Jump to ratings and reviews
Rate this book

পায়রাবন্দের শেকড় সংবাদ

Rate this book

104 pages, Hardcover

First published February 1, 1993

39 people want to read

About the author

Monajatuddin

8 books7 followers
মোনাজাতউদ্দিন (১৮ জানুয়ারি ১৯৪৫ – ২৯ ডিসেম্বর ১৯৯৫) ছিলেন একজন বাংলাদেশী সাংবাদিক। আশির দশকে বাংলাদেশে তিনি মফস্বল সাংবাদিকতার পথিকৃৎ চারণ সাংবাদিক হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। দৈনিক সংবাদে পথ থেকে পথে শীর্ষক ধারাবাহিক রিপোর্টের জন্য তিনি খ্যাতি লাভ করেন। সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তাকে ১৯৯৭ সালে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়।

লেখক হিসেবেও সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন ছিলেন অনন্য। তার রচিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘শাহ আলম ও মজিবরের কাহিনি’, ‘পথ থেকে পথে’, ‘কানসোনার মুখ ও সংবাদ নেপথ্যে’, ‘পায়রাবন্দ শেকড় সংবাদ’ প্রভৃতি।

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
13 (100%)
4 stars
0 (0%)
3 stars
0 (0%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 4 of 4 reviews
Profile Image for Muhammad .
152 reviews12 followers
July 22, 2021
শুরুর আগেঃ এই বইটিতে প্রায় দুই যুগ আগের বাঙলাদেশের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের নারীদের ওপর চলা নানারকম শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার এর খন্ড খন্ড চিত্র লেখনীর আকারে অঙ্কিত আছে। ৬৪টি জেলার মাত্র ১টি’র সংবাদ পাওয়া যায় এই বই থেকে, এবং সেটিও যথেষ্টই ভীতিকর। বাকি ৬৩টি জেলার খবর কি? কি হয় গোটা বাঙলাদেশে? প্রায় দুই যুগ পরে বর্তমানে? তখনের কথা জানিনা, এখনের সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য হল দক্ষিণ এশিয়ায় কিশোরী নির্যাতনের দিক দিয়ে বাঙলাদেশ শীর্ষে (৪৭ শতাংশ) আর পুরো পৃথিবীতে ৭ম (১৯০টি দেশের মাঝে) (সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো, ০৬-০৯-১৪); দুই যুগের ব্যবধানে অবস্থার খুব একটা হেরফের আসলে হয়নি। বইটি পড়ে যে হতাশাবোধ জেগেছিলো মনে, প্রথম আলো’র রিপোর্টটি তাতে ঘি ঢেলে দিলো।

‘পায়রাবন্দের শেকড় সংবাদ’ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন এর গ্রাম-সাংবাদিকতার স্মৃতিকথা। পেশাগত কাজেই মোনাজাতউদ্দিনকে ৭০-৮০-৯০ এই তিন দশকের বিভিন্ন সময়ে বাঙলাদেশের গ্রাম-গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে, লিখতে হয়েছে ‘ক্লিশে’ হয়ে যাওয়া ‘দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত’ বিশেষণটিতে বিশেষায়িত মানুষদের দুঃখ-কষ্টের গল্প। পায়রাবন্দ উত্তরাঞ্চলের রংপুর জেলার একটি ইউনিয়ন। বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া’র জন্মস্থান হিসেবে এই ইউনিয়নটি বিখ্যাত হয়ে আছে। ১৮৮০ সালে জন্ম নেয়া বেগম রোকেয়ার জীবনের একটি বড় অংশই কেটেছে নারী’র সম-অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে নানারকম সামাজিক বাধা বিপত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। ১৮ শতকের শেষভাগের সাথে ‘মানানসই’ নারীর ওপর আচরিত অত্যাচার ও বৈষম্যমূলক আচরণগুলো বেগম রোকেয়া’র জন্মের ১১২ বছর পর (বইটি লিখবার সময়কাল, ১৯৯২ সাল) কতটুকু বদলেছে? সেই পায়রাবন্দেই? ১০৪ পৃষ্ঠার বইটিতে মোনাজাতউদ্দিন বারবার এই প্রশ্নের উত্তরই খুঁজেছেন। ১৯৯২ এর ২২ বছর পর, ২০১৪ সালে দাঁড়িয়ে বাঙলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির আলোকেই আসলে ‘তাত্ত্বিকভাবে’ প্রশ্নটির উত্তর অনেকখানি দিয়ে দেয়া সম্ভব। পায়রাবন্দের দারিদ্র্য ও নারী শিক্ষার দুরবস্থা সম্পর্কে হাতেকলমে জ্ঞান আমার নেই, মোনাজাতউদ্দিনের হয়েছিলো। এই বইটির পাঠ-অনুভূতি’র বর্ণনায় আমি তাই লেখককেই উদ্ধৃত করবো ঘুরেফিরে। আমার ধারণা মোনাজাতউদ্দিনের লেখায় পায়রাবন্দের অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়টির বিবরণী কমবেশি সকলকেই একইভাবে আলোড়িত করবে, যেটি আমার নিজের ক্ষমতার বাইরে।

বইটি শুরু হয়েছে পায়রাবন্দের শিক্ষার করুণ দশার বিবরণী দিয়ে। দারিদ্র্যের জন্য বিশেষত কন্যাসন্তানদের জামাকাপড় কিনে দিতে পারেননা বাবা-মা’রা। বেশীরভাগ শিশুরই একটিমাত্র জামা, যা জীর্ন হতে হতে ন্যাকড়ায় পরিণত হয়েছে। এই জামা পরে স্কুলে যাওয়া চলেনা। ফলে শিশুরা শিক্ষাও পায়না। একই দুষ্টচক্রের পরিধিতে আবদ্ধ দরিদ্র এই পরিবারগুলো। আছে নানারকম মধ্যযুগীয় কুসংস্কারের প্রকোপও। মোনাজাতউদ্দিন লিখেছেন, “
আপনি যদি পায়রাবন্দে বেড়াতে আসেন, তা হলে কিছুটা সময় হাতে নিয়ে আসবেন, মিশবেন মানুষের গভীরে, জানতে পারবেন এই গ্রামের অনেক স্ত্রীলোক অসচেতনতার অন্ধকারে এমনভাবে ডুবে আছে যে, তারা মুখের হা বড় করে না ভাতের গ্রাস মুখে তোলার সময়। ভাত চিবোয়না। তাদের ধারণা, হাঁ একটু বড় করে পূর্ণগ্রাস ভাত মুখে তুললে ‘সংসারের অকল্যাণ হবে’; বিয়ের রাতে স্বামীর পায়ের বুড়ো আঙুলধোয়া পানি পান করত অনেকে এই ক’বছর আগেও। এখন সে প্রথা নেই বটে, কিন্তু এ যুগেও অনেক স্ত্রীর বদ্ধমূল ধারণা, স্বামী মারপিট করলে তা মুখ বুজে সহ্য করতে হয়, কেননা মারপিট ধর্মসিদ্ধ ব্যাপার। কেউ কেউ আবার এমনও মনে করে যে, একজন স্বামী তার শরীরের যেসব স্থানে মারবে সেসব জায়গা রোজ কেয়ামতের পরে যাবে বেহেশতে।”


পায়রাবন্দে বাল্যবিবাহ এবং বহুবিবাহ, দুইই ব্যাপক প্রচলিত রীতি। বইতে আছে মাকড়া বুড়োর গল্প, ৯৪ বছর বয়সে ১৯তম বিয়ে করেছে সে। কন্যার বয়েস ১৪ বছর। মেয়েটির সাথে কথা বলে জানা যায় সে স্বেচ্ছায়ই এ বিয়েতে বসেছে। লেখকের সাথে তার কথোপকথন এর চুম্বক অংশঃ
আমি তো নিজের ইচ্ছায় এ বিয়ে করেছি!
-তাই নাকি?
-হ্যাঁ, তা-ই। ...আমি এখন এই স্বামীর পদসেবা করব। এতে আমার সওয়াব হবে। তারপর কদিন বাদে বুড়ো মারা গেলে তার সম্পত্তির মালিক হব। তখন একটা যুবক ছেলেকে বিয়ে করে ঘর-সংসার করব।"

১৪ বছরের মেয়ের মুখে এ-কথা শুনে লেখক মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন। তবে এটি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পায়রাবন্দে এই রীতিই পালিত হয়ে এসেছে, যদিও বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই কিশোরী এই মেয়েগুলো তাদের বৃদ্ধস্য বৃদ্ধ স্বামীদের মৃত্যুর পর সম্পত্তির কানাকড়িও পায়না। সৎ ছেলে/মেয়েরাই তাদের ঘাড় ধরে বের করে দেয়। বুড়ো’র সম্পত্তির মালিকানা পেয়ে যুবক ছেলেকে বিয়ে-এটি এদের জন্য স্বপ্নই থেকে যায়।

৫ বছর বয়েসী সুরমার বিয়ে হয়েছিলো একাদশ শ্রেনীতে পড়ুয়া লজিং মাস্টারের সাথে। গ্রামের কাজী সাহেব রেজিস্ট্রী খাতায় সুরমা’র বয়েস বানিয়েছেন ১৬ বছর। এই বিয়েতে এলাকার মোড়ল মাতবর জনপ্রতিনিধিরা এসেছেন, খাওয়া দাওয়া করে গেছেন। কেউ প্রশ্ন তোলেননি বাল্যবিবাহ নিয়ে। সুরমাদের ঘরে স্টুডিওতে তোলা ফ্রেমে বাঁধানো ছবি ঝোলানো আছে। সুরমা ছেলেটির কোলে বসা। লেখকের সাথে সুরমার কথোপকথনের নমুনাঃ
তুমি কি জানো ঐ ছেলেটা, ঐ যে যার কোলে বসে আছ, সে তোমার কি হয়? চেনো ওকে?”
“সুরমা ফিক করে হাসল। বলল: চিনবোনা ক্যান? ও তো আমার ভাইয়া!
:ভাইয়া না স্বামী? জানো না ওর সাথে তোমার বিয়ে হয়েছে?
সুরমা তার ছোট্ট হাতের মুঠোয় একটা কিল পাকাল। আমার দিকে দূর থেকেই তা ছুঁড়ে দিয়ে বলল-দূর! কী যে আপনি অসভ্য কথা বলেন!"

মোনাজাতউদ্দিন কি দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন?

এমন অসংখ্য বাল্যবিবাহের বিবরণী লেখক দিয়ে গেছেন। যে সরকারী কর্মকর্তারা বিয়েতে এসেছেন, বর-বধূ কে নিয়ে হাসি ঠাট্টা তামাশা করেছেন, তারপর মাংশ দিয়ে ভাত খেয়ে চলে গেছেন, তাদের নাম-ধামও উল্লেখ করেছেন। এতে অবশ্য কিছু আসে যায় না। দূর্ভেদ্য, অচ্ছেদ্য অদৃশ্য এক বর্মের আড়ালে তাঁরা ঢাকা থাকেন, কখনো তাঁদের নাগাল পাওয়া যায়না। গ্রীক পুরাণে বর্ণিত আছে দেবী থেটিস তাঁর পুত্র একিলিসকে পায়ের গোড়ালীতে ধরে স্টিক্স নদীর পানিতে গোসল করান। গোড়ালীর ধরে থাকা অংশে স্টিক্স এর পানি পৌঁছাতে পারেনি বলে সেটাই একিলিসের একমাত্র দূর্বল স্থান হয়ে পড়ে। শরীরের আর কোথাও আঘাত করেই একিলিসের ক্ষতি সাধন সম্ভব ছিলোনা। ট্রোজান রাজপুত্র প্যারিস একিলিসের এই গোড়ালীতে তীর মেরেই একিলিসকে হত্যা করেন। থেটিস নিশ্চিতভাবেই বাঙলাদেশের সরকারী কর্মকর্তাদের ব্যাপারে অবগত ছিলেননা। থাকলে একিলিসকে নিশ্চয় সরকারী কোন একটি বিভাগে চাকরীতে ঢোকাতেন! মিছেমিছি একিলিসকে হারাতে হতোনা থেটিসকে। হাজার হাজার বছর ধরে এক দেবসন্তান আমাদের কোন একটি সরকারী দপ্তরকে আলোকিত করে রাখতেন।

যৌতুকপ্রথা পায়রাবন্দের নারীদের জন্য অভিশাপের আরেকটি রুপ। কথামত যৌতুক দিতে না পারলে মারধোর তো আছেই, আছে ‘ক্ষতিপূরণ’ হিসেবে ছোটবোনকে নিয়ে যাওয়ার নজিরও। লেখক বইতে দিয়েছেন খাতের আলী ও রীনা বেগমের উদাহরণ। যৌতুক পরিশোধে অপারগ রীনার ছোট বোন রাণী বেগম কে খাতের আলী জোর করে তুলে নিয়ে বিয়ে করলে মওলানা সাহেব ফতোয়া দেন খাতের আলী যখন শালীকে বিয়ে করেছে, তখন আপনাআপনি তালাক হয়ে গেছে রীনা বেগম। সেক্ষেত্রে নাকি অভিযোগ উত্থাপনের অধিকার রীনা’র নেই! আবার রীনা বেগম তালাক চা��লে ছোট বোন রাণীর সংসারও ভেঙ্গে যাবে। কোথায় যাবে রীনা বেগম-রাণী বেগমেরা?

মানুষের হাতেই মানুষের নিপীড়নের এই গল্পগুলো যত পড়ি ততই ক্লান��তি এসে ভর করে। ২০ বছরের আনজেরা যখন একপাশে ৫৫ বছরের বাবা আর আরেকপাশে ৬০ বছর বয়েসী স্বামীকে নিয়ে ছবি তোলে, সে ছবি এক ধরণের তীব্র বিবমিষা জাগায় আমার ভেতর। স্রেফ বন্ধুত্বের শখ মেটাতে রিকশাওয়ালা ও দিনমজুর দুই বন্ধু যখন নিজ নিজ স্ত্রীকে তালাক দিয়ে নিজেরাই অভিভাবক সেজে একে অপরের স্ত্রীকে বিয়ে করে, সে বিবরণী পড়ে আমার নাক কুঁচকে আসে। যখন সাড়ে ৭ মাস বয়েসের মেয়ের সাথে হাঁটতে শেখা ছেলের বিয়ে দেয়ার কথা পড়ি, আমি জানিওনা আমার কেমন লাগে। টুপি দাঁড়ির লেবাস পরিহিত ২০০ বাল্যবিবাহ পড়ানো মৌলবি যখন খোদার কসম কেটে বলে একটিও নাবালক বিয়ে পড়াইনি, আমার চোখ দপ করে জ্বলে ওঠে, হাত মুঠো হয়ে আসে। আর যখন ৬ বছর বয়েসী হাওয়া বিবিকে ২২ বছরের মোসলেম ‘বউ ঘরে আসে না’, ‘বেয়াদপ’, ‘বেত্তমিজ’ এই অভিযোগে তালাক দেয়, তখন আর না পেরে হেসেই ফেলি। (হাওয়া বিবির অপরাধ ছিলো সে তার চেয়ে ১৬ বছরের বড় মোসলেম কে ভয় পেত। হাওয়া বিবির পরিণত বয়েসে চতুর্থ বিয়ে হয় ৭০ বছর বয়েসের এক বৃদ্ধের সাথে। রোগশয্যাশায়ী তৃতীয় স্বামীর মৃত্যুর পর অনাহারী হাওয়া বিবির পেটে সন্তান এলো কিভাবে তা-ই সবার গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তার এবং তার ভয়ানক অপুষ্ট শিশুটির কি হবে তা নিয়ে ভেবে কেউ সময় নষ্ট করেনি।)


ছবিঃ বইয়ের মলাটের পেছনের অংশ থেকে সংগৃহীত

২০১৪ সালের আজকের পায়রাবন্দ হয়ত ১৯৯২ সালের পায়রাবন্দ থেকে অনেকটাই উন্নত, হয়তো বাল্যবিবাহ উঠেই গেছে, হয়তো যৌতুক আর এখন কেউ দেয়া-নেয়া করেনা। কিন্তু তাতে এই মানুষগুলোর কষ্টগুলো ফ্যালনা হয়ে যাবেনা। ১২ বছর বয়েসী মেয়েটির গর্ভধারণের কষ্ট মুছে যাবেনা। ২০ বছর বয়েসেই ৪টি বিয়ের গ্লানি মেয়েটির ধুয়ে যাবেনা। রোগগ্রস্ত কন্যাশিশুটির আরোগ্যলাভের উদ্দেশ্যে কুসংস্কারবশত দেয়া গাছের সাথে বিয়ের হাস্যকর দিকটিও একই রকম অমলিনই থাকবে। এরা এই বিকৃত আচরণগুলোর শিকার হয়েছে বলেই আজ মানুষ সচেতন। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে হয়তো তাদের অর্থহীন জীবন যাপন টা অত্যন্ত অর্থবহই হয়, তবু জীবনের ‘অর্থবহ’ হয়ে ওঠার এই যাত্রাটা মেনে নিতে পারিনা। এদের অমানবিক কষ্টভোগের মূল্য দিয়েই আমরা আজ সচেতনতা কিনলাম। জীবন এতো হালকা? আহ!
Profile Image for Harun Ahmed.
1,667 reviews429 followers
February 2, 2023
"পায়রাবন্দের শেকড় সংবাদ" হচ্ছে বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন। খুব গালভরা ভাষায় বেগম রোকেয়াকে বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত বলা হয়। অথচ রোকেয়ার জন্মের শতবর্ষেরও পরে তাঁর নিজের এলাকা পায়রাবন্দে গিয়ে সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দীন স্তম্ভিত হয়ে যান। বাল্যবিবাহ, যৌতুক প্রথা, নারী নির্যাতন, কুসংস্কার, সীমাহীন দারিদ্র, অশিক্ষা, কুশিক্ষায় জর্জরিত পায়রাবন্দ যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। পায়রাবন্দ যেন সমগ্র দেশের প্রতিচ্ছায়া। নিস্পৃহ, নিরাবেগ গদ্যে লেখক পায়রাবন্দের যে অন্ধকারাচ্ছন্ন, পিতৃতান্ত্রিক, কুটিল সমাজব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরেন তা এতোই নির্মম যে বিশ্বাস হতে চায় না। এইভাবে মানুষ থাকতো? মাত্র ত্রিশ বছর আগে সাত বছরের মেয়েকে মানুষ বিয়ে দিয়ে দিতো?! বারো বছরের মেয়ে গর্ভবতী হোতো? কুফা কাটানোর জন্য গাছের সাথে বিয়ে দেওয়া হোতো? এইভাবে নির্যাতন করা হোতো? আইন কই এখানে? রাষ্ট্র কই এখানে? যেন কোনোকিছুরই অস্তিত্ব নেই। আর এটাই বাংলাদেশ। আমরা বোধহয় এই ত্রিশ বছরে খুব একটা এগোতে পারিনি। উন্নয়নের যে বুলি আমাদের শেখানো হয়, জানানো হয়, মানানো হয় তার বিরুদ্ধে এ বইটি জীবন্ত প্রতিবাদ।

(বইটির বিস্তৃত ও অসাধারণ রিভিউ লিখেছেন muhammad।সবাইকে বইটি ও মুহাম্মদের রিভিউটা পড়ার অনুরোধ রইলো।)
Profile Image for Anjuman  Layla Nawshin.
85 reviews146 followers
April 27, 2023
"পায়রাবন্দের অনেক চরিত্র। এদের একজন হলেন মাকড়া বুড়া। বয়স তার ৯৪ বছর। যখনকার কথা বলছি, অর্থাৎ সাত বছর আগে, ১৮টি স্ত্রী মারা যাবার পর তিনি ১৯তম বিয়ে করেছেন। স্ত্রীর বয়স মাত্র ১৪ বছর।"

বেশীরভাগ সময়ই মোনাজাতউদ্দিনের লেখা পড়লে মনে হয় আমি কোন সংবাদ ঘটনা পড়ছি না। পড়ছি শরৎ বাবু, বিভূতিবাবুদের সাহিত্য। এত সহজ সাবলীলভাবে ঘটনাকে তুলে ধরেছেন তিনি যা পড়ে কেবল হাহাকারই জন্মায়। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না এমন ঘটনা ঘটেছে আমাদের গ্রামগুলোতে।

এত চমৎকার করে সংবাদ ঘটনাগুলোকে জীবন্ত করে তুলে ধরার পরও শক্তিমান এই সংবাদ সাহিত্যিক তার ঐ সংবাদ চরিত্রগুলো নিয়ে লিখেছিলেন,

"... আমার আফসোস, আমি যদি উপন্যাস-লিখিয়ে কিংবা নিদেনপক্ষে গল্পকার হতে পারতাম, কিছু অন্তত লিখতে পারতাম ওদের নিয়ে। কিন্তু তা হয়নি। সুরমা, হাওয়া বিবি, মাকড়া বুড়ো- এরা শুধু কিছু সচিত্র ফিচার হয়ে আছে 'সংবাদ' এর পাতায়।"

বেশকিছুদিন আগে এক পড়ুয়া বন্ধু আফসোস করে বলেছিলেন, লাতিন আমেরিকার সাংবাদিক হয়ে ওঠেন মার্কেসের মত গল্পবলিয়ে, ভারতের সাংবাদিক হয়ে ওঠেন শ্রীপান্থের মত লেখক আর বাংলাদেশের সাংবাদিক হয়ে ওঠেন ওমুক সাহিত্যিক (একজন সমসাময়িক লেখকের কথা বলেছিলেন)।

অনেক আগে থেকে মোনাজাতউদ্দিন পড়া থাকলেও সেদিন মোনাজাতউদ্দিনের কথা আমার মনে পড়েনি। তবে, আমি গর্ব করে বলতে পারি, বাংলাদেশেও ছিলেন এমন সাংবাদিক যাকে মার্কেস-শ্রীপান্থের পাশে নির্দ্বিধায় বসানো যায়।
তিনি আমাদের মোনাজাতউদ্দিন। আমি জানি না, ঠিক সংবাদ সাহিত্য বলতে যা বোঝায় (মোনাজাত উদ্দীন যেমনটি করেছেন) তেমন সংবাদ সাহিত্য পৃথিবীতে আর কেউ লিখতে পেরেছেন কিনা।
Profile Image for Salman Sakib Jishan.
274 reviews159 followers
February 20, 2024
"একনা ফির কী? এতোয় ঠোকস ঠোকস করি কি কন্নেন?"

ক্যামেরা জীবনে দেখেননি, বিদ্যুৎ এখনো পৌছায়নি এমন একটি অজপাড়াগাঁ-এর বধু কথাটা জিজ্ঞেস করলেন। সত্তর বা আশির দশকের কোনো একটা সময়ের কথা। বধুর জীবনের ২০ বসন্ত পার হয়ে গিয়েছে, কোনোদিন টেলিভিশনের সাথে পরিচয় হয়নি। দূর থেকে বিদ্যুতের আলো দেখা হয়েছে, ভোগ করা হয়নি। পত্রিকায় ছাপা হবে এ শুনে বধু মুখ ভেংচি দিয়ে চলে গেলেন।

'পায়রাবন্দের শেকড় সংবাদ' প্রায় দুই যুগ আগের বাংলাদেশের এক খন্ডচিত্র। যে সে অঞ্চল নয়, 'নারী জাগরণের অগ্রদূত' বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের গ্রাম পায়রাবন্দের চিত্র। সত্তর থেকে নব্বই দশকের মাঝে বেশ কয়েকবার পায়রাবন্দে গিয়ে গ্রাম সাংবাদিকতার ভেতর দিয়ে বাংলার মানুষের জীবনচিত্র তুলে ধরবার চেষ্টা করেন মোনাজাতউদ্দিন। হয়তো ভেবেছিলেন রংপুরের পায়রাবন্দ, যেখানে প্রায় শতবছর আগে জন্মেছিলেন বেগম রোকেয়া, এ গ্রামে হয়তো অন্তত নারীর অমর্যাদা হবেনা।
চারিদিক গাঢ় সবুজ বোরোক্ষেতের সমারোহ, শ্যালো মেশিনে একটানা ধকধক শব্দ, কৃষকের ভাঙাচোরা ঘর, বাঁশঝাড়, কবরখানা, অপুষ্ট শিশু, ক্ষুধার্ত কোটরাগত চোখের মহিলা...
এরমাঝে অন্দরের খবর কি আসলেই তেমন?
উল্টো এই বিচিত্র জনপদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে বাল্যবিবাহ, ঘরে ঘরে যৌতুক, বহুবিবাহ, নারী নির্যাতন আর ন্যায্য অধিকার-বঞ্চনার হাজারো ঘটনা। অশিক্ষা কুশিক্ষা, কুসংস্কার কুপ্রথার অবস্থা দেখে মনে হয় এখনো সেই ১০০ বছর পিছিয়ে আছে এই অঞ্চল।

সুরমা নামের এক নাবালিকা ��েয়ে, যে কিনা জানেই না তার বিয়ে হয়ে গেছে পাঁচ বছর বয়সে এক কলেজ ছাত্রের সাথে। ঘরে ঘরে বউ তালাকের হিরি্ক। এক ঘরে বউ ফেলে রেখে চলে গিয়ে অন্য ইউনিয়নে সংসার পাতার ঘটনাও অনেক। এখানকার নারীরা জানেনই না তাদের অধিকারের কথা, তাদের অনুমতি ছাড়া যে তার স্বামী অন্য কোথাও বিয়ে করতে পারেন না সেই ধারণাই নেই।
ওদিকে যৌতুকের দাবীতে ঘরে পরে আছে কন্যা। কন্যার অন্যঘরে বিয়েও দেয়া যাচ্ছেনা তালাক না হওয়ায়। যৌতুকের টাকা না পেয়ে বউ কে ফেলে রেখে শালিকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে এই গ্রামে। গ্রামের মাওলানা সাহেব ফতোয়া দিয়েছেন, সে যখন শালীকে বিবাহ করেছে, রীনা বেগম আপনা আপনি তালাক হয়ে গেছে! রীনা বেগম মেনে নিয়েছে। না নিয়েও কি উপায়? মামলা চালাবার ক্ষমতা কই? বোনের সংসারই বা সে ভাঙে কি করে?

বাল্যবিবাহ এবং যৌতুকের অভিশাপ যেমন আছে পায়রাবন্দে, তেমনি বহুবিবাহ, অসম বিবাহের অনেক ঘটনা রয়েছে এই অঞ্চলে। ইউনিয়নের ২১টি মৌজায় শতাধিক বুড়োর কথা শোনা হয়েছে যারা যুবতী মেয়েদের বিয়ে করেছে অথচ তাদের বয়স ৫০ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে।
কাছিম বুড়োর কথাই শুধু বলি। এই বুড়ো বিয়ে করেছে ৫বার। এরমধ্যেই বুড়ো চান আবার বিয়ে করতে।
তারপর ধরি বৃদ্ধ গোলাম মোস্তফার কথা। তার বয়স পঞ্চাশ বছর, তার জামাইদ্বয়ের বয়স ৬০ বছর! এই বৃদ্ধেরও এই সম্বন্ধে রাজি হওয়া ছাড়া উপায় ছিলনা। গ্রামে যুবতী মেয়ে ঘরে থাকলেই শুরু হয় রাত বিরাতে উৎপাত। অসং্খ্য ঘটনা রয়েছে ধর্ষণের।

পাতায় পাতায় নানা বিচিত্র ঘটনার বর্ণণা একেবারে নিরাবেগ ভাষায় রচিত হয়েছে। শহরে বসে এইসব ঘটনা বোঝা তো দূরে থাক, কল্পনাও সম্ভব নয়। মাকড়া বুড়ো, শিয়ালি চাচা, শুকনীবালা, রঞ্জিনা, হাওয়া বিবি, আকলিমা, রীনা বেগম, আজিফা, পাখিরন, বারেক, সুরমা, কালটু, মছিরণ, মুক্তিযোদ্ধা রমজান, ইসফ সাক্ষী, পোড়াখাটিয়া প্রমুখের নাম লিপিবদ্ধ হয়েছে এই লেখায়। তাদের প্রত্যেকের জীবন কাহিনী নিয়ে পাতার পর পাতা গল্প-উপন্যাস রচিত হতে পারতো। কিন্তু লেখক-সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন ভেতরে ভেতরে অপরাধবোধে দ্বগ্ধ হয়েছেন। বলেছেন,
"আব্দুল মালেক, আম্বিয়া। শহর সভ্যতা এবং আমার মতো পেশার মানুষদের সম্পর্কে অজ্ঞাতই থাকো তোমরা। আমি তোমাদের সংবাদ সংগ্রহ করি, আমি তোমাদের পণ্য করি, আমি তোমাদের এইসব অসহায়ত্ব কিংবা মানবিক গুণাবলির গল্প কাহিনী লিখে খাই..."

এই ধরণের বইগুলো সাধারণত সামনে আসেনা। অথচ এইটুকুন একটা বই পড়ে আমি এত অবাক হয়েছি, অনেকদিন এত গূঢ় অনুভূতি হয়নি কোনো বই পড়ে। প্রথম দিকে মার্কার দিয়ে মার্ক করা শুরু করেছিলাম। কয়েক পৃষ্ঠা যেতেই বুঝলাম এই বই প্রতি পাতায় মার্ক করলেও শেষ হবেনা। আসলে গ্রামের মানুষে্র, বিশেষ করে নারীদের দূর্দশার কথা গল্প উপন্যাসে যা-ই হয়, নিতান্তই সামান্য। এ ধরণের অসাধারণ প্রতিবেদন আরও কিছু দেশে হলে বেরিয়ে আসতো হয়তো আরও অনেক সত্য। লেখক মোনাজাতউদ্দিন বেশ কষ্ট নিয়ে বইটা শেষ করেছেন। শেষটা লিখেছেন এভাবে...

"এক রোদজ্বলা দুপুরে পায়রাবন্দ থেকে শহরে ফিরে আসি। আমার নোটবুকে অনেক সুখ-দুঃখের কাহিনী, ক্যামেরায় বন্দি অনেক ছবি। এগুলো আমি বেচে খাব। এই আমার গ্রাম! এই আমার দেশ। এই আমার পেশা।
পথের ধারে একখন্ড জমিতে, প্রচন্ড রৌদ্রের ভেতর, পোড়া খাটিয়া তখন ধানক্ষেত নিড়ানি দিচ্ছেন। তাঁর হাতের যত্নে এই চারাগাছ বেড়ে উঠবে, থোড় আসবে, শিষ আসবে, ধান পাকবে, যাবে রংপুর শহরের বাজারে।
এবং পোড়া খাটিয়াদের কথা-কাহিনী বিক্রির টাকায় আমি সেই ধান থেকে পাওয়া চাল কিনব, ধোঁয়া ওঠা ভাতের গ্রাস মুখে তুলতে তুলতে বলব, বাহ, চালটা তো বেশ ভালো।"
Displaying 1 - 4 of 4 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.