১৯৭১ সালের ২০শে মে বৃহস্পতিবার (৫ই জৈষ্ঠ্য ১৩৭৮ বংগাব্দ) আর দশটা সাধারণ গ্রীষ্মের দিনের মতই সকাল। পার্থক্য শুধু তখন বাংলাদেশ একটি সশস্ত্র যুদ্ধের ভিতরে স্বাধীনতার অর্জনের দিকে যাচ্ছে। ঠিক এইদিনে ততকালীন বৃহত্তর বরিশাল, যশোহর, গোপালগঞ্জ, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা অঞ্চলের মুসলমান- হিন্দু ( অধিকাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী ) ভারত গমনের উদ্দেশ্যে চুকনগর ভায়া খুলনা হয়ে সীমান্ত পারের জন্য চুকনগর ( চুকনগর কলেজের সামনে বিলে) এর রুপসার শাখা নদী -ভদ্রা নদীতে নৌকায় করে আসে। তখনকার বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে খরস্রোতা ভদ্রা নদীতে এত পরিমাণ নৌকা এসেছিল যে নৌকার উপর হেঁটে নদী পার হওয়া যেত। দুপুরে ভারতে যাওয়ার জন্য নিরাপদ এই সবাই কিছু খেয়ে নেয়ার জন্য রান্না করছে, কেউ গোসল করছে, কেউ বাজারে গেছে শুকনা খাবার কিনতে, ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা খেলাধুলা করছে। ঠিক তখনি বেলা ১১ টার দিকে ঘটে যায় পৃথিবীর ইতিহাসে একক দিনে সবচেয়ে বড় গনহত্যা। দুই ট্রাক পাকিস্তানি আর্মি এসে সাব মেশিন গান দিয়ে দুই' ঘন্টার ভিতর হত্যা করে ১০,০০০ জন বেসামরিক নিরীহ বাংলাদেশী মানুষকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অউশউইৎস এ একক দিনের হত্যাকান্ডকেও যেটা হার মানায়, সেইটা চুকনগরের গণহত্যা। বিকাল নাগাদ দেখা যায় যেই নদী নৌকার উপর হেটে পার হওয়া যাচ্ছিল সেটা এখন ভেসে থাকা লাশের উপর হেঁটে পার হওয়া যাচ্ছে, বিল মাঠ শুধু লাশ। কারো মাথার ঘিলু বের হওয়া, কারো চোখ বের হয়ে এসেছে, কেউ কেউ তার বাবা মাকে স্ত্রী কে জড়িয়ে ধরা, কারো বেয়নেটের খোচায় বের হওয়া পাকস্থলী, সবচেয়ে হৃদয় বিদারক দুই'মাস বয়সের শিশু মৃত মায়ের বুকের দুধ পান করে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক মুনতাসির মামুন সম্পাদিত ' ১৯৭১ চুকনগরের গণহত্যা ' বই এই ঘটনার একটা জীবন্ত দলিল। অর্ধেক পড়ার পর মনে হয়েছিল আর পড়া সম্ভব না। অনেক কষ্টে ১৪০ পেজের এই বইটা শেষ করছি। চুকনগরের নাম শুনলে মনে আসে খুলনার চুই ঝালের গরু খাসির মাংস। কিন্তু এখানেই হয়ে গেছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নৃশংস ঘটনা, যেইটা অনেকেই জানিনা, লেখকের মতে এমনকি স্বাধীনতার ১৫ খন্ডের দলিলেও উল্লেখ নেই এই ঘটনার। অবশ্য এই গোত্রে আমিও ছিলাম, খুলনায় বাসা হবার সুবিধার্থে কাছেই চুকনগরের এই গণহত্যাটি জানা ছিল, কিন্তু কত বড় ঘটনা সেটা জানা ছিলনা। সত্য সাক্ষ্যপ্রমাণ হিসেবে আমার রেটিং ৫ তারকা।