হেমেন্দ্রকুমার রায় রচনাবলী ১ -এর প্রথম বড়গল্প বিখ্যাত 'যকের ধন'। বিমল-কুমারের আসামের জঙ্গলে গুপ্তধন খোঁজার দারুণ এক রোমহর্ষক কাহিনী এটি। তাদের সাথে ছিল কুমারের কুকুর বাঘা এবং বিমলের বিশ্বস্ত চাকর রামহরি।
কুমারের ঠাকুরদা মারা যাওয়ার পর তাঁর সিন্দুক থেকে পাওয়া যায় অঙ্ক চিহ্নিত একটি মড়ার মাথার খুলি ও একটি পকেট বই। এই দুটির সমন্বয়ে বিমল আবিষ্কার করে গুপ্তধন লাভের উপায়। কুমারও যোগ দেয় তার সাথে। গন্তব্য আসাম। পথে নানাবিধ সমস্যা, হাতাহাতি, জীবনহানির সম্ভাবনা সামলে আসামে পৌঁছনোর পরেও বিপদ তাদের পথ ছাড়ে না। গল্পের অন্যতম চরিত্র করালী, যে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর এবং ক্ষতিকারক, সেও চায় সেই গুপ্তধন হস্তগত করতে। দুর্ধর্ষ করালীকে হারিয়ে বিমল-কুমার জুটি গুপ্তধন লাভ করতে পারবে কি না তাই নিয়ে এই কাহিনী 'যকের ধন'।
গল্পটি শুরুতে অনেক প্রত্যাশা জাগিয়ে তুললেও শেষে কাহিনীর সরলীকরণের জন্য সেই আশা খানিকটা অপূর্ণ রয়ে যায় বলে মনে হয়। কুমারের চরিত্রটিকে এখানে ভীতু এবং অনেক ক্ষেত্রেই অত্যন্ত নেতিবাচক দেখানো হয়েছে, জায়গা বিশেষে যা কিছুটা বিরক্তি
উদ্রেক করে। মূলতঃ বিমল চরিত্রটিকে বেশি করে উদ্ভাসিত করার উদ্দেশ্যে এমন করা হয়েছে বলে মনে হয়। লেখাটি সহজ, সরল এবং গতিশীল ।
এই বইটির দ্বিতীয় সংযোজন হল 'সন্ধ্যার পরে সাবধান'। আটটি ছোট ছোট ভূতের গল্প রয়েছে এতে। গল্পগুলো ভালো এবং ভয়প্রদানকারী।
তৃতীয় বড় গল্পটি হল 'হিমাচলের স্বপ্ন'। মজার এই গল্পে ভাল্লু নামক এক শান্ত ও বাধ্য ভাল্লুক চিড়িয়াখানা থেকে পালিয়ে যায়। গন্তব্য তার হিমালয়। চিড়িয়াখানায় থাকতে তার খাওয়া-ঘুম সব নির্বিঘ্নেই চলছিল। কিন্তু সমস্যা হয়ে দেখা দিল তার হিমাচলের স্বপ্ন, স্বাধীনতার স্বপ্ন। এরপর ভাল্লু কি কি ঘটনার সম্মুখীন হল বা কি ঘটনা ঘটালো- তাই নিয়েই এই কাহিনী। দারুণ লেখা এবং এই বইটির সবচেয়ে ভালো লেখা মনে হয়েছে এটিকে।
চতুর্থ অংশ হল 'এখন যাঁদের দেখছি'। এটিকে একটি প্রবন্ধ সংকলন বলা যেতে পারে। এখানে আছে লেখকের স্পষ্ট ও সরল চিন্তাভাবনা নিম্নলিখিত বিষয় অথবা ব্যক্তির উপর :
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ী,
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর,
স্যার যদুনাথ সরকার,
সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় এবং
কাজী নজরুল ইসলাম।
এর পরে আছে 'মেঘদূতের মর্ত্যে আগমন '। এটি একটি কল্পবিজ্ঞান ভিত্তিক গল্প। এই লেখাটিতে আবার দেখতে পাওয়া যায় বিমল- কুমার জুটিকে। তবে বিমল-কুমার এখানে মূলতঃ পার্শ্বচরিত্র। পৃথিবীর বাইরে কি কোন জীবিত প্রাণীর অস্তিত্ব আছে, থাকলেও তারা কেমন, কোথায় তাদের বসবাস, তারা যদি হঠাৎ করে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে পৃথিবীতে প্রবেশ করে তাহলে কি হবে - এই নিয়েই এই কাহিনী। এই গল্পটির সূচনা দূর্দান্ত হলেও শেষে এসে কাহিনীটি খুবই দূর্বল হয়ে যায়। কাহিনীর শেষটা সম্ভবত নতুন আরেকটি গল্পের সূচনার আভাস জানিয়ে যায়।
বইটির শেষে রয়েছে চারটি ছড়া এবং একটি চিঠির উত্তরে লেখা লেখকের চিঠি।
বইটি দ্রুত গতিসম্পন্ন এবং উপভোগ্য। লেখার ভাষা সহজ ।
প্রকাশক: এশিয়া পাবলিশার্স, মূল্য: ১৮০ টাকা।