মানুষ অমর নয়, সে জানে। তারপরও সে মরতে চায় না, অমর হতে চায়। হয়তো ভাবে - আমি অমৃতের সন্তান, অমর হব না কেন। তাই জীবন ও মৃত্যুর রহস্য সে খুঁজে ফেরে। আজকের আধুনিক যুগেই শুধু নয়, হাজার হাজার বছর পূর্বে সভ্যতার উষালগ্নেও।
গিলগামেশ-এর কাহিনী বিশ্বের প্রাচীনতম উপাখ্যান। এখন পর্যন্ত জানা প্রথম গল্প পৃথিবীর। এ গল্পেরও বিষয় মরণশীল মানবের অমরত্ব-সন্ধান।
হায়াৎ মামুদ সে-কাহিনী শুনিয়েছেন তাঁর অননুকরণীয় কথনশৈলীতে। বাংলা ভাষায় এ পর্যন্ত এমন গিলগামেশ-কাহিনী আর কেউ লেখেন নি। ছোটদের জন্য লেখা, অথচ বড়োদেরও উপভোগ্য একইভাবে।
হায়াৎ মামুদ (জন্ম : ৩ জুন ১৯৩৯) বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান লেখক। তিনি একজন আধুনিক কবি, প্রবন্ধকার , অনুবাদক ও অধ্যাপক । মৃত্যুচিন্তা রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য জটিলতা তার বিখ্যাত গ্রন্থ যা ১৯৬০-এর দশকে প্রকাশিত হয়ে সাড়া জাগিয়েছিল । তিনি শিশুদের জন্য অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন । তার অনূদিত মাক্সিম গোর্কি বিরচিত চড়ুইছানা সকলমহলে উচ্চ প্রশংসা লাভ করেছে ।
ড. হায়াৎ মামুদের জন্ম ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ২ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলায় । তার ছেলেবেলা কেটেছে পশ্চিমবঙ্গে-ই । ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর তারা পশ্চিবঙ্গেই থেকে গিয়েছিলেন । কিন্তু ১৯৫০-এর হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি পিতার সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন । কর্মজীবনের শুরুতে কিছুদিন চাকুরি করেন বাংলা একাডেমিতে । ১৯৭৮ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত দীর্ঘকাল তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্বদ্যিালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন ।
হাসান আজিজুল হক কে নিয়ে রচিত তার জীবনীগ্রন্থ উন্মোচিত হাসান একটি প্রামাণিক গ্রন্থ । তিনি রুশ ভাষা থেকে বহু গল্প বাংলায় অনুবাদ করেছেন । শিশু-বিশোরদের জন্য জীবনীগ্রন্থ রচনা ছিল তার প্রিয় বিষয় ।
রাজা "গিলগামেশ", যিনি তিন ভাগের দুই ভাগ দেবতা, একভাগ মানুষ এবং "ইনকিদো" যাকে এক দেবী সৃষ্টি করে গিলগামেশের compitator হিসেবে.... এই দুজনকে নিয়ে কাহিনী....
এখানে ছিল বন্ধুতের গল্প, দেবীদের বিরুদ্ধে লড়াই, এক পিশাচের বিরুদ্ধে লড়াই, এবং গিলগামেশের পৃথিবীর শেষ প্রান্তে ভ্রমণ অমরত্বের খুজে
বেশ ভাল একটা বই পড়লাম!! ❤ আর, হায়াৎ সাহেবের লেখা বেশ ভাল ছিল
অতি সম্প্রতি গিলগামেশের আরেকটা বই বেরিয়েছে। আলমগীর তৈমুর লিখেছেন। তবে আমি হায়াৎ মামুদেরটাকেই এগিয়ে রাখবো। ধ্রুব এষের চমৎকার অলংকরণ বইটার উপরি পাওনা। একটাই অভিযোগঃ কিশোরদের উপযোগী করতে গিয়ে কিছু জিনিসে কাঁচি চালিয়েছেন হায়াৎ মামুদ। মানে, সেন্সর করেছেন। এই ব্যাপারটা পছন্দ হয় নাই।
পড়ে শেষ করলাম হায়াৎ মাহমুদ এর ‘গিল্গামেশ্’। এপিক অফ গিল্গামেশ্ বা গিল্গামেশ্ মহাকাব্য পৃথিবীর এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত প্রাচীনতম সাহিত্যকর্ম। এই মহাকাব্য চার হাজার বছরের ও পুরনো অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ২১০০ শতকের রাজা গিলগামেশের কাহিনী।
গিল্গামেশ্ ছিলেন মেসোপটেমিয়ার দক্ষিন অঞ্চলের উরুক শহরের রাজা। বিখ্যাত টাইগ্রিস ও ইউফ্রেতিস নদীর মাঝে এই উরুক শহর। তিনি অবশ্য সম্পূর্ণ মানুষ ছিলেন না। ডেমিগড অর্থাৎ মানুষ ও দেবতার সংমিশ্রণ ছিল তার শরীরে। পিতা লুগালাবান্দা ছিলেন উরুক শহরের ধর্মযাজক আর মাতা স্বর্গের দেবী নিনসাল। তাই গিলগামেশের শরীরের দুই তৃতীয়াংশ দেবতার এক তৃতীয়াংশ মানবের। অর্থাৎ মানুষের মতো রোগ শোক সবই তার আছে আবার অমরত্বও আছে। এই উপাখ্যান গিল্গামেশ্ ও তার বন্ধু এনকিদুর অসাধারন বন্ধুত্তের। এনকিদুর ছোট বেলা কেটেছে গহীন জঙ্গলে পশুপাখিদের সাথে খেলাধুলা করে অনেকটা টারজান বা মোগলির মতো। ছোট বেলায় এনকিদু জানতোই না সে মানুষ।
এনকিদুকে বানানো হয় যখন রাজা গিল্গামেশ্ তার খামখেয়ালিপানা দিয়ে রাজ্যের মানুষকে অতিস্ট করে তুলেছিল তখন। ডেমিগড হওয়ায় রাজা গিল্গামেশ্ শৌর্যে বীর্যে ছিল অতুলনীয়। তাই তার অহমিকা ও ছিল বেশ। অত্যাচারী না হলেও তিনি ছিলেন খামখেয়ালী। তার এই খামখেয়ালীপনায় বিরক্ত হয়ে একসময় তার প্রজাগন দেবরাজ আনুর কাছে নালিশ করে। তখন দেবরাজ সিদ্ধানত নেন রাজা গিল্গামেশ্ এর মতো শৌর্য বীর্যবান আরেকজন কে পৃথিবীতে পাঠানোর, যাতে রাজা গিল্গামেশ্ এর অহমিকা কিছুটা কমে। তাই দেবরাজ আনু দেবী আরুরু কে নির্দেশ দেন কাদামাটি দিয়ে রাজা গিল্গামেশ্ এর প্রতিদন্ধি তৈরি করতে। এই আরুরুই কাদা মাটি দিয়ে মানুষ তৈরি করেছিল। দেবী আরুরু দেবরাজ আনুর নির্দেশে রাজা গিল্গামেশ্ এর প্রতিদন্ধি তৈরি করলেন যার নাম এনকিদু। রাজা গিল্গামেশ্ ও এনকিদু এক দারুন মল্ল যুদ্ধের মাধ্যমে বন্ধুতে পরিনত হন। কেউ কারো চাইতে কম যায় না, মল্ল যুদ্ধ শুরু হল রাতে, রাত গড়িয়ে সকাল, সকাল গড়িয়ে বিকেল হল। অবশেষে যুদ্ধ থামলো। রাজা গিল্গামেশ্ বন্ধু বানিয়ে ফেললেন এনকিদুকে। সে এক অসীম বন্ধুত্ত, যেন একে ওপরের ছায়া।
কিন্তু এই বন্ধুত্তে একসময় ঘনিয়ে আসে কালো ছায়া। দুই বন্ধুর অসীম সাহস দেবতাদের অসন্তুষ্ট করে তোলে। মৃত্যুর কালো ছায়া নেমে আসে এনকিদুর উপর। কিন্তু প্রিয় বন্ধুর মৃত্যু কি মেনে নেয়া যায়? এনকিদুকে মৃত্যুর ওপার থেকে ফিরিয়ে আনতে রাজা গিল্গামেশ্ ছুটে চলেন পৃথিবীর অপর প্রান্তে, উৎনা পিশতিম এর খোজে, যে একমাত্র মানব যে অমরত্ব লাভ করেছে। এ যাত্রা মোটেই সাধারন ছিল না। সব বাধা বিপত্তি পেড়িয়ে রাজা গিল্গামেশ্ কি আদৌ পৌছাতে পেড়েছিলেন উৎনা পিশতিম এর কাছে? জানতে পেড়েছিলেন অমরত্ব লাভের রহস্য? জানতে হলে পড়ুন হায়াৎ মাহমুদ এর লেখা ‘গিল্গামেশ্’।
যদিও বইটি লেখক লিখেছেন ছোটদের জন্য। কিন্তু আপনার বয়স যতই হোক, উপভোগ করবেন বলে আমি মনে করি। ও হ্যা আরেকটা কথা, এখানে সেই নুহ নবীর জলোচ্ছ্বাসের মতো একি রকমের কাহিনী পাবেন যেখানে নুহ নবীর জায়গায় আপনি দেখতে পাবেন উৎনা পিশতিম কে।
"একা, সবাই একা, বুঝলে গিলগামেশ। যিনি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তৈরি করেছেন তিনিও বড়ো নিঃসঙ্গ, তাঁর কোন দোসর নেই। অমরতা মানে নিঃসঙ্গতা।"
অসাধারণ এক বন্ধুত্বের গল্প গিলগামেশ। বন্ধুর জন্য কতদূর যাওয়া যায় তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই গল্পটা। পৃথিবীর প্রথম গল্প এইটা। দারুণভাবে উত্থাপন করেছেন হায়াৎ মামুদ।
পৃথিবীর প্রথম গল্প বা পৌরাণিক আখ্যান বলা হয় "গিলগামেশ " কে। খ্রিস্টপূর্ব ৭২০০ অব্দের দিকের কাহিনি হিসেবে ধরা হয় একে, যাহার মূখ্য বিষয় হচ্ছে " মরণশীল মানবের অমরত্বের সন্ধান ", যেটাকে আমরা আধুনিক ভাষায় বলি এলিক্সির অফ লাইফ।
গল্পের প্রধান চরিত্র হচ্ছে গিলগামেশ, যিনি অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক দেবতা। আর দেবতা হওয়ার সুবাদে, " অমরত্ব নামক ব্যাপারটা মাগনা "। যদিও দেব থেকে দেবতার উদ্ভব, যেখানে দেব মানে হচ্ছে " যিনি সাহায্যকারী "। গিলগামেশ ছিলেন দোর্দণ্ড প্রতাপ একজন রাজা, যাহার ছিলো না কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী। সুতরাং একচ্ছত্র আধিপত্য পেলে মানুষ যে ধরণের কাজ করে গিলগামেশ সেগুলাই করা শুরু করলো, যেটা রাজ্যের প্রজাদের উষ্মার কারণ। উদাহরণস্বরূপ গিলগামেশের রাজ্যে কোনো প্রজার বিবাহ হলে, তাকে সর্বপ্রথম রাজার সেবায় আত্মনিয়োগ করতে হতো। রাজা তুষ্টির পর স্বামীর তুষ্টি। এইসব ব্যাপার থেকে দেবতারা সৃষ্টি করলো গিলগামেশের প্রতিদ্বন্দ্বী " এনকিদু " কে। এভাবেই ধীরে ধীরে কাহিনির ধারাবাহিকতায় এনকিদু আর গিলগামেশের পরম ভ্রাতিত্ব সমগ্র কিছুকে ছাড়িয়ে, এক নতুন উপবেশনে উপনিত হইলো।
এই সুন্দর পৃথিবীতে সবাই যেমন চিরদিন বেঁচে থাকতে চায় তেমনি সবাই চায় তাঁর প্রিয় মানুষ গুলোও বেঁচে থাকুক চিরদিন কেননা আশেপাশের প্রিয় মানুষ গুলো ব্যাতিত বেঁচে থাকার কোন অর্থই হয় না। তেমনি সুন্দর এই পৃথিবীতে গিলগামেশও তাঁর বন্ধু এনকিদুকে হারিয়ে বেঁচে থাকার অর্থও হারিয়ে ফেলেছিল। গিলগামেশ কে?? গিলগামেশ ছিলেন হাজার হাজার বছর আগে টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা মেসোপটেমিয়া সভ্যতার মেসোপটেমিয়া'র উরুক শহরের রাজা। উনার পিতা একজন মানুষ এবং মাতা একজন দেবি হওয়ায় উনার শরীরের কিছু অংশ ছিল দেবতা এবং কিছু অংশ ছিল মানুষ। একারণে তিনি ছিলেন অমর এবং অসীম শক্তির অধিকারী। রাজা হিসেবে খুবই ভাল ছিলেন তিনি কিন্তু উনার সবচেয়ে বড় দোষ ছিল খামখেয়ালীপনা। উনার এই খামখেয়ালীপনার কারণে প্রজাদের অনেক কষ্ট সহ্য করতে হত। এই কষ্ট থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রজারা দেবতাদের শরণাপন্নয় হলে তাদের সাহায্যের জন্য দেবতারা গিলগামেশ এর সমান শক্তিধর একজন লোক প্রেরণ করেন, যার নাম এনকিদু। এই এনকিদুর সাথে প্রথম দেখায় তুমুল যুদ্ধ হলেও একসময় তারা একে অন্যের প্রাণ প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠেন। তারা যা করতেন একসাথে করতেন। ঘটনাক্রমে একসময় এনকিদুর মৃত্যু হয়। প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুকে মেনে নিতে না পেরে রাজা গিলগামেশ বেরিয়ে পড়েন অমৃতের খুঁজে। পাড়ি দেন পৃথিবীর এক কোণা থেকে আরেক কোণা। এই অমৃত না পেলে তাঁর প্রিয় বন্ধু ফিরে পাবে না তাঁর জীবন। গিলগামেশকে তাঁর সারা জীবন কাটাতে হবে একা একা। রাজা গিলগামেশ কি পারবে অমৃত এনে তাঁর বন্ধুকে বাঁচাতে??
গিলগামেশ হল অ্যাসিরীয়-ব্যাবিলনীয় পুরান। এ পর্যন্ত জানা এটি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীনতম উপাখ্যান এবং পৃথিবীর প্রথম গল্প। এই উপাখ্যানের নায়ক গিলগামেশ হল একটি ঐতিহাসিক চরিত্র। কথিত আছে তিনি ঐ অঞ্চলে প্রায় ১২৬ বছর রাজত্ব করেছিলেন। তিনি ঐ অঞ্চলে এতোটাই জনপ্রিয় এবং বিখ্যাত ছিলেন যে, উনাকে নিয়ে প্রচুর গল্প, উপকথা জন্মলাভ করেছিল। এই গল্প এবং উপকথা গুলোকে এটেল মাটি দিয়ে তৈরী তক্তিতে লিপিবদ্ধ করে ঐ সময়ের অ্যাসিরীয় অঞ্চলের এক বিশাল পাঠাগারে সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরবর্তিতে উনবিংশ শতকের পঞ্চাশ দশকের দিকে প্রত্নতত্ত্ববিদরা এই পাঠাগারটিকে আবিষ্কার করেন এবং সেখানেই খুঁজে পান গিলগামেশ এর উপখ্যান। উপাখ্যানটি পদ্যে লেখা ছিল বলে এর নাম রাখা হয়েছিল "Epic of Gilgamesh" অথবা " গিলগামেশ মহাকাব্য"। পরবর্তীতে একে বিভিন্ন ভাষায় অনুদৃত করা হয়। বাংলা একাডেমীর পক্ষ থেকেও গিলগামেশ এর এই উপাখ্যান বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। কিন্তু সুলেখক হায়াৎ মামুদ সর্বপ্রথম ১৯৮৫ সালে ছোটদের জন্য গিলগামেশ উপাখ্যানটি নিয়ে ছোট একটি বই লিখেন। ছোট কিন্তু অসাধারণ এই বইটিতে হায়াৎ মামুদ তাঁর অসাধারণ লেখনশৈলীর মাধ্যমে উপাখ্যানটি ফুটিয়ে তুলেছেন সুচারো ভাবে। ছোটদের জন্য লেখা কিন্ত বড়দের জন্যও সুখ পাঠ্য এই বইটি। হাতে দুই ঘন্টা সময় পেলেই পড়ে নিতে পারেন বইটি।
ছিল সে এক রাজা— নাম যে ‘গিলগামেশ’, বন্ধু ‘এন্ কিদু’ সাজা পেল শেষমেশ। গিলগামেশ—এন্ কিদু প্ৰাণের বন্ধু বটে, কাব্যকথায় মৃদু। সে—কাহিনীই রটে
সে অনেক বছর আগের কথা। একশো-দুশো নয় , চার হাজার বছর আগের। বর্তমান সময়ের ইরাক তখন পরিচিত ছিল মেসোপোটেমিয়া নামে ৷ দক্ষিণ মেসোপোটেমিয়ায় এক শহর ছিল উরুক নামের। খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক সপ্তবিংশ শতাব্দীতে এই সুমেরু অঞ্চলের উরুক শহরের (বর্তমানে এর নাম ওয়াকা) রাজা ছিলেন এক কিংবদন্তিতুল্য পুরুষ। যাকে পিতা বা পুরুষশ্রেষ্ঠ বলে অভিহিত করা হয়েছে। কারণ তিনি ছিলেন স্বর্গ্যের অমর এক দেবী এবং মর্ত্যের মরণশীল মানুষের ঔরসজাত। ডেমিগড যাকে বলে। তার নাম ছিল গিলগামেশ। এই গিলগামেশকে নিয়েই এই গল্প।
আসলে গল্প না ঠিক। তখনকার যুগে তো আর এখনকার মত কাগজে ঝকঝকে ছাপার অক্ষরে গদ্যাকারে গল্প লিখা হতো না। তখনকার লিখার পদ্ধতি ছিল আরো চমৎকার । এঁটেল মাটির তৈরি তক্তিতে ছুঁচালো কাঠি দিয়ে দাগ কেটে কেটে কবিরা কবিতার পঙক্তিতে মানুষের কথা,ইতিহাসের কথা,ধর্মের কথা বলতেন। । এই লিপির নাম বাণমুখ বা কীলক লিপি, ইংরেজিতে বলে কিউনিফর্ম। সর্বমোট ১২টি তক্তির উপরে বাণমুখ লিপিতে লিপিবদ্ধ হয়েছিল গিলগামেশকে নিয়ে পৃথিবীর প্রাচীনতম মহাকাব্য।
সেই মহাকাব্যে কী লেখা ছিল? ছিল রাজা গিলগামেশের উড়নচণ্ডী আর খেয়ালি আচরণে বিরক্ত হয়ে তাকে শায়েস্তা করতে দেবতাদের কূটবুদ্ধির কথা। এনকিদু নামের প্রাণের বন্ধুকে পেয়েও তাকে হারিয়ে ফেরার কথা। আর তাকে খুঁজে পেতে পৃথিবীর একেবারে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত গিলগামেশের যাত্রার কথা। অনেকটা বেহুলা- লখিন্দর এর মত। আবার এই গল্পে রয়েছে মহাপ্লাবনে কতিপয় মানুষ এবং পশু-পাখি ব্যতীত সমগ্র সৃষ্টির ধ্বংসের কথা। বাইবেলের নোয়া কিংবা কোরানের নূহ নবীর মত। এত মিলের কারণ এ গল্প যে পৃথিবীর প্রাচীনতম অনুভূতির গল্প। ভালোবাসার গল্প, বন্ধুত্বের গল্প। আবার বন্ধুর বিরহ মানতে না পেরে পুরো পৃথিবী পাড়ি দিয়ে অমরত্বের সন্ধানে যাওয়ার গল্প। যে গল্পের শেষ বড়ই বেদনাদায়ক।
হায়াৎ মামুদের গিলগামেশ ছোটদের জন্য লেখা। কিন্তু এমনভাবে লেখা যে বড়োরাও সমানভাবে উপভোগ করতে পারবেন। সাইজে ছোট এবং সাবলীল লিখনশৈলীর কারণে এক বসাতেই শেষ করে ফেলবার মত বই। তো আর দেরী কীসের? গিলগামেশের সাথে পরিচিত হতে সবাইকে স্বাগতম।
বইটা শেষ করার পরমুহূর্তেই কেন যেন মনে হলো লেখক কাটাছেঁড়া করে খানিকটা বাদ দিয়েছেন, এত অল্প পরিসর হবার কথা নয়। জাহিদ হোসেনের রিভিউ পড়ে মোটামুটি সেটারই ইঙ্গিত পেলাম। আরেকটু ঘাটতে হবে গিলগামেশ নিয়ে। সাড়ে চার হাজার বছর আগেও এত অর্থবহ গল্প বুনন সম্ভব তা গিলগামেশ মহাকাব্য না পড়লে বোঝা দায় হতো। সময় পেরিয়ে যায়, তবুও মানবমনের অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা, অপ্রাপ্তির দগদগে ক্ষত সহস্র বছর ধরে জীবিত থাকে। সাড়ে চার হাজার বছর আগের মানুষটাও ঠিক আমাদের মতোই নিঃস্ব বৈকি! কাহিনীটা সম্পূর্ণ কাল্পনিক, তবে নিঃসন্দেহে কোনো বন্ধু বিয়োগের বিরহ পর্যবেক্ষণ করেই কেউ অমোঘ সত্যটা লিখেছিল পঙক্তির আকারে। এই পার্থিব মায়া চিরস্থায়ী নয়, সকলকে একদিন ফিরে যেতে হবে এই সুজলা পৃথিবী ছেড়ে।
✰"একা, সবাই একা, বুঝলে গিলগামেশ্। যিনি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তৈরি করেছেন তিনিও বড়ো নিঃসঙ্গ,তাঁর কোনো দোসর নেই।অমরতা মানে তো নিঃসঙ্গতা, গিলগামেশ্। সে একাকিত্ব যে কী ভয়ানক, তুমি বুঝবে না।"
✰আমার ভাবনাঃ
১/ গল্প উপন্যাসের ম্যাসেজ একটা থাকবেই। পৃথিবীর প্রাচীনতম লিখিত পদ্যে 'মানুষ মরণশীল' ম্যাসেজটা ছিল, তখনকার মানুষ আর এখনের মানুষ যে একে অপরের প্রতিবিম্ব তার একটা বিশদ উদাহরণ গিলগামেশ।
২/ উৎনা পিশতিমের সময়ের মহাপ্লাবন আর নৌকা তৈরির ঘটনা নূহ আ: এর মহাপ্লাবনকে ইঙ্গিত করে। যদিও দেবতাদের বিষয়টা আলাদা।
৩/এক বসায় পড়ে ফেলে���ি। ছোটখাটো উপন্যাস। সহজ-সরল। কম সময়ে মেসোপটেমিয়ার পূরাণ জানতে উপকারি একটা বই
হায়াৎ মামুদের সরল গদ্যের ছাঁচে অনবদ্য হয়ে উঠেছিল "গিলগামেশ"।
চার হাজার বছরের আগেকার ব্যাবিলনীয় ইতিহাসের এক উজ্জ্বলতম নিদর্শন অজ্ঞাতনামা সৃষ্টিশীল মানুষদের এ সৃষ্টিকর্ম।
উরুর রাজা আধো দেব, আধো মানব খামখেয়ালি গিলগামেশ আর তার পরমমিত্র এনকিদুরকে নিয়েই এ প্রাচীনতম মহাকাব্য। যার সংক্ষিপ্ততম সহজিয়া গদ্যরূপ দান করেছেন হায়াৎ মামুদ।
কী নেই এতে?
পরাক্রমশালী রাজা আছেন,ঐশ্বর্যময় রাজত্ব আছে, রমণীর ভূমিকা গুরুত্ববহ।
দৈত্য-দানোরা বাদ পড়েনি, দেব-দেবতাগণের উপস্থিতি না থাকলে তো ঘটনা জমবেই না। যুদ্ধ আছে,মৃত্যু আছে। আছে আশা ভঙ্গের তীব্র কষ্ট যা বাস্তবতাকে রূপকার্থে চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয়।
অতীতকে আকড়ে ধরে রাখা রাজা গিলগামেশ পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম নীতিকে মানতে বাধ্য হন,, বন্ধুত্ব শেখান পশুমানব এনকিদু আর পাঠক পান চমৎকার সুস্বাদু গদ্যের আকারে পৃথিবীর প্রাচীনতম মহাকাব্য পড়ার সুযোগ।
গিলগামেশের কাহিনীর বুনন চারহাজার বছর নয়, এই অসাধারণ কাহিনী বুননকে সময়ের ফ্রেমে বাঁধা অসম্ভব। এ যে কাহিনীর অমরত্ব লতার মতোই চিরনবীনা!
১.মানুষ মরণশীল। মানুষ হয়ে জন্ম যেহেতু একসময়ে সব ছেড়ে প্রত্যেকেরই চলে যেতে হবে সে যেই হোক। মহা শক্তিশালী বীর এনকিদুও এর উর্ধ্বে না। সকলকেই মৃত্যুর সামনে হার মানতে হবে। তবে অমর আমাদের ভালোবাসা, ভালোবাসা যা থেকে যায় আমাদের একে অন্যের জন্যে। এনকিদুর মৃত্যুর পর এনকিদু চলে গেলেও থেকে যায় তার প্রতি গিলগামেশের ভালোবাসা, যে ভালোবাসা থেকে গিলগামেশ এনকিদুর জন্য অমরত্বের খোঁজে পৃথিবী পারি দেয়, করে অসাধ্য সাধন। ভালোবাসার দ্বারাই যেন সম্ভব অসাধ্যসাধন। ভালোবাসা নিজেই যেন অসাধ্য। এক মানুষ নিজেকে ব্যতীত অন্য আরেকজন মানুষের জন্য ভাবা, তার ব্যথায় ব্যথিত হওয়া, তার খুশিতে খুশি হওয়া; এ যেন স্বার্থপর জীব মানুষের চরিত্রের বিপরীত তবুও ভালোবাসা সব জায়গায় বর্তমান।
২. অমরত্ব দেবতাদের বৈশিষ্ট্য, সাধারণ মানব জাতির জন্য তা নয়। মৃত্যু আমাদের বৈশিষ্ট্য। মৃত্যু আমাদের জন্য পুরস্কার স্বরূপ। মৃত্যুই আমাদের জীবনের মূল্য দেয়, যেমনটা অন্ধকার আলোর মূল্য বুঝায়। আমরা মারা যাবো বলেই আমরা আমাদের জীবন আরো উপভোগ করি, এর সমাদর করি।
আর অমরত্ব আমাদের জন্য অভিশাপ স্বরূপ। অমরত্ব আসে একাকীত্ব নিয়ে। "উৎনা পিশতিম" অমরত্ব প্রাপ্ত হওয়ার পরও যেন সন্তুষ্ট না। সেহ বার বার একাকিত্বের কথা বলে। দেবতাদের থেকে অমরত্ব পুরস্কার পেলেও তা তার জন্য এখন অভিশাপ স্বরূপ।
৩. মৃত্যু মানব জাতির জন্য সব থেকে সাধারণ বিষয়। তবুও প্রিয়জন হারানোর বেদনা যে অসহ্য যন্ত্রণাদায়ক, তাই আমরা কাঁদি। কাঁদি কারণ আমরা সেই প্রিয়জন ছাড়া নিজের জন্য কষ্ট পাই। প্রিয়জন ছাড়া নিজের জীবন কল্পনা করাও যেন অভিশাপ আর যখন সেই অভিশাপ ফলে যায় তখন পথ যেন অন্ধকার। আমরা কাঁদি সেই প্রিয় হাত আবার ধরতে, যে হাত সাথে নিয়ে গিয়েছে সব আলো। তবুও মৃত্যু সাধারণ। জীবন কিছুর জন্যই থেমে থাকে না। আমরা আমাদের মৃত প্রিয়জনদের নিজেদের মধ্যে ধারণ করে বেঁচে থাকি, আর তারা এভাবে বেঁচে থাকে আমাদের মাঝে। মৃত্যুকে স্বীকার করে মৃত প্রিয়জনকে নিজের মধ্যে ধারণ করে তাকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই হয়তো এই বেদনা থেকে মুক্তি রয়েছে। আর নয়তো আমরা সকলেই হয়তো প্রিয়জনের অমরত্বের খোঁজে গিলগামেশের মত অসাধ্যসাধনে বেরিয়ে পড়বানি।
পৃথিবীর আদিমতম মহাকাব্য এই গিলগামেশ উপাখ্যান। গ্রিসের ইলিয়াড-ওডিসি কিংবা ভারতবর্ষের রামায়ণ-মহাভারত থেকেও অনেক বেশি প্রাচীন এই গিলগামেশ। লোকের মুখে মুখে বহু পুরুষ ধরে বংশপরম্পরায় গিলগামেশকে নিয়ে অজস্র কাহিনী প্রচলিত হয়েছে, তারপর খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দের কাছাকাছি কোন একসময় তা সর্বপ্রথম লিপিবদ্ধ করা হয়। অদ্ভুত এই গল্পঃ দুই অভিন্নহৃদয় বন্ধুর কাহিনীকে ঘিরে দানা বেঁধে উঠেছে, যা শেষ হয়েছে মানুষের পরম আরাধ্য অমরত্ব খোঁজতে গিয়ে। এতে আছে বিধ্বংসকারী মহাপ্লাবনের কাহিনী। দেব-দেবী, দত্যি-দানো, স্বর্গ-মর্ত-নরক, আর তার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সাধারণ আশা-আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ ও বেদনা, আনন্দ ও হাহাকার- সবই মিলেমিশে একাকার হয়েছে এর মধ্যে। এক দুঃসাহসী ও অক্লান্ত যাত্রার শেষে মহান ও নিষ্ঠুর এক সত্যের মুখোমুখি এসে দাঁড়ান গিলগামেশ। অবশেষে তিনি বুঝতে পারেন – এই তো স্বাভাবিক। শোক সত্য, দুঃখ সত্য, মৃত্যু সত্য এবং সত্য ভুলে যাওয়া, সব মানুষই হারিয়ে যায়, সবাইকেই ভুলে যায় মানুষ। তার এই বোধ হয় যে, অমরত্ব মানেই নিঃসঙ্গতা, মৃত্যুই যৌক্তিক পন্থা। গিলগামেশের কথা শুনে আমরা হয়তো ভাবি, গিলগামেশ কী বোকা, অমরত্ব লাভ করা কি সম্ভব? কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়, আসলে আমরা সবাই তো ওরই দলে। আমাদের এনকিদুকে মৃত্যুর হাত থেকে ছিনিয়ে আনার জন্য আমরাও কীই না করতে পারি! অথচ কিছুই করা যায় না, সবই ব্যর্থ হয়! প্রিয়জনের স্মৃতি ও তার জন্য বুকভরা হাহাকার ছাড়া কিছুই থাকে না।
তবে একটা কথা অবশ্য বলা যায়ঃ সব মানুষ কিন্তু মৃত্যুর সাথে শেষ হয়ে যান না। শিল্পীরা বেঁচে থাকেন, কবিরা বেঁচে থাকেন, বিজ্ঞানীরা বেঁচে থাকেন। তারা চলে যান, কিন্তু তাদের কর্মের মাধ্যমে বেঁচে থাকেন মানুষের চিন্তায়, মানুষের স্বপ্নে।
ক্ষণজন্মা মানুষ অমর নয় জেনেও অমর হতে চায়।যুগে যুগেও তারা অমরত্বের সন্ধান করে গেছে।সভ্যতার সূচনালগ্নেও মানুষ তাই করেছে যা বর্ণিত হয়েছে সভ্যতার ১ম মহাকাব্য 'গিলগামেশে'।
বই - গিলগামেশ। লেখক - হায়াৎ মামুদ।
প্রাচীন মহাকাব্য রামায়ণ, মহাভারতের চেয়েও পুরাতন মহাকাব্য 'গিলগামেশ'।গিলগামেশ লিখিত হয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব ৬৬৯-৬২৮ অব্দে।এর ভাষা আক্কাদীয়,লিপি কিউনিফর্ম।এটি পাওয়া গেছে প্রাচীন আসিরিয়ার রাজধানী নিনেভেহ শহরের আসিরীয় রাজা আসুরবনিপালের বিরাট পাঠাগারে।সমগ্র মহাকাব্য যেহেতু গিলগামেশকে নিয়ে লেখা তাই গ্রন্থটির নাম গিলগামেশ করা হয়েছে। ------------------------------------------------------------- মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণ অঞ্চলের শহর উরুক।উরুকের রাজা গিলগামেশ।তার পিতা লুগালবান্দা ও মাতা দেবী নিনসান।ফলে গিলগামেশ তৃতীয়াংশ দেবতা এবং এক তৃতীয়াংশ মানুষ।তাই সে ছিল অমর।দিন দিন শক্তিতে সে অহংকারী হয়ে উঠছিল।তার এই অহংকার নিরসন করতে দেবরাজ আনু সৃষ্টি করলেন এনকিদুকে।পশুপাখির বন্ধু এনকিদু ও গিলগামেশ যখন সামনাসামনি হলো তখনি তারা বন্ধু হয়ে গেল।এই দুই মহাপরাক্রমশালী বীর একে একে নিধন করলো স্বর্গবৃষ ও হুম্বাবাকে।কিন্তু মানুষ এনকিদু যুদ্ধে মারা গেল।বন্ধুকে বাঁচাতে গিলগামেশ পৃথিবী ভ্রমণে বের হল। পাড়ি দিল মৃত্যুশায়র, নিয়ে এল জীবনলতা।কিন্তু বন্ধুর কাছে জীবনলতা নিয়ে পৌঁছানোর আগেই এক সাপ তা খেয়ে নিল।অমরত্বের নাগাল থেকে ছিটকে গেল এনকিদু কিন্তু মহাকাব্যে বেঁচে রইলো সে।
"ছিলো এক রাজা নাম যে গিলগামেশ বন্ধু এনকিদু সাজা পেল শেষমেশ"
গিলগামেশ উপখ্যানটি পৃথিবীর আদিতম মহাকাব্য, যা ইলিয়াড, অডিসি এবং কি ভারতীয় উপমহাদেশের রামায়ণ ও মহাভারত এর চেয়েও বেশি প্রাচীন, পৃথিবীর প্রথম পুরান যাকে পশ্চিমী পন্ডিতেরা 'এপিক অব গিলগামেশ' বলে অভিহিত করেন।
গিলগামেশ মহাকাব্যটি মেসোপোটেমিয়া অঞ্চলের যার নায়ক 'গিলগামেশ' একজন ঐতিহাসিক চরিত্র। অর্ধদেব আর অর্ধমানব গিলগামেশ ছিলেন উরুক শহরের রাজা, অন্যদিকে এনকিদু ছিলো বনের পশু ও মানব, এই গল্পে তাদের উভয়ের ক্রমে ক্রমে মানুষ হওয়া ও বন্ধুত্বের কথা উঠে এসেছে।
মূল কাহিনিটি কাব্য আকারে রচিত হলেও বইটির লেখক কাব্যকে গল্প আকারে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে রয়েছে দুই অভিন্ন হৃদয়ের বন্ধুর অমরত্ব লাভের অন্বেষণ, মহাপ্লাবনের কাহিনি, দেবদেবী, দত্যি-দানোদের পাশাপাশি দুই বন্ধুর একে অপরের প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। আশা-আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ বেদনা, আনন্দ হাহাকার সবই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
মানুষ মরণশীল, কিন্তু সে মরতে চায় না। সে চায় অমরত্ব, নিজের কীর্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে, সময়ের ভ্রুকুটিকে উপেক্ষা করে। এই গল্প গিলগামেশের,যে অমর ছিল, কিন্তু তার কোনো সঙ্গী ছিল না। আবার এই গল্প এনকিদু-রও,যে মরণশীল মানুষ ছিল, কিন্তু তাকে মৃত্যুর হাত থেকে ছিনিয়ে আনতে পৃথিবীর শেষ প্রান্তে গিয়েছিল গিলগামেশ। সব সত্য। দুঃখ সত্য,শোক সত্য,মৃত্যু সত্য,বিস্মৃতি সত্য। সব হারিয়ে যায় কালের গর্ভে, থেকে যায় শুধু ভালোবাসা। একাকীত্ব আর হতাশার তমসায় ভালোবাসার জ্যোৎস্নাই পথ দেখায় জীবনকে। মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম মহাকাব্য সেই ভালোবাসারই কথা বলে,যে ভালোবাসার টানে সব ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল গিলগামেশ। কি অভিজ্ঞতা হয়েছিল তার? সে কি পেয়েছিল উত্তর? জবাব মিলবে এই গ্রন্থে। আসুন,হারিয়ে যাওয়া যাক চার হাজার বছর আগের পৃথিবীতে....
মানুষ মরণশীল। আর এই নিয়তিকে তাকে স্বীকার করতেই হয়।নিজের কাছের জনকে হারানোর কষ্ট পরিমাপ করা যায় না।লোকে হয়তো ভুলে যাবে তাকে কিন্তু তাকে যে আপন মনে করে তার অন্তরে সে থেকে যায় চিরকাল।এই নিয়তি কে নিয়ে লেখা হয়েছে এখন পর্যন্ত সর্বপ্রথম আবিষ্কৃত সাহিত্যকর্মে।এখানে গিলগামেশ নামক এক রাজার বন্ধুত্ব এর কথা এবং তার বন্ধু এনকদুর মৃতু্্যতে শোকাচ্ছন্ন হওয়া, সর্বোপরি এনকদুকে বাচানোর প্রচেষ্টা নিয়েই সেই অজানা লেখক (যাকে প্রথম সাহিত্যিক বলা হয়) এর কাহিনী। লোকে হয়তো ভুলে যাবে এনকদু কে কিন্তু গিলগামেশ এর অন্তরে ঠিকি বাস করছে সে।
"পিশতিম গিলগামেশকে উদ্দেশ করে পুনরায় বলতে থাকেন: ‘একা, সবাই একা, বুঝলে গিলগামেশ। যিনি এই বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ড তৈরি করেছেন তিনিও বড়ো নিঃসঙ্গ, তার কোনো দোসর নেই। অমরতা মানে তো নিঃসঙ্গতা, গিলগামেশ। সে একাকিত্ব যে কী ভয়ানক, তুমি বুঝবে না। ’ "
" ‘কেন? জান ন! এনকিদু কে ছিলেন?’ গিলগামেশ ইতিহাসের সুতো ধরিয়ে দিতে চান অন্ধ লোকটির হাতে। কিন্তু কোনোই ভাবান্তর হয় না তার। সে বলে: ‘হবেও-বা। মরে গেলেই তো হারিয়ে গেল। যা হারিয়ে যায়। তাকে আগলে কতক্ষণই — বা বসে থাকি বলো? আর বসে থেকে লাভ ও তো নেই।’৷ "
পড়ে ফেললাম বিশ্বের প্রাচীনতম উপাখ্যান, গিলগামেশ মহাকাব্য বা এপিক অফ গিলগামেশ। এরকম দুর্দান্ত একটা বই দিয়ে এবছরের বই পড়াটা শুরু করতে পেরে দারুণ লাগছে। এর আগে আলমগীর তৈমুরের অনুবাদটা পড়েছিলাম এবং সেটা বেশ ভালোও লেগেছিল। তবে হায়াৎ মামুদের উপস্থাপন ও বর্ণনাভঙ্গী চমৎকার লেগেছে। মরণশীল মানুশের অমরত্ব সন্ধানের গল্প আমি মুগ্ধ হয়ে পড়েছি। না পড়ে থাকলে এক্ষুনি পড়ে ফেলুন।
◾গিলগামেশ একটি প্রাচীনতম উপাখ্যান যেটা এখনো পর্যন্ত জানা পৃথিবীর প্রথম গল্প। ঠিক এ কারণেই এটা পড়ার আগ্রহ জন্মেছিলো। মেসোপটেমিয় এই পুরাণ হায়াৎ মাহমুদের একটি সংস্করণ আরকি। কিছুটা কিশোর গল্প ঘরানার। ৮৫ পৃষ্ঠার এই বই আমাকে কিছুটা সেই স্কুল জীবনের রূপকথার গল্পের বইয়ের কথাই মনে করিয়েছে বলা যায়। খুব বেশি উচ্চাকাঙ্খা নিয়ে না পড়লে খারাপ লাগবে না। চলনসই।
গিলগামেশ হলো পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন গল্প। খারাপ হোক বা ভালো হোক, যেহেতু এটিই প্রথম উপাখ্যান তা-ই সবার পড়া উচিত বলে মনে করি। গিলগামেশ একজন মহান রাজা, এবং পরাজিত বন্ধু। এই গল্প দ্বারা প্রমাণিত হয়, আসলে মানুষ একা। তার নিজে ছাড়া কেউ বা কিছুই নেই। মনে রাখার কেউ নেই, ভালোবাসার কেউ নেই। আছে শুধু নিজের নিজ।
বইটা গিলগামেশকে নিয়ে— যে তার একমাত্র বন্ধু এনকিদু’র প্রতি ভালোবাসার টানে পৃথিবীর শেষ প্রান্তে বাস করা অমর বৃদ্ধ ‘উৎনা পিশতিম’ এর কাছে গিয়েছিলো। যে বৃদ্ধ জানতো জন্ম-মৃত্যুর রহস্য। পৃথিবীর প্রথম গল্প এই গিলগামেশ।
ভীষণ সহজ এবং সুন্দরভাবে সব বয়সী পাঠকের উপযোগী করে বইটা লেখা হয়েছে। গিলগামেশ‚ এনকিদু‚ উৎনা পিশতিম ছাড়াও মিথলজির বিভিন্ন দেব-দেবীর কথা প্রসঙ্গক্রমে বইতে উল্লেখ করা হয়েছে।
মানে, গল্প তো ভালো লাগা বা না লাগার কারণ নাই। পৌরাণিক কাহিনি। অবাক করা সব কর্মকাণ্ড দেবতা ও অতিকায় মানুষদের। লেখাটা ছোট মানুষদের উপযোগী আর কি। বড়বেলায় পড়তে ভালো লাগবে কিনা সিওর না। বাসার ক্লাস ফাইভ, সিক্স, সেভেন পড়ুয়া বাচ্চাদের কিনে দেওয়ার জন্য পারফেক্ট।
জাহীদ হোসেন ভাইয়ের গিলগামেশ পড়ার পর থেকেই আসলে গিলগামেশ পড়ার ইচ্ছা ছিলো..আজ পড়ে ফেললাম... বন্ধুত্বের এক অনন্য গল্প...গিলগামেশ আর এনকিদু.. মৃত্যু শেষ নাকি শুরু এ নিয়ে অনেক গল্প হবে অনেক কথা হবে...তবে এর মাঝে গিলগামেশ-এনকিদু বেঁচে থাকবে চিরকাল!!!
হায়াত মামুদের ল��খনির আমি যে ভক্ত, তাতে সন্দেহের লেশমাত্র নেই। কিন্তু কিশোর উপযোগী করতে গিয়ে গিলগামেশকে অনেক "শল্যচিকিৎসা"(সার্জারি) করা হয়েছে এবং কিছু প্রশ্নের উত্তর অপূর্ণ রয়ে গেছে। সাড়ে তিন দেবার সুযোগ নেই বলে পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে চার দিতে বাধ্য হলুম।