ড. ফাতালি এম মোগদ্দাম তাঁর ‘দ্য সাইকোলজি অব রেভ্যুলিউশন বা বিপ্লবের মনস্তত্ত্ব’ বইয়ে বিস্তৃত পরিসরে বিপ্লবী মানসিকতার পর্যালোচনা ও ব্যাখ্যা করেছেন। বিপ্লবের মনস্তত্ত্ব নিয়ে ১৮৯৪ সালে ফরাসি মনোবিজ্ঞানী ও দার্শনিক গুস্তাভ লে বনের ক্লাসিক বইটি প্রকাশের সোয়া শ বছর পর এ ধরনের আরেকটি বই পাঠকের সামনে এলো। মনোবিজ্ঞানী ফাতালি তাঁর মাতৃভূমি ইরানে বিপ্লব পর্যক্ষেণের সরাসরি অভিজ্ঞতা লাভ করেন। তাঁর জন্য ১৯৭০-এর দশকের ওই বিপ্লবের ফল ছিল হতাশাজনক। বিশ্বে ‘ক্ল্যাসিক’ হিসেবে বিবেচিত ফরাসি, রুশ, চীনা ও কিউবান বিপ্লবকে মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করেছেন লেখক। বিপ্লবী আন্দোলন ও রেজিম পরিবর্তনের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তাঁর মত হলো—একটি বিপ্লব সমাজে মৌলিক পরিবর্তনের বদলে শুধু একনায়কত্বের প্রতিস্থাপন ঘটায়। নতুন শাসকও কেন সমাজকে একই ধারায় পরিচালিত করেন এবং মানুষ কেন শেষপর্যন্ত মৌলিক পরিবর্তনের বিষয়ে অনিচ্ছুক তার মনোজাগতিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে এই বইয়ে।
প্রয়োজনীয় কিন্তু সরলীকৃত ব্যাখ্যাযুক্ত বই। বিপ্লব বা গণ অভ্যুত্থান পৃথিবীর সব জায়গাতেই হয় নতুন স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। একনায়ক বা চরমপন্থী সরকারকে হটাতে দেশের মানুষ একযোগে কাজ করে,মনে হয় মানুষে মানুষে বিভেদ ঘুচে গেছে, সবাই ঐক্যবদ্ধ কিন্তু বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পর পুরনো দ্বন্দ্ব ও বিভাজন মাথাচাড়া দেয়। দেখা যায়,বিপ্লবীরাই উল্টো দেশের বিরুদ্ধে কাজ করছে এবং স্বার্থ উদ্ধারের জন্য এরা নিজেরাই হয়ে উঠছে স্বৈরাচারী। বাংলাদেশের বর্তমান গণ অভ্যুত্থান পরবর্তী অবস্থার সাথে বইয়ে বর্ণিত ইরান, ফ্রান্স, রাশিয়া,কিউবা প্রভৃতি দেশের অবস্থার এতো মিল যে হকচকিয়ে যেতে হয়। প্রায় প্রতিটি বিপ্লবের পর একই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে সবখানে - নৈরাজ্য, ভিন্ন মতাবলম্বীদের নিধন, ডানপন্থীদের উত্থান, বিপ্লবীদের খলনায়ক হয়ে ওঠা ও চূড়ান্ত অরাজকতা। এ অবস্থা থেকে অনেক দেশ উত্তরণ লাভ করেছে, আবার অনেক দেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে ছদ্মএকনায়কতন্ত্র। বাংলাদেশের কী হবে সেটা সময়ই বলে দেবে।
লেখক বিপ্লবকে শুধু রাজনৈতিক নয়, মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও ক্ষমতার কাঠামোর দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। ২০২৪ সালের মার্চে ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হলেও বইটির বাংলা অনুবাদ আসে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, বাংলাদেশে এক বিপ্লবোত্তর অস্থির সময়ে। এই কারণেই বইটি পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে, লেখক যেন আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিকেই অবিকল আঁকছেন।
মোগদ্দাম দেখান—বিপ্লব ঘটে, কিন্তু এলিটদের আধিপত্য কখনোই সত্যিকারে ভাঙে না। কমিউনিস্ট, ধর্মীয়, সমাজতান্ত্রিক বা পুঁজিবাদী যে মুখোশই তারা পরুক না কেন, ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকে একই শাসকগোষ্ঠী। জনগণের সামনে এই মুখোশগুলো শুধু মরীচিকা, যার আড়ালে এলিটরা টিকে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন, ইরান ও কিউবাসহ মোট পাঁচটি ঐতিহাসিক বিপ্লবকে তিনি যেন অস্ত্রোপচারের মতো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেন। প্রত্যেক বিপ্লবেরই প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল উদার সমাজ, ন্যায়, সমতা ও মানবিক রাষ্ট্র গঠন। কিন্তু মোগদ্দাম দেখান—প্রতিটি বিপ্লবের পরপরই উল্টো দেখা দিয়েছে চরমপন্থা, স্বৈরাচার ও দুর্নীতির নতুন রূপ। জনগণের মুক্তির বদলে এসেছে তাদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ, নেতার ব্যক্তিকেন্দ্রিক আধিপত্য এবং প্রশ্নহীন আনুগত্যের দাবি।
বইটির অন্যতম শক্তি হলো; বিপ্লবের উৎপত্তি থেকে চূড়ান্ত পরিণতি পর্যন্ত সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি তিনি চারটি স্পষ্ট ধাপে ভেঙে দেখিয়েছেন। প্রতিটি ধাপে বাস্তব বিপ্লবের উদাহরণ, বিখ্যাত চিন্তাবিদদের তত্ত্ব এবং মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা যুক্ত করে লেখক তুলে ধরেছেন এক অস্বস্তিকর সত্য। বিপ্লব মানুষের আশা জাগায়, কিন্তু মানুষকে পূর্ণাঙ্গ মুক্তির দিকে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়। পুরোনো স্বৈরাচার ভেঙে গড়ে ওঠে আরও কঠিন নতুন স্বৈরাচার।
বইটির বাংলা অনুবাদ অত্যন্ত সাবলীল ও পাঠকবান্ধব। অনুবাদকদ্বয়ের প্রতি আলাদা করে কৃতজ্ঞতা জানাতে হয়, মূল গ্রন্থের বিশ্লেষণাত্মক ঘনত্ব, তত্ত্ব ও উদাহরণগুলো খুব মসৃণভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
পাঠক বারবার চমকে উঠবেন-কারণ, লেখক যেসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন, সেগুলো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতার সঙ্গেও যেন অদ্ভুতভাবে মিল রয়েছে।