অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক আফসোস করতেন এই বলে যে, আরবি-ফারসির মতো ভাষায় লেখা কেতাবকে পড়ার মতো যোগ্যতা বেশির ভাগ গবেষকের নেই। তাই তারা 'ফার্স্ট হ্যান্ড' রেফারেন্স ব্যবহার করতে অপারগ। তাদের ভরসা মূল গ্রন্থের ইংরেজিতে অনুবাদ। এক্ষেত্রে আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ ব্যতিক্রমী আদমি। তিনি আরবি ও ফারসিসহ একাধিক ভাষা জানতেন। সেই দক্ষতার পরিচয় মেলে 'শিগার্ফ-নামা-এ-বিলায়েত' তর্জমার মাধ্যমে। মির্জা শেখ ইতিসামুদ্দিন প্রথম ভারতীয় ও বাঙালি, যিনি বিলাতে গিয়েছিলেন এবং দস্তুরমতো এক সফরনামা লিখেছেন প্রায় আড়াই শ বছর আগে। বহুকাল সেই কেতাব ধূলায় ধূসরিত ছিল। ১৯২৩ সালে ঢাকার হাকিম হাবিবুর রহমান তাঁর 'যাদু' পত্রিকায় একটি কলাম লেখেন। উর্দুতে লেখা সেই কলামের মাধ্যমেই শত বছর বাদে নজরে আসে 'শিগার্ফ-নামা-এ-বিলায়েত'। বেশ কসরৎ করে তা পরবর্তীতে জোগাড় করেন ইতিহাসবিদ আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ। মাত্র এক শ পাতার বইটি এক ধ্রুপদী সফরনামা। যা আড়াই শ বছর আগের বিলেতের সঙ্গে তৎকালীন ভারতবর্ষের ফারাককে পাঠকের সামনে নিয়ে আসে।
১৭৮০ সালে বাদশাহ দ্বিতীয় শাহ আলমের দূত হিসেবে বিলাত রওনা হন শেখ ইতিসামুদ্দিন। এক ফরাসি জাহাজে লম্বা সফর শেষে পৌঁছান বিলাত। দরিয়ায় সফরের চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন লেখক। বিভিন্ন অবাক হওয়ার মতো তথ্য আছে। তা যাচাই করা অসম্ভব। এক্ষেত্রে ইয়াদ রাখা দরকার যে, তখনো বিজ্ঞান বিকশিত হয়নি। কুসংস্কার ও সংস্কারের বালাই থাকবে তা স্বাভাবিক।
শেখ ইতিসামুদ্দিন ইতিহাসের এক বাঁক বদলের সময়ে বিলাত গিয়েছেন। পলাশির যুদ্ধ শেষ হয়েছে। পুরো বাংলা কোম্পানির দখলে। মোগল বাদশাহ নিরুপায়। তাই ভাতাসহ সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে অনুরোধ করতে চাইছেন ব্রিটেনের রাজাকে। অর্থাৎ তখতের আসল মালিক ব্রিটেনের রাজা। সাম্রাজ্যবাদের নখড় শেখ ইতিসামুদ্দিন দেখেছেন। তিনি ইংরেজশক্তির অনুরাগী। তিনি বুঝতে চান, কেন ইংরেজরা এত তাকত রাখে। উপনিবেশের 'কালা আদমি' হয়ে তার এই বুঝতে চাওয়ার চেষ্টা পুরো বিলাত সফর জুড়েই ছিল।
তিনি দেখেছেন, রাত তিন-চার ঘটিকা পর্যন্ত বিলেতে নারীরা অবাধে চলাচল করতে পারে। কোনো তকলিফ পোহাতে হয় না৷
ইংরেজের গুণপনার খোঁজ করেছেন শেখ ইতিসামুদ্দিন। তিনি লক্ষ করেছেন, এরা কর্মযোগী। কাজকে সবচেয়ে বেশি দাম দেয়। জমিদারের চাইতে মহাজন ও ব্যবসায়ীর কদর সেখানে ঢের বেশি।
ইংরেজদের নিয়ে শেখ ইতিসামুদ্দিন লিখেছেন,
"নিজেদের কৃতিত্ব বা শৌর্যবীর্য নিয়ে দর্প করা ইংরেজদের চরিত্রবিরুদ্ধ। যারা এ রকম করে তাদেরকে ওরা নিন্দনীয় মনে করে। কখনো যুদ্ধের কথা উঠলে কোনো অধিনায়ক, যে সুকৌশল ও বীরত্বের বলে যুদ্ধ জয় করেছে, সে যুদ্ধের কেবল নিছক বস্তুতান্ত্রিক একটা বর্ণনা দিয়ে যাবে, নিজের ভূমিকা মোটেই উল্লেখ করবে না। সে মজলিশের কেউ যদি অধিনায়কের প্রশংসা বা তার কৃতিত্বের কথা বলতে থাকে, তা হলে সে অধিনায়ক অত্যন্ত অপ্রতিভভাবে নিজের পায়ের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে চুপ করে বসে থাকে, আর লজ্জায় ঘামতে থাকে। তাদের সম্মুখে তাদের তারিফ করা ইংরেজরা পছন্দ করে না। কেউ এ রকম করলে ওরা তাকে খোশামুদে মিথ্যাবাদী মনে করে। এ জন্য এদের মধ্যে খোশামোদ করার রীতি নেই। সব দেশে খোশামোদ ও আত্মম্ভরিতাকে বুদ্ধিমান লোকেরা ঘৃণ্য মনে করে; কেননা তা কাপুরুষ ও নীচ প্রকৃতির লোকের কাজ। "
ইংরেজসাম্রাজ্য কেন সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে ছিল তা বুঝতে শেখ ইতিসামুদ্দিনের বইটা পড়া জরুরি। উপনিবেশের যাঁতাকলে পিষ্ট সাম্রাজ্যভক্ত এক দরিদ্র মুনসির লেখা হিসেবে 'শিগার্ফ-নামা-এ-বিলায়েত' পাঠ করলে ভুল করবেন৷ এই লেখার মূল্য ঢের বেশি।
আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ কামেল আদমি। তাঁর তর্জমার সমালোচনা করার জুররত এই অধমের নেই। তিনি সত্যিই বড় উমদা তর্জমা করেছেন। ভ্রমণকাহিনি ও ইতিহাসের মিশেল এই কেতাব। আগ্রহী পাঠক অবশ্যই দিব্য প্রকাশনীর বইটা পড়ুন।