তখন অনেক রাত| আগের দিন ভোর থেকে শুরু হওয়া ঝিরঝিরে বৃষ্টিটার দাপট তখন বেড়েছে, আর ইলেকট্রিসিটিও “আমার খুউব ভয় করছে” বলে হাওয়া হয়েছে অনেকক্ষণ আগেই| তবে ইনভার্টার-এর জোরে আমি সব কিছুকে উড়িয়ে দিয়ে পড়া চালিয়ে যাচ্ছিলাম| বইটা শেষ হবার পর জল খেয়ে লাইট নিভিয়ে শুতে গেলাম, কিন্তু ঘুম আসতে চাইছিলো না| ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না, যে এই বইটিকে কোন গোত্র-ভুক্ত করা যায়|
বইটি আমার দুর্দান্ত লেগেছে, এবং আগামী অনেক দিন/বছর বইটি আর তার আশ্চর্য চরিত্রেরা যে আমার সঙ্গে থাকবে, সেটাও হলফ করে বলা যায়| কিন্তু বইটি ঠিক কীসের? এটি কি কল্পবিজ্ঞান? উপন্যাসটি শুরু হয়েছে যে ই-মেইল দিয়ে, তাতে তো তেমনটাই মনে হয়| কিন্তু পরে বোঝা যায় যে কল্পনা আর সম্ভাব্যতা নিয়ে অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্য ও তত্ব এই উপন্যাসে পেশ করা হলেও এটি কল্পবিজ্ঞান নয়| এটি কি সামাজিক উপন্যাস? সমাজের যে স্তরের কয়েকটি মানুষের চালচিত্র ধরা পড়েছে এই উপন্যাসে তারা, তাদের যাবতীয় নিরাপত্তা-হীনতা, অসহায়তা এবং ফাঁপানো প্রতিষ্ঠা নিয়েও ভীষণভাবে ‘ক্রিমি’-লেয়ারের, ফলে সমাজের অধিকাংশ মানুষের পক্ষে তাদের সঙ্গে নিজেদের মিলিয়ে দেখা অসম্ভব| এটি কি প্রেমের উপন্যাস? অট্টহাসি হাসতে গিয়েও হাসিটা গিলে ফেলতে হলো, কারণ শেষ বিচারে এটা বোধহয় প্রেমেরই উপন্যাস| নিজের হারিয়ে ফেলা সরলতার জন্যে প্রেম, নিজের বিবেকবোধ এবং ন্যায়-অন্যায় জ্ঞানের জন্যে প্রেম, ব্যবহৃত হতে-হতে শুয়োরের মাংসে পরিণত হওয়া আমাদের মেধা ও মননের জন্যে প্রেম: এই নিয়েই তো এই উপন্যাস| আবেগ, অনুতাপ, ভয়, লোভ, এইসব দুর্বলতায় মন্থর আমাদের জীবনেও যে থাকে অন্য সব পরিচিতিকে মুছে ফেলে স্রেফ নিজের মতো করে বাঁচতে চাওয়ার আকুলতা, শুধু নিজেকে ভালোবেসে মাঝেমাঝে বেহিসেবি হওয়ার প্রবল তাড়না, তারও তো উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটেছে এই উপন্যাসে| এইচ.জি. ওয়েলস-এর বিশ্ব-বন্দিত ও যুগান্তকারী “দ্য টাইম মেশিন” যদি হয়ে থাকে কল্পবিজ্ঞানের মোড়কে বিবর্তন আর মানব সভ্যতার শ্রেনি-বিভাজনের অনিবার্য পরিণতি নিয়ে লেখকের চিন্তার প্রতিফলন, তাহলে এই উপন্যাসও কল্পবিজ্ঞানের ছদ্মবেশে লালনের গানই গেয়েছে: “এমন মানব জনম আর কি হবে, মন যা করো ত্বরাই করো এই ভবে”|
হে পাঠক, দয়া করে বইটি পড়ুন| ঠকবেন না, এটা গ্যারান্টি দিচ্ছি|