হাসনাত আব্দুল হাই (English: Hasnat Abdul Hye) একজন বাংলাদেশি লেখক এবং প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক। তিনি ঢাকা, ওয়াশিংটন, লন্ডন ও কেমব্রিজে লেখাপড়া করেন। তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, জগদীশ চন্দ্র বসু পুরস্কার, শের-ই-বাংলা পুরস্কার, এস.এম. সুলতান পুরস্কার, শিল্পাচার্য জয়নুল পুরস্কারে ভূষিত হন।
[ হাসনাত আব্দুল হাইয়ের নাম শুনি 'বিলাতে সাড়ে সাতশ দিন' বইয়ের সাথে, আর তাঁর পয়লা বই পড়লাম এই মরচে পড়া স্টেনগান। অল্পই জানতাম তাঁর সম্বন্ধে, গল্প লেখেন জানা ছিল না। প্রথম পরিচয়টা বেশ ভালোই জমলো। ]
১৬টা গল্পের এই সংকলনটা যেন একটা ক্যালাইডোস্কোপ। আরশিতে আলো পড়ে সবদিকে ঠিকরে বেরিয়েছে আলো- ইতিহাসের একেক অধ্যায়, সমাজবাস্তবতার নানা দিক। পছন্দের গল্পগুলো নিয়ে সংক্ষেপে বলে গেলাম :
১। মরচে পড়া স্টেনগান : রাহুলের বাবার স্মৃতি ঘাঁটতে ট্রাঙ্ক থেকে বেরিয়ে এলো মুক্তিযুদ্ধের এক পুরনো অস্ত্র। ততদিনে যুদ্ধের বহুদিন পেরিয়েছে। এ অস্ত্র কেন এতদিন ধরে রেখেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা বাবা? সে অস্ত্র বেরিয়ে এসে জন্ম দেয় নানান ঘনঘটার, চোখে তুলে ধরে সমাজবাস্তবতার একেকটা দিকের। বেহাত অস্ত্র জমা না দেবার পেছনের পাওয়ার প্লে, আর সেসব অস্ত্র উদ্ধারের তৎপরতার ফাঁকে পুলিশের সুনাম কামানোর ধান্দা, সবের মাঝে, মুক্তিযুদ্ধের অস্ত্রের মূল যে উদ্দেশ্য, অর্থাৎ মুক্তির যুদ্ধ, তাই কেমন ম্লান হয়ে আসে। আর তাতে হোঁচট খেয়ে চলে স্বচক্ষে মুক্তিযুদ্ধ না দেখা, অথচ যুদ্ধের পরিণতির মুখে এসে পড়া একটা প্রজন্ম। সে গভীর বোধ ধরে রেখেছে এই গল্পটা, 'মরচে পড়া স্টেনগান।
২। জাবেদালীর ছেলেরা : জাবেদালী পানির ধারে বসে চোখ রাখেন নদীর দিকে, দূরে সাগরের দিকে। যে নদীর পানি ঘোলা করে ঢেউ তোলে মৌসুমের ইলিশের ঝাঁক, যে সাগর একে একে দাবী করেছে তাঁর তিন ছেলেকে। বাকি আছে এক ছেলে, জেলে হওয়া ছাড়া যার নিয়তি নাই। আর আছে জাবেদালীর অভিজ্ঞতার চোখ, অভিজ্ঞতার ভার। পানির ধারে এক জায়গায় স্থির বসে জাবেদালী, সেটুকু জায়গাতেই হাই-এর লেখায় ব্রাত্যজনের জীবন ফুটেছে নিদারুণ।
৩। ট্যাঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে : বিখ্যাত ছবিটা মনে আছে, সাঁজোয়া বহরের সামনে একটা শপিং ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়েছে যুবক, ইতস্তত থেমে পড়েছে ট্যাঙ্কের সাড়ি? আচ্ছা, প্রতিবাদের ভাষা জায়গাভেদে অথবা সময়ভেদে পাল্টাতে পারে, কিন্তু দু'পক্ষ যখন সেই অত্যাচারী আর অত্যাচারিত, তখন তার মাঝে কি ঘুরেফিরে একই ছবি ফুটে ওঠে না? বাংলাদেশের কোনো এক হরতালের প্রেক্ষাপট। একই ছবির পুনরাবৃত্তি। চমৎকার দৃশ্যবর্ণনা।
৪। রাজার ছবি : বাংলাদেশে জেএমবি'র দৌরাত্ন্যের পিঠাপিঠি, সন্ত্রাসী সংহারের সময়টা মনে আছে? পিচ্চি অমুক, হাতকাটা তমুক, কালা অমুক, একে একে সংবাদ হয়ে যাচ্ছে। রাজা, তেমন এক সন্ত্রাসী, তাড়া খেয়ে এসে লুকিয়েছে এক পতিতার ঘরে। দুজন মানুষের সংযোগ, তাঁর মাঝে মৃত্যুদন্ডের আসামীর মনস্তত্ত্বের ভিন্ন দিক খুঁজে ফিরি আমরা, পাঠক। যৎসামান্য রূপকের ব্যবহার লক্ষণীয়।
৫। বিটোফেনের সিম্ফনি : রূপকের ব্যবহার উপস্থিত এখানেও। যে সময়ে গল্পকথকের জানলার বাইরে মা কাক ডিমে তা দিতে বসেছে, কথকের কন্যাও সন্তানসম্ভবা হয়েছেন। দুটো স্রোতে একই গল্প প্রবাহিত, দু-খানে প্রায় একই সংঘাত। এবং একই টিকে থাকা। সুন্দর একটা গল্প।
৬। কাঙালিনী সুফিয়ার গল্প / এবং / তারামন এবং একটি মিথের গল্প : দুটা গল্পে বাংলাদেশের দুজন স্বল্পালোচিত নারী কিংবদন্তীকে তুলে আনা হয়েছে। যেখান থেকে গল্প দুটো বলা হয়েছে, সেটা বেশ ইন্টারেস্টিং।
৭। পানকৌড়ি : লঞ্চডুবি। অব্যাবস্থাপনা। দুর্নীতি। ডেক ভর্তি মৃতদেহ নিয়ে যাত্রা করেছে এমভি পানকৌড়ি, লঞ্চ চালানোর জন্য অবসর থেকে তুলে আনা হয়েছে আবুল সারেং-কে। চাঁদপুর, বরিশাল,... একে একে ঘাটে লাশ পৌঁছে দিতে পানকৌড়ির এই যাত্রা। লাশ ভর্তি লঞ্চটা যেন নিজেই একটা লাশ- সিস্টেমের। জুড়ে থাকা মানুষদের। সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয়, গল্পের আবহ। থমথমে।
হাসনাত আবদুল হাইয়ের গল্পের নির্মাণ আহামরী না। 'স্টোরি'-র চাইতে, ভেতরের চিন্তাটুকু বেশি গুরুতর। এবং গল্পের সংলাপ অথবা ঘটনাবর্ণনা তেমন একটা আকর্ষক মনে হয়নি বেশিরভাগটায়; সেখানে পুষিয়ে দিয়েছে থটস বা চিন্তাগুলো। তাই বলে কিন্তু আবহ নির্মাণে দুর্বলতা নেই, গল্প পড়ার সময়ে তাঁর ছবিটা পরিষ্কার ফুটে ওঠার মতো বর্ণনাভঙ্গি তাঁর।
সবগুলো গল্প মিলিয়ে, 'মরচে পড়া স্টেনগান'-এ হাসনাত আব্দুল হাই যে বাংলাদেশকে তুলে এনেছেন, তা দেখতে পাওয়ার দরকার আছে। আমার মতো যদি "গতকাল অব্দিও বইটার কথা জানতাম না" অবস্থা হয়ে থাকে আপনার, বলি, বইটা পড়ে ফেলুন।
মরচে পড়া স্টেনগান (গল্পসংকলন) লেখক : হাসনাত আব্দুল হাই প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০০৮ প্রকাশক : আগামী প্রকাশনী পৃষ্ঠাসংখ্যা : ১৫২ মুদ্রিত মূল্য : ১৮০ টাকা