শহীদুল্লা কায়সার তখন কারাবন্দি। ছোটো ভাই জহির রায়হান তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে বললেন, জেলগেটে তার জন্য খাতা ও কলম দিয়ে যেতে। এরপর সেগুলো হাতে পাওয়ার পর নিয়মিত দিনলিপি লিখতেন। যা 'রাজবন্দীর রোজনামচা' নামে ছাপা হয়। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে সাধারণ জিনিসকে আমরা অসাধারণ মনে করি। গ্রামীণ ব্যাংক ও মুহাম্মদ ইউনূস নিয়ে জ্ঞানের ও বিশ্লেষণের অভাবে অনেকের মতো হয়তো বীরপূজায় শরিক হইনি। তবে বিস্তর ভক্তি ও ভালোবাসা ছিল। বদরুদ্দীন উমরের লেখা মাত্র ১১২ পাতার বইটি পড়ার পর নিজের নতুন করে কিছু বিষয় চিন্তা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। নিঃসন্দেহে ইউনূস মিথ ও গ্রামীণ ব্যাংকের কিংবদন্তিতুল্য সাফল্যের ওপর ইমান অনেকটাই চলে গেছে।
গ্রামীণ ব্যাংক কত শতাংশ সুদে 'বিনা জামানতে' ঋণ দেয় তা অস্পষ্ট। বদরুদ্দীন উমর লক্ষ করেছেন, প্রতিষ্ঠানটি একবার ২০ শতাংশ সুদের কথা বলেছে। আবার, ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সুদের হারের উল্লেখও রয়েছে। যেহেতু তারা বিনা জামানতে ঋণ দেয়, সেহেতু বাধ্য হয়েই তাদের সুদের হার বেশি। এই যুক্তিকে খণ্ডন করে বদরুদ্দীন উমর লিখেছেন, ঋণ নিয়ে ঋণগ্রহীতা যা কেনে তা ঋণ পরিশোধের আগে কোনোভাবেই মালিকানা হস্তান্তর করতে পারে না। অর্থাৎ , টেকনিক্যালি জামানত রইলই।
মুহাম্মদ ইউনূসকে উচ্চ সুদের হারের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, জোর করে গ্রামীণ ব্যাংক কাউকে ঋণ দেয় না। বদরুদ্দীন উমরের যুক্তি, চরম সুদখোর মহাজন ও কাবুলিওয়ালারা কী জোর-জবরদস্তি করে ঋণ দিতো? ঋণ কেউই জোর করে দেয় না। বরং দরকারে মানুষ নেয়। তাই মহাজন ও কাবুলিওয়ালার সঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংকের পার্থক্য তিনি খুঁজে পাননি। বিশেষত, ঋণ সময়মতো শোধ করতে ব্যর্থ হলে যা করা হয় তা মহাজনদের জুলুমের চাইতে কম নয়।
কর দিতে মুহাম্মদ ইউনূস এক ধরনের অনীহাবোধ করেন বলে উল্লেখ করেছেন বদরুদ্দীন উমর। তিনি ৭ শ কোটি টাকা বিনিয়োগকে তার ব্যক্তিগত ট্রাস্টে নিয়ে যান এবং সেখান থেকে ব্যাংকের হিসাবে জমা করেন। যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন, টাকাটা সরাসরি যুক্ত হলে সরকারকে ৪০ শতাংশ সুদ দিতে হতো। তা এড়াতেই কাজটি তিনি করেছেন। এমনকি তার নোবেল পুরস্কারের টাকায় যেন করারোপ করা না হয় তা নিশ্চিত করতে তদবির করেন বলে উল্লেখ করেছেন বদরুদ্দীন উমর। উল্লেখ্য, এই পুরস্কারে করমুক্তি পেতে তিনি ২০০৭ সালে তৎকালীন এনবিআর চেয়ারম্যান বদিউর রহমানের কাছে লোক পাঠান। এই ঘটনা বদিউর রহমান তার 'সরকারি চাকরিতে আমার অনুভূতিসমগ্র' বইতে লিখেছেন।
বদরুদ্দীন উমরের মতে, মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত পছন্দের ব্যক্তি। তাকে ২০০৬ সালে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো না কোনোভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। বদরুদ্দীন উমর লিখেছেন, ২০০৬ সালে নোবেল মনোনয়নের তালিকায় তিনি ছিলেন না। বরং ইন্দোনেশিয়ার বান্দা আচেহ সংকট মোকাবিলার জন্য শান্তিতে নোবেল আলোচিত ছিল। কিন্তু সেবার আলোচনায় না থেকেও নোবেল পান মুহাম্মদ ইউনূস। কারণ হিসেবে উমর মনে করেন, ২০০৬ সালের আগেই যুক্তরাষ্ট্রে বুঝতে পারে এদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে মতানৈক্য তৈরি হবে। তখন ঐক্য তৈরির পথ দেখাবেন মুহাম্মদ ইউনূস। উল্লেখ্য, ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতবিরোধ সমাধানে আগে এক শ দিনের একটি ফর্মূলা দিয়েছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও সিপিডি আয়োজিত সৎ ও যোগ্য প্রার্থী আন্দোলনের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। এই আন্দোলনটি নব্বই দশক থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে সংস্কার নিয়ে কথা বলত।
আজকে বাংলাদেশে সকল দল নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এসব কথা ২০০৬ সালেই মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন। তার ফর্মূলা ছিল, নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল পাবে প্রধানমন্ত্রী পদ এবং দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ভাগে পড়বে উপ-প্রধানমন্ত্রিত্ব ও তিনটি মন্ত্রণালয়। এছাড়াও সংসদের মেয়াদ কমানোর প্রস্তাব তিনি করেছিলেন। আগামী নির্বাচনের পর এসব ফর্মূলা কার্যে পরিণত হলে অবাক হবো না।
'The Micro Debt' শিরোনামে গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণের ফাঁদ ও মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে টম হেইনম্যান একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। যা নরওয়ের রাষ্ট্রায়ত্ত টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হয়। বদরুদ্দীন উমর এই প্রামাণ্যচিত্রটির কথা একাধিকবার উল্লেখ করেছেন। ইউটিউবে খুঁজলেই পাবেন। আমি দেখলাম এবং বিস্মিত হলাম। সুযোগ হলে দেখুন।
বদরুদ্দীন উমরের লেখার একটা দোষ আছে। তিনি সবকিছুকে বামপন্থার আতশকাঁচের নিচে ফেলে বিচার-বিশ্লেষণ করেন। তা ঠিক আছে। তবে সমালোচনা করতে গিয়ে 'ভাওতাবাজ', 'প্রতারক', 'উন্মাদ', 'মিথ্যুক', 'অসৎ' ইত্যাদি বলে গাল দেন। আমাদের ইউনূস সাহেবকেও তিনি এসব বলে গাল দিয়েছেন। যদিও কেন গালাগাল দিচ্ছেন তা ব্যাখা করেছেন। তবুও ভালো লাগেনি।
ব্যক্তিপূজার খপ্পরে পড়লে মগজের মুক্তি নেই। দেবদূত শুধু স্বর্গে থাকেন। আদমসন্তানকে দেবদূত ভাবলে আখেরে বোকা হতে হবেই। বদরুদ্দীন উমরের বইটার প্রকাশক শ্রাবণ। এখন আর ছাপা হয় না। তবে খুঁজলে হয়তো পেয়ে যাবেন। পড়ুন, আলোচনা করুন। হোক তা যুক্তির আলোকে পক্ষে-বিপক্ষে। এভাবেই মহামহিম কিংবদন্তির বাইরে বেরিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হবে।