বহু ভাঙন তিনি দেখেছেন জীবনের, বহু চড়াই-উতরাইয়ের পথ হয়েছেন পার। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের প্রেক্ষাপটে প্রত্যক্ষ করেছেন দাঙ্গাক্ষুব্ধ কলকাতাকে, কীভাবে এক সম্প্রদায়ের মানুষ নির্বিচারে হত্যা করতে পারে আরেক সম্প্রদায়ের মানুষকে। ১৯৭১ সালে আতঙ্কের রাত ২৬ মার্চের সাক্ষী হয়ে নিজের চোখে অবলোকন করেছেন জগন্নাথ হলের ঘৃণ্য সেই গণহত্যা, আতঙ্কের জনপদ ঢাকায় প্রাণ হাতে নিয়ে পালন করে গেছেন আপন কর্তব্যকর্ম। পরবর্তীকালে দেখেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কীভাবে ক্রমে ক্রমে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। মূল্যবোধ হারিয়ে মানুষগুলো কীভাবে পরিণত হচ্ছে ক্লীবসত্তায়। শুধু যে বৃহত্তর পারিপার্শ্বিকতার ভাঙনে চূর্ণ হয়েছেন তা নয়, ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষতও কম নয়। বনেদি হিন্দু পরিবারের মেয়ে হয়ে একজন মুসলমান ছেলের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কারণে যেমন সইতে হয়েছে আত্মীয়স্বজনের অবজ্ঞা, তেমনি সেই প্রিয়তম স্বামীকে অকালে পেন ক্র্যাশে হারিয়ে গ্রহণ করতে হয়েছে বৈধব্যের যন্ত্রণা! এমনি কত অকালমৃত্যুর লাভা, কত জীবনযন্ত্রণার দাবদাহের ভেতরেও শেষ পর্যন্ত তিনি পরম জীবনপ্রেমিক। ক্ষণমুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু মহাকালের আমন্ত্রণে ঠিকই আপন হাতে চাষ করেছেন গোলাপ, ফুরসত পেলেই ঘুরে বেড়িয়েছেন প্রকৃতির অনিন্দ্যলোকে — ইউরোপ থেকে আমেরিকা, সারা পৃথিবী। নিজের হাতে প্রতি প্রভাতে আজো জলসিঞ্চন করে চলেন গাছের। তাই এ বইটি শুধু তাঁর দিনগুলির বর্ণনা নয়, জীবনের জন্য একটুকু আগুনের পরশমণি। যার ছোঁয়া অনিবার্যভাবেই পাঠকের বোধকে ঈষৎ হলেও নাড়িয়ে দেবে। বিভাগোত্তরকালে কলকাতার এক বনেদি পরিবারে জন্ম নেওয়া রেখা কীভাবে সুস্মিতা রায় থেকে কালক্রমে সুস্মিতা ইসলাম হয়ে উঠলেন এবং কলকাতা-করাচি-ঢাকার চড়াই-উতরাইয়ের জীবনকে ধারণ করে হয়ে উঠলেন উপমহাদেশেরই ভাংচুর ও মিলনসত্তার প্রতীকী চরিত্র — এই গ্রন্থ তারই সাবলীল আখ্যান।
সুস্মিতা ইসলামের জন্ম কলকাতায়, ডিসেম্বর ১৯২৬। পিতা ত্রিদিব নাথ রায় ছিলেন খ্যাতিমান আইনজীবী, সংস্কৃত সাহিত্যে পণ্ডিত, মধ্যযুগ বিষয়ক গবেষক। পিতামহ নিখিল নাথ রায় যশস্বী ঐতিহাসিক। মা কল্যাণী রায় কবি হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছেন। সুস্মিতা ইসলাম ১৯৪৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় অনার্সসহ স্নাতক হন। কবি গোলাম মোস্তফার পুত্র বৈমানিক মুস্তাফা আনোয়ারের সঙ্গে তিনি পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। ১৯৬১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এড পাশ করে রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে শিক্ষকতায় যোগ দেন। পরে ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আই.ই.আর-এ শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম.এ পাশ করেন। ১৯৭১-৭৩ সালে আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ করেন। আশির দশকে ঢাকায় কিছুকাল ইউনেস্কো উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একটু দেরিতে হলেও লেখালেখির মাধ্যমে মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন বোদ্ধা পাঠকের।
লেখিকার ফিরে ফিরে চাই পড়ে যতটা আগ্রহ জেগেছিলো বইটা সম্পর্কে ততোটাই আশাহত হলাম। যদিও শুরুর দিকটা ভালো, অনেকটাই ফিরে ফিরে চাই এর পুনরাবৃত্তি, তবে লেখিকার প্রথম স্বামী আনোয়ার সাহেবের মৃত্যুর পরের অংশ পড়তে হয়েছে অনেক কষ্ট করেই, তাইতেই বইটা শেষ করতে এতো দেরী হলো। আনোয়ার সাহেব কবি গোলাম মোস্তফার ছেলে, তার যে চরিত্র চিত্রন লেখিকা করেছেন, তাতে তাকে নিয়ে রীতিমতো একটা সিনেমা বানানো সম্ভব বলেই মনে হয়েছে। লেখিকার অযৌক্তিক সব আচরন বারবার বিরক্তির উদ্রেকই করেছে আমার, অবাক লেগেছে জ্যোতিষবিদ্যার উপর তার এতো গভীর আস্থার ব্যাপারটা। মেয়েকে এতোটা ধর্মীয় শিক্ষা দেয়ার বাড়াবাড়ি তার চরিত্রের দূর্বলতা বলেই মনে হয়েছে। এই বইকে পুরস্কার দেয়া হলো কোন বিচারে, হয়তো আত্মজীবনীর ঐতিহাসিক মূল্য বিচারে, কিন্তু এর চেয়েও ঢের ঢের ভালো আত্মজীবনী পড়েছি ঐ সময়ের বা কাছাকাছি সময়ের বলে আমার কাছে পুরস্কারের মান নিয়েই প্রশ্ন জাগলো মনে। ভালো লাগেনি।