বাংলাদেশের এক যুবকের কথা ভাবি যে দূরের ছোট্ট দ্বীপ দেশ কিউবার দিকে কৌতূহলে তাকায়। মাত্র বছর বত্রিশের এক তরুণ ক্যাস্ট্রো তার সহযোদ্ধাদের নিয়ে পরাক্রমশালী আমেরিকার একেবারে নাকের ডগায় ঘটিয়ে ফেলেছিলেন এক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। তারপর আমেরিকার অবিরাম বিরোধিতা আর চোখ রাঙানির ভেতরও টিকিয়ে রেখেছেন সেই বিপ্লবের মন্ত্রকে। একসময় নদীর পাড় ভাঙার মতো পৃথিবীর চারদিকে এক এক করে শোনা গেল সমাজতান্ত্রিক চরাচরের ভাঙনের শব্দ; কিন্তু তবু ক্যাস্ট্রো তার নিঃসঙ্গ দ্বীপটিকে জ্বালিয়ে রাখলেন সেই পুরনো স্বপ্নের বাতিঘর। যুবকের জানতে ইচ্ছা হয় কী করে পারলেন তিনি? ক্যাস্ট্রোর নিজ মুখে সে তখন শোনে নাগরদোলায় চড়া তার আশ্চর্য জীবনের গল্প।
Shahaduz Zaman (Bangla: শাহাদুজ্জামান) is a Medical Anthropologist, currently working with Newcastle University, UK. He writes short stories, novels, and non-fiction. He has published 25 books, and his debut collection ‘Koyekti Bihbol Galpa’ won the Mowla Brothers Literary Award in 1996. He also won Bangla Academy Literary Award in 2016.
ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সাথে বাংলাদেশী এক যুবকের কথোপকথোন, ডকুফিকশনের আদলে লেখা, যেখানে ফুটে উঠেছে ফিদেলের পাহাড়সম ব্যক্তিত্ব, কথার পিঠে কথায় হারিয়ে যেতে হয়- এক জন্মবিপ্লবীর ছেলেবেলায়, যৌবনে, প্রেমে, বিপ্লবে। আমেরিকার নাকের ডগায় বসে ছোট্ট কিউবা কিভাবে অসাধ্য সাধনক্ষম হয়ে ওঠে সে উপাখ্যান। বাংলাদেশের সাথে ফিদেলের সামান্য কিছু স্মৃতিও রোমন্থিত হয়, যুদ্ধের পর বিজয় ছিনিয়ে নেয় অযোদ্ধারা- সে আশংকা ক্রাচের কর্ণেলের মত এ বইতেও ফিদেলের জবানিতে বলে যান শাহাদুজ্জামান। বইটা পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিলো, প্রশ্নকর্তা এ যুবকটি যেন শাহাদুজ্জামান নিজেই, কখনো মনে হয়েছে না এ তো আমি- আমারও তো এমন কিছু জিজ্ঞেস করবার ছিল এ প্রখর বিপ্লবীকে। ধন্যবাদ শাহাদুজ্জামানকে এত কাছ থেকে এ মানুষটিকে এভাবে দেখবার সুযোগ করে দেবার জন্য।
‘ডকুফিকশন’সাহিত্যের একটি আধুনিক হাইব্রিড জনরা। বাংলা সাহিত্যে ডকুফিকশনের ধারা খুব একটা পরিচিত নয় পাঠকের মাঝে। অল্প কিছু ডকুফিকশন লেখার প্রয়াস লেখকেরা দেখিয়েছেন। শাহাদুজ্জামানের ডকুফিকশন ‘আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে’ইতোমধ্যেই বেশ সাড়া ফেলেছে। যদিও অনেক সমালোচকই তাঁর উপন্যাস ‘ক্রাচের কর্নেল’কে ডকুফিকশন আখ্যায়িত করে থাকেন, আমি একে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলতে আগ্রহী। কারণ, এই উপন্যাসের ঘটনাক্রম একেবারে ঐতিহাসিক সত্য; এতে ফিকশনের চেয়ে ইতিহাসের ছায়াই বেশি। কিন্তু ‘আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে’র ফিকশনটুকু একেবারে নিখাদ ফিকশন। সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী এক বাংলাদেশি যুবকের কথা লেখক কল্পনা করেছেন যে পৃথিবীর অপর প্রান্তের ছোট্ট দ্বীপদেশ কিউবার দিকে তাকায় কৌতুহলভরে। কিউবার বিপ্লবী ফিদেল ক্যাস্ট্রোর ভাবনায় বিভোর হয়ে একদিন সে যুবক নিজেকে আবিষ্কার করে ক্যাস্ট্রোর পড়ার ঘরে। শুরু ক্যাস্ট্রো ও যুবকের মধ্যকার দীর্ঘ কথোপকথন। এ নিয়েই এগিয়েছে ‘আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে’ গ্রন্থটি। যুবকের সঙ্গে কথোপকথনে ক্যাস্ট্রো যে সব তথ্য,যেমন- নিজের পরিবারের ইতিহাস, ব্যক্তিগত তথ্য, কিউবার ইতিহাস, বিপ্লবের ঘটনাবলী ইত্যাদি; দিয়েছেন- সে সমস্ত তথ্য শাহাদুজ্জামান ইতিহাসম্মত এবং বিভিন্ন প্রামাণ্য সূত্র থেকে নিয়েছে। বিভিন্ন বই, ডকুমেন্টরি,ফিচার ফিল্ম- থেকে সাহায্য নেবার কথা লেখক বইয়ের ভূমিকাতেই লিখেছেন। প্রামাণ্য সূত্র থেকে তথ্য নেয়ায় গ্রন্থটি হয়ে উঠেছে চমৎকার ডকুফিকশন- যার মাঝে তথ্য এবং কল্পনার সঠিক মিশ্রণ রয়েছে।
বইটি পড়ার সময় একটা প্রশ্ন আমার মাথায় উঁকি দিয়েছে গেছে। শাহাদুজ্জামান চাইলেই ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে নিয়ে বাংলা ভাষায় একটি প্রামাণ্য জীবনী-গ্রন্থ লেখায় হাত দিতে পারতেন। কিন্তু তা না করে কেন তিনি ডকুফিকশনকে বেছে নিলেন? উত্তর শুরুতে পাইনি। তবে যতোই পড়েছি ততোই বুঝতে পেরেছি যে রসকষহীন ইতিহাসগ্রন্থ ক্যাস্ট্রোর জীবনের নানা তথ্য এবং আদর্শ তুলে ধরতে পারলেও তাঁর স্বভাব, যুক্তি প্রদানের পদ্ধতি এবং ব্যক্তিত্ব তুলে ধরতে পারত না। এসব বিষয় উপলব্ধি করা জন্য ব্যক্তিকে সামগ্রিকভাবে উপস্থিত থাকতে হয়, যা এই গ্রন্থের ফিদেল ক্যাস্ট্রো’র মাঝে ছিলো। আন্তরিক ক্যাস্ট্রোর প্রচুর কথা বলার অভ্যাসের সঙ্গে এই গ্রন্থে মাধ্যমে পরিচিত হই। ক্যাস্ট্রোর বাচাল স্বভাব নিয়ে তাঁর প্রিয় বন্ধু গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলেছেন, ‘তিনি যখন কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখন বিশ্রাম নেওয়ার জন্য কথা বলেন’।
যুবকের সাথে ক্যাস্ট্রোর কথোপকথনে নানা বৈচিত্র্যময় বিষয় উঠে এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই বেশি জায়গা দখল করেছে কিউবা এবং তাঁর বিপ্লবের গল্পগুলো। শাহাদুজ্জামান চমৎকার একটি কাজ করেছেন। সেটি হলো- ক্যাস্ট্রোর বিপ্লবের গল্পগুলো বলার আগে তাঁর মুখ দিয়েই তাঁর পরিবার এবং কিউবার ইতিহাসের বাঁকগুলো বলিয়ে নিয়েছেন যাতে পাঠকের কিউবার বিপ্লবের পূর্ব-কথা এবং ভিত্তিগুলো পাঠকের জানা হয়ে যায়। তাই বইটিতে কিউবার বিপ্লব পূর্ববর্তী ঔপনিবেশিকতা, শোষণ, বৈষম্য, পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রাসন, আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন প্রদর্শনী ইত্যাদি নানা জটিল রাজনৈতিক বিষয় ঠাই পেয়েছে। কিন্তু পড়তে গিয়ে কখনোই মনে হয়নি এটি রাজনৈতিক কিংবা ইতিহাসের বই, বরং মনে হয়েছে যেন এক প্রৌঢ় তাঁর পূর্ব-জীবনের কথা শোনাচ্ছে তাঁর উত্তরসূরিকে। এখানেই শাহাদুজ্জামান সফল; ভূ-রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক এবং অর্থনৈতিক কন্টেন্টগুলো আলাপের ঢঙ্গে পাঠকের সাথে শেয়ার করতে পেরেছেন। যুবকের পাল্টা প্রশ্নের উত্তরে ফিকশনাল ক্যাস্ট্রো যেভাবে উত্তরগুলো দিয়েছেন, তাতে তাঁর চিন্তার ধরণও পাঠকের কাছে পষ্ট করে তুলে ধরতে পেরেছেন লেখক। বিশ্ব মিডিয়ায় ক্যাস্ট্রোকে নিয়ে এবং কিউবার সমাজতন্ত্রী সরকারকে নিয়ে যেসব অভিযোগ হররোজ উচ্চারিত হয় তার অনেক কয়টির জবাবও বইয়ে আমরা পাবো। তবে পুঁজিবাদ এবং সমাজতন্ত্রের মধ্যকার বিতর্কে যেসব বিষয় বইয়ে উঠে এসেছে সেসবের মাঝে নিরপেক্ষতার স্বাদ খুব কমই পাওয়া যাবে। কারণ স্বাভাবিকভাবেই, একজন সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী বিপ্লবীকে নিয়ে লেখা বইয়ে তাঁর আদর্শের কথাই মূলত অধিকাংশ জায়গা দখল করবে এবং তাঁরই গুণগান গাইবে; এতে অবাক হবার কিছু নেই। আমরা জানি যে, একসময় সমাজতন্ত্রের আদর্শে আস্থা রেখেছিলেন শাহাদুজ্জামান; হয়তোবা এখনো রাখেন। ক্যাস্ট্রোর মুখে যেসব সংলাপ আমরা পড়ি, তার কিছু হয়ত শাহাদুজ্জামানের আদর্শকে প্রতিফলিত করে। এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়; আমরা বরং লেখকের ব্যাখ্যার অপেক্ষায় থাকি।
বাংলাদেশী যুবকের সাথে কথোপকথনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গও বারবার উঠে এসেছে। স্বাপ্নিক তরুণ বারবার ক্যাস্ট্রো কাছে জানতে চেয়েছে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি কীভাবে পালটানো যায়। জবাবে ক্যাস্ট্রো বলেছেন যে, সবার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ভৌগোলিক অবস্থান ভিন্ন; সবাইকে যার যার পথ নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে। দেশের হতাশ যুব-সমাজ ক্যাস্ট্রোর প্রজ্ঞা এবং জ্ঞান থেকে দিশা পেতে পারে; পেতে পারে রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করে দেশের কপাল পাল্টে দেয়ার পথ। ভবিষ্যতের পথ খুঁজে পেতে আমাদের বরাবরই পেছনের দিকে ফিরে তাকাতে হয়, তাকানো উচিত। ‘আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে’ আমাদেরকে সেই পথই দেখাতে চাইবে।
বইয়ের প্রোডাকশন খুবই ভালো। ছাপার মান সন্তোষজনক। ভুল বানান এবং মুদ্রণপ্রমাদ প্রায় নেই বললেই চলে। শিবু কুমার শীলের তৈরি নান্দনিক প্রচ্ছদ দারুণ মানিয়েছে বইয়ের বিষয়বস্তুর সাথে, বাড়িয়ে দিয়েছে বাহ্যিক সৌন্দর্য। সব মিলিয়ে সংগ্রহে রাখার এবং পড়ার মতোই বই- ‘আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে’।
শাহাদুজ্জামানের সাথে ক্যাস্ট্রোর কাল্পনিক কথোপকথনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বইয়ের মূল স্তম্ভ। কথোপকথন পড়তে বেশ আনন্দদায়ক হলেও মাঝে মাঝে হয়ত তথ্যের চাপে সাহিত্যগুণ হারায় অনেক লেখাই। কিন্তু, শাহাদুজ্জামানের ব্যাপারখানাই আলাদা। রোমাঞ্চকর ভাবে তিনি ফিদেল ক্যাস্ট্রোর জীবনকাহিনী ফুটিয়ে তুলে���েন।
অবশ্য ক্যাস্ট্রো সাহেবের জীবনকাহিনী কম নাটকীয় নয়, বেশ কয়েকবার মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে এসেছেন ক্যাস্ট্রো সাহেব, নইলে কিউবার ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত। অবশ্য এক্ষেত্রে, মার্তির সেই বিখ্যাত উক্তিটি মনে পড়ে, যে পাথর একবার পাহাড় থেকে নেমেছে সেই পাথর তার গন্তব্যে পৌঁছুবেই। কোথাও সে বাধাপ্রাপ্ত হবে, কোথাও তার গতি শ্লথ হবে, কিন্তু যেখানে যাওয়ার সে যাবেই। ক্যাস্ট্রো ও সে পাথর, যে পাথরের উপর ভর দিয়ে ঘুরে যাবে কিউবার ইতিহাসের পাল্লা। বাতিস্তা থেকে দেশের ক্ষমতা দখল করে নেয়া শেষ ছিল না, সে ছিল সবে শুরু। মার্কিনীদের বিপক্ষে বহু যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়েছে কিউবা কে। তবুও, স্বাধীনতার প্রতি সাধারণ মানুষের আকুলতায় ছাড়িয়ে গেছে সব বাধা বিপত্তি৷
বামপ্রীতি সম্পন্ন লেখকের কাছ থেকে ক্যাস্ট্রোর বন্দনা শুনতে হবে, এটা জেনেই পড়া শুরু করছিলাম। লেখনীর জোরে অদ্ভুত রকমের ভাল লাগল।
ডকুফিকশন এই লেখাটা আমার শুরুতে অতটা পছন্দ হয় নি। পুরোপুরি ননফিকশন লিখতে চাচ্ছিলেন না বলে হয়ত অনেকটা কাল্পনিক সাক্ষাৎকারমূলক ডকুফিকশনাল এক্সপেরিমেন্ট করেছেন । কিন্তু ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সাথে কথোপকথনরত যুবকের ভূমিকাটা আমার খুব ডামি মনে হয়েছে। শুরুতে যুবকের ডায়লগ গুলোও খুব naive ছিল , ফলে ফিদেল ক্যাস্ট্রোর জবানিতে তাঁর সংগ্রামের যে কথাগুলো স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে তুলে ধরা হয়েছে তার ফ্লো টা আমার মনে হয়েছে বাধা পেয়েছে। তবে হ্যাঁ পরে যুবকের জবানীতে কিছু useful প্রশ্ন করা হয়েছে ক্যাস্ট্রোর বক্তব্যগুলোকে একটা ডিরেকশন দেবার জন্য । আমার মনে হয় ডকুফিকশন এক্সপেরিমেন্ট টা অনেকটা স্ট্র্যাটেজিক , যেমন টা লেখকের 'একজন কমলালেবু' এই ননফিকশনাল বায়োগ্রাফি বইটাকে উপন্যাস হিসেবে মেনশন করা ।
বাইশের গোড়ার দিকে পড়া বই। কিন্তু এখনো মনের মাঝে কি দগদগে হয়ে আছে। রচনার চমৎকারিত্বই সবচেয়ে মুগ্ধ করেছে। বাংলাদেশের এক যুবকের ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে কাল্পনিক কথোপকথন বা সাক্ষাৎকারই হচ্ছে 'আধো ঘুম ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে '। ছোট একটা বই, তবু তার কি ভার! ইতিহাস, ভূগোল, রাজনীতি ইত্যাদি সমস্ত কিছুকে শাহাদুজ্জামান কলমের ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে উঠেছিলো। তথ্যে ভারে নুয়ে পড়েনি, কোনো আধিখ্যেতা নেই, নেকামি নেই। এই বইয়ের রেশ এখন আমার মধ্যে আছে। হয়তো আরো অনেক দিন থাকবে
নিয়ত করছিলাম যে শেষ করে ঘুমাবো তাইতো ঘুমানোর রুটিন টাইম পার হওয়ার পরও পড়লাম বইটা! যাহোক, বইটা মূলত ক্যাস্ট্রোর জীবনী। কিন্তু উপস্থাপনায় অভিনবত্ব আনতে লেখক এক বাংলাদেশী যুবকের সাথে ক্যাস্ট্রোর একটা কাল্পনিক সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করেছেন। এমন এক যুবক যে ক্যাস্ট্রোতে মুগ্ধ ( ভূমিকা অনুযায়ী লেখক নিজেই) সে নানা প্রশ্নের মাধ্যমে ক্যাস্ট্রোর জীবনের নানা ঘটনাকে তুলে এনেছে। কিউবা ও বিপ্লব সম্পর্কে জানতে ভালো একটা বই হতে পারে বইটা। বেশ ভালো লেগেছে বলা যায়।
"আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে" একটি ডকু-ফিকশন ধারার বই। মাত্র ৭০ পাতার একটা বইয়ে "ফিদেল" কে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন লেখক। ফিদেল এবং কিউবাকে নিয়ে নতুন কারো আগ্রহ জাগানোর জন্য কামেল এই বই।
ফিদেল কিউবার বিপ্লবী নেতা। তার রয়েছে একটা বিচিত্র জীবন। যে মানুষ মাত্র ৩০ বছর বয়সে বিপ্লব করে একটা শাসিত, শোষিত, নিপীড়িত দেশকে এনে দিয়েছিল মুক্তি, প্রতিষ্ঠা করেছিল সমাজতন্ত্র। শুধু এতেই থেমে নেই,সারা জীবন লড়াই করে গেছেন অন্যায়,অত্যাচার,শোষণ এর বিরুদ্ধে।
ফিদেল অবিস্মরণীয় একটা মানুষ। তাঁকে জানা শুরু করার জন্য "আধো ঘুমে কাস্ট্রোর সঙ্গে " দারুণ সহায়ক। শাহাদুজ্জামানের কাজ আমার সব সময় নিখুঁত এবং রুচিসম্মত মনে হয়। এটাও তার ব্যতিক্রম নয়।
ক্যেস্ট্রো সম্পর্কে জানতে পারলাম। কিউবার বিপ্লব, এর পেছনের ইতিহাস, চে গুয়েভারার সাথে ক্যেস্ট্রোর সাক্ষাৎ আর যুদ্ধ। শেখ মুজিববের সাথে ক্যেষ্ট্রোর সাক্ষাৎ ও চুক্তি এবং আমেরিকার হস্তক্ষেপ ইত্যাদি।
ক্যাস্ট্রোর ভাবনায় বিভোর বাংলাদেশের সেই যুবকটি ডকুফিকশনে তেমন কোন ভূমিকা পালন করতে পারলো না। পড়ে মনে হলো শ্রেফ কথোপকথন রিপ্রেজেন্টেশনের জন্য যুবক মাঝে মাঝে কিছু প্রশ্ন করছিল, প্রশ্নগুলো রিডান্ডেন্ট। বেশির ভাগ জায়গায় কেবল প্রয়োজনের তাগিদে, এমনকি মাঝে মাঝে প্রশ্নগুলো স্পন্সরড অ্যাডের এর মতো ফ্লো নষ্ট করেছে বলে মনে হয়েছে। তবে বইটাটে খুব সংক্ষেপে কিউবার ইতিহাস-রাজনীতির চড়াই-উৎরাই, ক্যাস্ট্রোর বীরত্বগাথার পাশাপাশি সাহিত্যপ্রেম, বন্ধুত্ব, মাতৃপ্রীতির বেপারগুলো উঠে এসেছে।
সারা দুনিয়া জুড়ে যখন এক মহাপরাক্রমশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষ আর মানুষের সমাজের অন্তরাত্মা শুষে ক্রমে শুষ্ক বিরান করে তুলছে, তখন বিকল্প ব্যবস্থাগুলো আসলে কেমন বা সে ব্যবস্থায় মানুষের সমাজের রূপ কেমন হয় বা তা কেমন করে হাসিল করা যায়-এমন সব প্রশ্ন কারও কারও মনে উঁকি দিয়ে যেতেই পারে । সোভিয়েত বিপ্লব বা কিউবার বিপ্লবের দিকে তাই চোখ চলে যায় । কিন্তু সোভিয়েত বা কিউবা সকলেই যে ন্যাক্কারজনকভাবে পুঁজিবাদী প্রোপাগান্ডার শিকার । প্রোপাগান্ডার জঙ্গল হাতড়ে তাই সাধারণের জন্য সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সরূপ বোঝাটা একটু মুশকিল । মুশকিলটা আরও বেড়ে যায় প্রথম পরিচয়টার বিষয়ে নজর দিলে । সে দিক থেকে ভাবলে শাহাদুজ্জামানের "আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে" বইটি বেশ কাজের । কিউবার উপনিবেশিক ইতিহাস থেকে মার্কিন পুঁজিবাদী আগ্রাসন আর এরপর কিউবার জমিন থেকে ক্যাস্ট্রোর মত বিপ্লবী জননেতার উঠে আসার গল্প খুব সহজ এবং সংক্ষিপ্ত আকারে উঠে এসেছে শাহাদুজ্জামানের ভাষায় । সংক্ষিপ্ত হলেও, কথাচ্ছলে আর ক্যাস্ট্রোর জবানীতে পড়তে বেশ লেগেছে । কিউবা আর ক্যাস্ট্রোর সাথে প্রাথমিক পরিচয়ের ব্যাপারটা এই বইয়ের মাধ্যমে ঘটে যেতে পারে এবং পরে আগ্রহীরা আরও জানবার তাড়না অনুভব করতে পারেন । তার জন্য লেখককে সাধুবাদ ।
বাংলাদেশের এক যুবকের সাথে বৃদ্ধ ক্যাস্ট্রোর কথোপকথন এই ছোট্ট উপন্যাসের পাটাতন । শুনলে দারুণ একটা ব্যাপার বলে মনে হয় । তবে সৃজনশীলতার দৃষ্টি থেকে কারিগরির সীমা এই পর্যন্তই- বাংলাদেশের এক যুবকের সাথে অবসরপ্রাপ্ত ক্যাস্ট্রোর বাতচিত । যুবক বাঙাল হওয়াতে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ এসে গেছে স্বাভাবিকভাবেই । কথা চলেছে হালকা চালে, মাঝে মাঝে প্রবীণের স্মৃতিকাতরতার রেশও আছে । কিউবা আর বাংলাদেশের ইতিহাসের পালা বদলের বাঁকগুলোর মিল চোখে পড়তে পারে প্রায় । তবে কিউবা পারলেও আমরা পারি নি । যাহোক, কিউবা আমাদের জন্য এখনো গুরুত্বপূর্ণ । কারণ, সোভিয়েত ধ্বসে পড়লেও কিউবা টিকে আছে । সবাই ভেবেছিল ক্যাস্ট্রো মরলেই বুঝি সব শেষ হয়ে যাবে । কিন্তু কিউবা টিকে গেল । তা নিশ্চয়ই কপাল জোরে হয় নি । কিছু মানুষের সচেতন সিদ্ধান্ত এবং কর্মপরিকল্পনা বাস��তবায়নের ফলশ্রুতিতে হয়েছে । জানি না এমন বিরূপ পৃথিবীতে, মার্কিন দেশের নাকের ডগায় বসে কিউবা আর কতদিন তার নিজস্ব ধারার সমাজন্ত্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবে । তবে কিউবার, তার সংগ্রামী মানুষদের জন্য ভালবাসা । ক্যাস্ট্রোর জন্য ভালবাসা আর ভালবাসা নাম জানা-না জানা আরও অসংখ্য সংগ্রামী-বিপ্লবী মানুষদের জন্য যারা যুদ্ধ করেছেন-করে যাচ্ছেন একটি সমতাভিত্তিক মানব সমাজ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে ।
"আমাদের তোমরা হত্যা করতে পার কিন্তু তোমরা আমাদের বিশ্বাসকে, আদর্শকে, বিপ্লবকে হত্যা করতে পারবে না। আমরা ফিরে ফিরে আসব।"
স্প্যানিশ জাহাজ নিয়ে ইন্ডিয়ার উদ্দ্যেশে বের হয়ে কলম্বাস ভুলবশত কিউবায় এসে পৌঁছায়। ভুল শুধরে দেয় ইতালীয় নাবিক 'আমেরিগা ভেস পুসি'।তার নামেই নাম দেওয়া হয় ঐ ভুখন্ডকে 'আমেরিকা'। স্পেনীয়রা কিউবার মাটিতে পা দিতেই কিউবার স্থানীয় আদিবাসীদের সংখ্যা আশ্চর্যজনকভাবে কমে যায়। আফ্রিকা থেকে আনা দাসদের দিয়ে নগর পত্তন করে স্পেনীয়রা। কিউবা যায় স্পেনের দখলে। কিন্তু কিউবার বিপ্লবী হোসে মার্তি স্পেনের বিরুদ্ধে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ শুরু করে। আমেরিকার নাকের ডগায় থাকা কিউবার রাশ স্পেনের হাতে থাকবে - এটা মেনে নিতে পারেনি আমেরিকা।তাই তারাও যুদ্ধ ঘোষণা করে স্পেনের বিরুদ্ধে। দীর্ঘ ৪ বছর যুদ্ধের পর কিউবার প্রভু বদলে এবার আমেরিকা হলো। সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ফিদেল কাস্ত্রো সবই দেখছিলেন।মানুষকে দাসত্বের অধিনতা থেকে মুক্তি দিতে তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন আমেরিকার বসানো পুতুল জেনারেল বাতিস্তার সাথে। বিভিন্ন সংগ্রাম ও জেল খাটার পর ফিদেল শুরু করেন গেরিলা যুদ্ধ।পতন হয় আমেরিকার বসানো শাসকের। কিন্তু প্রতিবিপ্লবীদের সাথে নিয়ে আমেরিকা চালাতে থাকে ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধের খেলা।তারা কিউবার সাথে সব অর্থনৈতিক চুক্তি বাতিল করে। বিপর্যস্ত কিউবা সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য চায়।এতে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ু যুদ্ধের সূচনা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিউবা আরো সংকটে পড়ে। আমেরিকার নাকের ডগায় বসে দুর্দশাগ্রস্ত কিউবার অর্থনীতি,পর্যটন শিল্প ও স্বাস্থ্যখাতকে উন্নত করে জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সমাজতন্ত্রের চেতনায় কিউবাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায় কাস্ত্রো।
বাংলাদেশী এক যুবকের সাথে ফিদেল কাস্ত্রোর কাল্পনিক কথোপকথনের মাধ্যমে বেরিয়ে এসেছে কিউবার সংগ্রাম, আমেরিকার আগ্রাসন, ফিদেল কাস্ত্রোর শৈশব ও রাজনৈতিক জীবন। ছোট কিন্তু তথ্যে ভরপুর এই ডকুফিকশন পাঠককে আঠার মত আটকে রাখে।
অজ্ঞাতসারেই ফিদেল ক্যাস্ট্রোর জন্মবার্ষিকীতে বইটা পড়া শুরু করেছিলাম। ১৯২৬ সালের ১৩ আগস্ট কিউবার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেন ফিদেল ক্যাস্ট্রো। বইটা মূলত ফিদেল ক্যাস্ট্রোর জীবনী আর সেই সাথে কিউবাকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামগাঁথা নিয়ে লেখা। তবে লেখার ধরণটা বেশ অভিনব। লেখক যুবকের রূপক নিয়ে ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সাথে কথোপকথনের মধ্যে দিয়েই সবটা তুলে ধরেছেন। এজন্যে পড়তে নিয়ে বেশ উপভোগ করেছি।
কিউবার সংগ্রামের ইতিহাস আর সাথে ফিদেল ক্যাস্ট্রোর অন্যরকম জীবন সম্পর্কিত তথ্যবহুল বইটি যেকোনো জ্ঞানপিপাসু পাঠকের জন্য সুখপাঠ্য।
ফিদেল ক্যাস্ট্রো কে চিন্তায় বিভোর হয়ে থাকা যুবক আধঘুমে হঠাৎ নিজেকে আবিষ্কার করে ক্যাস্ট্রোর রিডিং রুমে । ক্যাস্ট্রোর সাথে আলাপচারিতায় ক্যাস্ট্রো যুবককে তার জীবনের কৈশোর থেকে বিপ্লবী জীবন , গেরিলা যুদ্ধ থেকে কিভাবে কিভাবে আজকের সমাজতান্ত্রিক কিউবা প্রতিষ্ঠিত হল তার গল্প শোনায় । আমেরিকার নাকের ডগায় বসে কিভাবে ক্যাস্ট্রো কিভাবে আমেরিকার নাকে ছড়ি ঘুরালেন , কিভাবে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরও নিজের দেশের সমাজতন্ত্রকে টিকিয়ে রেখেছেন - সেই উপাখ্যান যুবক তন্ময় হয়ে শোনে । ক্যাস্ট্রোর স্মৃতিতে চলে আসে কিউবা থেকে বহু দূরের একটি দেশ যারা একটি বর্বর শাসকগোষ্ঠী থেকে নিজেদের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল , সেই বাংলাদেশ আর তাদের স্বাধীনতার রূপকার শেখ মুজিবুর রহমান যাকে কাস্ত্রো বলেছিলেন ‘আই হ্যাভ নট সিন দ্য হিমালয়েজ। বাট আই হ্যাভ সিন শেখ মুজিব। ইন পারসোনালিটি অ্যান্ড ইন কারেজ, দিস ম্যান ইজ দ্য হিমালয়েজ। আই হ্যাভ দাজ হ্যাড দ্য এক্সপিরিয়েন্স অব উইটনেসিং দ্য হিমালয়েজ।’
শাহাদুজ্জামানের লেখা 'আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সাথে' মূলত একটি ডকুফিকশন , তবে আদতে ডকুফিকশনের সার্থকতা কতটুকু পূরণ করেছে তা প্রশ্নবিদ্ধ । কাল্পনিক সাক্ষাৎকারের আদলে লেখা এ বইয়ে লেখক পাতায় পাতায় শুধু ইতিহাস বর্ণনা করেছেন , যুবকের মাঝে মাঝে করা প্রশ্নগুলো গতানুগতিক এবং দায়সারা । ডকুফিকশন না লিখে ইতিহাস হিসেবে লিখলেই সম্ভবত লেখক ভালো করতেন , যদিও এই বইটি আমার কাছে শাহাদুজ্জামানের অন্যান্য বইগুলোর তুলনায় বেটার মনে হইছে ।
আমার রেটিং: 3 (এক বেশি দিছি কারন লেখক অনেক খাটাখাটনি করে লিখছেন তাই)
বাংলাদেশের এক যুবক তার স্বপ্নে নিজেকে আবিষ্কার করে কিংবদন্তিতুল্য বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রোর পড়ার ঘরে।তারপর প্রশ্নোত্তর আর কথোপকথনের মাধ্যমে দ্রুতলয়ে এগিয়ে চলে কিউবার মুক্তিসংগ্রাম,কিউবার অতীত,বর্তমান এবং ভবিষ্যতের গল্প।বেশ ইন্টারেস্টিং একটা টপিক! শাহাদুজ্জামানের লেখনী বরাবরের মতোই ব্রিলিয়ান্ট।তবে বইটাকে বড্ড বেশি ছোট মনে হয়েছে। ফিদেল কাস্ত্রোর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা!
পৃথিবীর সব স্থল ডুবে গেছে কোন বিক্ষুদ্ধ জলোচ্ছ্বাসে। শুধু রাজার একরোখা প্রচেষ্টায় রক্ষা পেয়েছে ১০৯৮৮৪ বর্গ কিলোমিটারের এক ক্ষুদ্র দ্বীপ। কিন্তু সেই ঝড়, সেই জলোচ্ছ্বাস থামেনি। সময়ে সময়ে হয়ে উঠেছে আরও উগ্র, আরও বিক্ষুদ্ধ। নিজের মাতৃভূমির প্রতি কঠোর পরিশ্রম আর গভীর মমতায় রাজা আরও ১৫ টি বছর আগলে রেখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে���। পিছনে রেখে যান আদর্শের যুদ্ধকে জনযুদ্ধে রূপান্তরের এক অসামান্য দৃষ্টান্ত।
সেই দ্বীপটির নাম কিউবা। রাজার নাম কিংবদন্তী ফিদেল ক্যাস্ট্রো। আর সেই বিক্ষুদ্ধ ঝড় হলো সম্রাজ্যবাদ। যার প্রধান অভিভাবক কিউবা থেকে মাত্র ৯০ মাইল দূরের দেশ সর্বোচ্চ শক্তিমান যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯১ সাল। তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে গেল সমাজতন্ত্রের স্বপ্নঘর সোভিয়েত ইউনিয়ন। জন্ম নিল একের পর এক রাষ্ট্র। লেনিনের অক্টোবর বিপ্লব পৃথিবীকে শোষণমুক্তির যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল আয়ু পেল মাত্র ৮৪ বছর। কিন্তু সমাজতন্ত্রের শরীর অর্থব হলেও প্রাণটুকু আজও যেন ধুকে ধুকে বেঁচে আছে কিউবায়।
সেই কিউবা প্রাণশক্তির রহস্য নিয়ে শাহাদুজ্জামান লিখেছেন তাঁর ডকু ফিকশন আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে। যেখানে বাংলাদেশের এক স্বপ্নবাজ তরুণ হাজির হয় ক্যাস্ট্রোর কাছে। ক্যাস্ট্রোও যেন অনেকদিন পর কারও সাথে কথা বলতে পেরে উচ্ছ্বসিত হন। বলে যেতে থাকেন একের পর এক শৈশব থেকে সংগ্রামের জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোর কথা। কিউবা ছিল সত্যিকার অর্থে ক্যাস্ট্রোর মাতৃভূমি। ১৫৯২ সালে কলম্বাসের হাজার কিউবার বেলাভূমির স্পর্শ করার খুব অল্প সময়ের মাঝেই কিউবার তায়নো এবং সিবানো আদিবাসীগোষ্ঠীকে জাতিগত নির্মূল করা হয়। অস্ত্র এবং ব্যাধি নিয়ে। সেই আদিবাসীগোষ্ঠীর বেঁচে যাওয়া গুটিকয়েক ব্যক্তিদের বংশধর ছিলেন ক্যাস্ট্রোর মা। তাই ক্যাস্ট্রোর শৈশব থেকেই মাতৃভূমিকে দেখেছেন, অনুভব করেছেন, ভিন্নচোখে। ক্যাস্ট্রোর কাছে বিপ্লবের প্রথম এবং প্রধান আদর্শ ছিলেন হোসে মার্তি। যিনি স্পেনিয়ার্ড দখলকারদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে কিউবার প্রথম শহীদ নেতৃত্বদানকারী। মার্তির মৃত্যুর ৭ বছর পর কিউবা থেকে স্পেনের দখলমুক্ত হয়। পায় নতুন মনিব, যুক্তরাষ্ট্র।
পুতুল সরকার বসিয়ে প্রতিনিয়ত দাস কিউবাকে শোষণ করায় নতুন মনিব যেন ছাড়িয়ে যাচ্ছিলো সাবেক স্পেনকেও। উল্লেখ্য, পঞ্চাশ দশকে কিউবার আখ খামারের ৪০ ভাগ ছিল আমেরিকার কোম্পানির অধীনে, যে খনিজ ছিল তার ৯০ ভাগও ছিল ওদের হাতে। দেশটির ৮০ ভাগ তেলও নিয়ন্ত্রণ করতো আমেরিকান স্বত্বাধিকারী। এসব কিছু ক্যাস্ট্রোর পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছিলেন তুলনামূলক সূক্ষ্মতরভাবে। কারণ সমাজের পুঁজিবাদীদের একজন ছিলেন স্বয়ং ক্যাস্ট্রোর স্প্যানিশ বাবা।
আদর্শের হাতেখড়ির দিনগুলোতে ক্যাস্ট্রোকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিলো চিবাসের আত্মহত্যা। ক্যাস্ট্রোর পাশে বসেই কিউবান পিপল পার্টির নেতা এডুয়ার্দো চিবাস নিজের মাথায় পিস্তল ধরে গুলি করেন। ক্যাস্ট্রোর চিবাসের জন্য কিছুই করতে পারেননি। তবে পরে পেরেছিলেন সমগ্র কিউবার জন্য। মাত্র ১২০ জন নিয়ে গিয়েছিলেন প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধে। ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয়বার সেই সংখ্যাটি ছিল মাত্র ৮৬। আর প্রতিবার ক্যাস্ট্রো আর যোদ্ধাদের যেন মায়ের মত আগলে রেখেছিল সিয়েরা মিয়েস্ত্রো পাহাড়। চূড়ান্ত যুদ্ধে মাত্র ৩০০ গেরিলা দিয়ে রুখে দিয়েছিলেন ৮০ হাজার সৈন্যের বিশাল বিগ্রেড।
ফিদেল ক্যাস্ট্রো এক বিশাল সমুদ্রের নাম। যেন তাঁর উপরে ভেসে ছিল এবং আছে কিউবা নামের দ্বীপটি। মাত্র ৭০ পৃষ্ঠায় সেই সমুদ্রকে তুলে ধরা যায় না। তবে লেখক নিঃসন্দেহে তুলে এনেছেন সময়ের সেরা বিন্দুগুলোকে। এই সমুদ্রের আরও গভীরে যারা গুপ্তধনের অভিযানে যেতে চান তাঁদের জন্য বইটি হতে পারে একটি মানচিত্র।
'আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে' ছোট্ট একটা বই, কিন্তু খুবই ভালো লাগলো আমার। ফিদেল ক্যাস্ট্রো, চে গুয়েভারা দের মতো নাম গুলোর ইতিহাস নিয়ে খুব জানতে ইচ্ছে করে। কিন্তু খটমটে ভাষা, আর মোটা মোটা বই শুরু করলে খেই হারিয়ে ফেলি মাঝপথে। এ প্রজন্মের একজন খ্যাতিমান লেখক শাহাদুজ্জামান একটা কাজ করলেন, উনি একটা কাল্পনিক সাক্ষাৎকার আয়োজন করলেন লিখে ফেললেন একটা চমৎকার ডকু-ফিকশন খোদ ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সঙ্গে। সেখানে ক্যাস্ট্রো নিজের মুখে বর্ণণা করলেন তার ইতিহাস। ব্যাপারটা খুবই ইন্টারেস্টিং আর অবশ্যই সুখপাঠ্য। একবসাতেই শেষ! কিউবা একটা আশ্চর্য শক্তিতে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। এই শক্তিটা তারা কোথায় পেল? আমেরিকার অবস্থান যেখানে মাত্র ৯০মাইল দূরে, সেই নাকের ডগায় বসে দেশ চালানো কিউবাকে সামনে থেকে নেত্রিত্ব দিয়েছিলেন এই মানুষটি। ক্যাস্ট্রোকে নিয়ে বিস্তারিত হয়তো জানা হলোনা, তবে মূল বিষয়বস্তু নিয়ে খুব সুন্দর একটা ডকু-ফিকশন হয়েছে বলাই বাহুল্য! অনেক প্রশ্ন উত্তর পেয়ে গিয়েছি এই বইতেই। লেখককে ধন্যবাদ।
আমেরিকা থেকে মাত্র ৯০ মাইল দূরে অবস্থিত ছোট্ট দেশ কিউবা।পূর্বে এটি স্পেনের আওতায় থাকলেও পরবর্তীতে আমেরিকার শাসনাধীন হয়ে যায়।স্বভাবসিদ্ধ নিয়মানুযায়ী আমেরিকা কিউবাকে শাসন ও শোষণ করে।এভাবে দিনের পর দিন কিউবাতে বেড়ে যেতে থাকে দূর্নীতি, মানুষে মানুষে বৈষম্য বাড়তে থাকে। তেমনি কিউবাতে বাড়তে থাকে বিপ্লবীদের সংখ্যা যারা চায় কিউবাকে আমেরিকার কবল থেকে মুক্ত করতে, পুঁজিবাদী সরকার হটিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে।তেমনি একজন বিপ্লবীর নাম ফিদেল ক্যাস্ট্রো যার অবদানে স্বাধীন হয়েছে কিউবা। . বইটিতে শুরু হয়েছে বাংলাদেশী যুবকের সাথে ক্যাস্ট্রোর কথোপকথন-এর মধ্য দিয়ে। বইটিতে একের পর এক উন্মোচিত হয়েছে আমেরিকার নৃশংসতা, ক্যাস্ট্রো এবং তার দলের দৃঢ় মনোবল, নিজের দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা যার জোরেই ফিদেল এবং তার দল বাতাস্তা সরকার উৎখাত করেছে। যখন পৃথিবীতে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ভেঙ্গে পড়েছিল তখনও পুঁজিবাদী আমেরিকার নাকের ডগায় দাড়িয়ে কিউবা নিজেদের সমাজতান্ত্রিক সমাজ টিকিয়ে রেখেছে।বইটিতে আরও উঠে এসেছে সাহসী ফিদেল ক্যাস্ট্রোর শৈশব। . ফিদেল ক্যাস্ট্রোর জীবন থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। যত বাধা বিপত্তিই আসুক, নিজেকে দমিয়ে রাখা যাবে না।বরং ঐসব বাধা বিপত্তি থেকে শিক্ষা নিয়েই চলার পথ সুগম করতে হবে। তবেই না জীবনে সফল হওয়া যাবে! এই ৭০ পৃষ্ঠার বই পড়ে কিউবা কিংবা ক্যাস্ট্রো সম্পর্কে সসম্পূর্ণ ধারণা পাওয়া যাবে, তা বলব না। তবে ক্যাস্ট্রোর সাহসীকতা,দৃঢ় মনোবল একবারের জন্য হলেও গায়ে কাঁটা দিবে।
একজন যুবকের সাথে ফিদেল কাস্ত্রোর সংলাপকে ঘিরে কিশোর রচনা। টিনেজদের জন্য অত্যন্ত যুতসই লেখনী। বোরিংনেস ছাড়াই শেষ হয়ে যাবে। বিপ্লব, ফিদেল কাস্ত্রো ও কমিউনিজম সম্পর্কে টিনেজদের ধারণা দেওয়ার জন্য উত্তম লেখনী।
কিউবার মতো আমেরিকার নাকের ডগায় থাকা একটা দেশ স্পেন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করতে সাহায্য পায় আমেরিকার। তারপর? বিশ্বরাজনীতির নিয়ন্ত্রক পুঁজিবাদী আমেরিকা দখল করে কিউবার অর্থনীতি। পুতুল সরকার বসিয়ে কিউবার সম্পদ অাহরণ বেশ ভালোভাবেই করছিলো। এক স্পেনিশ বাবা আর কিউবান মায়ের ঘরে জন্ম হয় ক্যাস্ট্রোর.. ফিদেল ক্যাস্ট্রো। শৈশবেই প্রথা অনুযায়ী পড়ালেখার উদ্দেশ্যে বাবা-মায়ের থেকে দূরে পাঠানো, তারপর একসময় বোর্ডিং স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে রাজনীতিতে পা। পুঁজিবাদে বড়ই অনাস্থা। নিজের ভাই রাউল ক্যাস্ট্রোকে সাথে নিয়ে গেরিলা দল বানিয়ে সামরিক ঘাঁটিতে হামলা, সামরিক বাহিনীর কাছে ধরা পড়ে বন্দী জীবন, মৃত্যুর খুব কাছে থেকে ফিরে আসা, জীবন বাঁচাতে মেক্সিকো গমন, চে গুয়েভারার সান্নিধ্য, একসাথে কিউবায় আক্রমণ, চূড়ান্ত বিজয়, আমেরিকার সাথে স্বল্পশক্তি নিয়েও যুদ্ধে প্রতিরোধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার স্বত্তেও মাথা উঁচু করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সোভিয়েত পতনের পরও সমাজতন্ত্র নিয়ে সফলভাবে দেশ পরিচালনা আর বিশ্বমিডিয়ায় ক্রমাগত উদ্দেশ্যমূলকভাবে খলনায়ক আর একনায়ক হিসেবে উপস্থাপনের পরও কিভাবে দেশের জনগণের ভালবাসায় এখনো সিক্ত হন সে সব নিয়ে ফিদেল ক্যাস্ট্রে গল্প করেছেন বাংলাদেশী এক তরুণের সাথে।
কাল্পনিক সাক্ষাতকার হলেও লেখক শাহাদুজ্জামান বেশ চমৎকারভাবে ফিদেল ক্যাস্ট্রো, ক্যাস্ট্রোর আদর্শকে এবং জীবনীকে সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। এক কথায় বইটিকে বাংলা ভাষায় লেখা অন্যতম সেরা ডকুফিকশনের স্বীকৃতি দিতে দ্বিতীয়বার ভাবতে হবে না!
কেউ হয়ত আপনার উপর অনর্থক বিরক্ত হবে, মুগ্ধ হবে, কাছে আসবে, বন্ধু হবে, ছেড়ে যাবে, কখনো ব্যবহার করবে আপনাকে তাদের কাজে, কখনো জোর করে এসে আপনার কাজে নিজেকে ব্যবহার করবে নিজের স্বার্থেই! আর এতে একটুও বিচলিত হবার কোনো অবকাশ নেই... সবচেয়ে মজার কথা বলেছিল আমার একজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, "...পারলে একটা বটগাছ হোস! পথিক এসে ছায়া পাবে, শান্তি পাবে, যাবার সময় হয়ত একটা ডাল ভেঙে নিয়ে যাবে! কত পাখি বাসা বাঁধবে, মলমূত্র ত্যাগ করে নোংরা করবে! কত লতা পরজীবীর মত গজাবে তোকে ঘিরে! কিছু যায় আসে না! বটগাছ বটগাছই...তার মহিমা একটা ডাল ভাঙলে কিছু কমে না, পাখির মলমূত্রের নোংরাও কিছু মনে আসে না! ধ্বংস হয়ে গেলেও শুধু ইতিহাসের বুকে লেখা থাকে, এখানে একটি বটবৃক্ষ ছিল! " কথাগুলো অনেক আগের। আজ অনুধাবন করি এই কথাগুলোর মূল্য। দশজন মিলে একটা কিছু বলল, ভাবল, করল, করালো... ব্যাস! হয়ে গেল?? এত সহজ?? ইতিহাস বড় নির্মম, কাউকে ছাড়ে না! যারা ইতিহাসে নন্দিত ও নিন্দিত--- এ দুয়ের মধ্যে কত পার্থক্য!
কিউবার সমস্ত ইতিহাস জানা হয়ে যাবে ৭০ পৃষ্ঠার ছোট্ট বই 'আধো ঘুমে ক্যাস্ট্রোর সাথে' পড়লে। ডকুফিকশন আমি এর আগে পড়িনি, সুতরাং আমার জন্য এটা ছিলো একদমই নতুন একটা অভিজ্ঞতা এবং ডকু-ফিকশন আমার বেশ ভালো লেগেছে। শাহাদুজ্জামান চাইলে ক্যাস্ট্রোর জীবন, দর্শন, সংগ্রাম নিয়ে একটা নন-ফিকশন বায়োগ্রাফি টাইপ লিখতে পারতেন। তা না করে, একজন কৌতুহলী বাঙ্গালী যুবকের সাথে ক্যাস্ট্রোর এই কাল্পনিক কথোককথনের মাধ্যমে ফিদেল ক্যাস্ট্রোর শৈশব, সংগ্রামী মনোভাবের উৎপত্তি, কিউবার ইতিহাস, পরাশক্তিশালীর বারবার দমিয়ে রাখতে চাওয়া সত্ত্বেও মাথা তুলে দাঁড়ানোর যে গল্প তিনি লিখেছেন তা নিঃস্ব ন্দেহে প্রশংসনীয়। ইতিহাস না কপচিয়েও ইতিহাস জানানো, ফিদেল ক্যাস্ট্রোর দর্শন খুব সহজে তুলে ধরা এই বইটি আমার দীর্ঘদিন মনে থাকবে।
ফিদেল ক্যাস্ট্রো। কিউবার অবিসংবাদিত নেতা। বাঙালি এক যুবকের সাথে কাল্পনিক কথোপকথনের মাধ্যমে মূলত ক্যাস্ট্রোর জীবনী তুলে এনেছেন লেখক। সেখানে ক্যাস্ট্রো নিজেই একে একে তার জীবনের ঘটনাবলি বলে গিয়েছেন। বলার ভঙ্গি চমৎকার। পড়তে বেশ লাগে।
লেখক পুরো বইতে ক্যাস্ট্রো এর ভালো দিক বা গুনগান করেই শেষ করেছেন। অনেকটা বিটিভি যেমন করে সরকারের খবর প্রচার করে। ভালো-মন্দ মিলিয়েই তো মানুষ। ক্যাস্ট্রোও বহু ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জীবনজুড়ে। লেখক চাইলে সেগুলো আলোকপাত করতে পারতেন।
(কাচের কর্ণেল পড়ার পর মনে হয়েছিল ইতিহাস নিয়ে শাহাদুজ্জামানের না লেখাই ভালো। এটা পড়ে সেকথাটা পুনরায় মনে পড়লো।)
ফিদেল ক্যাস্ট্রো এমনিতেই আমার প্রিয় নেতা,এই বই পড়ে ভালো লাগা বেড়ে যায় আরও অনেকটা। তবে লেখক যদি এই বই টি না লিখতেন তবে উনার বা ক্যাস্ট্রো র কারোর ই বিশেষ ক্ষতি হতোনা কিন্তু আমার হতো অনেক! লেখক কে অশেষ ধন্যবাদ।