত্যাগের আখ্যানে বাঁধেননি; তিনি দেখিয়েছেন, সেটি এক দায়গ্রহণের সাহসী পদক্ষেপও—নিজের ভ্রান্তির দায়, কামনার ছায়া, এবং অন্তর্গত 'মার'-এর স্বরূপ বুঝে নেওয়ার দায়। তাঁর লেখায় বুদ্ধ কেবল এক ঐতিহাসিক পুরুষ নন, বরং আত্মান্বেষণের এক জীবন্ত প্রতীক, যিনি আজও আমাদের শিখিয়ে যান—“Greater in battle than the man who would conquer a thousand-thousand men, is he who would conquer just one — himself.” এই আত্মবিজয়ের যাত্রাই এই গ্রন্থের মর্মবাণী।
দেবজ্যোতির ভাষা কখনও ইতিহাস-অনুগামী, কখনও দর্শন-বিশ্লেষক, আর মাঝে মাঝে এমন এক রূপকথার কাব্যভাষায় রূপান্তরিত হয়, যা পাঠকের মননকেও পরিবর্তনের পথে ঠেলে দেয়। ইতিহাস এখানে শুধু অতীত নয়, বরং বর্তমানকে বুঝে নেওয়ার এক দৃষ্টিপথ। তাঁর লেখায় বোধিজ্ঞান উদিত হয় যেন ধ্যানের মতো ধীরে, অথচ গভীরতায় তীব্র—পাঠকের মনের আকাশে সূর্য-চন্দ্রের মতো।
মীনাক্ষী ও বিনয়—এই যুগল চরিত্র যেন বুদ্ধচেতনার আধুনিক প্রতিধ্বনি। তারা নিছক অনুসন্ধানী নয়, তারা আত্মানুসন্ধানী। তাদের যাত্রা কোনো বাইরের গুহায় নয়, বরং নিজস্ব অন্তর্গুহায়। “Peace comes from within. Do not seek it without.” —এই শিক্ষাই তাদের পথনির্দেশ করে। জঙ্গলের গভীরে প্রবেশ করতে করতেই তারা উপলব্ধি করে, মুক্তি কোনো দেবতালব্ধ বরদান নয়, বরং এক নিরবিচ্ছিন্ন আত্মচর্চা, নিজের ভিতরকার অশান্তিকে আলিঙ্গন করার সাহস। তারা যেন এই বোধেই পৌঁছায়—যে বুদ্ধের প্রজ্ঞা কেবল ইতিহাসের অক্ষরে বন্দি নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনে জন্মায়, নতুন করে।
এই গ্রন্থের পাঠ শেষে আমরা শুধু এটুকু বললে চলবে না যে এটি এক পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণা—বরং বলতে হয়, এ এক অন্তর্জাগতিক অভিযাত্রা। একরকম ধ্যানের ভেতর দিয়ে লেখা, পড়া, আর উপলব্ধির মেলবন্ধন। “Your purpose in life is to find your purpose and give your whole heart and soul to it”—এই বুদ্ধবাণী যেন বইটির প্রতিটি পাতায়, প্রতিটি নিঃশ্বাসে, অদৃশ্য কালি দিয়ে লেখা। পাঠ করতে করতেই সেই অক্ষরগুলো চোখে নয়—হৃদয়ে ফুটে ওঠে।
দেবজ্যোতির এই বই আসলে বুদ্ধের পথে হেঁটে জীবনের পাঠ নেওয়ার এক মানচিত্র। যাঁরা ভাবেন, প্রশ্ন করেন, দ্বিধায় থাকেন—এই বই তাঁদের আত্মার জরুরি খাদ্য। যাঁরা নিজের অন্ধকারের দিকে তাকাতে ভয় পান না—তাঁদের জন্য এই বই এক আশ্চর্য আয়না।
“Doubt everything. Find your own light.” এই বই সেই আলোর শিখা—শুদ্ধ নয়, নিটোল নয়, কিন্তু জীবন্ত, জ্বলন্ত। যেটা শুধু পথ দেখায় না, পথ চিনতেও শেখায়।
শাক্যমুনির ভাষা ধার করে বলতে গেলে, “It is like a lighted torch whose flame can be distributed to ever so many other torches which people may bring along; and therewith they will cook food and dispel darkness, while the original torch itself remains burning ever the same. It is even so with the bliss of the Way.”
‘জীবনযন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তির খোঁজে একদিন পথে বের হয়েছিলেন এক রাজপুত্র। পেছনে ফেলে এসেছিলেন তাঁর স্ত্রীপুত্র-পরিবারকে। আর তারপর, আ... আমাদের এই বন-আবাসে এসে... আমাদের বনবাসী পূর্বজদের জীবন থেকে পাঠ নিলেন সেই ক্ষত্রিয়কুমার। ব্যক্তিগত জীবনযন্ত্রণা নিরাময়ের স্বার্থপর কামনা দূর হল তাঁর। আমাদের অহিংস, সত্যাশ্রয়ী জীবন তাঁকে প্রকৃত মুক্তির পথ দেখাল... আট সত্যের আশ্রয়ে এক অহিংস জীবনকে গড়ে তুললেন মুক্তির পথ হিসেবে... তারপর অর্ধেক পৃথিবী সেই পথকে আশ্রয় করল...সেই পথে হেঁটে গেলেন মহামতি অশোক, হর্ষ, কণিষ্ক, জয়বর্মণ... আমাদের জীবনবোধ, এই মাটির অতি সাধারণ ভূমিপুত্ররা তাঁকে তা শিখিয়েছিল...’
দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের "গৌতম বুদ্ধের পথ ধরে" বইটি বাংলা সাহিত্যের একটি অসাধারণ সংযোজন, যেখানে লেখক গৌতম বুদ্ধের জীবনকে তাঁর অন্তর্দৃষ্টি��� মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছেন। এটি একটি মৌলিক গবেষণা যা গৌতমের জীবনের উদাহরণ, তাঁর শিক্ষণ ও দর্শনের নানান দিককে উন্মোচন করে।
লেখক এখানে সিদ্ধার্থের গৃহত্যাগ, তাঁর জটিল আত্মানুসন্ধান, এবং পরবর্তীতে ধর্ম ও দর্শনের ধারক হিসেবে তাঁর চরিত্রের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করেছেন। বিনয় চক্রবর্তী ও মীনাক্ষী কুমারীর মতো চরিত্ররা গৌতম বুদ্ধের শিক্ষাকে আরো জীবন্ত করে তুলেছে। লেখক এই চরিত্রগুলির মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, গৌতমের শিক্ষা কেবল মৌখিক বা ধর্মীয় নয়; বরং এটি মানব জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
লেখক ইতিহাসকে একটি চলমান চেতনার প্রবাহ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে চরিত্রগুলো নিছক দর্শক হয়ে থাকেনি। এরা হয়ে উঠেছে আত্মানুসন্ধানী তীর্থযাত্রী। সেজন্যই এই গ্রন্থ কেবল একটি পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণা নয়, বরং মানবপ্রেমের একটি গভীর যাত্রা, যা শুধুমাত্র পথপ্রদর্শন করে না, একইসাথে আমাদের নিজেদের অন্তর্দৃষ্টি খুঁজে বের করার প্রেরণা দেয়। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রকৃত শান্তি আমাদের অন্তরে বিদ্যমান, এবং তা উন্মোচন করার জন্য আমাদের নিজেদের অভ্যন্তরে মনোনিবেশ করতে হবে।