মবিনুর রহমানকে হাজতে ঢোকানোর তিন ঘন্টার ভেতর থানার চারপাশে দু’তিন হাজার মানুষ জমে গেল। তারা হৈ চৈ, চিৎকার কিছু করছেনা। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সবাই শান্ত। এই লক্ষণ ভালো না। খুব খারাপ লক্ষণ। এরা থানা আক্রমণ করে বসতে পারে। থানায় আগুন লাগিয়ে দিতে পারে। থানায় টেলিফোন আছে- অতিরিক্ত ফোর্স চেয়ে টেলিফোন করা যায়। কিন্তু টেলিফোন গত এক সপ্তাহ থেকে নষ্ট।
Humayun Ahmed (Bengali: হুমায়ূন আহমেদ; 13 November 1948 – 19 July 2012) was a Bangladeshi author, dramatist, screenwriter, playwright and filmmaker. He was the most famous and popular author, dramatist and filmmaker ever to grace the cultural world of Bangladesh since its independence in 1971. Dawn referred to him as the cultural legend of Bangladesh. Humayun started his journey to reach fame with the publication of his novel Nondito Noroke (In Blissful Hell) in 1972, which remains one of his most famous works. He wrote over 250 fiction and non-fiction books, all of which were bestsellers in Bangladesh, most of them were number one bestsellers of their respective years by a wide margin. In recognition to the works of Humayun, Times of India wrote, "Humayun was a custodian of the Bangladeshi literary culture whose contribution single-handedly shifted the capital of Bengali literature from Kolkata to Dhaka without any war or revolution." Ahmed's writing style was characterized as "Magic Realism." Sunil Gangopadhyay described him as the most popular writer in the Bengali language for a century and according to him, Ahmed was even more popular than Sarat Chandra Chattopadhyay. Ahmed's books have been the top sellers at the Ekushey Book Fair during every years of the 1990s and 2000s.
Early life: Humayun Ahmed was born in Mohongonj, Netrokona, but his village home is Kutubpur, Mymensingh, Bangladesh (then East Pakistan). His father, Faizur Rahman Ahmed, a police officer and writer, was killed by Pakistani military during the liberation war of Bangladesh in 1971, and his mother is Ayesha Foyez. Humayun's younger brother, Muhammed Zafar Iqbal, a university professor, is also a very popular author of mostly science fiction genre and Children's Literature. Another brother, Ahsan Habib, the editor of Unmad, a cartoon magazine, and one of the most famous Cartoonist in the country.
Education and Early Career: Ahmed went to schools in Sylhet, Comilla, Chittagong, Dinajpur and Bogra as his father lived in different places upon official assignment. Ahmed passed SSC exam from Bogra Zilla School in 1965. He stood second in the merit list in Rajshahi Education Board. He passed HSC exam from Dhaka College in 1967. He studied Chemistry in Dhaka University and earned BSc (Honors) and MSc with First Class distinction.
Upon graduation Ahmed joined Bangladesh Agricultural University as a lecturer. After six months he joined Dhaka University as a faculty of the Department of Chemistry. Later he attended North Dakota State University for his PhD studies. He grew his interest in Polymer Chemistry and earned his PhD in that subject. He returned to Bangladesh and resumed his teaching career in Dhaka University. In mid 1990s he left the faculty job to devote all his time to writing, playwright and film production.
Marriages and Personal Life: In 1973, Humayun Ahmed married Gultekin. They had three daughters — Nova, Sheela, Bipasha and one son — Nuhash. In 2003 Humayun divorced Gultekin and married Meher Afroj Shaon in 2005. From the second marriage he had two sons — Nishad and Ninit.
Death: In 2011 Ahmed had been diagnosed with colorectal cancer. He died on 19 July 2012 at 11.20 PM BST at Bellevue Hospital in New York City. He was buried in Nuhash Palli, his farm house.
শুধু এইটুকুই মনে আছে যে, বেঙ্গল বইয়ে গিয়ে টানা দেড় ঘন্টায় বই টা শেষ করার পর বান্ধবী যখন জিজ্ঞেস করল কেমন ছিল বইটা তখন বলেছিলাম "খারাপ না। অ্যাজ ইউজুয়াল হুমায়ুন।" সেই কথার হিসেবেই ৩ তারা দিয়ে রাখলাম।
#এই লেখাটি যদি আরও কিছুটা ছোট হতো তাহলে লেখক অপ্রয়োজনীয় কিছু অংশ বাদ দিতেন এবং এটি একটি ভাল মানের ছোট গল্প হতে পারতো।
# যাদু বাস্তবতা হিসেবে সফল নয়, হঠাৎ করে ক্রোমোজোম লজিক না আসলে এই বিপত্তি আর বাঁধতো না। যদিও লেখক একে ফ্যান্টাসি বলেছেন কিন্তু ফ্যান্টাসি হিসাবে ভাবতে গেলে এর ব্যর্থতা আরও বেশি। যাই হোক, আই গেস হুমায়ুন খেয়ালী মানুষ, এত কিছুর ধার তিনি ধারেন নাই। তরতর করে লিখে গেছেন আমিও তরতর করে পড়ে গেছি।
# ঘণ্টা খানেক না পড়লে ঘুমাতে পারি না। আবার সাম্প্রতিক ঘটনা এবং তার আফটার ইফেক্টে মানসিকভাবে ভালই ধাক্কা খেয়েছি। মাথার ভিতরকার ক্যাওস সামলে কিছু পড়তেও পাড়ছিলাম না, হুমায়ুনের লেখনী বাঁচিয়ে দিল। (এই কারণে এক তারা বোনাস।)
"তুমি আরো ভাব। কল্পনাকে আরো ছড়িয়ে দাও। নতুন নতুন জগৎ সৃষ্টি কর। তোমার কল্পনা যতই উন্নত হবে তোমার আনন্দের পরিমাণ হবে ততই তীব্ৰ।"
হুমায়ূন আহমেদের আরেকটা ভালো বই পড়লাম। সর্বমোট ৮৩টা। উনার সমস্ত বই এখন অবধি না পড়ে বোধহয় ভালোই করসি। প্রতি মাসে একটা করে পড়লে ভালোই লাগে। ক্লান্তি দূর হয়। প্রশান্তি আসে।
ইস! বইপোকাদেরও যদি নি'দের মতো ভিন্ন মাত্রায় আলাদা একটা জগৎ থাকতো যেখানে সবাই কানেক্টেড তবে কেমন হতো!
" নি " এর ভূমিকা - তেই হুমায়ূন আহমেদ লিখছেন, এটি ফ্যান্টাসি ধরনের রচনা। আর এই ফ্যান্টাসি আবর্তিত হয়েছে নীলগঞ্জ মডেল হাই স্কুলের সায়েন্স টিচার মবিনুর রহমান - কে ঘিরে ৷ লেখক এর ভাষ্যমতে তার ক্রোমোজোম সংখ্যা ৪৭ । যারা " নি " শুধু তারাই বাড়তি ক্রোমোজোম নিয়ে আসে ৷ এই গল্পের আরেকটি চরিত্র জেবা ও " নি " গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ৷
- 'বাড়তি ক্রোমোজোম টির কাজ কি ? ' - ' বাড়তি ক্রোমোজোম টির জন্যই তুমি স্বপ্নকে মুক্ত করতে পার ৷ কি অসীম তোমার ক্ষমতা তা তুমি জানো না, ক্ষুদ্র অর্থে তুমি স্রষ্টা ৷' -'সব মানুষই স্রষ্টা। সৃষ্টি করাই মানুষের কাজ ৷' -'তোমার সৃষ্টির ক্ষমতা অসাধারণ ' -'অসাধারণ ?' - 'হ্যাঁ অসাধারণ ৷ " নি" দের জন্ম হয়েছে স্বপ্ন দেখার জন্য ৷ তারা স্বপ্ন দেখে - নতুন সৃষ্টি হয় । প্রকৃতি তাই চায় ৷ ' -'এক দিকে সৃষ্টি মানে অন্যদিকে ধ্বংস। '
লেখকের ফ্যান্টাসির আড়ালে, আমার মতে নেহাত অপ্রত্যাশিতভাবে শেষ হয়ে যাওয়া ছোটগল্প বলেই মনে হচ্ছে ৷ বেশ কয়েকটি অন্যান্য লেখনীর গতানুগতিক ধারার অংশ হিসেবে এখানেও রয়েছে অসম প্রেম ৷ যাহোক, মুবিন স্যারের ছাত্রী রূপা - র জিজ্ঞেস করা ধাঁধার উত্তর টি অনুমান করতে পারেন ?
> আমবাগানে টুপ করে শব্দ হলো ৷ একটা পাকা আম গাছ থেকে পড়েছে । যে দু'জন শুনল সে দু'জন গেল না ৷ অন্য দু'জন গেল ৷৷ যে দু'জন গেল সে দু'জন দেখলো না অন্য দু'জন দেখল ।। যে দু'জন দেখল সে দু'জন তুললো না অন্য দু'জন তুলল। যে দু'জন তুলল সে দু'জন খেলো না অন্য একজন খেলো ।।
“নি” বইটি আরও একটি হুমায়ূনীয় সমাপ্তির উদাহরণ। পাঠক যখন তীব্র আগ্রহে কী হবে জানার অপেক্ষায় আছে, ঠিক তখনই বোধহয় হুমায়ূন আহমেদের লেখার মুড চলে যায়। তিনি যেন পাঠকের সাথে উপহাস করে বলেন,
“থাক বাছাধন, অনেক পড়েছ। আর পড়তে হবে না। এবার নিজের মতো করে কল্পনা করে নাও শেষটা।”
তখন রাগ দুঃখে চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করে। কী হবে, কী হওয়া উচিত ভাবতে ভাবতে রাতের ঘুম নষ্ট হয়। অনেকের কী হয় জানি না। হুমায়ূন আহমেদের কোন লেখা শেষ করার পর আমার এমন একটা অনুভুতি হয়। আমি ঠিক ঘুমোতে পারি না। আমি চরিত্রগুলোর সাথে এমনভাবে জড়িয়ে পড়ি, ঘুমের মধ্যেও আমার মনে হয় তাদের সমাপ্তি কি এভাবে হওয়া উচিত ছিল? পরবর্তীতে তাদের কী হবে? আমি জানি না, হুমায়ূন আহমেদ কীভাবে পাঠকের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। তবে তিনি যেভাবে লিখতেন; সাদামাটা, রসকষহীন লেখাও উপস্থাপনার জোরে পাঠকের মনের মধ্যে অন্যরকম অনুভূতি দিত।
“নি” বইটিকে অবশ্য কোনোভাবে সাদামাটা বলার উপায় নেই। এই বইয়ের জনরা নিয়ে তর্ক বিতর্ক হতেই পারে। আপাতদৃষ্টিতে পরাবাস্তব, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি ধারার মনে হলেও বইটিকে লেখক ফ্যান্টাসি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যদিও প্রথাগত ফ্যান্টাসি বইটি না। একটি বই ফ্যান্টাসি হতে যে উপাদানগুলোর প্রয়োজন হয়, এখানে তার অনুপস্থিতি আছে। প্রাইমারি ফ্যান্টাসি হিসেবে অবশ্য চালিয়ে দেওয়া যায়। রূপক হিসেবেও ধরে নেওয়া যায়।
এই বইয়ের প্রধান চরিত্র মুবিনুর রহমান খুবই সোজাসাপ্টা মানুষ। সে কারণেই যখন চাকরির ইন্টারভিউতে যেতেন, তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হতো তার নাম কী? তার জবাব থাকত, নাম জেনেই তো ডেকে আনলেন। চাকরি পেতে হলে তোষামোদ করতে হয়, হা তে হা মেলাতে হয়। কিন্তু মুবিনুর রহমান তা করতে পারেন না। কেবলই চাকরির বাজারে তার গুরুত্ব নেই। তবে যিনি রিযিক নির্ধারণ করেন, তিনি তো আর কাউকে খালি হাতে ফেরান না। তাই মুবিনুরের চাকরি অবশেষে হয়। নীলগঞ্জের এক স্কুলে এক এক করে আট বছর কাটিয়ে ফেলেন তিনি।
মুবিনুরের কিছু অস্বাভাবিকতা আছে। তিনি কিছুটা খামখেয়ালী। এমন এক বাড়িতে থাকেন, দেখলে মনে হবে বাড়িটা যেকোনো সময় ভেঙে পড়বে। চারিপাশে সাপখোপের আড্ডা। একটা নৌকা কিনে নিয়েছেন। মাঝে মাঝে সে নৌকায় খোলা আকাশের নিচে রাত্রিযাপন করেন। তাছাড়াও একটি বিশাল টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশের তারা, গ্রহগুলো দেখার চেষ্টা করেন। এমন এক মানুষকে গ্রামে পাগলাটে বলে অভিহিত করা অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু এই কথা কম বলা, নিজের মতো থাক খামখেয়ালী মানুষকে অনেকেই ভালোবাসেন। তাদের মধ্যে একজন স্কুলের দপ্তরী কালীপদ আর ধর্মের শিক্ষণ জালালুউদ্দিন।
আর ভালোবাসে রূপা। রুপা মুবিনুর রহমানের ছাত্রী। কিন্তু শিক্ষক হলেও মুবিনুরকে সে অন্য চোখে দেখতে শুরু করেছে। কেন যেন স্যারের সংস্পর্শ ভালো লাগে। কথা বলতে ভালো লাগে। কোনোদিন স্যার না এলে অস্থির হয়ে ওঠে মন। এসব কীসের লক্ষণ? শুধুই কি পড়াশোনা? নাকি মনের মধ্যে নতুন কোনো অনুভূতির জন্ম নিচ্ছে? রূপা জানে, কিন্তু স্বীকার করতে চায় না। কিন্তু একসময় তো স্বীকার করতে হয়। গ্রামাঞ্চলে উঠতি বয়সের কিশোরীদের খুব দ্রুতই বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আর যেখানে নি��ের স্যারের প্রতি দুর্বলতা অনুভূত হয়, সেখানে অন্যকে বিয়ে করা কি সহজ?
এই বইয়ের ঘটনাগুলো আবির্ভূত হয়েছে দুইজনকে কেন্দ্র করে — মুবিনুর রহমান আর রূপা। তাদের পাশাপাশি অনেকগুলো চরিত্র এসেছে। অনেকগুলো ঘটনা এসেছে। হুমায়ূন আহমেদের লেখাতে একটা বিষয় আমি লক্ষ্য করি। তিনি গল্প বলার মাঝে মাঝে গল্পের মধ্য দিয়েই এমন সব ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আসেন, যা হয়তো সমাজের দিক দিয়ে বেশ গুরুত্বপুর্ণ। তৎকালীন সময়ের অসংলগ্নতা, অন্যায়গুলো ফুটে ওঠে। এই যেমন, আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় রেশনের জিনিসপত্র আত্মসাৎ করার ঘটনা অহরহ ঘটে। হয়তো কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এক বস্তা চাল বরাদ্দ, কিন্তু দেওয়া হলো সামান্যই। কিন্তু কিছু করার থাকে না। উপরমহলের কাছে ভর্তুকি দিতেই হবে। ফলে যা কপালে জোটে তা-ই নিয়ে আসতে হবে। আর এই অন্যায়ের ক্ষেত্রে একজন সাদাসিধে, সহজ সরল মানুষকে ফাঁসিয়ে দেওয়া খুব বেশি সম্ভব।
সেই সাথে যদি ক্ষমতাশালী মানুষের ব্যক্তিগত আক্রোশ থাকে! তখন অবজ্ঞা, অপমানে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার শেষ চেষ্টা করা হয়। কিন্তু মুবিনুর রহমান তো ভিন্ন ধাতুতে গড়া। এসব নিয়ে তার তেমন মাথা ব্যথাও নেই। আমার মনে হয়েছে লেখক আসলে প্রমাণ করতে চেয়েছেন, যিনি অপরাধ করেননি তিনি কখনও মাথা নত করেন না। তার শির সবসময় উন্নত। তাকে কখনও কোনো দোষে দণ্ডিত করা যায় না। তাকে সাহায্য করার মানুষ থাকে। অপরাধ না করলে তার ভয়ের কিছু নেই। যদিও বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। কিন্তু লেখক সম্ভবত তা-ই প্রমাণ করতে চেয়েছেন।
হুমায়ূন আহমেদের আরেকটি জিনিস আমার ভীষণ ভালো লাগে। তিনি মনস্তত্ত্ব নিয়ে। দারুণভাবে খেলতে পারেন। তার হিউমারের প্রশংসা সমসময়-ই করতে হয়। সিরিয়াস মুহূর্তে যেভাবে হাস্যরস তৈরি করেন, কোনরকম অতিরঞ্জিত কিছু মনে হয় না। তিনি তার চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্ব এক অন্যরকম মাত্রায় নিয়ে যান। এ জাতীয় বইয়ে তা প্রবলভাবে ধরা দেয়। সহজ লেখনশৈলীতে তা হয়তো অনুভূত হয় না। তবে একটু গভীরভাবে অনুধাবন করার চেষ্টা করলে বোঝা যায়।
এই বইয়ের প্রতিটি চরিত্রের মনস্তত্ত্ব এখানে উন্মুক্ত হয়েছে। একজন উঠতি বয়সের কিশোরীর মানসিক অবস্থা, ভালোবাসার জন্য হাহাকার, কারো কারো নিজেকে বাঁচানোর জন্য অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া, নিজের আভিজাত্য, ক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা করা — এই সবই এই সমাজে থাকা প্রতিটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে।
হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রগুলোকে তার উপস্থাপনার জোরে কিছুটা পাগলাটে মনে হয়। কিন্তু একটু ভাবলে মনে হবে, না এই চরিত্র আমাদের সমাজে আছে। আমাদের আশেপাশেই আছে। কেউ এমন থাকে, যে তার চারপাশের মানুষকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করে। বিশেষ করে নারী জাতিকে। কথায়, কাজে বা অন্য কোনো উপায়ে। এই বইয়ের ইন্টারেস্টিং চরিত্র হিসেবে রূপার ভাইয়ের মেয়ে জেবার কথা বলা যায়। রহস্যময় এ চরিত্রকে আমি বুঝতে পেরেছি। আপনি পারবেন তো?
হুমায়ূন আহমেদ শুধু যে বইয়ের চরিত্রগুলোর সাথে মনস্তাত্বিক খেলা খেলেন এমন না, তিনি পাঠকদের সাথেও খেলেন। হুমায়ূন আহমেদের গল্পে হুটহাট কিছু সাবপ্লট আসে। আবার হুট করেই শেষ হয়ে যায়। তিনি কিছু ঘটনা আনেন, কিন্তু বর্ণনা করেন না। পাঠকের ভাবনার উপর ছেড়ে দেন। এই জিনিসটা একদিক দিয়ে ভালো, আবার অন্য দিক দিয়ে খারাপ। ভালো কারণ এর সাথে পাঠকের সাথে সংযোগ স্থাপিত হয়। বই পড়তে পড়তে পাঠকের ভাবনার জগৎ খুলে। অন্যদিকে যে বিষয়টা আমার খারাপ মনে হয়, কিছু বিষয়ের ব্যাখ্যা আসলে প্রয়োজন হয়। যেহেতু লেখক নিজে এই বইকে ফ্যান্টাসি বলেছেন, অনেক কিছুর ব্যাখ্যা দরকার ছিল। একটা সময় গল্পকে সামাজিক উপন্যাস হিসেবেই মনে হচ্ছিল। কিছু বৈজ্ঞানিক আলোচনা ছিল। কিন্তু ফ্যান্টাসি হয়ে যতটা উপাদান প্রয়োজন ছিল, আমার কাছে যথেষ্ট মনে হয়নি। তবুও উপভোগ করেছি। পড়তে ভালো লেগেছে। এই ভালো লাগা তৈরি করা বোধহয় হুমায়ূন আহমেদকে দিয়েই সম্ভব।
এই বইয়ের সবচেয়ে আলোচ্য বিষয় হতে পারে ‘নি’ আসলে কী? কিংবা কারা? অনেক কিছু আলোচনার ছিল। কিন্তু স্পয়লার হয়ে যাবে বলে বলছি না। শুধু এতটুকু বলা যায়, ‘নি’ তাদেরকে বলা হয় যারা নিজেদের কল্পনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বিষয়টা খুব বেশি অবাস্তব, এমন না। আমাদের মাঝেই এমন কিছু মানুষ থাকে যারা কল্পনার জগতে বসবাস করে। তাদের ভাবনা দিয়ে তারা একটি জগৎ তৈরি করতে করেন। যে জগতে হারিয়ে যেতে তাদের ভালো লাগে। নিজেদের আরও কল্পনার জগৎ তাদের মতোই রঙিন। তাদের মতো করে সাজানো হয়, তাদের পরিচিত, প্রিয় মানুষদেরকে ভাবনায় স্থান দেওয়া হয়। যারা এ কাজগুলো করতে পারে, তাদের নি বলা হয়। নি-রা অনেক ক্ষমতাসম্পন্ন। ক্ষমতা দেওয়া হলেও একটি সীমার মধ্যে প্রত্যেককে থাকতে হয়। প্রকৃতি যদিও নি-দের সাথে আছে। তারপরও প্রকৃতির বিরুদ্ধে যায় এমন কিছু করা যাবে না। ক্ষমতার উৎস পাওয়ার পরও সীমা অতিক্রম করা যাবে না। করলে ঘোর বিপদ। সীমা লঙ্ঘনকারীকে আল্লাহও পছন্দ করেন না।
হুমায়ূন আহমেদের লেখা বা গল্প বলার ধরন নিয়ে তো বিশেষ কিছু বলার নেই। তিনি গল্পের জাদুকর। আমার কাছে শব্দের জাদুকর। আমি মুগ্ধ হই তাঁর শব্দচয়নে। তিনি কত সাবলীলভাবে বাংলা ভাষার ব্যবহার করেন। সংলাপে কিছুটা ইংরেজি এলেও তার বর্ণনায় ইংরেজি শব্দ থাকে না বললেই চলে। বাংলা ভাষায় এর সহজবোধ্য ও সাবলীল শব্দচয়নই তাঁকে অনন্য করেছে। তাঁর প্রতিটি বই পড়তে গেলে মুগ্ধ হই। আরও একবার মুগ্ধ হলাম। তাঁর এই শব্দের খেলায় বারবার বুঁদ হয়ে যাই।
পরিশেষে, নি ভালো লেগেছে। প্রথাগত ফ্যান্টাসির চেয়ে সামাজিক উপন্যাস হিসেবেই অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছে। এর মাঝে লেখক বিজ্ঞানের কিছু আলোচনার পাশাপাশি কল্পনার দুয়ার খুলেছেন। সাথে দেখিয়েছেন মানুষকে বরাবরই সীমারেখার মধ্যে থাকতে হয়। তবুও মানুষ এমন এক চরিত্র, নিষিদ্ধ জিনিসে তার আকর্ষণ বেশি। বাঁধা দিলে সে পথে এগিয়ে যায় বারবার। আর ভালোবাসা কিংবা প্রিয় মানুষের জন্য কোনো সীমানা-ই মানুষকে বেঁধে রাখতে পারে না। কখনও পারবেও না।
পৃথিবীতে বুদ্ধিমান মানুষেরা কখনোই নিজেদের বুদ্ধিমান প্রমাণ করার চেষ্টা করে না, বরং তুলনামূলক কম বা সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরাই নিজেদের বুদ্ধিমান প্রমাণ করার চেষ্টা করে। নিরীহ মানুষের উপর সহজেই দোষ চাপিয়ে দেয়া যায় বলেই মানুষ নিজের দোষ নিরীহ কোনো মানুষের উপর চাপিয়ে নিজে বেঁচে যেতে চায়। হুমায়ূন আহমেদের অন্যান্য বই এর মতোই as usual লেগেছে।
আজ অফিস থেকে ফিরে বই-এর শেলফ গোছানোর ফাঁকে এই উপন্যাসটা পড়া হয়ে গেল। হুমায়ুন আহমেদের লেখা খারাপ লাগা অসম্ভব, তাই দুটো তারা সেখানেই এসে গেল। কলমের ছোট্ট ছোট্ট আঁচড়ে বুকের ভেতরে মোচড় তোলা চরিত্রচিত্রণ আরও একটি তারা বসিয়ে দিল। কিন্তু তার বেশি কিছু লিখতে পারছি না কারণ কল্পবিজ্ঞান আর পরাবাস্তব মিশিয়ে দেওয়া এই উপন্যাস শেষ হয়েছে ছোটোগল্পের মতো করে, যাকে মেনে নেওয়া যায়না।
মবিনুর রহমান। সাদা সিদে একজন মানুষ। সোজা সাপ্টা মানুষ তিনি। এই কারনেই সবার কাছে তিনি কিছুটা অদ্ভুত হিসেবে পরিচয় লাভ করেছেন। ঠোটকাটা আর সত্যবাদী দুইটাই এক সাথে হওয়ার কারনেই কিনা কোন চাকুরি তার হয় না। অবশেষে হয়ে যায় তার চাকুরি তাও ইন্টারভিউ না থাকার কারনে, নীলগঞ্জ হাই স্কুলে সায়েন্স শিক্ষক। তার মা খুব ভাল ভাবে নিতে পারেনি ব্যাপারটা। কিন্তু ছেলেকে খুশি করতেই তার আনা মিষ্টি খেয়ে খুব জলদিই মারা যান অনেক দিন অসুখে ভোগা তার মা। মা মারা যাবার পর যায়গা জমি বিক্রয় করে সেই টাকা দিয়ে খুব ভাল টেলিস্কপ কেনেন মবিনুর সাহেব। নীলগঞ্জে ভালই চলছিল সব। খুব নিয়ম করে নিজের দায়িত্ত্ব পালন করেন তিনি। মানুষ পছন্দও করত খুব তাই তাকে সাদাসিধা পাগলাটে মানুষ হিসেবে। ৮ বছর ভাল ভাবেই পালন করে গিয়েছেন দায়িত্ত্ব। বিয়ে থাও করেননি। ঝামেলা বাধল রুপাকে নিয়ে। রুপা হুট করে ভালবেসে ফেলল মবিনুর রহমান, তার স্যার কে। অসম প্রেম কেউ মেনে নেয় না, শুরু হল ঝামেলা। এদিকে মবিনুর সাহেব স্বপ্নে দেখা শুরু করলেন তিনি নি। তার অনেক ক্ষমতা। তিনি যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন। কি ঘটবে আসলে মবিনুর রহমানের সাথে?
মবিনুর রহমান নীলগঞ্জ হাই স্কুলে সায়েন্স শিক্ষক।ছাত্রী রুপা হুট করে ভালবেসে ফেলল মবিনুর রহমানকে।এদিকে মবিনুর সাহেব স্বপ্নে দেখা শুরু করলেন তিনি নিদের।জানতে পারলেন তিনি নিজেও একজন অসীম ক্ষমতা সম্পন্ন নি।তিনি যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন।একসময় রূপা মারা যায় আর তিনি নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে রূপাকে ফিরিয়ে এনে ধ্বংসের মুখে পরেন।বইটি সম্ভবত ডিস্টোপিয়ান সাইন্স ফিকশন।
হুমায়ুন আহমেদ তার বেশ কিছু গল্পেই গল্পের চরিত্রদের নিয়ে এক ধরনের বুদ্ধির খেলা খেলেন।এই খেলা খেলে তিনি মজা পান কিনা জানিনা তবে আমি অনেক মজা পাই। "নি" সেই ধরনেরই একটি উপন্যাস। আবারো লেখকের অদ্ভুত এবং কল্পনাবিলাসী চিন্তাশক্তির দেখা মিলল..
এখানে মোহাম্মদ আজমের একটি লেখা তুলে দিচ্ছি। 'হুমায়ূন আহমেদ পাঠপদ্ধতি ও পর্যালোচনা' বইটির অংশ এই লেখাটি।
হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস 'নি': প্রেম ও ফ্যান্টাসি
মোহাম্মদ আজম
নি উপন্যাসের ভূমিকায় হুমায়ূন লিখেছেন, নি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি নয়, ফ্যান্টাসি ধরনের রচনা। এই সাবধানবাণী তাকে উচ্চারণ করতে হয়েছে, কারণ এ বইকে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি হিসাবে পাঠ করার কিছুটা প্রণোদনা খোদ বইটির ভিতরেই আছে। বলা হয়েছে, ‘নি’ এক ধরনের মানব-প্রজাতি, যাদের ক্রমোজমের সংখ্যা বেশি। অন্যদের যেখানে ছেচল্লিশটি ক্রমোজম থাকে, সেখানে নি-গোত্রভুক্তদের থাকে সাতচল্লিশটি। এই বাড়তি ক্রমোজম তাদের অভাবনীয় ক্ষমতার উৎস। নিজেদের কল্পনার জগৎকে বাস্তব রূপ দেয়ার অসাধারণ সামর্থ্য আছে তাদের, এবং নতুন দুনিয়া সৃজনের ক্ষমতার দিক থেকে তারা স্রষ্টার পর্যায়ভুক্ত। স্পষ্টতই এ কল্পনার ভিত্তি ‘বৈজ্ঞানিক’ বা ‘ছদ্ম-বৈজ্ঞানিক’ উপাত্ত। ফলে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির সাথে একে মিলিয়ে পাঠ করার একটা সুযোগ থাকছেই। কিন্তু লেখক একে পড়তে বা পড়াতে চান ফ্যান্টাসি হিসাবে। এ কথার অর্থ হলো, ফ্যান্টাসি হিসাবেই রচনাটির অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ পাঠ সম্ভব। আমরা পরে দেখব, লেখকের এই দাবি শুধু যে যৌক্তিক তাই নয়, অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ পাঠের জন্য এর কোনো বিকল্পও নাই। বস্তুত, লেখকের দিক থেকে উল্লেখ না থাকলেও যে কোনো ‘কুশলী’ পাঠক রচনাটিকে ফ্যান্টাসি হিসাবেই পড়বে।
কিন্তু ফ্যান্টাসি হিসাবে, বিশেষত দুনিয়াজোড়া খ্যাতিমান ফ্যান্টাসিগুলোর নিরিখে, রচনাটি পড়া যে খুব আমোদজনক তা-ও নয়। ফ্যান্টাসির মধ্যে রোমান্সের বিস্তর উপাদান থাকে। বাস্তবকে ছাড়িয়ে যাওয়াই উভয়ের নিয়তি, ফলে যতদূর যাওয়া যায় ততই ভালো। হুমায়ূনের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিগুলো প্রমাণ করে, কল্পনায় বহুদূর চলে যাওয়ার এবং নিয়ে যাওয়ার একটা সহজাত প্রতিভা তার ছিল। বিকল্প বা কল্পিত জগৎ নিয়ে তিনি বিস্তর কাজ করেছেন; কল্পনা করেছেন এমন সময় এবং উপাদানরাশি যা আমাদের চেনা দুনিয়ার সাথে সংযোগের চেয়ে বিযোগই বেশি রচনা করে। শিশুদের কল্পনার জগৎকে কিংবা নানা ধরনের প্রাণী ও উদ্ভিদকে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কল্পদুনিয়ার অঙ্গীভূত করে নেয়ার কুশলতা তার রচনায় ঢের পাই। এতে মনে হয়, রোমান্স তিনি খুব সাফল্যের সাথে রচনা করতে পারতেন—যদি চাইতেন; ফ্যান্টাসির বহুল-প্রচলিত ধরনগুলোর কোনো-কোনোটি বাংলা ভাষায় অন্য যে কারো চেয়ে সাফল্যের সাথে রচনা করতে পারতেন—যদি চাইতেন। কিন্তু করেন নি। যা করেছেন, তার প্রায় সবগুলোরই একটা হুমায়ূনীয় ঢং আছে। ফ্যান্টাসির মাত্রাকে কমিয়ে, বাস্তবের সীমানাকে খানিকটা বাড়িয়ে তিনি রচনা করতে চাইতেন এক ভিন্ন ধরনের ফ্যান্টাসি, যার মধ্যে ফ্যান্টাসির সীমানায় বাস্তবই খেলা করে। হুমায়ূনের এ ধরনের রচনার মধ্যে নিঃসন্দেহে নি শ্রেষ্ঠ। আর বলে রাখা হয়তো প্রয়োজনীয়ই, বাংলা সাহিত্যের এ ধরনের রচনার তুলনামূলক গরিব ভুবনে নি-র তুল্য রচনা সম্ভবত নাই।
ফ্যান্টাসি বংশের প্রধান যে বৈশিষ্ট্য—প্লট, চরিত্র এবং আবহের মধ্যে ফ্যান্টাসি উপাদানের কার্যকর ভূমিকা—তা নি-তে যথেষ্টই আছে। প্রধান চরিত্র মবিনুর রহমান একজন নি; তার কাজকারবারকে খুব সহজেই অন্যদের থেকে আলাদা করে নেয়া যায়। সে যে শেষ পর্যন্ত বাস্তবকে লঙ্ঘন করে নিজের মন-মতো ভুবন তৈরি করেছে, করতে পেরেছে, তাতেও কোনো সন্দেহ নাই। পুলিশের আওতা থেকে যেভাবে সে মুক্ত হলো তার মধ্যেও, কাহিনি পরিষ্কার সাক্ষ্য দিচ্ছে, ফ্যান্টাসির ভূমিকা আছে। এ কাজে তাকে সাহায্য করেছে তুলনামূলক কম ক্ষমতার আরেকজন নি—রূপার ভাস্তি জেবা। এগার বছরের মেয়েটি সংসারের খুব স্বাভাবিক দৈনন্দিনতার মধ্যে অস্বাভাবিক কেতায় জীবনযাপন করে। খুব সহজে বুঝে ফেলে তার ফুফু রূপা শিক্ষক মবিনুর রহমানের প্রেমে পড়েছে। আগেই জেনে ফেলে, খুব শিগগির এ বাড়িতে দুটি দল হবে, একদিকে থাকবে শুধুই রূপা, অন্যদিকে বাড়ির আর সকলে। সে তার ফুফুকে এই বলে আশ্বস্ত করে, সে থাকবে তার ফুফুর সাথে। ফুফুকে সাহায্য করবে তার গভীর গোপন ফ্যান্টাস্টিক ক্ষমতা দিয়ে। সে তার কথা রেখেছে। মবিনুর রহমানকে যখন থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন দুজন মানুষকে মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সে কাজে খাটায় পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য। একজন স্কুলের দপ্তরি কালিপদ, অন্যজন ধর্ম ও আরবি-শিক্ষক জালালুদ্দিন। এরা দুজন মানসিক ক্ষমতাবলে মবিনুর রহমানের শত্রুদের কাবু করে ফেলে। শত্রুদের তালিকায় আছে স্কুলের হেডমাস্টার, বাজারের মেয়ে সাবিহা বেগম এবং থানার ওসি। মবিনুর রহমান মুক্ত হয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। রূপা উত্তাল নদীতে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। মবিনুর রহমান চেয়েছে তার ক্ষমতা ব্যবহার করে মৃত রূপাকে আবার জীবিত করে তুলতে। প্রকৃতির নিয়মের এই লঙ্ঘন প্রকৃতি মেনে নেয় নি। নদী এসে মবিনুর রহমানকে গ্রাস করে।
স্পষ্টতই ফ্যান্টাসি উপাদানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কাহিনির মূল বাঁকগুলো সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু এ-ও আমাদের দৃষ্টি এড়ায় না যে, উপাদানগুলো এমনভাবে কাজ করেছে যাতে বাস্তবের ন্যায় তাতে লঙ্ঘিত না হয়। বাস্তব মানে ডাহা বাস্তব। একেবারেই আশি বা নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশের যে কোনো থানা শহর। সেখানকার পুলিশপ্রশাসন ও শিক্ষাপ্রশাসন; স্কুলের শিক্ষকরুমে বসে থাকা কয়েকজন শিক্ষক আর তাদের আলাপচারিতা; ভুলোমন বিজ্ঞানশিক্ষক এবং করিৎকর্মা ধর্মশিক্ষক; থানা সদরের প্রভাবশালী ব্যক্তি, তার সুলক্ষণা কন্যা এবং সুপরিসর বাড়ি। গল্প বলার ওস্তাদ হুমায়ূন নিমেষেই বিশেষ কিছু বুঝতে না দিয়েই বেঁধে ফেলেন জমজমাট এক কাহিনি। মবিনুর রহমানকে এঁকে নেন শুরুতেই। তার অতীতের সাথে বর্তমানের বিচ্ছেদ তৈয়ার করেন। তাকে আলাদা করে নেন আর সবার কাছ থেকে। কিন্তু সে আলাদা হয় এমনসব বৈশিষ্ট্যের জন্য, এমনসব আচরণ আর তৎপরতার জন্য, যেগুলো তার প্রতি এলাকাবাসীর সশ্রদ্ধ ভালোবাসারও জন্ম দেবে। তার চেয়ে বড় কথা, দৈনন্দিনতার সাথে কোনো বিরোধ তৈরি করবে না। দপ্তরি কালিপদের পৈতৃক নিবাস লোকালয় থেকে খানিকটা দূরে। পড়ো-পড়ো দশা আর সাপের উৎপাতের জন্য সে সেখানে থাকে না। সে ঘরই ভাড়া নেয় মবিনুর। তাতে লোকালয়ের খানিকটা বাইরে থাকা হয়। এমন এক ভবনে থাকা হয় যেখানে সাপের উপদ্রবের মধ্যে ভাঙা ছাদের নিচে থাকায় অস্বাভাবিকতা তৈরি হবে, কিন্তু ব্যাপারটা কোনো দিক থেকেই অসম্ভব মনে হবে না। গল্পের দিক থেকেও না, গল্পের চরিত্রগুলোর দিক থেকেও না। বাড়তি সুবিধা হয় এই যে, কালিপদ তার এই ভাড়াটিয়া শিক্ষককে খুব নিবিড়ভাবে চেনার সুযোগ পায়। তার ভক্তিমন্ত হয়ে ওঠার নানান কারণ ঘটে। এবং কাহিনির শেষদিকে সে জরুরি ভূমিকা পালন করে। স্কুলের শিক্ষক কমনরুমে মবিনুর রহমানের পাশের চেয়ারে বসে জালালুদ্দিন। তাদের দুজনের ভিতরে-বাইরে কোনো মিল না থাকলেও স্বভাবের গভীরতর কোনো বৈশিষ্ট্যের কারণে ভালোই খাতির হয়। জালালুদ্দিন মবিনুর রহমানকে গভীরভাবে আবিষ্কার করে ভালো-মানুষ হিসাবে, যার নীতি-নৈতিকতার উপর ভরসা করা যায়। কাহিনির শেষভাগে সে যে জরুরি দায়িত্ব পালন করবে, তার বাস্তব শিকড় এভাবে আগে থেকেই পোঁতা ছিল।
প্রাথমিক পরিচিতি সম্পন্ন হওয়ার পর এ উপন্যাসের প্রধান দুটি ঘটনা ঘটে প্রায় একই সাথে। দুটিরই কেন্দ্র মবিনুর রহমান। এ অঞ্চলের প্রভাবশালী আফজাল চেয়ারম্যানের মেয়ে রূপা মবিনুরের প্রেমে পড়ে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারায় অথবা নতুনতর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে; আর স্কুলের হেডমাস্টার নিজের গমচুরির দায় পুরোপুরি মবিনুরের উপর দিয়ে মামলায় তাকে ফাঁসিয়ে দেয়। দুটি ঘটনাই ঘটে বাস্তবের অস্থি-পাঁজরের ভিতর থেকে, কোনোভাবেই দৈনন্দিনতার ন্যায় লঙ্ঘিত হয় নি এসব ঘটনায়, আর লেখক আক্ষরিক অর্থেই উল্লেখযোগ্য মুনশিয়ানায় দুটি ঘটনাকে একত্রে বুনে মিলিয়ে দিলেন পরস্পরের সাথে। রূপাকে মবিনুর পড়ায় মাস ছয়েক হলো। রূপার বয়স এমন যে, তাকে কিশোরী বলা যায় না। তার প্রেমের প্রকৃতি অবশ্য বেশ খানিকটা বয়ঃসন্ধিকালের; অন্তত হুমায়ূন আমার আছে জল-এর মতো বেশ কিছু স্মরণীয় রচনায় কিশোরীর বয়ঃসন্ধিকালীন প্রেমের যে ছক আবিষ্কার করেছেন, তার নিরিখে এ কথা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব। কিন্তু এ রচনায় নিজের পক্ষে রূপার যে শক্ত অবস্থান তার সাথে ওই ছক যায় না। ফলে রূপার বয়স বাড়াতে হয়েছে। অনেকটা ‘হৈমন্তী’ গল্পে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে কারণে হৈমন্তীর বয়স বাড়িয়েছেন। বলা হয়েছে, অসুস্থতাজনিত কারণে রূপা আগের বছর এসএসসি পরীক্ষা দেয় নি। তার বয়স আরো বাড়ানো সম্ভব ছিল না। সেরকম হলে মবিনুরের সাথে তার দেখা হওয়ার সম্ভাবনা কমে যেত। তার চেয়ে বড় কথা, বাস্তব ও সামাজিক ভাষায় অভ্যস্ত কারো পক্ষে জীবনবিনাশী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা অনেক কম।
রূপার দিক থেকে আকর্ষণজনিত আবেগ অনেকদিন থেকে বিকশিত হয়ে হয়ে পরিপূর্ণ মূর্তি পেয়ে যাওয়ার পর ব্যাপারটা মবিনুরের চোখে পড়ে। সেদিন সন্ধ্যায় ঘটনাটা ঘটে, যেদিন পাঠকদের সাথে রূপার প্রথম পরিচয় ঘটেছে। বলার সঙ্গত কারণ আছে, অচেতনে যে আকাঙ্ক্ষা মবিনুরের আগে থেকেই ছিল, নিজের বিশেষ জীবনধারা ও চিন্তাপ্রণালির জন্য যে আকাঙ্ক্ষাকে নিজের মনের ভাষায় রূপান্তরের আগ্রহও তার জাগে নাই, সামাজিক ভাষার প্রচণ্ড বিরোধিতার সম্ভাবনায় যে আবেগকে চেতনলোকে প্রশ্রয় দেয়ার কথা মবিনুরের কখনো মনে হয় নাই, রূপার সম্মতি এবং সম্মতির তীব্রতা আবিষ্কৃত হওয়ার পর তা মনের গহনে বাসা বাঁধে। রূপা ফ্যান্টাস্টিক মেয়েই বটে। পড়াশোনায় ভালো। বুদ্ধিতে চৌকস। আচরণে সপ্রতিভ। শারীরিক সৌন্দর্যে দুর্লভ প্রজাতির। বহুজনের মুখ দিয়ে বা বলা-না-বলা ভাষায় রূপার যে প্রবল সম্মোহনী রূপের পরিচয় লেখক তৈরি করেছেন, মবিনুরের তা থেকে মুক্ত থাকার কোনো কারণ নাই। সে আসলে মুক্ত থাকেও নাই। আগে ব্যাপারটাকে সে চেতনলোকে আসতে দেয় নাই। রূপার সম্মতি আবিষ্কৃত হওয়ার পরেও সামাজিক ভাষায় সে আবেগটা প্রকাশ করে নাই। কিন্তু তার চেতন-অচেতন এক নতুন লোকে উপনীত হয়েছে, জীবনযাপনের যাবতীয় ‘অস্বাভাবিকতা’ সত্ত্বেও আগে যার সাথে তুলনীয় কোনো কিছু তার জীবনে ঘটে নাই। ঠিক এ জায়গাটাতেই মনে হয়, নি ফ্যান্টাসি বা আর কিছু নয়, বিশুদ্ধ প্রেমের উপন্যাস। সেই মাপের রচনা যেগুলো নতুন সংজ্ঞায়ন করে, নতুন প্যাটার্ন তৈরি করে। আরো মনে হয়, হুমায়ূনের প্রেম-ধারণা প্রধানত নারীমূলক হলেও অন্তত এ উপন্যাসে তা ‘পুরুষমূলক’। পুরুষের সক্রিয়তাই প্রধান। বাসনার অনুকূলে যে জীবনবিধ্বংসী সক্রিয়তা, তা-ই সেই প্রেমের তুরীয় প্রকাশ।
এরকম পাঠ-নির্ণয়ের পক্ষে জোরাল যুক্তি হাজির হয় যখন দেখি মবিনুর কথিত নি-বৃদ্ধদের অস্পষ্ট মুখ দেখতে পায় ঠিক সেদিন যেদিন রূপার মতি এবং গতি তার কাছে স্পষ্ট হয়। সে যে ঝড়বৃষ্টির কারণে মে মাসের দুই তারিখে পড়াতে যায় নি, রূপা তা মনে রেখেছে। পড়ার মাঝখানে শাড়ি পালটে এসেছে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেও মবিনুরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মবিনুরের উপর তার প্রভাব পড়েছে গভীরভাবে। সে শুধু নিজেকে অতিশক্তিমান ‘নি’ হিসাবেই আবিষ্কার করে নি, নিজেকে বিস্মিত করে দিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুসন্ধান করাও শুরু করেছে। শরীর খারাপের অজুহাতে স্কুল কামাই দিয়েছে, যা তার ক্ষেত্রে আগে কখনো ঘটে নি। শরীর খারাপ বললেও তার কোনো লক্ষণ আমরা দেখতে পাই না। ফলে ব্যাপারটা মনোজাগতিক ভাবতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আর এই নিরিখকে সামনে রেখে যদি পুরো ঘটনাপ্রবাহ আরেকবার বিচড়ে দেখি, তাহলে বোঝা যাবে ফ্যান্টাসি হিসাবে না দেখে পুরো ঘটনাবলিকে মনোজাগতিক বিপর্যয়ের অতিরেক হিসাবে ভাবা খুবই সম্ভব এবং সঙ্গত।
অতি শক্তিমান ‘নি’ হিসাবে মবিনুর কি এমন কোনো সুবিধা পেয়েছে যা তার আকাঙ্ক্ষার অনুকূলে কাজ করেছে? পায় নি। রান্নার সময়ে যে শব্দময় জগৎ তৈরি হওয়ায় কথিত নি-রা তাকে বাহবা দিয়েছে, তা যে কারো ঘোরের মধ্যে তৈরি হতে পারে। চির-জোছনার কল্পনা থেকে জোছনামাখা যে জগৎ সে আধা-ঘুম আধা-জাগরণে দেখে ঘোঁ ঘোঁ শব্দে নৌকার ছাদে পাশে বসে থাকা জালালুদ্দিনকে চমকে দিয়েছে, সে পরিস্থিতিও ঘোরের মধ্যে বা স্বপ্নে বা মানসিক বৈকল্যে সম্ভব। মনে রাখা দরকার, দুটি ঘটনাই ঘটেছে তার রূপা-আবিষ্কারের পর। বাস্তবে কোনোভাবেই এই রূপা-লাভ সম্ভব নয়—এরকম মানসিক ঘোরের মধ্যে যদি এই মনস্তাত্ত্বিক নিরীক্ষা অচেতনে হয়ে থাকে, তাহলে মানব মনস্তত্ত্বের দিক থেকে তাকে কিছুতেই অবাস্তব বলা যাবে না। এ ধরনের ঘটনা স্বপ্নে ঘটতে পারে, সিজোফ্রেনিয়ার মতো মনোবিকলনের ক্ষেত্রে ঘটতে পারে, এমনকি ইচ্ছার প্রচণ্ড তীব্রতার মধ্যেও ঘটতে পারে। এরকম ভাবার পক্ষে অন্তত দু-প্রস্ত কারণ আছে। এক. মবিনুরের মনে হয়েছে, কাছাকাছি ধরনের স্বপ্ন সে দেখেছে সেই দূর শৈশবে। সেই স্মৃতি অস্পষ্ট। এখন যে ‘নি’-দের দেখছে সে, তারাও অস্পষ্ট। মাঝের কয়েক দশকে এ ধরনের কোনো স্বপ্ন সে দেখে নি। দুই. কথিত ‘নি’রা আসলে তার জন্য প্রত্যক্ষত কিছুই করে নি। যদিও বলা হয়েছে, প্রতিকূলতা থেকে মবিনুরকে বাঁচানোর জন্য তারা চেষ্টা করবে, কিন্তু বাস্তবে আমরা এমন কিছু ঘটতে দেখি না, যাকে অতিপ্রাকৃত বলা যেতে পারে।
আসলেই ঘটে নি। মবিনকে থানায় নিয়ে যাওয়ার পথে এবং থানার চারপাশে বিস্তর লোকসমাগম হয়েছে। এটা মোটেই অভাবনীয় নয়। যাদের সাথে আমাদের প্রত্যক্ষত কথা হয়েছে—জালালুদ্দিন, হরিপদ, আফজাল—তারা প্রত্যেকেই বলেছে, গমচুরির ব্যাপারটা মবিনুর করতেই পারে না। আমাদের আগেই জানানো হয়েছে, নীলগঞ্জের মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন মবিনুর। এমতাবস্থায় থানার চারপাশে লোক জমায়েত হওয়া অবাস্তব নয়। এই জমায়েত যে কোনো অলৌকিক ইশারায় হয় নি সে প্রমাণ দাখিল করতেই যেন মবিনুরের বিরুদ্ধে ‘রেপ কেইসে’র সংবাদ শুনে তারা চলে যেতে শুরু করে। কালিপদ যে হেডমাস্টারকে ও বাজারের মেয়েটিকে আর জালালুদ্দিন যে থানার ওসিকে কায়দা করতে পারল তার পেছনে থানার চারপাশে লোক-জমা���়েতের ভূমিকা থাকা খুবই সম্ভব। সম্ভব এমনকি নদীভাঙনের কবল থেকে মবিনুরের আবাস এবং নৌকার রেহাই পাওয়া। নদী সব বাঁকে সমান মাত্রায় উত্তাল হয়ে ওঠে না। নদীভাঙনও সব জায়গায় একই সাথে শুরু হয় না। রাতে বাজারের অংশে ভেঙে মবিনুরকে নৌকা ও বসতিসমেত নদী সকালে গ্রাস করতেই পারে।
পুরো কাহিনিটি এভাবে দ্বিতীয়বার পড়ার পর কোনো সন্দেহ থাকে না যে, অতিপ্রাকৃত বা ফ্যান্টাসি বলা যায় এমন কিছু নি উপন্যাসের মূল কাঠামোয় কোনো প্রভাব ফেলে নি। এ অর্থে ফ্যান্টাসি এ কাহিনির ছদ্মবেশ মাত্র। আদতে যাকে ফ্যান্টাসি বলে মনে হয় তা মবিনুরের তীব্র আবেগজনিত কল্পনা, যা বাস্তবের মতোই প্রতিভাত হয়। সে তো আবাল্য জেনে-বুঝে এসেছে, সে অন্যদের মতো নয়। তার আয়না হয়ে অন্যরা একথা কি তাকে অসংখ্যবার বলে নি? নিজের বুঝ আর অন্যের বুঝ মিলে তার মধ্যে এই গভীর প্রতীতি কাজ করতেই পারে যে, সে আলাদা। বিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে এই স্বাতন্ত্র্য তার কল্পনায় একটি বাড়তি ক্রমোজমের কাণ্ড বলে মনে হওয়া খুবই সম্ভব। আর নিজেকে প্রকৃতির বিশেষ পছন্দের মানুষ হিসাবে ভাববারও কারণ আছে বৈকি! চন্দ্রবোড়া সাপের সাথে সহাবস্থান তো প্রকৃতি সম্পর্কে তার দার্শনিক সিদ্ধান্তের ফল। ঔষধ প্রয়োগ করে ধানের পোকা ধ্বংস করার খবর তাকে উদ্বিগ্ন করে। প্রকৃতির স্বাভাবিক সংস্থান সম্পর্কে এতটা সতর্ক একজন যদি প্রকৃতির পক্ষপাত দাবি করে বসে, তাহলে বিশেষ দোষ দেয়া যায় না। বিশেষত এখন যখন তার জন্য এ ধরনের আনুকূল্য খুব জরুরি হয়ে উঠেছে। নারীর সাহচর্য, আবেগ এবং সৌন্দর্যবোধ ছাড়াই যৌবন কাটিয়ে দেয়া মানুষটি সহসা রূপার অভাবিত আশকারা পেয়ে নিজের বাড়তি ‘অতিপ্রাকৃত’ ক্ষমতায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। সামাজিক বা সাংস্কৃতিক ভাষার মধ্যে যা কখনোই ঘটবার নয়; নিজের বয়স, দারিদ্র্য, স্বভাব ও অভ্যস্ততার মধ্যে রূপাকে বাস্তবে পাবার লড়াইটা যেখানে অর্থহীন—অর্থহীন কেবল অন্যের বিরুদ্ধতার জন্য নয়, নিজের নৈতিকতা ও নিজের বাস্তবের ন্যায় লঙ্ঘনের আশঙ্কার জন্যও—তখন বিকল্প বাস্তবে রূপাকে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষাই মবিনুরের একমাত্র বাস্তব হয়ে ওঠে। লক্ষণীয়, রূপা নদীতে আত্মাহুতি দেয়ার আগেই মবিনুরের এই আকাঙ্ক্ষা মূর্তি পাচ্ছিল। কল্পনার ‘নি’রা তাকে একদিকে বাহবা দিচ্ছিল জোছনাশোভিত কল্পলোক বা শব্দময় বস্তুলোক তৈরির সাফল্যের জন্য—এবং এভাবে অধিকতর জটিল কল্পনাকে ব্যক্তিগত বাস্তবে রূপান্তরের একটা ধারাক্রম তৈরি হচ্ছিল; অন্যদিকে আবার নিরন্তর ভীতি প্রকাশ করছিল প্রকৃতির নিয়ম লঙ্ঘনের যে কোনো উদ্যোগ সম্পর্কে। নিশ্চিতভাবেই শরীর খারাপের অজুহাতে স্কুলে না যাওয়ার এবং রূপাকে এড়িয়ে চলার সেই দিনগুলোতে এটা ছিল মবিনুরের কল্প-অভিযানের ক্রম-অগ্রসরতা আর তার বিপরীতে অচেতনের সাবধানবাণী। সেই সাবধানবাণী হয়তো নিজেকে ধ্বংস করার অমোঘ যুক্তি মাত্র। থানা থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফেরার সময়ে ঘুরপথে রূপার বাড়িতে হাজির হয়েছিল মবিনুর। সামাজিক বিধি আর ভাষার অধীন রূপা মবিনুরের সাথে চলে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু বিদ্যমান ভাষাকাঠামোয় এ ধরনের বিপর্যয় ঘটানো মবিনুরের পক্ষে সম্ভব ছিল না। অথচ তার আবেগ ছিল তীব্র, হয়তো এ ধরনের আবেগের সাথে পূর্ব-পরিচয়ের অভাবেই। রূপা আত্মবিসর্জনের মধ্য দিয়ে ওই সম্পর্কের জাল ছিন্ন করলে মবিনুরের বাসনার পরিপূরণের সুযোগ তৈরি হয়। অনুপস্থিত রূপাকে বাস্তবে হাজির করে সে অগ্রসর হয় বিলয়ের দিকে। ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে আসা নদী তার কাজকে সহজ করে দিয়েছিল মাত্র।
হুমায়ূনের প্রেম-সম্পর্ক প্রায়শই অসামাজিক, এ অর্থে যে, সামাজিক ভাষার সম্মতির মধ্যে প্রেমজনিত আবেগ তীব্র হয়ে ওঠার কোনো উপলক্ষ তৈরি হয় না। একই কারণে এ সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রেই ট্র্যাজিক। মবিনুরের কল্পলোককে বলতে পারি এই ট্র্যাজেডি শমিত করে আনার প্রকল্প। কাজটা করতে হয়েছে, কারণ সামাজিক ভাষায় যে বাসনার অনুবাদ হয় না তা আসলে ফ্যান্টাসিই। এদিক থেকে মনে হয়, এতক্ষণ নি উপন্যাসের বাস্তবলিপ্ততা সম্পর্কে যা বলেছি, তা সত্যের একদিক মাত্র। মনে হয়, ফ্যান্টাসি এ উপন্যাসের ছদ্মবেশ নয়, আবরণ বা আভরণ নয়, আত্মাই বটে। লেখক ফ্যান্টাসির মতো করে ঘটনা সাজিয়েছেন, আমাদের সেভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছেন, মবিনুরের তৈরি করা রূপাকে প্রায় দেখিয়ে দিয়েছেন হরিপদকে, রূপার ভাস্তি জেবাকে এমনভাবে বানিয়েছেন যেন কম শক্তিমান ‘নি’ হিসাবে সে ঘটনাপরম্পরায় যথেষ্ট পরিমাণে উপস্থিত থেকেছে। লেখক চেয়েছেন, আমরা ফ্যান্টাসি হিসাবেই একে ভাবি। কারণ, অন্য দশ বাসনার মতো এই বাসনার আকারও ফ্যান্টাসির মতোই—রূপার দিক থেকে বেশ কতকটা, আর মবিনুরের দিক থেকে সবটাই।
সাধারণ একটা গল্প তবে জাদুকরের জাদুকরী ছোঁয়াতে অসাধারণ হয়ে উঠলো,শেষ টা সেই চিরচেনা হুমায়ূন স্টাইলে হলো আগে অনেক বই পড়া থাকায় খুব একটা অবাক হই নি সব মিলিয়ে ভালো সময় কাটলো।
◽বই পরিচিতি : বই : নি লেখক : হুমায়ূন আহমেদ কাকলী প্রকাশনী প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ প্রকাশক : এ কে নাসির আহমেদ সেলিম প্রচ্ছদ : সমর মজুমদার পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১০০ মুদ্রিত মূল্য : ১৬০৳
◽বই সম্পর্কে : নি উপন্যাসটি সায়েন্সফিকশন ধর্মী মনে হলেও লেখক এটিকে ফ্যান্টাসি ধর্মী উপন্যাস বলে আখ্যায়িত করেছেন বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠাতেই।
◽লেখক সম্পর্কে : বিখ্যাত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জে মাতামহের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। বড় বড় হতে হতে তিনি লেখালেখির প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হন এবং একে একে ২৭০ টি উপন্যাস লিখে ফেলেন যার সবকয়টিই ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে পাঠক মহলে। কিছু উপন্যাস চলচিত্র আকারেও প্রকাশ পেয়েছে এবং সেগুলোও তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। তিনি তার উপন্যাসে কিছু চরিত্রের জন্ম দিয়েছেন। যেগুলো পাঠকরা স্বাদরে গ্রহন করেছে এবং লালন করে চলেছে। নন্দিত এই কথা সাহিত্যিক ২০১২ সালের ১৯ জুলাই কোলন ক্যান্সারে আক্র���ন্ত হয়ে পরলোক গমন করেন।
◽উপন্যাসের চরিত্রসমূহ : উপন্যাসের প্রধান চরিত্রে আছেন নীলগঞ্জের স্কুল শিক্ষক মবিনুর রহমান, সেই স্কুলের প্রিন্সিপাল হাফিজুল কবির, সহকর্মী জালালউদ্দিন, দপ্তরি কালিপদ, মবিনুর রহমানের ছাত্রী রূপা, তার বাবা আফজাল হোসেন, বড় ভাই রফিক, ভাবী মিনু, ভাইয়ের দুই মেয়ে জেবা ও রুবাবা, ভাইয়ের বন্ধু তানভীর ও থানার ওসি সাহেব। এই নিয়েই উপন্যাস নি।
◽কাহিনী সংক্ষেপ : “নি” বিশেষশ্রেণীর ক্ষমতাধর কিছু মানুষ। অনেক বছর পর পর প্রকৃতিতে একজন “নি” আসে। প্রকৃতি এদের অসীম সৃষ্টিশীল ক্ষমতা দিয়ে পাঠিয়েছে। উপন্যাসের মুল চরিত্র “মুবিনুর” একজন “নী”। তবে সে এই বিষয়ে অবগত নয়। মাঝে মাঝেই স্বপ্নে কিছু বুড়ো মানুষকে দেখতে পায়, যাদের কথা সে কিছুই বুঝে না।
নীলগঞ্জ হাইস্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক মুবিনুর। বি.এস.সি এবং এম.এস.সি পাশ সিরিয়াস ধরনের মানুষ। মুবিনুর গ্রামের ভিটেবাড়ি বিক্রি করে উঠে এসেছে নীলগঞ্জে। এখানে পরিত্যক্তপ্রায় একটা বাড়িতে ভাড়া করে থাকেন। বাড়ি বিক্রির টাকা দিয়ে অনেকদিনের শখের একটা টেলিস্কোপ কিনেছেন। গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে নদী। মুবিনুর প্রকৃতি প্রেমী মানুষ। নদীতে ভেসে বেড়ানো আর মাঝ নদীতে বসে জোছনা দেখার জন্য সে একটি নৌকাও কিনেছেন।
৮ বছর ধরে নীলগঞ্জে আছেন মুবিনুর। অত্যন্ত সময়নিষ্ঠ মুবিনুর কারো সাতেও নেই, পাঁচেও নেই। এখানকার লোকজন তাকে বেশ শ্রদ্ধা করে। ভেতরে ভেতরে তারা তাকে “গণিতের ডুবোজাহাজ” বলে ডাকে।
বিকেলে মুবিনুর নীলগঞ্জের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ও ধনী ব্যাক্তি আফজাল সাহেবের মেয়ে “রূপাকে” পড়াতে যান। অসম্ভব সুন্দর, রূপবতী মেয়ে রুপা, এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। এই মেয়ের অনেক কিছুই মুবিনুর বুঝতে পারেন না। মেয়েতি অসম্ভব বুদ্ধিমতি তবে পড়াশুনায় মন নেই। মাঝে মাঝে সে পড়া বন্ধ করে একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। অদ্ভুত স্বভাবের এই স্যারটাকে রূপার ভাল লাগে। প্রায় সময়ই তিনি অন্যমনস্ক হয়ে কী যেন ভাবেন। রূপা অপলক স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মনে হয় এই মানুষটার দিকে সারাজীবন তাকিয়ে থাকলেও মন ভরবেনা।
নীলগঞ্জ হাইস্কুলের জন্য “ফুড ফর ওয়ার্ক” প্রজেক্টে সরকারীভাবে ১০ বস্তা গম দেয়া হয়। হেডমাস্টার হাফিজুল কবির মুবিনুরকে দিয়ে সাইন করিয়ে গম আনেন। মূলত গম বরাদ্ধ হয়েছিল ১০০ বস্তা। বাকীগুলা উপজেলা অফিসের লোকজন খালাস করে দিয়েছে। উপর থেকে এই বিষয়ে খোঁজ করা হলে হেডমাস্টার মুবিনুরকে ফাসিয়ে দেয়……
তারপর কী হয়? নি জাতির মানুষের ক্ষমতা কেমন? কী করতে পারে তারা? রূপার কী হল? এইসব জানতে হলে পড়ুন "নি"।
◽পাঠ্যানুভূতি : শুরুতে মবিনুর রহমান চরিত্রটাকে খুব ইন্ট্রেস্টিং মনে হয়েছে। তার কথা, চাল চলন এগুলো সব আলাদা। দুনিয়াবি কোনো বিষয়ে তার কোনো মোহ নেই। জেবা চরিত্রটাও খুব ইন্ট্রেস্টিং ছিল। সেও নি জাতির হওয়ায় সে যা বলে তাই হয়ে যায়। আর রূপাও যা কল্পনা করে তাই বাস্তব হয়! সব চরিত্রগুলো খুব সুন্দর সাজানো। শেষের দিকে মবিনুর রহমানের হয়ে যত মানুষ থানার সামনে জমা হয়েছিল তা আরও বিষ্ময়কর ছিল। সব মিলিয়ে চমৎকার একটা উপন্যাস।
◽ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৫/৫
◽কিছু উক্তি :
মৃত্যুতে খুব বেশি দুঃখিত হবার কিছু নেই। প্রতিটি জীবীত প্রানীকেই একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর মরতে হবে। তবে এই মৃত্যু মানে পুরোপুরি ধ্বংস নয়। মানুষের শরীরে অযুত কোটি নিযুত ফান্ডামেন্টাল পার্টিকেলস ইলেক্ট্রন প্রোটন নিউট্রন এদের কোনো বিনাশ নেই। এরা থেকেই যাবে। ছড়িয়ে পড়বে সারা পৃথিবীতে। কাজেই মানুষের মৃত্যুতে খুব বেশি কষ্ট পাবার কিছু নেই।
মৃত্যুভয় বুদ্ধিমত্তার লক্ষন। শুধু নির্বোধদেরই মৃত্যুভয় থাকেনা।
পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখতে হয় ক্ষুধার্ত অবস্থায়। ক্ষুধার্ত মানুষের স্নায়ুবোধ থাকে তীক্ষ্ণ। আহারে পরিতৃপ্ত একজন মানুষ ভোতা স্নায়ু দিয়ে কিছু বুঝতে পারেনা।
নীলগঞ্জ হাই স্কুল নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের কয়েকটি উপন্যাস আছে। এই উপন্যাসের পটভূমিও নীলগঞ্জ হাইস্কুলকে কেন্দ্র করে রচিত। উপন্যাসের উপজীব্য বিষয় হয়ে উঠেছে প্রকৃতিপ্রেম, ফিকশন এবং কিছুটা রোমাঞ্চ। ফিকশন থাকলেও, একে পুরোপুরি ফিকশন ধর্মী বই বলা চলে না। স্বাভাবিক ঘটনা প্রবাহের সাথেই সামান্য পরিমাণে ফিকশন মিশ্রিত ছিল।
“নি” বিশেষশ্রেণীর ক্ষমতাধর কিছু মানুষ। অনেক বছর পর পর প্রকৃতিতে একজন “নি” আসে। প্রকৃতি এদের অসীম সৃষ্টিশীল ক্ষমতা দিয়ে পাঠিয়েছে। উপন্যাসের মুল চরিত্র “মুবিনুর” একজন “নী”। তবে সে এই বিষয়ে অবগত নয়। মাঝে মাঝেই স্বপ্নে কিছু বুড়ো মানুষকে দেখতে পায়, যাদের কথা সে কিছুই বুঝে না।
নীলগঞ্জ হাইস্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক মুবিনুর। বি.এস.সি এবং এম.এস.সি পাশ সিরিয়াস ধরনের মানুষ। মুবিনুর গ্রামের ভিটেবাড়ি বিক্রি করে উঠে এসেছে নীলগঞ্জে। এখানে পরিত্যক্তপ্রায় একটা বাড়িতে ভাড়া করে থাকেন। বাড়ি বিক্রির টাকা দিয়ে অনেকদিনের শখের একটা টেলিস্কোপ কিনেছেন। গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে নদী। মুবিনুর প্রকৃতি প্রেমী মানুষ। নদীতে ভেসে বেড়ানো আর মাঝ নদীতে বসে জোছনা দেখার জন্য সে একটি নৌকাও কিনেছেন।
৮ বছর ধরে নীলগঞ্জে আছেন মুবিনুর। অত্যন্ত সময়নিষ্ঠ মুবিনুর কারো সাতেও নেই, পাঁচেও নেই। এখানকার লোকজন তাকে বেশ শ্রদ্ধা করে। ভেতরে ভেতরে তারা তাকে “গণিতের ডুবোজাহাজ” বলে ডাকে।
বিকেলে মুবিনুর নীলগঞ্জের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ও ধনী ব্যাক্তি আফজাল সাহেবের মেয়ে “রূপাকে” পড়াতে যান। অসম্ভব সুন্দর, রূপবতী মেয়ে রুপা, এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। এই মেয়ের অনেক কিছুই মুবিনুর বুঝতে পারেন না। মেয়েতি অসম্ভব বুদ্ধিমতি তবে পড়াশুনায় মন নেই। মাঝে মাঝে সে পড়া বন্ধ করে একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। অদ্ভুত স্বভাবের এই স্যারটাকে রূপার ভাল লাগে। প্রায় সময়ই তিনি অন্যমনস্ক হয়ে কী যেন ভাবেন। রূপা অপলক স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মনে হয় এই মানুষটার দিকে সারাজীবন তাকিয়ে থাকলেও মন ভরবেনা।
নীলগঞ্জ হাইস্কুলের জন্য “ফুড ফর ওয়ার্ক” প্রজেক্টে সরকারীভাবে ১০ বস্তা গম দেয়া হয়। হেডমাস্টার হাফিজুল কবির মুবিনুরকে দিয়ে সাইন করিয়ে গম আনেন। মূলত গম বরাদ্ধ হয়েছিল ১০০ বস্তা। বাকীগুলা উপজেলা অফিসের লোকজন খালাস করে দিয়েছে। উপর থেকে এই বিষয়ে খোঁজ করা হলে হেডমাস্টার মুবিনুরকে ফাসিয়ে দেয়।
অনেকদিন বাংলা বই হাতে নিয়ে পড়ি না, তাই ভাবলাম বান্ধুবির থেকে নিয়ে পড়ি। তো যেই ভাবা, সেই কাজ।১০০ পৃষ্ঠার একটা বই। মুবিন চরিত্রটিকে বেশ ভাল লেগেছে। একটু হেঁয়ালি, ভাবুক, প্রকৃতিপ্রেমী। রূপা চরিত্রটিও পছন্দের ছিল। উপন্যাসে একটা রোমাঞ্চকর আবেশের সৃষ্টি করেছে। আমার তো প্রায় প্রেমে পড়ি পড়ি অবস্থা!! নীলগঞ্জ হাইস্কুল নিয়ে উপন্যাসগুলো অনেক ভাল লাগে। পড়তে পড়তে নিজের স্কুল জীবনে হারিয়ে যাই। পুরো উপন্যাস জুড়ে একটা মোহনীয় শক্তি আছে। শেষ না করে উঠতে মন চাইবে না। সবশেষে বলতে চাই, এটি একটি গুড রিড উপন্যাস।
This entire review has been hidden because of spoilers.
শুধু এ বইতেই নাকি হুমায়ূন আহমেদের জীবনের ��্রতিফলন ঘটে নি। বাকি সব বই-ই কোনো না কোনোভাবে তাঁর জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। যাইহোক, হুমায়ূন আহমেদীয় কল্পনাশক্তির আরেকটি অনন্য উদাহরণ এটি!
এমন এক অদ্ভুত মানুষের প্রেমে পড়ে যায় ক্লাস টেনের ছাত্রী রূপা। রূপা অসম্ভব সুন্দরী। যথেষ্ট স্মার্ট ও বুদ্ধিমতীও। কিন্তু তার মন পড়ে থাকে স্যারের কাছে। কিছুতেই সে মাথা থেকে স্যারকে ঝেড়ে ফেলতে পারেনা। শেষে ঘটিয়েই ফেলে অঘটন।
হুমায়ূন আহমেদ তাঁর চিরাচরিত 'অল্পবয়সী টিনএজ বালিকাদের অপেক্ষাকৃত বয়স্ক পুরুষের প্রেমে পড়া' টাইপ ট্রেডমার্ক এই গল্পেও রেখেছেন। তাঁর নিজের জীবনের প্রতিফলন কি? হলেও হতে পারে। লেখকের লেখনীতে তাঁরই প্রতিবিম্ব ভেসে ওঠে।
রূপা চরিত্রটি বেশ দৃঢ়, স্মার্ট, একগুঁয়ে। হুমায়ূনের ক্যারেক্টারাইজেশনটা দুর্দান্ত। বলতে দ্বিধা নেই প্রেমে পড়ে গেছি। যদিও বাস্তবে এত কমবয়সে এমন পরিণত মেয়ে দুর্লভ।
নভেলাটির মূল সূত্র কিন্তু রূপা-মবিনুর রহমানের প্রণয় নয়। আদতে এটি সায়েন্স ফ্যান্টাসি। লেখক মবিনুর ও রূপার ভাগনি জেবার মধ্যে দিয়ে মানুষ অপেক্ষা ভিন্ন নতুন এক প্রজাতিকে দেখিয়েছেন যাদের নাম "নি"। নি রা জগত সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে নয়, স্বপ্নে, কিংবা বলা যায় অন্য মাত্রায়। এর বেশি কিছু জানা যায়নি, হুমায়ূন ধোঁয়াশা রেখে দিয়েছেন।
কিছু সুতা পাশাপাশি সমান্তরালে গেছে। যেমন মবিনুর রহমানের নামে মিথ্যা মামলা। রূপার পাগলামি নিয়ে বাসায় মনোমালিন্য ইত্যাদি। সব সুতা শেষে এসে এক গুঁটিতে মেলার কথা ছিল। কেনো যেনো মেলেনি। মোটকথা শেষটা মনঃ পুত হয়নি। একটু নাটুকে লেগেছে।
হুমায়ূন মানেই পেজ টার্নার (এটলিস্ট সায়েন্স ফিকশন ও সাইকোথ্রিলারগুলি)। শেষটা বাদ দিলে আমার মন্দ লাগেনি। অবাস্তব পরিস্থিতিগুলোও দেখি দিব্যি হজম করে ফেললাম।
রেটিং দিলাম পাঁচে চার। এক পয়েন্ট দিলাম মবিনুর রহমানের চরিত্রায়নে, দুই রূপার চরিত্রায়নে, বাকি এক পয়েন্ট কাহিনীর সাসপেন্স ধরে রাখার জন্য। নভেলার মূল আকর্ষণ 'নি' দের অনাকর্ষণীয় বানানোর জন্য এক কাটা গেলো!
সব ধরণের বই বা গল্প পড়ে সাধারণত ইতিবাচক কিছুই খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা থাকে। 'নি'ও তার ব্যতিক্রম নয়! যদিও বা 'নি' গল্পটি ফ্যান্টাসির জগৎ, কিন্তু প্রকৃতির সাথে মানুষের প্রকৃতপক্ষেই আছে এক সুন্দর বন্ধন বা সেতু। আর এই যোগসূত্রগুলোই যুগ যুগ ধরে মানুষ জেনে এসেছে বা আসছে কোয়ান্টাম মেকানিজম বা কোয়ান্টাম সাইন্স কিংবা ব্রাজিলিয়ান রাইটার কোয়েলহো'র উক্তিতে, "When you want something, all the universe conspires in helping you to achieve it."
মূলত প্রকৃতি ও মানুষের চিন্তাশক্তির মধ্যকার এই সংযোগ আমার কাছে সব সময়ই মনোমুগ্ধকর। আর তাই বইয়ের 'নি' চরিত্রগুলো ভীষণভাবে করেছে মুগ্ধ। শিখিয়েছে ইচ্ছাশক্তি ও ইতিবাচক চিন্তার আশ্চর্য ফল! হয়তো দৃঢ়ভাবে কোয়ান্টাম সায়েন্সে বিশ্বাস করার জন্যই 'নি' গল্প জগতে ফ্যান্টাসি পাঠক হয়ে পা রাখলেও উপসংহারে বাস্তববাদী কিছু অনুভূতি আর ইতিবাচকতাই গ্রাস করে বসে!
বিশ্বজগতের সাথে মানব মন সংযোগের সত্যতা হোক আর ২০২১ সালের পড়া শেষ বই-ই হোক, 'নি' গল্পটি থেকে যাবে মনের মাঝে বিশেষ স্থান নিয়েই...
When you read some novel, you find it interesting at first. As you keep reading, the gravity of the story pulls you inside the story. As you keep reading more, you start empathizing with the characters of the story. At this point, you are no longer reading but you are living in the story. Slowly but effectively, you start turning into one of the characters in the story. In my case, I turned into the main character of the story whose name is Mobinur Rahman, a school teacher. As the story went on, I could feel the happiness, and the sadness of other characters as well.
I am not revealing any part of the story, but I can assure any future reader that he or she will fall in love with Rupa, a student of Mobinur Rahman like I did. I must share that I read the novel a couple of days ago, but I can't get the story out of my head. In other words, I can not get out of the story.
আজ অনেকদিন পর হুমায়ুন আহমেদ এর "নি" উপন্যাসটা এক নিঃশ্বাসে পড়লাম। হুমায়ুন আহমেদের অন্যান্য লেখার মতো বেশ ভালোই লেগেছে এটিও।
মবিনুর রহমান, নীলগঞ্জ হাই স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষক, যার কিনা ক্রোমোজম সংখ্যা ৪৭ টি, তিনি কিনা আবার টেলিস্কোপ দিয়ে নদীতে বাঁধা নৌকায় বসে মহাকাশ ও পর্যবেক্ষণ করেন। একদিকে স্কুলে পড়ান, এলাকার প্রভাবশালীর মেয়ে রুপাকে টিউশনিও পড়ান, আবার নিজে রান্না করেই খান, অন্যদিকে ৩১টা বাচ্চাওয়ালা বিষধর চন্দ্রবোড়া সাপ দম্পতির সাথে দপ্তরির ভাঙা ঘরে রুম ভাগাভাগি করে থাকেন। গল্পের শেষ দিকটা বেশ উপভোগ্য ছিলো। কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃতির নিয়ম ভঙ্গ করাই যায় আর সেই নিয়ম ভঙ্গের শাস্তিও যেনো শাস্তি মনে হয় না। পড়া না হয়ে থাকলে পড়তে পারেন। সময় নষ্ট হবেনা।
আহা, অনেকদিন পরে একটা এমন বই পড়লাম। প্রকৃতি কাউকেই ছাড়ে না। রুপা জীবন্ত থাকলেও মবিনুর রহমান সাহেব তার জন্য নিজের জীবন দিয়ে মারা গেলেন..তিনি ছিলেন একজন অতি ক্ষমতাসম্পন্ন 'নি' । "নি" রা হলেন প্রকৃতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রকৃতি তাদেরকে নিজ সন্তানের মতো গড়ে তোলেন। তবে প্রকৃতির নিয়ম ভঙ্গ করা তাদের জন্য দৃঢ় ভাবে নিষিদ্ধ। কারো অধিকার নেই। এখানে সবাই সমান। মবিনুর রহমান সাহেব এটাই করেছিলেন। রুপার মতো একজন নিষ্পাপ নির্দোষ মেয়েকে তিনি বাচিয়ে দিয়ে নিজে "নি" দের দল থেকে আলাদা হয়ে গেলেন। মারা গেলেন। রুপা তাকে পেল না। ঘটনা যা ঘটার ছিল তা ঘটল না। হুমায়ুন আহমেদ স্যার আপনাকেই বলছি। কাজটা ঠিক করলেন না। কষ্ট দিলেন আমাকে...
বইটিতে ভালো লাগার মতো উপাদান পেলাম না, ২ তারার বেশি দিতে ইচ্ছে করছে না। অতটুকু জেবা আগে থেকে কি হবে সবকিছু বলে দিচ্ছিল,কিভাবে বলছিল !? গল্পের শেষটা কি হলো পরিষ্কার করা নাই।
জায়গার নাম নীলগঞ্জ। মবিনুর রহমান সেখানকার স্কুলের গম্ভীর টাইপের বিজ্ঞানের শিক্ষক। তিনি রূপা বলে একটি মেয়ে কে টিউশন পড়াতে যান।আর এই রূপা তার এই শিক্ষকটিকে অসম্ভব পছন্দ করে। এই মবিনুর রহমান এক স্বপ্ন দেখেন প্রায়ই। যারা স্বপ্নে আসে তারা পরিচয় দেয় নি বলে।আর তাদের দাবি মবিনুরও তাদের মতো নি, সে যা স্বপ্ন দেখবে তাই ঘটবে, নি রা অসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন হয় এই মূল। মবিনুর তার সর্বোচ্চ ক্ষমতা কোন কাজে ব্যবহার করবেন সেটাই দেখার।
মানুষের শরীরে ক্রোমোজোম সংখ্যা ৪৬ হলেও যারা নি তাদের শরীরে ক্রোমোজোম সংখ্যা ৪৭।
মবিনুর রহমান নামের এক স্কুল শিক্ষক আর রূপা নামের( হুমায়ূন আহমেদ স্যারের বই যেহেতু অবশ্যই হুরের চেয়ে কম সুন্দর না) মেয়েকে নিয়ে বইটার কাহিনী।
বইয়ের নামটার মতো বইয়ের কাহিনীটাও বেশ অন্যরকম লেগেছে। হুমায়ূন আহমেদ স্যারের বইয়ে এন্ডিং পাওয়া তো অমাবশ্যার চাঁদ। হ্যাপি এন্ডিং না হলেও এই বইটার একটা এন্ডিং ছিলো।
অনেক এ বলে সাইন্স ফিকশন।কিন্তু একে ফ্যান্টাসি বললে ভাল হয়। লেখাটি মবিনুর রহমান বলে একজন শিক্ষক এর যার একান্ত জানা না সত্ত্বেও একজন সুপার হিউম্যান যাকে বলে নি।বাংলায় এরকম ফ্যান্টাসি খুব কম ভাল কাজ আছে। এই লেখাতেই হুমায়ুন আহমেদ বিফ্যান্টাসি জগতে যে দেশের সেরা মানতে হয়।
ভালো বই। খুব ভালো নাকি অল্প ভালো তা বলতে পারছিনা। কাহিনীর দিক থেকে মোটামুটি ভালো আর বইটা পড়ে যে প্রশ্নগুলো মাথায় এসেছে সেগুলোর উত্তর মিলাতে না পেরে খুব ভালো বলতে পারছিনা।তবে শেষ দিকটা বেশ ভালো লেগেছে।সব মিলিয়ে ভালোই।খারাপ না।