#আমার রবি বাবু:
"আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে, দেখি নাই তোমায়, দেখি নাই।"
রবি বাবুর ‘নৌকাডুবি’ (১৯০৬) বাংলা সাহিত্যের এক অনন্যসাধারণ উপন্যাস, যেখানে প্রেম, মানবিকতা, সামাজিক প্রথা ও ভাগ্যের নির্মম পরিহাস গভীরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এটি মূলত একটি ট্রাজিক প্রেম কাহিনি, যেখানে নিয়তি এবং সামাজিক বিধিনিষেধ নায়ক-নায়িকাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
"এ নদী যে ধীরে বহে, আমি তার ধারা,
আমারি প্রাণের ভাষা বাজাইছে সারা।"
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলির মধ্যে রয়েছেন রমেশ, হেমনলিনী, কমলা ও ডাক্তার নন্দকুমার। রমেশ একজন উচ্চশিক্ষিত যুবক, যার সঙ্গে হেমনলিনীর বাগদান হয়। কিন্তু এক আকস্মিক নৌকাডুবির ফলে রমেশ ভুলক্রমে কমলাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। কমলা মনে করেন রমেশই তার স্বামী, কিন্তু পরে জানা যায়, প্রকৃতপক্ষে তার স্বামী ছিল ডাক্তার নন্দকুমার, যিনি দুর্ঘটনায় নিখোঁজ হন। এই পরিস্থিতি রমেশ, কমলা ও হেমনলিনীর জীবনে এক গভীর সংকট সৃষ্টি করে।
"তুমি সে যে আমারে চাও আমি তা জানি,
তাই কি গো আমাতে পাও অবহেলা?"
‘নৌকাডুবি’ শুধুমাত্র একটি প্রেমকাহিনি নয়, এটি এক গভীর জীবনদর্শনও বহন করে। রবীন্দ্রনাথ এখানে প্রেমকে কেবল ব্যক্তিগত আবেগের ব্যাপার হিসেবে দেখাননি, বরং সমাজ ও ভাগ্যের সঙ্গে তার সংঘাতকেও তুলে ধরেছেন। হেমনলিনীর সঙ্গে রমেশের প্রেম আধুনিক শিক্ষিত সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সমঝোতার গুরুত্ব রয়েছে। অপরদিকে, কমলার চরিত্র ঐতিহ্যবাহী নারীর প্রতীক, যিনি স্বামী-সংসারকে ঈশ্বরপ্রদত্ত কর্তব্য বলে মনে করেন।
"পথের সাথী যাবার আগে,
বলতে যদি চাও কিছু।"
রমেশের চরিত্রে দ্বিধা, দায়িত্ববোধ ও প্রেমের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব দেখা যায়, তা তাকে বাস্তবধর্মী করে তোলে। কমলা এক স্নিগ্ধ, কোমল, কিন্তু দৃঢ়চেতা নারী, যিনি সমাজের নিয়ম মেনে চললেও নিজের আত্মমর্যাদা বিসর্জন দেন না। হেমনলিনী শিক্ষিত ও স্বাধীনচেতা নারী, যার ভালোবাসা আবেগের চেয়ে অধিকতর বুদ্ধিবৃত্তিক। ডাক্তার নন্দকুমারও একজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, যিনি প্রেম, কর্তব্য ও ভাগ্যের টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যান।
"গান ভেসে আসে, দূর নীলিমায়
কে জানে কাহার, ব্যথা-ব্যথায়।"
রবীন্দ্রনাথের ভাষা সবসময়ই ছিল কা���্যময় ও মাধুর্যমণ্ডিত। ‘নৌকাডুবি’-তে তিনি সরল কিন্তু গভীর ভাষাশৈলীর মাধ্যমে চরিত্রদের মানসিক টানাপোড়েন অত্যন্ত জীবন্ত করে তুলেছেন। কাহিনির গতি কখনো ধীর, কখনো দ্রুত, যা পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়ক।
"জীবন মরণ যাতনা লাঘব কর,
দুঃখ শোক সন্তাপ নাশ কর।"
‘নৌকাডুবি’ কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির গল্প নয়, এটি সমাজের রীতিনীতি ও ভাগ্যের অপ্রতিরোধ্য প্রভাব সম্পর্কেও এক গভীর বিশ্লেষণ। নারী-পুরুষের সম্পর্ক, বিবাহপ্রথা, ব্যক্তির ইচ্ছা ও সমাজের চাপ—এসব বিষয় রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত সূক্ষ্মতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন।
"এসো, এসো, আমার ঘরে এসো,
আলো জ্বেলে রেখে গেছি, দ্বার খুলে রেখেছি।"
‘নৌকাডুবি’ রবীন্দ্রনাথের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, যা আজও প্রাসঙ্গিক। এটি প্রেম ও কর্তব্যের এক অনন্য সংমিশ্রণ, যা পাঠকের মনে গভীর দাগ কাটে। নিয়তি ও সমাজের দ্বন্দ্বের মধ্যে দাঁড়িয়ে মানুষের আত্মপরিচয়ের সন্ধান এই উপন্যাসকে চিরন্তন করে তুলেছে।
পড়ুন। আরেকবার পড়ুন। আগামী প্রজন্মকে পড়তে উৎসাহিত করুন।