তাঁর জন্ম এবং বড় হওয়া হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর উপাধি অর্জনের পরে তিনি রাজ্য সরকারের অধীনে আধিকারিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ দুই-দশকের লেখক-জীবনে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক এবং কিশোর-সাহিত্য, উভয় ধারাতেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তিনি যখন গল্প-উপন্যাস লেখেন, তখন ঘটনার বিবরণের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন মানব-মনের আলোছায়াকে তুলে আনার বিষয়ে। লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি। তাঁর বহু কাহিনি রেডিও-স্টোরি হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে সমাদর পেয়েছে। সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন দীনেশচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার এবং নান্দনিক সাহিত্য সম্মান।
গল্প লেখার দিক থেকে বলতেই হয় সৈকত মুখোপাধ্যায় একজন সেরা লেখক। কিছুদিন আগে পর্যন্ত এই নাম আমার কাছে অচেনা ছিল কিন্তু এখন ওনার বইএর নাম শুনলেই মনে হয় কখন পড়বো। এই বইএর প্রচ্ছদটি অবশ্য চোখকে আকর্ষণ করে না। কিন্তু এর মধ্যে যে গল্পগুলো আছে সেগুলো খাসা। মোট ৯টি গল্প আছে। সেগুলি হল -
১) রানি : আট বছরের ছোট্ট যতন মা মারা যাবার পর, তার বাবা তাকে দিদিমার কাছে রেখে আসে।আর যতন তার সঙ্গে পোষা টিয়া(রানি) টাকেও নিয়ে যায়। যেহেতু তার বাবা জাহাজে চাকরি করে তাই যতনের দেখাশোনা করা সম্ভব নয়।তবে যাওয়ার সময় বলে যায় ঠিক আঠারো মাস বাদে কলকাতা ডকে ফিরতি জাহাজ থেকে নামবে। কিন্তু এরমধ্যেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।আর যতন ও তার দিদিমাও সীমানা পেরিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়।কিন্তু এরপর তাদের জীবন কিভাবে কাটে ? যতন কি তার বাবার সাথে দেখা করতে পারে ? আর কি কোনোদিন সে নিজের দেশে ফিরতে পারে ? * এই গল্পটা বড্ড ছেলেমানুষী টাইপের মনে হয়ছে। ছোটদের ভালো লাগতে পারে,bt আমি নিতে পারলাম না।
২) পলাতকের প্রার্থনা : সিকিমের রিংসিম নামক এক নির্জন জায়গার বৌদ্ধ গুম্ফার একমাত্র বাসিন্দা লামা গিয়াৎসে। এই লামা গিয়াৎসের কাছে আশ্রয় নেয় হেনড্রিক নামের এক যুবক।কিন্তু কি তার উদ্দেশ্য ? সে কি কোনো অপরাধী নাকি অন্য কিছু ? কেনো সে তারা খেয়ে বেড়াচ্ছে? তার শেষ পরিণতি কি হয়? * কল্পবিজ্ঞানের গল্প এটি। বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে যে এত সুন্দর ছোটগল্প ও হয় ভাবা যায়না।
৩) ধূমাবতী : গল্পটিকে কল্পবিজ্ঞানের ঘরানাতে ফেলা যেতে পারে। তিনজন সঙ্গীর সঙ্গে সতোপন্থ হিমবাহের উদ্দেশ্যে ট্রেকিং এ বেরিয়ে, মিঃ গাঙ্গুলি মাঝপথেই থেমে যান।ঘটনাচক্রে বৃদ্ধ গাইড তাকে ধূমাবতী দেবীর মন্দিরে নিয়ে যান। সেখানে পৌঁছবার পর তিনি যা দেখলেন তা দেখার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না, কি ছিল সেখানে ? কি এমন জিনিস দেখেছিলেন তিনি ??
৪) চৌবেসাহেব ও চুম্বক রহস্য : রহস্য টা একটা সার্কাসে খুনের ব্যাপারে। বানারগুড়ি থানার সেকেন্ড অফিসার ও থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার উমাশঙ্কর চৌবে এই কেসএর সমাধানের চেষ্টা করে।
৫) ঘড়িওয়ালা ও অন্য গ্রহের প্রাণী : জগদলপুরের বৃদ্ধ ঘড়িওয়ালা মাধব সিং ও মাওবাদী দলদের নিয়ে এই গল্প।
৬) মৃত্যুশীতল বন্ধু : ক্যাপ্টেন সুমন রায় ও ক্যাপ্টেন চিৎপাবন সিং - দুই বন্ধু, দুন অ্যাকাডেমির সহপাঠী।তাদের দুজনেরই স্বপ্ন নাঙ্গা পর্বত জয়। তাদের যাত্রাও শুরু একইসাথে। কিন্তু কাছাকাছি পৌঁছে ভাগ্য তাদের বাধ সাধলো। দুর্ভাগ্যের কারণে চিৎপাবন সিং 'ক্রিভ্যাস' এর মধ্যে পড়ে যায় এবং যার পরিণতি হয় মৃত্যু। তবে তার আরেক সঙ্গী বেঁচে যায়। সে কি পারবে একা ওই নাঙ্গা পর্বত জয় করতে ? পারবে তার বন্ধুর ইচ্ছা পূরণ করতে ? ওই হিমবাহের মধ্যে কি কিছু অলৌকিক ঘটেছিল ? * ক্রিভ্যাস : পুরু বরফের চাদরের মধ্যে থাকে অগণিত ফাটল।একেই ইংরেজিতে বলে ক্রিভ্যাস। এই ক্রিভ্যাস গুলো বেশির ভাগই হয় খুব গভীর। এর ওপর পা রাখা মানে মুহূর্তের মধ্যে খাদের গভীরে পড়ে মৃত্যু।
৭) ছোটরাজার পোষ্য : গল্পের প্রথমে ভাবতেই পারিনি শেষটা এতো ডেঞ্জারাস। মোহনপুরের রাজবাড়ীর একা যুবরাজ মহারাজা জিতসুন্দর। তার শখ জংলী জীব জন্তু পোকামাকড় দের পোষা।বর্তমানে তার বয়স হয়েছে আশি, এবং আর্থিক অবস্থারও অবনতি ঘটেছে, পোষ্যদেরও আর পালন করতে পারেননি। তবে তিনি যে শেষ পোষ্য কিনেছিলেন তাঁর শেষ সম্বল দিয়ে,সেগুলো তাঁর বাড়িতেই ছিল। কি ছিল সেগুলো ? ছোটোরাজার বাড়িতে যে লোকদুটো চুরি করতে ঢুকেছিল সেগুলো তাদের কি অবস্থা করেছিল ? * এটা সত্যিই awesome একটা গল্প এবং প্লটও বেশ ইউনিক।
৮) টেন্ডং গুম্ফার প্রেতশ্রমিক : এটি একটি বৌদ্ধ গুম্ফা তৈরির কাহিনি। দক্ষিণ সিকিমের ডামথাং গ্রামের ঘটনা।নতুন গুম্ফা বানানোর ইচ্ছা লামা জিগমে নামগিয়ালের। পাহাড়ে প্রচন্ড বৃষ্টির কারণে শিলিগুড়ির বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার মণীশ মিত্র গুম্ফা কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু পরদিনই নতুন গুম্ফার উদ্বোধনের জন্য বনবৌদ্ধগোষ্ঠীর সন্ন্যাসীদের আমন্ত্রণ করা হয়েছে। তখন লামা জিগমে এক ভয়ঙ্কর পন্থা বেছে নেয় এক রাতের মধ্যে গুম্ফা বানাবার জন্য। কি সেই পথ ? জানতে হলে পড়তেই হবে...😊
৯) মারাং গ্রামের পান্থশালা : অবুঝমারের আদিবাসী গ্রামের সর্দার কে বেঁধে রেখে সাদা চামড়ার সাহেবরা কলঙ্কিনীর সোনার মূর্তি নিয়ে যাওয়ার সময় গ্রামেরই একটি ছেলে বাবুলালকে নিয়ে যায়। যাতে গ্রামের লোকেরা পরে আর আক্রমণ করতে না পারে।তখন সর্দার বাবুলাল কে আদেশ দেয় অতিথিদের যেন মারং গ্রামের পান্থশালায় আশ্রয়ের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু এরপর কি হয় সেটাই গল্পের মজা । কি আছে এই পান্থশালায়? এই সাহেবদের শেষ পরিণতি কি হয়? বাবুলাল কি এদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারে ? *এটা এই বইএর দুর্দান্ত একটি গল্প।
◾এখানের মধ্যে সবথেকে ভালো লেগেছে - মারাং গ্রামের পান্থশালা, ছোটরাজার পোষ্য, মৃত্যু শীতল বন্ধু আর পলাতক প্রার্থনা।
৩.৫/৫ এই গল্পগ্রন্থ বিষয়বৈচিত্র্যে ভরপুর। সবচেয়ে ভালো লেগেছে "ছোটোরাজার পোষ্য।"শেষের চমকটা দারুণ।ঘড়িওয়ালা আর অন্য গ্রহের প্রাণী, ধূমাবতী, পলাতকের প্রার্থনা,চৌবেসাহেব এবং চুম্বক রহস্য গল্পগুলো চমৎকার।নামগল্পটা ভালোই। কয়েকটি গল্পের পরিণতির ক্ষেত্রে একদম নতুনত্ব নেই।যেমন-মৃত্যুশীতল বন্ধু,টেনডং গুম্ফার প্রেতশ্রমিক।"রানি" অতিনাটকীয়তার জন্য ভালো লাগেনি। সব মিলিয়ে একবার পড়ার জন্য চমৎকার বই।
'ধূমাবতী' গল্পটার কলকব্জা দিয়ে চমৎকার একটা বড়গল্প হতে পারতো (সৈকত মুখোপাধ্যায়ের আর কোনো লেখা আগে পড়িনি, কিন্তু মনে হয়েছে তাঁর হাতে বড়গল্পও সুন্দর ফুটবে), ছোটগল্প হিসেবে সেটা খাপছাড়া লেগেছে। 'মৃত্যুশীতল বন্ধু' আর 'টেনডং গুম্ফার প্রেতশ্রমিক' গল্পদুটো হাজার-বছর-ধরে-চিবানো পানের মতো, রসকষ কিছুই আর পাইনি। বাকি গল্পগুলো ভালো লেগেছে, বিশেষ করে 'পলাতকের প্রার্থনা' আর 'ঘড়িওয়ালা আর অন্য গ্রহের প্রাণী'। 'রানি' গল্পটা বাকিগুলোর চেয়ে একটু ভিন্ন।
লেখকের আরও বই পড়ার আগ্রহ মনে জাগলো।
বিজন কর্মকারের অলংকরণ একমাত্র 'মারাং গ্রামের পান্থশালা' গল্পটায় ভালো লেগেছে, বাকিগুলো খুবই দায়সারা ঠেকেছে।
একটা মৃদু অনুযোগ রেখে যাই, প্রকৃতির বর্ণনায় পাখি আর বৃ��্ষের প্রসঙ্গে অকারণে নানা ইংরেজি শব্দ চলে এসেছে। এগুলোর বাংলা বিকল্প আছে, সেগুলোর প্রয়োগ বরং শিশু-কিশোর পাঠকের জন্যেই বেশি জরুরি।
সৈকত মুখোপাধ্যায় এর এই নিয়ে তিনটা বই পড়লাম। প্রতিটা বই এর মধ্যে বৈচিত্র্য আছে। যেমন এই মারাং গ্রামের পান্থশালার কথাই যদি বলি, একই বইয়ে আপনি এডভেঞ্চার পাবেন, ডিটেকটিভ গল্প পাবেন, অলৌকিক আবেশ পাবেন, সায়েন্স ফিকশন পাবেন। একদম একটা মাল্টি কুইজিন প্ল্যাটার এর মত। সাথে সৈকত বাবুর লেখার মধ্যে একটা মায়া আছে। যদিও শিশুতোষ বই, কিন্তু সব বয়সের মানুষের ভালো লাগার মতো।
বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, সে হাসির গল্পই হোক বা রহস্য, কল্পবিজ্ঞান হোক বা ভূতের, যে সীমিত সংখ্যক লেখক এদের প্রতিটিতেই স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেন, এবং পাঠকের মনে গভীর রেখাপাত করতে সফল হন্, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন সৈকত মুখোপাধ্যায়। ছোটোদের জন্যে তাঁর লেখা এক ঝাঁক গল্পকে এই সুমুদ্রিত সংকলনের মাধ্যমে আমাদের উপহার দেওয়ার জন্যে শিশু সাহিত্য সংসদ আমাদের কৃতজ্ঞতা-ভাজন হয়ে থাকবেন। যেসব মানবিকতার স্পর্শে সজীব, আবার রুদ্ধ-শ্বাস সাসপেন্স-এর গুণে ভরপুর গল্প এই বই-এ আছে তারা হলো: ১) রানি ২) পলাতকের প্রার্থনা ৩) ধূমাবতী ৪) চৌবেসাহেব এবং চুম্বক রহস্য ৫) ঘড়িওয়ালা আর অন্য গ্রহের প্রাণী ৬) মৃত্যুশীতল বন্ধু ৭) ছোটোরাজার পোষ্য ৮) টেনডং গুম্ফার প্রেতশ্রমিক ৯) মারাং গ্রামের পান্থশালা আলাদা ভাবে এই গল্পগুলো নিয়ে লিখলে লেখকের প্রতি, এবং পাঠকের প্রতিও ঘোর অবিচার করা হবে, কারণ এটা কোনোমতেই বোঝানো যাবে না যে কী দুর্দান্ত একটা প্যাকেজ অপেক্ষা করে আছে পাঠকের জন্যে, এই বই-এর দুই মলাটের মাঝে। অতএব হে পাঠক, যদি এখনও এই বইটি না পড়ে থাকেন, তবে যতো দ্রুত এই ত্রুটি সংশোধন করতে পারবেন, ততোই মঙ্গল।
Sci-fi, adventure, অতিপ্রাকৃত - এ সব ভিন্ন ভিন্ন জনরার ছোট গল্প রক মলাটে পেয়ে আমার মনে হয়েছে, এ বইটা বাংলা সাহিত্যের অনন্য সংযোজন। দুয়েকটা গল্প প্লেইন মনে হলেও কয়েকটা গল্প ভীষণ ভালো (ধূমাবতী, পলাতকের প্রার্থনা, ঘড়িওয়ালা আর অন্য গ্রহের প্রাণী)। যারা এক বইয়ে ভিন্ন ভিন্ন জনরা সাহিত্যের স্বাদ চান তাদের জন্য এ বইটি বিশেষভাবে রেকমেন্ডেড।
#HighlyRecommend কেউ যদি বলে "এমন একটা গল্পের বইয়ের নাম বলেন যেটা পড়ে খুব ভাল একটা শান্তি পাব, গল্পগুলো বিভিন্ন বিষয়ে হবে" তাহলে অবশ্যই এই বইটার নাম প্রথমে মুখে আসবে।
এই বইটা একটা ভালবাসা❤ এর মধ্যে ছিল নরমাল গল্প, sci-fi, adventure, প্রেত-সাধনা, detective ইত্যাদি.... লেখক গল্প নিখুঁত ভাবে সাজিয়েছেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু আসল কথা হল লেখার ডং, লেখার সুন্দরজ। লেখার হাত খুব ই ভাল। শব্দচয়ন, খুব সুন্দর বাক্য গঠন সব মিলিয়ে লেখাটা খুব উপভোগ্য, একদম নিজের একটা ছাপ আছে তার লেখায়।
বিষয়বৈচিত্র্যে ভরপুর সুখপাঠ্য নয়টি গল্প। লেখকের গল্প বলার ঢং ও শব্দচয়ন অত্যন্ত সুন্দর। হালকা মেজাজে, হাঁটতে হাঁটতে কিংবা কাজের ফাঁকে ফাঁকে পড়ে ফেলবার মতো বই।
A very bad cover design, followed by bad illustrations inside. But, stories were the real heroes here. Fantastic, and different. Most of the stories carried their weight properly and balanced this book. Author is very much efficient in storytelling. He made short stories cool. Hat's off.
নাম দেখেই বইটা পড়া শুরু করেছিলাম। অসম্ভব সুন্দর একটা বই, প্রতিটা গল্পেই নতুনত্ব আছে৷ একেবারে পাঁচমিশালি জিনিস দিয়ে ভরপুর। লেখকের লেখনশৈলীও বেশ সুন্দর, পড়ে আরাম পেয়েছি।
এই মোট ৯টি গল্প রয়েছে। যা বিষয় বৈচিত্র্যতায় ভরপুর। গল্পগুলো হলো~
১) রানি~ যতনের জন্মের সময় তার মা একটি টিয়াপাখি কিনেছিল, নাম দিয়েছিল রানি। কিন্তু যতনের মা মারা গেলে তার বাবা কাজে যাওয়ার আগে তাকে এবং টিয়াপাখি টাকে তার দিদিমার কাছে রেখে আসে। যতনের এখন ভরসা তার দিদিমা এবং এই টিয়াপাখিটা। পাখিটা কি পারবে যতনকে বিপদ থেকে বাঁচাতে?
২) পলাতকের প্রার্থনা~ রিংসিমের গুম্ফার একমাত্র বাসিন্দা লামা গিয়াৎসেকে তার বন্ধু শিবেন গুরুং, হেনড্রিক নামের একটি ছেলেকে তার কাছে আশ্রয় দিতে বলে। হেনড্রিক একজন বিজ্ঞানী। কিন্তু সে এমন কিছু একটা আবিষ্কার করে ফেলেছে যার জন্য পৃথিবীর শক্তিশালী দেশগুলো তার পেছনে পড়ে গেছে। কী এমন জিনিস আবিষ্কার করেছে হেনড্রিক? আর লামা গিয়াৎসে কি পারবে তাকে এই শক্তিশালী দেশগুলোর হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখতে?
৩) ধূমাবতী~ গাঙ্গুলীবাবু বন্ধুদের সাথে সতোপন্থ হিমবাহে যেতে না পারায় বৃদ্ধ গাইড গুলাব সিং-এর সাথে পরেরদিন ধূমাবতীর মন্দির দেখতে যায়। শাস্ত্রে বর্ণিত ধূমাবতী দেবীর মতো বৃদ্ধ নয়, যুবতী রূপ সেই মূর্তির। গাইড বলে দেবীর যুবতী রূপ অনেকে দেখেছে, তাই এরকম রূপ মূর্তির। এর পেছনের আসল রহস্য কী?
৪) চৌবেসাহেব এবং চুম্বক রহস্য~ সার্কাসে খেলা দেখাতে গিয়ে মৃত্যু হয় সার্কাস দলের সদস্য সাবিত্রীর। প্রথমে এটাকে সাধারণ অ্যাক্সিডেন্ট মনে হলেও পরে বোঝা যায় এটা একটা পরিকল্পিত খুন। কিন্তু খুনটা কে করলো এবং কেন?
৫) ঘড়িওয়ালা আর অন্য গ্রহের প্রাণী~ দম দেওয়া ঘড়ি আজকাল কেউ পড়ে না। তবুও জগদলপুর বাজারে মাধব সিং তার দোকান রোজ খোলা রাখে এই আশায় যে একদিন অন্য গ্রহের প্রাণীরা ঠিক আসবে তার দোকানে ঘড়ি সাড়াতে। এরপর একদিন তারা এলো মাধব সিং-এর কাছে ঘড়ি সারাতে। কিন্তু তারপর?
৬) মৃত্যুশীতল বন্ধু~ দুই বন্ধু দুর্গম নাঙ্গাপর্বতের শিখরে পৌঁছানোর যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু পাতলা বরফের চাদরে মোড়া ফাঁটলে পা পড়ে এক বন্ধু খাদে তলিয়ে যায়। বন্ধুর মৃত্যুতে অপরজন কি আর সাহস দেখাবে পর্বতের শিখরে ওঠার নাকি ফিরে আসবে সে?
৭) ছোটোরাজার পোষ্য~ মোহনপুরের রাজবাড়িতে একাই থাকে আশি বছরের হতদরিদ্র ছোটোরাজা জিতসুন্দর। এই জিতসুন্দরের ছোটো থেকে শখ ছিল হিংস্র জীবজন্তু পোষার, যার কিছু এখনও অবশিষ্ট আছে তার রাজবাড়িতে। কিন্তু দুই চোর তার অবশিষ্ট এক প্রিয় জিনিসকে নিয়ে যেতে চায়। কি করে বাঁচাবে সে সেটাকে?
৮) টেনডং গুম্ফার প্রেতশ্রমিক~ দুর্গম টেনডং পাহাড়ে গুম্ফা বা বৌদ্ধ মন্দির তৈরির কাজ করছে ইঞ্জিনিয়ার মনীশ মিত্র। কাজ প্রায় শেষ, শুধু বাকি গুম্ফার উপরে একটা মূর্তি বসানো, কিন্তু তখনই ঝড়-বৃষ্টিতে কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এদিকে পরেরদিন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা আসবে গুম্ফা উদ্বোধন করতে। এখন কী করে এক রাতের মধ্যে এই কাজ সম্পন্ন হবে?
৯) মারাং গ্রামের পান্থশালা~ অবুঝমারের আদিবাসী গ্রামে কিছু সাহেবি ডাকাত ঢুকে গ্রামের সর্দার সুখারামকে বেঁধে গ্রামের বহু প্রাচীন কঙ্কালিনী দেবীর সোনার মূর্তি নিয়ে যাওয়ার সময় গ্রামের ছেলে বাবুলালকেও সাথে করে নিয়ে যায়। কিন্তু তখন সুখারাম বাবুলালকে আদেশ দেয় এই সাহেবদের মারাং গ্রামের পান্থশালায় নিয়ে যেতে। সুখারাম কেন একথা বললো? কী আছে মারাং গ্রামের পান্থশালায়?
প্রতিটি গল্পই ভিন্ন স্বাদের। যেখানে রহস্য, কল্পবিজ্ঞান, অলৌকিক, অ্যাডভেঞ্চার সবই রয়েছে। বৈচিত্র্যতায় ভরপুর এই গল্পগুলো দারুন ভাবে উপভোগ করলাম। তবে এই ৯টি গল্পের মধ্যে আমার "রানি" এবং "টেনডং গুম্ফার প্রেতশ্রমিক" এই গল্পদুটো অতোটা ভালো লাগেনি। বাকি গল্পগুলো কিন্তু দারুন লেগেছে। সহজ সরল ভাষায় লেখক বর্ণনা করেছেন গল্পগুলো, যা পড়তে ভালো লাগবেই। যারা এক বইতে ভিন্ন জনরার গল্পের স্বাদ পেতে চান তারা অবশ্যই একবার পড়ে দেখতে পারেন এই বইটি। আশা করি ভালো লাগবে। পাঠে থাকুন।
বইমেলায় বিভিন্ন স্টলে গিয়ে র্যাকে সাজানো বইগুলি উল্টেপাল্টে দেখার পিছনে অনেকটা সময় খরচ করা বারংবার উপকারী হিসেবেই সাব্যস্ত হয়েছে। সেইভাবেই আলোচ্য বইটির সন্ধান পাই শিশু সাহিত্য সংসদের স্টলে। সূচীপত্রে চোখ বোলাতেই দেখি, এই ছোটগল্প সংকলনটির একটি গল্প উমাশঙ্কর চৌবে সিরিজের! সেই দেখে সঙ্গে-সঙ্গেই বইটি হস্তগত করেছিলাম।
বইটিতে রয়েছে ৯টি ছোটগল্প। তার মধ্যে বেশিরভাগ গল্পই লেখা গতিময় থ্রিলারের ভঙ্গিতে। সেই কারণেই এই ১০৫ পৃষ্ঠার বইটি পড়তে বেশি সময়ও লাগেনি।
লেখক সৈকত মুখোপাধ্যায়ের লেখনীর ক্ষেত্রে একটি বিষয় সবসময়ই দেখেছি, সেটা হল বিষয়-বৈচিত্র্য। গল্পের প্রেক্ষাপটের ক্ষেত্রে যে নিত্যনতুন বৈচিত্র্য লেখকের একটা ট্রেডমার্ক স্টাইল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এতদিনে, তা এই বইতে অনেকটাই অধরা রয়ে গেছে বলে মনে হল। জ্যঁর রিপিট না করে, নানারকম জ্যঁরের পাঁচমিশালি গল্প সংকলনটিতে স্থান পেলে একেকটি গল্প আরও বেশি উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠত।
তবুও এক এক করে পড়লে সব গল্পই সুন্দর। 'পলাতকের প্রার্থনা' গল্পটির কল্পবিজ্ঞানীয় এলিমেন্টের প্রতি সামান্য খটকা লাগা ছাড়া বাকি গল্পগুলিতে প্রেক্ষাপটজনিত কোন অভিযোগ নেই। এর প্রধান কারণ কমপ্যাক্ট লেখনী। ভণিতা বাদ, ঘটনাভিত্তিক গতিময় কাহিনি - এই কারণেই ভাল লাগা।
শিশু সাহিত্য সংসদ প্রকাশিত বই মানে টার্গেটেড অডিয়েন্স কীরকম বয়সের হবে, তা বলে দিতে লাগে না। সেইরকম হয়েও এই সংকলনটি আমার একেবারের জন্যও খুব মোটাদাগের বোকা-বোকা ছেলেভুলানো গোছের মনে হয়নি। সেইখানেই বইটির সার্থকতা। বইটির কোন গল্পই হয়তো এমন অত্যাশ্চর্য প্লট বহন করে না যা দীর্ঘমেয়াদি সময় অবধি মনে দাগ কেটে থাকবে কিন্তু পড়ার সময়ে সুখপাঠ্য মনে হওয়ার মতন যথেষ্ট রসদ জোগান দেয়।
২০১৮ সালের পরে আর নতুন করে প্রিন্ট পেরোয়নি বলে দামও এখনকার নিরিখে অনেক কম। অলংকরণও রয়েছে প্রতিটি কাহিনিতে। সব মিলিয়ে অল্প মূল্যে সুন্দর প্যাকেজ। লেখকের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বইগুলির মতন শখ করে গিয়ে না কিনলেও, কোনদিনও হাতের কাছে পেলে সংগ্রহ করা যেতে পারে।
সূচীপত্র : রানি পলাতকের প্রার্থনা ধূমাবতী চৌবেসাহেব এবং চুম্বক রহস্য ঘড়িওয়ালা আর অন্য গ্রহের প্রাণী মৃত্যুশীতল বন্ধু ছোটোরাজার পোষ্য টেনডং গুম্ফার প্রেতশ্রমিক মারাং গ্রামের পান্থশালা
সৈকত মুখোপাধ্যায় এমন একজন লেখক যার লেখা কোনও বই-ই ‘মিস’ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কী লিখেছেন বা কেমন লিখেছেন সেসব পরে বিবেচনা করব – এই মানসিকতা ইয়ে আগে সংগ্রহ করে ফেলি, আজ অবধি ঠকিনি। আমার শেষ বইটির পাঠ অভিজ্ঞতাতেও সৈকত বাবুর ‘রেকর্ড’ অটুট। বরং ‘এস্টিম’টা বহু... বহু গুণ বেড়ে গেছে।
গত রাতে একটা টানা ‘স্পেল’ পড়ে শেষ করেছি ‘মারাং গ্রামে পান্থশালা’। বইটিকে সমকালের লেখকদের লেখা কিশোর গল্প সংকলনের সেরার সেরা বলে মনে করছি।
প্রথমেই আমি সাধুবাদ দেব শিশু সাহিত্য সংসদ –কে, ন্যূনতম মূল্যে যে ‘প্রোডাক্ট’ পাঠকমহলে পেশ করেছেন তা সত্যিই তুলনাহীন। যেমন পাতার গুণমান, তেমন বইয়ের বাঁধাই। অসাধারণ!
এবার তাকানো যাক বইয়ের এক এবং একমাত্র যোগ্যতার মাপকাঠির দিকে, গল্প, হ্যাঁ গল্পের কথাই লিখব। বইটিতে ছোট –বড় মোট ন’টি গল্প আছে। * রানি * পলাতকের প্রার্থনা * ধূমাবতী * চৌবেসাহেব এবং চুম্বক রহস্য * ঘড়িওয়ালা আর অন্য গ্রহের প্রাণী * মৃত্যুশীতল বন্ধু * ছোটোরাজার পোষ্য * টেনডং গুম্ফার প্রেতশ্রমিক * মারাং গ্রামের পান্থশালা
রিভিউ সৎ হতে হলে রিভিউয়ারকে সাহসী হতে হয়, আর আমার নামের মধ্যে সাহস –টাহস মিশে আছে সকলেই জানেন, সেই মত ভগবান গণেশকে স্মরণ করে রিভিউ শুরু করছি। জানি প্রাথমিকভাবে আপনারা ধাক্কা খাবেন। তবুও সত্যিটা সত্যিই।
‘রানি’ গল্প দিয়ে বইটি শুরু হয়েছে। তখনও বাংলাদেশের জন্ম হয়নি, পূর্ব পাকিস্তান, মুক্তিযুদ্ধ, খানসেনার তাণ্ডব ইত্যাদি নিয়ে লেখা একটা গল্প। খানিকটা ‘সিনেমাটিক’ প্রেক্ষাপটের উপর লেখা কাহিনি। এই গল্প সংকলনের একমাত্র দুর্বল তথা আজ অবধি পড়া (লেখকের) দুর্বলতম গল্প। সম্ভবত লেখকের লেখক জীবনের প্রথম দিকের লেখা। চেনা সৈকত বাবুর লেখনী আমার কাছে অমিল মনে হয়েছে। গল্প – সংকলনের গল্পের সংখ্যা বাড়াতে ব্যবহার করা হয়েছে বলে মনে করছি। এই গল্পের জন্য একটাই কথা বলতে পারি, প্রভু, ‘কোথাকার তরবারি কোথায় রেখেছ’।
প্রথম বলে ‘ইয়র্কার’ সামলাতে নাকানি চোবানি খাবার পর ক্রিস গেইল ‘ধুঁয়াদার পাড়ি’ খেললে যে অনুভূতি আমাদের মনে জন্মায় একমাত্র তার সঙ্গেই বাকি অংশের পাঠ অভিজ্ঞতার তুলনা চলতে পারে। এবার ‘পলাতকের প্রার্থনা’। সিকিমের রিমসিংয়ে এক বৌদ্ধ গুম্ফায় লামা গিয়াৎসের কাছে আশ্রয় নিয়েছে জার্মান বিজ্ঞানী হেনড্রিক। কিন্তু কেন? কাদের থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে সে? সে কি অপরাধী? নাকি অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার এই বিজ্ঞানী? তার আবিষ্কার কি তার পলাতক হবার কারণ? যেমন হাইডেলবার্গ পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছিলেন, বুঝতে পারেননি কী ঘটতে পারে, সেই বোমা পড়েছিল সেই হাতে ‘যে হাতে আজ প্রেম পরিচ্ছন্নতা কিছু নেই’। হেনড্রিক কি তা আগেই বুঝেছেন? কল্প বিজ্ঞান এবং ‘ফ্যান্টাসি’র অতুলনীয় মিশেলে অসাধারণ এক কাহিনি। ‘বেসিক সায়েন্স’কে কাজে লাগিয়ে এমন গল্প লেখা যায় এটা ভুলে গেছিলাম। কিন্তু লেখক মনে করিয়ে দিতে পেরেছন, তিনি পেরেছেন।
‘ধূমাবতী’, আবার এক কল্প বিজ্ঞান এবং রূপকথার মিশ্রণ। এই গল্পটির উল্লেখ অনীশ দেবের মত লেখক প্রতিদিন কাগজের ‘রোববার’ -এ নিজের প্রবন্ধে করেছিলেন। অত্যাশ্চর্য এক গল্প! আমি বইটি সংগ্রহ করেছিলাম শুধু এই কাহিনিটির কথা পড়েই। দুর্গার ন’টি রূপের এক রূপ হল ধূমাবতী। কিন্তু তার সঙ্গে কি গল্পের চরিত্রের কোথাও কোন মিল আছে? বিজ্ঞানের নিত্য নতুন আবিষ্কারের খেলা ঠিক কত কতখানি ভয়ানক হতে পারে তা লেখক দেখিয়েছেন। উত্তরাখণ্ডের প্রেক্ষাপটে এক অদ্ভুত সুন্দর – অসুন্দরের ছবি এঁকেছেন লেখক, ক্ষমতা থাকলে আমি জীবনে একটা অমন গল্প লিখতে চাইতাম, ‘আতাচোরা পাখিরে, কোন তুলিতে আঁকি রে...?’
সম্প্রতি লেখক নিজের এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে গোয়েন্দা – রহস্য কাহিনি নাকি তাঁর কাপের চা নয়। আমার মনে হচ্ছে, হয় উনি মিথ্যে বলেছেন, নয় বিনয়ের পাপোশ দিয়ে নিজের মেধার ছটা ঢেকে রাখতে চাইছেন। ‘চৌবেসাহেব এবং চুম্বক রহস্য’র ‘টার্ন এন্ড টুইস্ট’ আমাকে বেশ ঝাঁকুনি দিয়ে গেছে। গল্পটা পড়তে অনুরোধ করব। গল্পের ‘শিকড় আঁকড়ে ধরে মাটির মতন’। নিজে পড়ে দেখুন, ঝাল অন্যের মুখে খাবেন না। গল্পের ইলাসট্রেশনে চৌবেসাহেবের ছবিতে ভুল আছে, গল্পের বিবরণের সঙ্গে মেলে না। একটা কথা চুপি চুপি বলি, লেখক নিজের ‘ইমেজ’টাই চৌবেসাহেবের মধ্যে দেখিয়েছেন।
মোচড়। ‘ঘড়িওয়ালা আর অন্য গ্রহের প্রাণী’ গল্পের প্লটকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়ে লেখক যে খেলা খেলেছেন, তার জন্য একমাত্র এই শব্দটিই ব্যবহার করতে পারি। অসাধারণ গল্প। ‘টুইস্ট’-এর পর ‘টুইস্ট’। ‘স্পেলবাউন্ড’। কিন্তু গল্পের সঙ্গে ব্যবহৃত ইলাস্ট্রেশন তাল কেটেছে, ছবির দিকে তাকালে গল্পের মশলা সামনে এসে যায়।
‘মৃত্যুশীতল বন্ধু’। গল্পটি মানানসই। প্রাথমিকভাবে গল্পের প্রথমাংশের সঙ্গে ‘ভার্টিকাল লিমিট’ (সম্ভবত) ‘সিনেমা’র মিল পাই, তবে এটুকুই, বাকিটা কিন্তু নিজগুণে ভাস্বর। অলৌকিক এক পর্বতারোহণের কাহিনি।
আমার ধারণা ছিল ছোটদের জন্য ‘সাইকোপ্যাথ’-র গল্প লেখা যায় না। ভুল ধারণা ছিল, নিজের সংকীর্ণ পাঠ পরিসরের কথা ভেবে লজ্জিত হচ্ছি। আমার টাকা পয়সা থাকলে ‘ছোটোরাজার পোষ্য’ নিয়ে একটা ‘সিনেমা’ বানাতাম। কেন যে নির্দেশকের দল এসব গল্প খুঁজে পায় না কে জানে? এখানেও শক্তি হল ‘টুইস্ট’। পড়াশোনা করে লেখা, ভুল নেই তথ্যে, শেষ তথ্যটিও যাচাই করে দেখেছি। আমার মতে এটা লেখক সব থেকে ‘আণ্ডাররেটেড’ গল্প। রাতে পড়ার সময় শিহরিত হলেও ছাড়তে পারিনি। আট থেকে অশীতিপর সবার জন্য সমান রোমাঞ্চকর। বলে রাখি, এই গল্পের নায়ক(!) অশীতিপর এক বৃদ্ধ।
‘টেনডং গুম্ফার প্রেতশ্রমিক’ লেখকের অন্যতম এক সৃষ্টি। আবার বৌদ্ধ গুম্ফার কাহিনি। পাহাড়ের চূড়ায় প্রচণ্ড বৃষ্টিতে গুম্ফার কাজ এঞ্জিনিয়ার মনীশ শেষ করতে পারছেন না নির্ধারিত সময়ের মধ্যে, তবে কি উদ্বোধন পিছিয়ে যাবে? নাকি জিগমে নামগিয়াল বেচে নেবেন চরম কোনও পথ? অমন ‘হরর এলিমেন্ট’ একমাত্র ইংরাজি বইতেই মেলে।
এবার শেষ গল্প। ‘লেকিন জানে সে পেহলে’, ‘মারাং গ্রামের পান্থশালা’ নিয়ে দু –চার লাইন। ‘হরর’ বলতে ভূত বোঝা বাঙালি এই গল্পটা পড়ে দেখুক। মনে হবে না ভারতের কোন আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামের গল্প, আমাজনের রহস্যময়তা অনুভব করেছি। সুখারামকে পিটিয়ে, এক গ্রামবাসীকে হত্যা করে গোরা সাহেবের দল ছিনিয়ে চলেছে কঙ্কালিনী দেবীর মূর্তি, সঙ্গে নিয়েছে বাবুলাল নামের এক ছোট ছেলেকে, সে আসলে বন্ধক বা ‘জিম্মি’। সুখারাম নির্দেশ দেয় বাবুলালকে, সে যেন গোরা সাহেবদের নিয়ে রাতে আশ্রয় নেয় তাদের (মারাং) গ্রামের পান্থশালায়। কী ঘটে? বলব না। নিজে পড়ুন এই দুর্দান্ত বায়ো - থ্রিলার। আমি ‘স্পেলবাউন্ড’!
বইয়ের প্রচ্ছদ ভালো লাগেনি, শিশু সাহিত্য সংসদের কোনও বইয়ের ক্ষেত্রেই লাগেও না। ওটুকু বাদে বাকি পয়সা উসুল হয়ে গেছে। লেখকের শক্তিশালী লেখনী কিশোর সাহিত্যে ‘জঁর ফিকশন’-র এক অন্যতম স্তম্ভ। অপেক্ষা করব লেখকের নতুন গল্প – সংকলন বইটির। অনন্ত অপেক্ষাও সইব। এমন লেখা পড়তে পড়তে ইচ্ছে করে ‘প্রভু, নষ্ট হয়ে যাই’।
গল্প সংকলন পড়ারবকিছু অসুবিধা আছে। অসুবিধা হলো এই, একটা গল্প শেষ করার পর সেটা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবতে হয়। এই ভাবার সকয় দিতে গিয়ে একটা গল্পের পিঠে কখনোই আরেকটা গল্প পড়া হয় না। তাই এইটা শেষ করতে বেশ দেরিই হয়ে গেলো। তবুও বলতে গেলে বইটা দারুণ। প্রতিটা গল্পই দারুণ। হরর, ফ্যান্টাসি, সাই-ফাই, রম্য, সমকালীন, থ্রিলার প্রায় প্রতিটা জনরার অন্তত একটা গল্প হলেও দেয়া আছে। তার মধ্যে ‘রানি’, ‘ধুমাবতি’, ‘চৌবেসাহেব ও চুম্বক রহস্য’ এবং টাইটেল ধারী গল্পগুলো বেশ প্রিয় হিয়ে থাকবে। লেখকের লেখনী ঝরঝরে, সুখপাঠ্য।
প্রতিটি গল্পের বিষয়বস্তু আলাদা। ফলে ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ-পরিস্থিতির ছোঁয়া পাওয়া যায়। সহজ সরল গদ্যে লেখক বর্ণনা করেছেন গল্পগুলো। তবে প্রতিটি গল্পই যে উতরে গেছে এমন নয়৷
পলাতকের প্রার্থনা, ধূমাবতী, ঘড়িওয়ালা আর অন্য গ্রহের প্রাণী, ছোটরাজার পোষ্য, মারাং গ্রামে পান্থশালা গল্পগুলো বেশ ভালো লেগেছে।
আর রানি, চৌবেসাহেব এবং চুম্বক রহস্য, মৃত্যুশীতল বন্ধু, টেনডং গুম্ফার প্রেতশ্রমিক গল্পগুলো আরো ভালো হতে পারত।
সৈকত মুখোপাধ্যায়ের যেকোন গল্প পড়লে আফশোস হবে না। কারণ তাঁর প্রতিটি গল্প আলাদাভাবে নাড়া দিয়ে যাবে। এই বইটি মূলত কিশোরদের জন্যে লেখা হলেও কিশোর থেকে বৃদ্ধ যে কেউ পড়ে আনন্দ পাবেন। বেশ কয়েকটি নানা স্বাদের ছোটগল্পের সংকলন এই বইটি। আমি বলি, পড়ুন ও অন্যদের উপহার দিন, পড়ান।
অসাধারণ, অসাধারণ এবং অসাধারণ। আমি আর কিছু বলতে পারছিনা। কেউ যদি আমার কাছে কখনো গল্পের বই এর সাজেশন চায়, আমি প্রথমেই বলবো "মারাং গ্রামের পান্থশালা! মারাং গ্রামের পান্থশালা"