Premendra Mitra (Bangla: প্রেমেন্দ্র মিত্র) was a renowned Bengali poet, novelist, short story writer and film director. He was also an author of Bengali science fiction and thrillers.
His short stories were well-structured and innovative, and encompassed the diverse to the divergent in urban Indian society. The themes of poverty, degradation, caste, the intermittent conflict between religion and rationality and themes of the rural-urban divide are a thematically occurring refrain in much of his work. He experimented with the stylistic nuances of Bengali prose and tried to offer alternative linguistic parameters to the high-class elite prosaic Bengali language. It was basically an effort to make the Bengali literature free from softness, excessive romance and use of old style of writing which were prevalent in older writings.
একটা গল্পের জন্য কি একজন মানুষকে খুন করা যায়? একটা গল্পের জন্য কি সেই গল্পের লেখককে খুন করা যায়! কোনো পক্ষ কোনো লেখার জন্য কোনো লেখককে খুন করে ফেললো কি না তা নিয়ে এই প্রশ্ন না। প্রশ্নটা হচ্ছে, একটা গল্পের জন্য একজন পাঠক একজন লেখককে খুন করতে পারেন কি না? অন্তত পক্ষে তার যদি লেখককে খুন করার ইচ্ছা হয় তাহলে পাঠককে আমরা দোষ দিতে পারি? প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘শুধু কেরানী’ গল্পটা পড়লে তাকে আমার খুন করতে ইচ্ছা করে। কারণ কী? কারণ তিনি গল্পটার ভিতর দিয়ে আমাকে বিপন্ন করেন,আমাকে এলোমেলো করে দেন।
একটা আসমানি রঙের নোটপ্যাড সাইজের পাতলা বই। নোটপ্যাডের কভার যতোটা শক্তিশালী হয় তেমন না। দুর্বল ভুসভুসে আসমানি মলাট গায়ে জড়িয়ে আছে কোনোমতে। ফেলেই দিতাম হয়তো বা বেচে দিতাম কেজি দরে। কেন খুলে দেখেছিলাম জানি না। সস্তা দরের ফটোকপি। কালি লেপ্টে আছে অক্ষরগুলোতে,কোনোটাতে বেশি কোনোটায় কম। স্পষ্ট বোঝা যায় না। কার বই সেটাও জানি না। তখন এসব ফটোকপি করা বই রাজশাহীর স্টেডিয়াম মার্কেটে পাওয়া যেতো। নামহীন গোত্রহীন একটা বই,চার পাঁচ হাত ঘুরে রদ্দি মালের ভেতরে এসে পড়েছে। পাতা ওল্টালাম। শুরুতেই যে গল্পের নামটা বড় বড় ফন্টে লেখা-‘শুধু কেরানী’... লেখকের নাম নেই। ছুটির দিন ছিল। স্কুলে যাবার তাড়া ছিল না। কী মনে করে পড়তে শুরু করলাম। দুটো লাইনের পরই হোঁচট খেলাম।
‘তখন পাখিদের নীড় বাঁধবার সময়। চঞ্চল পাখিগুলো খড়ের কুটি,ছেঁড়া পালক,শুকনো ডাল মুখে করে উৎকণ্ঠিত হয়ে ফিরছে। তাদের বিয়ে হল।—দুটি নেহাত সাদাসিধে ছেলেমেয়ে।’
পাখির নীড় বাঁধা দিয়ে শুরুর এই গল্প কী করে যে সাদাসিধে দুটি ছেলেমেয়ের সংসারের গল্পে ঢুকে গেল আমি বুৃঝে উঠতে পারলাম না। এই সাধারণ ঘটনার সমাপতনের অ্যাপ্রোচটাই আমাকে প্রবল ধাক্কা দিলো। আমি নেশাগ্রস্তের মতো পড়তে থাকলাম।
ফুলের মালা এনে দিয়েছে স্বামী তার স্ত্রীকে। ট্রামে না এসে, ট্রামের ভাড়া বাঁচিয়ে সেই টাকা দিয়ে ফুলের মালা কিনে আনতে হয়েছে কেরানিকে। এ-নিয়ে স্ত্রী বলে, কেন সে কষ্ট করে হেঁটে এলো; এ-ফুলের মালা না আনলেও তো হতো। স্বামীর কষ্ট হয়েছে বলে স্ত্রীর এ-অভিমান। স্ত্রীর জ্বর হলে স্বামী তাকে রাঁধতে দিতে চায় না। কারণ গরমে-ঘামে স্ত্রীর জ্বর আরো বেড়ে যাবে। পরস্পরের প্রতি প্রচণ্ড রকম ভালোবাসা তাদের। সুখানুভূতি তাদের প্রবল। অর্থাভাব ও দারিদ্র্যক্লিষ্টতায় তারা জর্জরিত হলেও তাদের হৃদয়ানুভূতি পরস্পরের জন্য উত্তুঙ্গ ও উদগ্রীব। কেরানি প্রায়ই হেঁটে আসে অফিস থেকে; ট্রাম ভাড়া বাঁচিয়ে তা দিয়ে ‘সূতিকা’ রোগগ্রসত্মা স্ত্রীর চিকিৎসা-খরচ জোগানোর জন্য। তবু স্ত্রীকে শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায় না। দুজনের কেউ-ই ভগবানের প্রতি অভিযোগ করে না। স্ত্রীর বেঁচে থাকার ইচ্ছা এবং স্বামীর স্ত্রীকে বাঁচিয়ে রাখার আকাঙক্ষা – উভয়ের হৃদয়গত ক্রন্দন যেন সমস্ত পাঠকের ক্রন্দন হয়ে ওঠে গল্পটিতে।
মাত্র সাড়ে তিন পৃষ্ঠার গল্প। আমি পড়বার পর খুব কাঁদলাম। কেন কেঁদেছিলাম সেটা এখন উপলব্ধি করতে পারি। অনেক পরে খুঁজে খুঁজে জানতে পেরেছিলাম,এই গল্পটা যে বদমায়েশ লোকটা লিখেছেন,তার নাম ‘প্রেমেন মিত্তির’...গল্পটায় লেখক দুইবার আমার হৃৎপিণ্ড বরাবর গুলি করে এফোঁড়ওফোঁড় করে দেন। সুখের অনুভূতি ও ভালোবাসার অমেয় স্বাদ এই দম্পতির অন্তরে ছিল। কিন্তু অর্থাভাবে স্ত্রীর ভালো চিকিৎসা করাতে না পারায় স্বামী-কেরানির অন্তরের যে-রক্তক্ষরণ স্ত্রীর করুণ হাসির মধ্যে যে প্রতিভাত তা স্পষ্ট : ‘একটা হাসি আছে – কান্নার চেয়ে নিদারুণ, কান্নার চেয়ে যেন বেশি হৃৎপিণ্ড নেংড়ানো।’
অনুভূতিময় দাম্পত্য যে দারিদ্র্যক্লিষ্টতায় কীভাবে আপামর পাঠকের কান্নায় রূপায়িত হয়, সে প্রমাণ এখানে পাওয়া যায় : ‘শুধু সেদিন জ্ঞান হারাবার আগে মেয়েটি একটিবারের জন্যে এতদিনকার মিথ্যাকরণ ছলনা ভেঙে দিয়ে কেঁদে ফেলে বললে – ‘আমি মরতে চাইনি – ভগবানের কাছে রাতদিন কেঁদে জীবন ভিক্ষা চেয়েছি, কিন্তু.... ’
আমার শ্বাস-প্রশ্বাস এই লাইনে এসে খুব ভারী হয়ে ওঠে। মনে হয় দশ টনি একটা ট্রাকের চাকা এসে বুকের ওপর চেপে বসেছে। আর তারপর?
‘তখন কাল-বৈশাখীর সমীকরণ আকাশে নীড়ভাঙার মহোৎসব লেগেছে।’ পাখির ঘর ভাঙা দিয়ে এই লাইনে এসে যখন গল্পটা বারবার শেষ হয়ে, আমার মাথায় রক্ত উঠে যায়। মনে হয় প্রেমেন্দ্র মিত্রকে খুন করে আসি। শরৎবাবুর স্টাইলে অতি প্রিয় হয়ে ওঠা ক্যারেকটারকে যখন অবলীলায় জ্বর দিয়ে তিনি হত্যা করেন, আমার মাথায় রাগের একটা আগ্নেয়গিরি অগ্ন্যুৎপাত করতে থাকে।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্প দাঁড়িয়ে আছে সম্ভাবনা,অনিশ্চয়তা আর শর্তের পিলারের উপর। ‘হয়তো,বোধহয়, যদি,তবে’ এই চার শব্দে দাঁড়ানো অজস্র সম্ভাবনা আর শর্তের আগুনে জ্বলেছে সেই গল্পের উনুন। তেলেনাপোতা আবিষ্কারের কথাই ধরা যাক। প্রথম বাক্যটাই বেশ অনিশ্চিত, একই সাথে সম্ভাবনার— ‘শনি ও মঙ্গলের– মঙ্গলই হবে বোধ হয়– যোগাযোগ হ’লে তেলেনাপোতা আপনারাও একদিন আবিষ্কার করতে পারেন।’
এই অনিশ্চিয়তার উপর ভর করেই মনে হয় বাংলা সাহিত্যের আরেক স্মরণীয় ছোটগল্প ‘হয়তো’ এর জন্ম। কখনো যে এমনটাই ঘটেছিলো সেই কথা জোর দিয়ে বলেন না গল্পকার। পাঠককে সবসময়ই একটা টানাপোড়েনের মাঝে রাখেন।
‘স্টোভ’ গল্পটার কথাই বলি। পাম্প দেওয়া এক ভাঙা স্টোভ জ্বেলে বসে আছে বাসন্তী। তার স্বামীর কাছে এসেছে মল্লিকা রায়। তার জন্য চা বসাচ্ছে বাসন্তী। বিয়ের হয়েছে পাঁচ বছর। ফুল শয্যার রাতে ঘরে ঢোকার আগে মল্লিকার নাম বলে দিয়েছিল কূটনি মেয়েরা। মল্লিকার কাছ থেকে স্বামী শশীভূষণের মন সরিয়ে এনে আঁচলে তাকে বাঁধার কথা বলেছিল। সেই থেকে মল্লিকা নামটি এক পুরোনো ক্ষতের মতো লেগে আছে তার মনে। শশীভূষণের প্রেম ছিল, কিন্তু ভীরু শশীভূষণ সাহসী হয়ে মল্লিকার কথাটি তার মাকে বলতে পারেনি। তাই জাদুঘরে প্রাচীন শিলা আর উল্কাপিণ্ডের ভিতরে প্রেম গিয়েছিল ফুরিয়ে। পরে মল্লিকার মনে হয়েছিল, সে কেন অনায়াসে মেনে নিয়েছিল তার ভবিতব্য। সে শশীভূষণকে বলতেই পারত, মাকে বলতে পারে নি শশী, কিন্তু মল্লিকাকে কি শশীভূষণের মায়ের অনুগ্রহ ভিক্ষার ওপর বাঁচতে হবে ? মল্লিকার মনে হচ্ছে, ওই ভিজে সলতেয় সারাজীবন ধরে আগুন ধরিয়ে রাখার ব্রত ক্রমশ কি দুর্বহ হয়ে উঠত না? এই গল্পে দুই নারী জ্বলতে থাকে, ফুঁসতে থাকে শশীভূষণকে ঘিরে। বাসন্তীর সময়ে সময়ে মনে হয়েছে স্টোভ ফাটিয়ে সে মরে। প্রাণপণে পাম্প দিয়েছে, কিন্তু মরেনি। ধীরে ধীরে সেই বাসনা গিয়েছিল, মনে হয়েছিল লোকটি অসহায়, তার উপর একান্ত নির্ভর। মল্লিকা এসেছে তার বাড়ি, তার পরিপূর্ণ সংসারের দিনে। মল্লিকাকে দেখার পর তার ভয় গেছে। বাসন্তী নানা কথা ভাবতে ভাবতে ভুলেই গিয়েছিল যে স্টোভ জ্বলছে। এই মুহূর্তে কি স্টোভ ফেটে যেতে পারে ? তাহলে কী ভুল ধারণাই না করবে মল্লিকা? ভাববে বহুদিনের নিরুদ্ধ বেদনাই ওই আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ! তা হতে দেবে না সে।
এই তীব্র অনিশ্চয়তার এক দোলাচলকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছো স্টোভ গল্পটা।
চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টির বাঁকবদল,পারিপার্শ্বিকের সাথে মিথস্ক্রিয়া নিয়ে বেশ দুর্দান্ত কিছু গল্প আছে। এর কিছু কিছু বেশ ব্যাঙ্গত্মক। যেমন সাগরসঙ্গম নামে একটা গল্প আছে। সাগর সঙ্গমে একজন ধর্মপ্রাণ বিধবা নারী প্রথমে বেশ্যার কিশোরী মেয়ে বাতাসিকে নেতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছিল, তারপর সাগরসঙ্গমে যাওয়ার পথে নৌকায় তাদের প���িচয় ও তীর্থে তাদের সময়যাপনের পরে সেই বেশ্যাকন্যা বাতাসিকেই নিজ কন্যা হিসেবে পরিচয়দানের মধ্য দিয়ে যে ঔদার্যের প্রকাশ পায় সেই রকম ঘটনা বিরল।
লেখকের আঙ্গিকের ক্রমাগত ভাঙাগড়ার বৈষম্যও দেখা যায় এমন গল্পও আছে। বাস্তবতার এক অলীক দুনিয়ায়, হ্যারিসন রোড ও আমহার্স্ট স্ট্রিটের চৌমাথায়, নাগরিক গলিঘুজির ভিড়ে এক ফালি রেলিংঘেরা, মরা ঘাস-বিছোনো জমি: আর সেখানেই বসত গাড়ে ‘কুয়াশায়’ গল্পটি। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে একটি রহস্যমৃত্যু: বছর দশ আগের এক শীতের ভোরে, মলিন দোলনা থেকে ঝুলতে থাকা এক নারীর বেওয়ারিশ লাশ। ‘শীতের রাত্রে একটি ক্লান্ত কাতর মেয়ে অর্ধোন্মত্ত অবস্থায় কলকাতার নিস্তব্ধ নির্জন প্রান্তরে’ আচমকা বিলীন হয়েছিল কী করেই বা– ‘কেউ তা জানে না’, এমন কী, পুলিশও তার কোনও কিনারা করতে পারেন নি, কিন্তু লেখক পেরেছেন। প্রশ্ন ওঠে, কী করে পেরেছেন? অথর সর্বেশ্বর বলে? আখ্যানে প্রচারিত সত্যের প্রতিটি অঞ্চলে তার বাধাহীন গতায়াতের জন্য? উত্তর: না। বরঞ্চ, লেখক গোয়েন্দাধর্মিতা ছেড়েছেন বলে। তিনি একটিই মাত্র, কোনও নির্দিষ্ট ও একক সত্য খুঁজতে-চাওয়া নিষ্ফল কোনও জ্ঞানতত্ত্ব বর্জন করেছেন বলে। দিব্যি বোঝা যায়– গল্প নেহাতই সম্ভাবনার জটিল নকশা মাত্র, যে সম্ভাবনার জমিতে গড়ে উঠবে আখ্যানের কোনও অলীক কল্পদেশ।
একই টেকনিক, সম্পূর্ণ বিপরীত চেহারায়, ‘নিরুদ্দেশ’-এও। লেখক অবশ্য এখানে গোয়েন্দাপ্রতিম, অগুনতি কল্পনকশার ভিড়ে বেছে নেবেন একটিকে। হারিয়ে-যাওয়া ছেলের গল্প। ছেলে ঘর ছেড়েছে, কাগজে বিজ্ঞাপন বের হয়, ছেলেকে চেনার চিহ্ন: মুখে জড়ুল, ভুয়ো ‘ছেলে’রা হাজিরা দেয় বিধ্বস্ত বাবা-মায়ের কাছে। এক দিন সত্যি ছেলে সত্যি সত্যিই ফিরে আসে, তত দিনে তার চেহারা পাল্টে গেছে অনেকখানি, বাপ-মায়ের স্মৃতিসাক্ষ্যে সে আর চেনা ছেলে নয়। উপরন্তু, বাড়ির লোক নিশ্চিত, ছেলে মারা গেছে– দুর্ঘটনায়, দিন কয়েক আগে। বিজ্ঞাপনদাতার জবানে সে ‘মৃত’। মুমূর্ষু মা এখনও সে-খবর জানে না। অতএব, সত্যি ছেলেকে মৃত সত্যি ছেলে সেজে দাঁড়াতে হয় মৃত্যুপথযাত্রী সত্যি মায়ের সামনে। গল্প থামে। অনেক গল্পের মত, এ’ গল্পও কথনের আঙ্গিকে পরিবেশিত: লেখকের বন্ধুর বলা, এক স্যাঁতসেতে বাদলা-শীতের দিনে, ঘরোয়া আড্ডায়। মজাদার যা: সেই বন্ধুটির মুখেও ছিল জড়ুল। আবশ্যিক শর্তটিকে গল্প শেষ হওয়া মাত্রই চিনে নেন লিখিয়ে, সেই জড়ুল-চিহ্নের ভিত্তিতেই এ’ গল্পের নায়ক হিসেবে শনাক্ত হয়ে যান গল্পের কথক স্বয়ং।
কল্লোল-গােষ্ঠীর অন্যান্য লেখকদের মতাে প্রেমেন মিত্তিরের গল্পে অবশ্য আমরা পেয়ে যাই কঠোর কঠিন বাস্তবতা এবং বুদ্ধির প্রখরতা। তাঁর 'হয়তাে' 'স্টোভ', 'শৃঙ্খল', 'মহানগর' ইত্যাদি গল্পে রয়েছে মধ্যবিত্তের মূল্যবােধের ভাঙনের ছবি। 'শুধু কেরানী' গল্পে পাই মধ্যবিত্তসুলভ মানসিকতার করুণ ছবি। 'পুন্নাম' গল্পে রূপায়িত হয়েছে বিবেকহীনতা ও প্রতারণার বিষাদময় রূপ, ‘বিকৃত ক্ষুধার' ফাঁদে গল্পে পাই অসহায় বীভৎসতার চিত্র। 'তেলেনাপােতা আবিষ্কার' গল্পে পাওয়া যায় মধ্যবিত্ত মানসিকতার এক গল্পকথককে, যিনি এক অদ্ভুত কাপুরুষতা ও স্বার্থপরতার বশবর্তী হয়ে অতি সহজেই ভুলে যেতে পারেন একটি অসহায় মেয়েকে দেওয়া তার প্রতিশ্রুতির কথা। 'শৃঙ্খল' গল্পে রয়েছে মৃত দাম্পত্যজীবনের বাধ্যতামূলক ভারবহনের করুণ চিত্র। আশ্চর্য- সহজ এক অনাড়ম্বর ভাষায় প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁর গল্পে কঠোর বাস্তবকেই প্রধান অবলম্বন করলেও তাঁর রচনায় আমরা একটি আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সাক্ষাৎ পেয়ে যাই।
দুলকি চালে বলতে থাকা গল্পের ডিটেইলিং,কাহিনীর মোচড়ের ফাঁকে ফাঁকে লেখকের রসবোধের তীব্রতা একই গল্পে একসাথে হাসায়,কাঁদায়। শুধু ঘনাদার স্রষ্টা হিসেবে এখনকার পাঠকেরা তাকে সংকীর্ণ মূল্যায়ন করে দেখে ছোটগল্পের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের প্রতি করা নির্মম অবিচারই মনে হয়!
অন্ধকারে শেয়ালের চোখ দেখে যদি আপনি ভয় পান, যদি ভয়ে আপনার জ্বর এসে যায়, যদি ডাক্তার আপনার চিকিৎসার জন্য হাওয়া বদলকেই শেষ পন্থা হিসেবে বেছে নেয় তবে আপনি হয়তো পুন্নামের পথে যাবেন, যেতে যেতে দেখবেন আপনি সুস্থ হয়ে উঠছেন অনেক কুটিলতা নিয়ে আর স্বচ্ছ জলের মতো আপনার বন্ধু হয়ে পড়ছে অসুস্থ... ঠিক যেন মোগল পিতা-পুত্রের গল্পের মতো। এই গল্প আপনাকে হয়তো অস্বস্তিতে ফেলবে, হয়তো আপনি নিজেকে আবিষ্কার করবেন একটি অতি প্রাচীন ভাঙা জমিদার বাড়িতে, হয়তো ঐ বাড়ির উঠোনে হেসে বেড়ায় একজন রহস্যময়ী নারী, হয়তো ঐ বাড়ির অভিশাপ আপনাকে ঝড়ের রাতে ফেলে দিতে চাইবে গভীর জলে, হয়তো আপনার সৌভাগ্য বাঁচিয়ে রাখবে আপনাকে। তবে চিরদিনের ইতিহাস এভাবে বদলায় না, সংসার সীমান্তে বেদনার সাথে পুনর্মিলন হয় বারবার। তখন আপনি নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন মহানগরে। এভাবে হারাতে হারাতে বুঝে ফেলবেন, মানুষ আসলে কখনওই হারাতে পারে না... আপনি তাই হারিয়ে যাওয়া কোন পতিতাকে হয়তো বলবেন, প্রত্যাবর্তনের মাঝে কোন লজ্জা নেই, আছে স্বস্তি। কেউ আপনার কথা বিশ্বাস না করলে আপনি ঘনাদাকে উদাহরণ হিসেবে সবার সামনে আনবেন, আপনি বলবেন ঘনাদা বলেছিল রবিনসন ক্রুশো মেয়ে ছিলেন। মেয়ের কথা মনে পড়তেই আপনার হয়তো মনে পড়বে রসুইঘরের কথা। রসুইঘর মানেই পুরাতন স্টোভ। পুরাতন স্টোভ মানে বাস্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। এই সম্ভাবনার মধ্যে বসে আপনি স্টোভে পাম্প করতে থাকবেন এবং মনে মনে স্মরণ করবেন তেলেনাপোতা আবিষ্কারের স্মৃতি। এই পুরো যাত্রায় আপনাকে সঙ্গ দেখে অপূর্ব ভাষা, চমৎকার ডিটেলিং, দুর্দান্ত স্টোরি টেলিং এবং যাত্রা শেষে আপনার মনে হবে, আহা এমন গল্প পড়ার মতো আনন্দ আর কিছুতেই নাই!
পুরানো বইয়ের দোকান থেকে একগাদা বই কিনতে গিয়ে এমনেই এই বইটা কিনে ফেলেছিলাম। স্রেফ কৌতুহলবশত কেনা। কিন্তু পড়ার কোনো আগ্রহই পাই নি। লঞ্চে যাচ্ছিলাম। বরিশাল থেকে ঢাকা। ডেকে। ডেকের পরিবেশ এমনিতেই ঘোরজাগানিয়া। তার মাঝেই এটা পড়া শুরু করলাম এবং যেমনটা অনুভূত হলো তাকে বলে "বিহ্বল হয়ে যাওয়া"। গল্প তো এমনই হওয়া উচিত, না?
ঘনাদার লিজেন্ডের কারণে প্রেমেন্দ্র মিত্রের ছোট গল্প নিয়ে কথাই হয় না। অথচ মহানগর/ তেলানাপোতা আবিষ্কারের মতো গল্প না পড়ে আমরা ছোট গল্প নিয়ে কথা বলি কী করে? বইটা আমার সেলফের কাছেই থাকে।
গল্পগুলো আবার মনে করিয়ে দিল যে এই পৃথিবীতে মানুষের জন্ম আদৌ সুখী হবার জন্য হয় নি । পৃথিবীটা সুখী হবার জায়গা নয় । এমন এক অসুখী পৃথিবীর ছবি চোখের সামনে বার বার ভেসে উঠলেও প্রেমেন্দ্র মিত্রের গদ্যমেজাজ আর গল্প বলার ধরণে ম��গ্ধ হতে হয় । ভাবাবেগের প্রাবল্য নেই । নেই ভাবালুতার স্থান । গল্পে গল্পে উঠে এছে বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অস্তিত্বের সংকট । প্রেমেদ্র মিত্র তার নিজের শহর কলকাতার ভিতর দিয়ে শুধু কলকাতার নয় বরং সকল শহুরে মানুষের জীবনের ভগ্নদশার চেহারাই এঁকেছেন । মানুষের জীবনের ব্যাথা-বেদনা, অর্থনৈতিক কাঠামোর ছায়া গল্পগুলোর শরীর জুড়ে ছড়িয়ে আছে । গল্প গুলো ভীষণ বাস্তব । অন্ধকার- বাস্তব । নানা ��ম্পাঙ্কের হাহাকার ।
আবার মনে হয় এরা ঠিক বাস্তব নয়, কারো স্মৃতি নয়, স্বপ্নও নয় । কিছু গল্পে সুররিয়াল মেঘ জড়ো হয়েছে । তবে সব গুলো গল্পেই কোথাও যেন অ্যাবসার্ডিটির হালকা রেশ অনুভব করা যায় । মানবতাকে ঠিক কোন গল্পেই জিততে দেন নি । বাস্তবে ঠিক এমনটাই যে হয় । এমনটাই যে দেখে আসছি । তবে " সাগরসংগম" গল্পে হাহাকারের পর শেষ পর্যন্ত মানবতাই যেন জিতে গেছে বলে মনে হয় ।
বাস্তবতার এত রুপ দেখিয়েও প্রেমেন্দ্র মিত্র কিন্তু অদ্ভুতভাবে অতিবাস্তববাদীদের বিপরীত সুরকেও তুলে এনেছেন । বাস্তববাদীরা যাদের পলাতক বলে আখ্যা দেয় তাদেরই এক প্রতিনিধি "ময়ূরাক্ষী" গল্পের ল্যাংড়া সাহেব বা ডোমিনীরাজ বা পতঞ্জলি রায় তীব্র বাস্তববাদীদের অহংকার এবং আভিজাত্যকেই লক্ষ্য করে যেন বলেন, “জীবনের কদর্যতা কলঙ্ককেই এক মাত্র সত্য বলে মানতে যে নারাজ সেই আপনাদের কাছে "পলাতক" । জীবনের উলঙ্গ কুৎসিত বাস্তবতার মাঝেও সৌন্দর্যের স্বপ্ন দেখবার সাহস যার আছে সে শুধু অক্ষম কল্পনাবিলাসী ।” ... “মানুষ একদিন আশ্চর্য সব রূপকথা তৈরি করেছে । সে কি শুধুই মিথ্যার মৌতাতে বুঁদ হয়ে, যা বাস্তব তাকে ভুলিয়ে দেবার ও ভুলে থাকবার জন্যে? সে রূপকথার মধ্যে সেই দুঃসাহসী আশার বর্তিকা কি নেই, বিকৃত বর্তমানকে অবজ্ঞা ভরে বিদ্রূপ ক'রে ভবিষ্যতের সঙ্কেত যা বহন করে! জীবনকে তার সমস্ত কদর্যতা, গ্লানি আর অসম্পূর্ণতা নিয়ে সত্য করে জানবার দুর্ভাগ্য যাদের হয়নি, বাস্তবের ফাঁকা বুলির হুজুগে তারই সব চেয়ে বেশি মেতে ওঠে । জীবনকে সত্য ক'রে যে জেনেছে, সে সত্যের চেয়ে আরও বেশি কিছু দিয়ে তা প্রকাশ করে; - সেই বেশি কিছুই স্বপ্ন ।”
আমি বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করার জন্য আমাকে অনেক গল্প উপন্যাসই পড়াশোনা অর্থাৎ পরীক্ষার জন্য পড়তে হয়েছে। আর সত্যি বলতে কি যেগুলো আমার সিলেবাসের মধ্যে থাকে সেগুলো ভালো গল্প/উপন্যাস হলেও আমার ভালো লাগে না। কিন্তু প্রেমেন্দ্র মিত্রর এই বইটি আমার খুব খুব ভালো লেগেছে।
এই বইটিতে মোট ২১টি গল্প আছে।
১) শুধু কেরানি ২)পুন্নাম ৩)ভবিষ্যতের ভার ৪) হয়তো ৫)সাগরসংগম ৬)মৃত্তিকা ৭)অনাবশ্যক ৮)মহানগর ৯) জনৈক কাপুরুষের কাহিনী ১০) কুয়াশায় ১১)সংসার সীমান্তে ১২) পুনর্মিলন ১৩) ভস্মশেষ ১৪)শৃঙ্খল ১৫) স্টোভ ১৬) চিরদিনের ইতিহাস ১৭) তেলেনাপোতা আবিষ্কার ১৮) ময়ূরাক্ষী ১৯) লেভেল ক্রসিং ২০)মল্লিকা ২১) রবিনসন ক্রশো মেয়ে ছিলেন ।
এর মধ্যে আমার খুব ভালো লেগেছে - কুয়াশায়, স্টোভ, জনৈক কাপুরুষের কাহিনী, হয়তো, সংসার সীমান্তে। এছাড়াও শৃঙ্খল, লেভেল ক্রসিং, শুধু কেরানি, পুন্নাম এই গল্প গুলোও ভালো।
তবে এই গল্পগুলো কিন্তু অন্যান্য গল্পের মতো না, এর এক একটা বিশেষ শব্দের অভ্যন্তরীণ মানে আছে সেগুলো বুঝে পড়তে হবে। তাই একবারের জায়গায় দুবার করে পড়তে হতে পারে।
এই সংকলনের গল্পগুলোতে চরিত্রের গভীরতা নির্মাণ এবং মনস্তত্ত্বের সুবিস্তৃত বিশ্লেষণের যে দক্ষতা প্রেমেন্দ্র মিত্র দেখিয়েছেন তা আপনাকে গল্পগুলো শুধু পড়েই ক্ষান্ত হতে দেবে না,বাধ্য করবে গল্পগুলো নিয়ে ভাবতে।
খুব বেশি কিছু বলে ঔদ্ধত্য দেখাব না, শুধু বলব আমি প্রেমেন্দ্র মিত্রের ফ্যান হয়ে গেছি। আগেকার লেখকদের নাম শুনলেই যাদের মাথায় সাধু ভাষার মারপ্যাঁচ আর ভাবগাম্ভীর্যে ভরপুর লেখার কথা মাথায় আসে, তাদের একবার হলেও প্রেমেন্দ্র মিত্রের ছোটগল্পগুলি পড়া উচিত, ধারণা পাল্টে যাবে। জীবনবোধ সম্পর্কে প্রেমেন্দ্র মিত্রের অসামান্য জ্ঞান আর অভিজ্ঞতার স্পর্শে লেখা প্রতিটা গল্পই দারুণ। লেখক ব্যক্তিগতভাবে স্যাডিজম দ্বারা প্রভাবিত বলে আমার মনে হয়েছে, প্রতিটা গল্পের সমাপ্তিই দুঃখের, চরম বাস্তবতার প্রতিফল। আর ছোটগল্পের সংজ্ঞাজাত অসম্পূর্ণতা, অতৃপ্তিকে প্রেমেন্দ্র মিত্রই বোধহয় একমাত্র বুড়ো আঙ্গুল দেখাতে পেরেছেন, প্রতিটি গল্প কলেবরে ছোট হলেও কাহিনীর পরিণতির দিক থেকে দারুণভাবে পরিপূর্ণ। সমাজের প্রতিটা স্তরের মানুষকে তিনি যতটা সূক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছেন, তা আমার কাছে অবাক লেগেছে। বিশেষ করে বেশ্যাবৃত্তির সাথে জড়িত নারীদের জীবনাচরণ তার একাধিক গল্পে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, তা বাংলা সাহিত্যে অমূল্য। এককথায়, প্রেমেন্দ্রকে না পড়লে আপনার বাংলা সাহিত্যের একটি বিরাট অংশই অজানা থেকে যাবে।
মহানগর, সাগরসংগম, সংসার সীমান্তে, তেলেনাপোতা আবিষ্কার-- এই গল্পগুলো প্রেমেন্দ্র মিত্রের সবচেয়ে বিখ্যাত গল্প হলেও আমার কাছে ভস্মশেষ, শৃঙ্খল, স্টোভ--সংকলনের এই তিনটা গল্প একদম লা জওয়াব৷
কেবল গল্প না, কেবল সংলাপ না, কেবল স্বগতোক্তি না, কেবল দীর্ঘ বর্ণনা নয়, মেলোড্রামায় ভারাক্রান্ত নয়, শুধুই দার্শনিক জিজ্ঞাসায় জর্জরিত নয়; আবার এই সবকিছুই মিশ্র অনুপাতে মিলেমিশে গল্প অনুরাগী পাঠককে দেবে দারুণ এক আস্বাদ।
এইসব বই পড়লে, জানা যায়, বাংলা ছোটগল্প কোন উচ্চতায় পৌঁছেছিল। আর কি অসীম বলিষ্ঠ ছিল লেখকের লেখনী। এই বইয়ের বিখ্যাত গল্প মহানগর, সংসার সীমান্তে, তেলেনাপোতা আবিষ্কার প্রভৃতি। কিন্তু আমার সেরা মনে হয়, 'হয়তো ' গল্পটিকে। গল্পটির মনস্তাত্ত্বিক মোচড় অসাধারণ। আর 'রবিনসন ক্রুশো মেয়ে ছিলেন ' গল্পটি এই বইয়ের অন্যসব সিরিয়াস গল্পের ভিড়ে ব্যতিক্রম ঠিকই। তবে পড়তে বেশ ভালোই লাগে।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখনীতে আছে এক নিবিড় কাব্যময়তা, ব্যক্তিগত সুরে গল্প বলে যান, যেন খুব বড় কিছু বলার তাড়া নেই, দৈনন্দিন টুকটাক, মিঠেকড়া, তারপর নির্বিকার বৃহত্তরের মুখোমুখি ঠেলে হকচকিয়ে দিয়ে মৃদু হাসেন। এ সংকলনে কিছু গল্প ন���হাত গল্প, আর কিছু স্মৃতিতে বিদ্ধ হয়ে জ্বলজ্বল করে জ্বলে, তারা শিগগির নিভে যাবে সে লক্ষণধারী নয়, নাক্ষত্রিক শব্দটাই এদের জন্য যুতসই।
আমি বুঝিনা যে ব্যাক্তি তেলেনাপোতা আবিষ্কার লিখেছেন সে কেন ঘনাদার লেখক হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছেন। সাগর সঙ্গম, নিরুদ্দেশ, বিকৃত ক্ষুধার ফাঁদে,স্টোভ,পুন্নাম, কুয়াশায়, অনাবশ্যক এর মত ছোটগল্পের জনক যিনি তিনি নিঃসন্দেহে কালজয়ী হয়ে থাকবেন বাংলা সাহিত্যে।
বেদনা, বিষাদ, যুক্তি, চিন্তা ও সুখের মিশ্রণে ভীষণ উপভোগ্য গল্প সংগ্রহ... বুদ্ধদেব বসু প্রেমেন্দ্র মিত্রকে বলেছিলেন, 'A broken-hearted dreamer...' সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত স্বপ্নের সংঘর্ষকে যিনি গল্পে যুক্তি ও কাব্যিকতার মিশেলে উপস্থাপন করেতেন সুস্বাদুভাবে।