মোবাইলে একটা ছবি এডিট করার ক্ষমতা নেই যার (করলেও সেই ছবির অবস্থা হয় একইসঙ্গে ভৌতিক এবং হাস্যকর), সেই আমি যদি AI-এর মতো আধুনিক সফিস্টিকেটেড তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে চিন্তাভাবনা করি, তাহলে কি মানায়? কিন্তু কী আর করা যাবে, জমানা যেদিকে এগোচ্ছে, একটু আধটু খবর না-রাখলে তো চলে না। ইউভাল নোয়াহ হারারির বইটা যদিও এতকিছু ভেবেচিন্তে কিনিনি। বরাবর এই লেখকের বই পড়তে ভালো লাগে, জানতে পারলাম তাঁর নতুন বই বেরিয়েছে, তাই কিনেছি। তো এই দফায় হারারির আলোচনার বিষয়বস্তু : A brief history of information networks from the stone age to AI.
উপরের ইংরিজি লাইনটা হলো বইয়ের উপ-শিরোনাম। প্রস্তর যুগ থেকে মানুষের দ্বারা উদ্ভাবিত এবং ব্যবহৃত বিভিন্ন information network (ভাষা, মিথোলজি, ব্যুরোক্রেসি, ধর্মগ্রন্থ, মুদ্রণযন্ত্র, বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র, সংবাদমাধ্যম, রেডিও, ইন্টারনেট, ইত্যাদি) নিয়ে আলোচনা করেছেন বটে, তবে শেষ অবধি এই বইয়ের মূল আলোচ্য বিষয় যে "আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স", সেটা বোধহয় ইতিমধ্যে প্রায় সবাই জেনে ফেলেছেন। হারারি প্রথমে খুব ধীরেসুস্থে এবং বেশ বিশদে একদম প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে হাল আমলের তথ্য-সম্প্রচার ব্যবস্থাগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। সমাজের উপর, রাজনীতির উপর, অর্থনীতির উপর, ধর্মের উপর, সর্বোপরি ব্যক্তিমানুষের উপর ইনফরমেশনের প্রভাব নিয়েও বিশদ আলোচনা করেছেন (বইয়ের প্রায় অর্ধেক আলোচনা এইসব বিষয়ে)। কারণ পুরো ইতিবৃত্তটা খোলসা না-হলে বর্তমান সমাজ এবং সভ্যতায় AI-এর প্রভাব আমার মতো বিজ্ঞানচর্চাহীন সাদামাটা পাঠকের মস্তিষ্কে সহজে ঢুকতো না। যদিও এই বইয়ের আলোচনা যতটা না প্রযুক্তি-বিষয়ক, তার চেয়ে বেশি আর্থসামাজিক। রাজনৈতিক।
হারারির প্রতিটা বইয়ের বিশেষত্ব হলো তিনি প্রচলিত চিন্তাভাবনাকে ভেঙেচুরে একটা নতুন রূপে পাঠকের সামনে হাজির করেন। এছাড়াও, হারারির প্রথম বই ("সেপিয়েন্স") থেকেই আরো একটা ব্যাপার খেয়াল করেছি, তিন��� তীব্রগতিসম্পন্ন অনুভূতিহীন অত্যাধুনিক যন্ত্রসভ্যতাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দ্যাখেন। তাই বলে পাঠককে পুনরায় সেই আদিম শিকারী জীবনে ফিরে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন, এমনটা নয়। তিনি শুধু এইটা বোঝাতে চান : আধুনিক সভ্যতার ব্যাপক অগ্রগতি নিয়ে নাচন-কোদন করার আগে একটু স্থির হয়ে বসে চিন্তা করো, বৎস। যতটা আহ্লাদে ডগমগ হচ্ছ, আদৌ কি ততটাও "মানুষ" হয়ে উঠেছে হোমো সেপিয়েন্স নামক প্রজাতিটা? নাকি বহু ক্ষেত্রে নিজের পায়ে কুড়ুল মারছি আমরা? এই বইতে এমন একটি প্রযুক্তি নিয়ে আমাদের সাবধান করেছেন তিনি, যেটাকে ঠিক মতো ব্যবহার করতে না-পারলে, সম্ভবত এটাই হবে শেষবারের মতো পায়ে কুড়ুল মারা। এরপর কুড়ুলও থাকবে না, পা-ও না, পায়ের মালিকও না। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিষয়ে হারারি ২০১৬ সালে প্রকাশিত তাঁর Homo Deus বইটিতে কিছু প্রাথমিক আলোচনা করেছিলেন বটে, কিন্তু গত আট বছরে তথ্যপ্রযুক্তির এই ক্ষেত্রটি বহু দিগন্ত অতিক্রম করে ফেলেছে।
২০২২ সালে চ্যাট-জিপিটি বাজারে আসার পর থেকে, দোকানে-বাজারে-মাঠে-ঘাটে-পথে-প্রান্তরে-ফেসবুকে-টুইটারে-ব্লগে-ভ্লগে-সংবাদপত্রের কলামে অসংখ্য মানুষ বাঁকা চোখে চাপা হেসে প্রতিনিয়ত মন্তব্য করে চলেছেন : আরে বাওয়া... মানুষের বুদ্ধি, মানুষের চেতনা, মানুষের অনুভূতি, মানুষের... ইয়ে কী যেন বলে... মৌলিক সৃজনশীলতা, এইসব আয়ত্ত করা কি অতোই সস্তা রে ভায়া? এই তো আজকে সকালেই চ্যাট-জিপিটি ব্যাটাকে দুটো সহজ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলাম। এমন হাস্যকর উত্তর দিলো, হাসতে হাসতে কাশি পেয়ে গ্যালো। এই এলেবেলে জিনিসটা নাকি মানুষকে টেক্কা দেবে, হাহাঃ!
হারারির বইটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় : এই বাঁকা-হাসিওয়ালা (এবং আমার মতো যারা বাঁকা হাসে না, কিন্তু এই বিষয়ে অজ্ঞ) মানুষদের প্রকৃত বিপদটা সম্পর্কে অবহিত করা। "আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স" প্রযুক্তিটি এখনও যে-পর্যায়ে রয়েছে, তাকে মানুষের জীবনচক্রের সঙ্গে তুলনা করলে বলতে হয়, এখনও সে হামাগুড়ি দিতেও শেখেনি। হাত পা ছুঁড়ে দোলনায় শুয়ে আঙুল চুষছে আর আবাবাবাবাবা গিগিগিগিগি এইসব দুর্বোধ্য কথা বলছে। কিন্তু এই দোলনা পর্যায়েই সে নিখুঁত ছন্দে কবিতা লিখছে (অসন্দিগ্ধ পাঠকের কাছে যেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত কোনো কবির নামে সহজেই চালিয়ে দেওয়া যায়)। ওস্তাদের মতো ছবি আঁকছে (ধরিয়ে না দিলে অনেকসময় বোঝার উপায় থাকে না সেটা কোনো বিখ্যাত চিত্রকরের আঁকা নয়)। গানের সুর সৃষ্টি করছে (এটার ব্যাপারেও একই কথা)।
শেয়ার বাজার কিংবা ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার বিপুল পরিমাণ জটিল হিসাবপত্র চোখের নিমেষে হজম করে ফেলছে। সুযোগ পেলে গোটা-গোটা প্রবন্ধ নিবন্ধ লিখে ফেলছে। অসংখ্য ধারা-উপধারা-দফা-অনুচ্ছেদ-কার্যবিধি-সংশোধনী সম্বলিত দেশের সংবিধানের খোলনলচে মুখস্ত করে ফেলছে (যেটা কোনো একক মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়)। এত বেশি পরিমাণে ফেক-টুইট কিংবা ফেসবুকে ফেক-স্ট্যাটাস পোস্ট করছে যে, ২০২২ সালের হিসেব অনুযায়ী সেইসব নকল পোস্টের সংখ্যা— দুনিয়ার সমস্ত পোস্টের শতকরা ৩০ ভাগ! মানে প্রতি তিনটে পোস্টের মধ্যে অন্তত একটা পোস্ট কোনো মানুষ লিখছে না, লিখছে একটা AI chatbot. এমনকি এই রিভিউটা আমি নিজে লিখেছি নাকি কোনো AI ওয়েবসাইট থেকে জেনারেট করা হয়েছে (পুরোটা না হলেও কিছুটা অংশ), এই ব্যাপারে পাঠকদের ১০০% নিশ্চিত হওয়ার উপায় নেই! 😅
এবং এসব ছাড়াও সে আরো অনেক কিছু করছে। এবং এটা সবে শুরু। এখানে কয়েকটা বিষয় জানিয়ে রাখা দরকার। আমরা ভাবছি মানুষ নামক প্রাণীটার সঙ্গে AI কোনোদিন পেরে উঠবে না কারণ, চৈতন্য (consciousness), ধী শক্তি (wisdom), বৈদগ্ধ্য (wit), আবেগ (emotion)— ইত্যাদি বিশেষ কয়েকটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে মানুষের মধ্যে, যেগুলো না-থাকলে সৃষ্টিশীলতা (creativity) আমদানি করা সম্ভব নয়। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ (এবং দুশ্চিন্তার) বিষয় হলো, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এইসব মানবিক গুণগুলোকে আদৌ পাত্তা দ্যায় না! আসলে সে "মানুষ" হতেই চায় না! সে আর্টিফিশিয়াল-ই থাকতে চায়! সে শুধুমাত্র INTELLIGENT হতে চায়! এবং intelligent হওয়ার জন্য সে আবেগের চেয়েও তথ্যের উপর বেশি নির্ভর করে।
ইতিমধ্যেই সে বহু ক্ষেত্রে মানুষের চেয়ে অনেকগুণ বেশি বুদ্ধিমান হয়ে গেছে! সে শুধু দুটো কাজ করে। যত বেশি সম্ভব ইনফরমেশন জোগাড় করে এবং সেই ইনফরমেশনকে বিশ্লেষণ কোরে একটা প্যাটার্ন খুঁজে বের করে। ব্যাস, এটুকুই তার কর্তব্য। ("Flooding people with data tends to overwhelm them and therefore leads to errors, flooding AI with data tends to make it more efficient.") একটু তলিয়ে ভাবলেই বোঝা যাবে, প্যাটার্ন খোঁজার এই পদ্ধতির দ্বারাই দাবা খেলায় সে অপরাজেয় প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছে (আজ থেকে মাত্র চল্লিশ বছর আগে এই ব্যাপারটা নিয়ে কম্পিউটার-বিজ্ঞানীরা হাসাহাসি করতো, কিন্তু বর্তমান পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই যে কম্পিউটারের বিরুদ্ধে খেলে জিততে পারে— জেতা দূরে থাক, জেতার কথা কল্পনাও করতে পারে!) বাঁকা হাসিওয়ালারা বলছেন, তো তাতে কী হয়েছে? "মেশিন-লার্নিং" পদ্ধতিতে দাবা খেলা শিখে গেছে বুঝলাম, কিন্তু ভ্যান গগের মতো ছবি এঁকে দেখাক দেখি। বেঠোভেনের মতো সিম্ফনি রচনা করে দেখাক দেখি। জীবনানন্দের মতো কবিতা লিখে দেখাক দেখি।
এখানেই একটা মস্ত বড় ভুল করে ফেলছি আমরা। মানুষের ইতিহাসে ভ্যান গগ কিংবা বেঠোভেন কিংবা জীবনানন্দ দাশের গুরুত্ব অপরিসীম, ঠিক কথা। কিন্তু একইসঙ্গে অ্যাডল্ফ হিটলার নামক ব্যক্তিটির গুরুত্বও অপরিসীম। জোসেফ স্ট্যালিন নামক গণহত্যাকারী খুনিটির গুরুত্বও অপরিসীম। ডোনাল্ড ট্রাম্প নামক নার্সিসিস্ট মিথ্যাবাদী লোকটির গুরুত্বও অপরিসীম। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নামক যুদ্ধবাজ জঙ্গিসর্দারটির গুরুত্বও অপরিসীম। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক মিথস্ক্রিয়ার গুরুত্বও অপরিসীম। আধুনিক পৃথিবীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে থাকা অর্থনৈতিক যোগাযোগ ব্যবস্থা (যার দ্বারা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে টাকা পাঠানো যায়)— তার গুরুত্বও অপরিসীম।
উপরে উল্লেখ করা সোনার টুকরো ব্যক্তিরা কিংবা উল্লিখিত ব্যবস্থাগুলির পরিচালকরা, এরা কেউই AI প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাকে দিয়ে ভ্যান গগের মতো ছবি আঁকাতে কিংবা লতা মঙ্গেশকরের মতো গান গাওয়াতে উৎসাহী হবেন না। জীবনানন্দ দাশের কবিতা বিষয়েও তাদের কণামাত্র উৎসাহ নেই। "বব ডিলান যদি শ্যামাসংগীত লিখতেন তাহলে সেটা কেমন হতো বলো দেখি?"— চ্যাটজিপিটিকে এইসব আজেবাজে প্রশ্ন করারও ইচ্ছে নেই তাদের। তাদের ইচ্ছে AI-কে কাজে লাগিয়ে সেইসব কাজ করানো, যেগুলো মানুষকে দিয়ে করানো যায় না (যেমন, দেশের জনগণের ব্যক্তিগত জীবনের উপরে চব্বিশ ঘণ্টা নজর রাখা)। করালেও প্রচুর খরচ হয়। কিছু ক্ষেত্রে খরচ করলেও কাজটা ঠিকঠাক হয় না। অথচ এইসব কাজ AI চোখের নিমেষে করে ফ্যালে! এবং নিখুঁতভাবে করে ফ্যালে। শুরুর দিকে যদি কিছু ভুলও করে, তবু মানুষের চেয়ে অনেক দ্রুততায় সেই ভুল সংশোধন করে ফ্যালে। মানুষের মতো তার বিশ্রাম নেওয়ার প্রয়োজন হয় না, ২৪/৭/৩৬৫ সে একাদিক্রমে কাজ করে যেতে পারে। তার কর্মদক্ষতা এত বিস্ময়কর যে, ওহে কিম জং উন, ওহে ভ্লাদিমির পুতিন, ওহে হি জিনপিং, ওহে আয়াতুল্লাহ খামেনি, চোখে না-দেখলে তোমাদের পেত্যয় হবে না হে!
বিপদের এখানেই শেষ নয়। বরং, সম্ভাব্য প্রকৃত বিপদের সঙ্গে তুলনা করলে এগুলো কোনো বিপদই নয়। কারণ আসল বিপদটা হলো, AI যদি নিজেই একজন কিম জং উনে রূপান্তরিত হয়ে যায়, তাহলে? কথাটা প্রথমবার শুনলে কল্পবিজ্ঞানের আজগুবি গল্প বলে মনে হয় (এবং বাঁকা হাসতে ইচ্ছে করে)। মনে হয়, AI-এর অনেক ক্ষমতা আছে বুঝলুম রে বাবা, কিন্তু তার চাবিকাঠি তো রয়েছে মানুষেরই হাতে। সত্যিই কি রয়েছে মানুষের হাতে? ইউভাল নোয়াহ হারারি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ অন্তর্দৃষ্টি এবং যুক্তিসম্মত বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, হ্যাঁ এখনও পর্যন্ত মানুষের হাতে রয়েছে বটে, কিন্তু খুব দ্রুত সেই চাবিকাঠি হাতছাড়া হয়ে যেতে চলেছে (যদি-না সাবধান হওয়া যায়)। এমনকি ইতিমধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দোসর, যার নাম "সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগোরিদম"— ইনি এমন কিছু কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছেন, এবং প্রতিনিয়ত ঘটাচ্ছেন, যে সত্যি কথা বলতে, ভবিষ্যতের পরিস্থিতি আজকের দিনেই আন্দাজ করে ফেলতে খুব বেশি অসুবিধে হচ্ছে না!
এই আর্টিফিশিয়াল বুদ্ধিমত্তার কাজকর্ম কিছু ক্ষেত্রে এতটাই অদ্ভুত, অচিন্তনীয়, অকল্পনীয়, অভাবনীয় যে হারারি মন্তব্য করেছেন, AI-কে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এর বদলে "এলিয়েন ইন্টেলিজেন্স" নামে ডাকলেও কথাটা একেবারেই বেঠিক হবে না। কারণ কোটি কোটি বছর যাবৎ বিবর্তনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা মানুষের "অর্গান���ক" বুদ্ধিমত্তা এবং মানবিক প্রবৃত্তির সঙ্গে AI-এর যান্ত্রিক, ইনঅর্গানিক, অশরীরী, অনুভূতিশূন্য, আপাদমস্তক কৃত্রিম, শীতল বুদ্ধিমত্তার পার্থক্য ইতিমধ্যেই বেশ বুঝতে পারা যাচ্ছে। আমি তো এই বইটা পড়ার আগে জানতামই না যে, মিয়ানমারে সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা সংকটের পিছনে ফেসবুকের, কিংবা ২০১৯ সালে ব্রাজিলের কট্টর দক্ষিণপন্থী নেতা জাইর বোলসোনারো'র উত্থানের পিছনে ইউটিউবের এমন প্রত্যক্ষ অবদান ছিল! অবদান তো আসলে ফেসবুক কিংবা ইউটিউবের নয়, এইসব সোশ্যাল মিডিয়া ওয়েবসাইটের "অ-মানবিক" অ্যালগোরিদমের।
"হীরক রাজার দেশে" ছবিতে সত্যজিৎ রায় গান লিখেছিলেন : "নহি যন্ত্র, নহি যন্ত্র, আমি প্রাণী। আমি জানি, আমি জানি, আমি জানি— হীরক রাজার শয়তানি!" হীরক রাজা ছিল রক্তমাংসের শয়তান। শয়তান হলেও তার মাথায় ছিল মানুষেরই বুদ্ধি। তাই তার শয়তানি ধরে ফেলা গেছিল। এবং সেই শয়তানির যথাযথ মোকাবিলা করা হয়েছিল। কিন্তু যে-রাজা রক্তমাংস দিয়ে তৈরি নয়, যে-রাজার মস্তিষ্ক রক্তমাংসের মস্তিষ্ক নয়, যে-রাজার বুদ্ধির বিচিত্র গতিপথ মানুষের মতো নয়, সেই রাজা যদি কোনোভাবে ক্ষমতাবান হয়ে যায়, তার মোকাবিলা মানুষ কীভাবে করবে? পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম, মানুষের মোকাবিলা মানুষের সঙ্গে নয়, একটা অপার রহস্যময় এলিয়েন ইন্টেলিজেন্স-এর সঙ্গে।
এবং এই এলিয়েন ইন্টেলিজেন্স এই মুহূর্তে ছোট্ট দোলনায় দুলতে দুলতে হাত পা ছুঁড়ে আঙুল চুষছে, আর গিগিগিগিগি আবাআবাবাবাবা এইসব দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলছে। তার এইসব বালখিল্য কাণ্ড দেখে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ বাঁকা হাসি হাসছে বটে, তাকে তাচ্ছিল্য করছে বটে, কিন্তু একদিন তো সে বড় হবে। একদিন তো সে হাঁটতে শিখবে। এবং সেই দিনটা কিন্তু খুব বেশি দূরে নয়। আজ থেকে মাত্র ২০ বছর আগে (২০০৪ সালে, খুব সম্ভবত এই সেপ্টেম্বর মাসেই!) আমি যখন নোকিয়া ৩৩১০ মোবাইলে আমার জীবনের প্রথম মেসেজটা টাইপ করছিলাম, তখন কি ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেছিলাম যে আজকে স্মার্টফোনে বাংলা ভাষায় এই রিভিউটা লিখে গুডরিডস ডট কম নামের একটা ওয়েবসাইটে পোস্ট করতে পারবো? ২০ বছর পরে আজকে প্রযুক্তির গতিও ২০ গুণ বেড়ে গেছে। (নাকি আরো বেশি?)
মুশকিলটা হলো—
"As long as humanity stands united, we can build institutions that will control AI and will identify and correct algorithmic errors. Unfortunately, humanity has never been united."
অতএব, এর পরে যে কী হইবে জানে শ্যামলাল!