হোমারের হেলেন প্রতীক্ষামাণা গৃহিণী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একাকিনী প্রেয়সী নয়, মাতাও নয় সীতার ধিক্কার অচরিতার্থ দ্রৌপদী তরুণী বিধবার পীড়িত হৃদয় শকুন্তলার জয় আদি স্ত্রীর প্রথম বিচ্যুতি ত্রিভুজের প্রথম বাহু পলাতক এমা আন্না কারেনিনার আত্মহনন নোরা, তুমি যাবে কোথায় রবীন্দ্রনাথের নায়িকা
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের প্রবন্ধগুলো এত প্রাণবন্ত হয় যে পড়তে একটুও বেগ পেতে হয় না। উপরন্তু, বিষয়বস্তুগুলো হয় আকর্ষণীয়। তবে ধীরে ধীরে মনোযোগ দিয়ে না পড়লে ঠিক রসটা উপভোগ করা যায় না। এই বইটিতে তিনি বিশ্ব সাহিত্যের কয়েকজন বিখ্যাত নায়িকাদের নিয়ে আলোচনা করেছেন। শুরু হয়েছে হোমারের হেলেনকে দিয়ে আর শেষ হয়ে রবিঠাকুরের সকল নায়িকাকে ছুঁয়ে। হেলেন, পেনেলোপি থেকে ঈভও আলোচিত হয়েছেন। আলোচিত হয়েছেন আ স্কারলেট লেটার এর হেস্টার প্রীন, আলোচিত হয়েছেন মাদাম বোভারীর এমা বোভারী। আন্না কারেনিনা এবং নোরা এসেছেন স্বমহিমায়। এসেছেন শকুন্তলা, দ্রৌপদী, সীতা। অবধারিতভাবে এসেছেন প্রায় সকল নায়িকা রবীন্দ্রনাথের। সকল বই আমার পড়া নেই। কিন্তু তাঁর আলোচনা পড়তে বা বুঝতে একটুও কষ্ট হয়নি,বরং পড়ার আগ্রহ জেগেছে। আবার যেসব নায়িকা আমার জানা তাঁদের দেখার জন্য আরেকটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ খুঁজে পেলাম।
তাঁর একটি কথাতেই সীতা আর দ্রৌপদীর চরিত্র বেশ ফুটে উঠেছে, সেটি হচ্ছে- সীতা মাটির মতো সর্বংসহা, দ্রৌপদী অগ্নির মতো তীব্র।
আন্না কারেনিনাকে আমি যে চোখে দেখেছিলাম, অনেকটা মিলে গেছে সে ভাবনাটা। তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছিলো পড়ার সময় আমার নোরাকে। কারণ, নোরা জীবিত থেকেছে। সে সংসার ছেড়ে গেছে কিন্তু মরে যায় নি, অন্যান্য বিখ্যাত নায়িকাদের মতো। আবার কম্প্রোমাইজ করে থেকেও যায়নি, কুমু কিংবা প্রফুল্ল যা করেছে। নিশ্চয়ই সময় এবং প্রেক্ষাপট আলাদা, তবুও সুন্দরভাবে রবিঠাকুরের নায়িকাদের সাথে নোরার কিছু মিল-অমিল দেখিয়েছেন লেখক, যেটা খুব ভালো লেগেছে আমার। পুঁজিবাদ এবং পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে দৃপ্ত অক্ষরে লেখা স্যারের স্পেশালিটি। অনেক বইতেও এই বিষয়গুলো এসেছে, এটাতেও গল্পের নায়িকাদের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এসেছে। সব মিলিয়ে নায়িকাদের বোঝার জন্য কিংবা লেখকের মতামত গ্রাহ্য বা অগ্রাহ্য করার জন্য হলেও আলোচিত বইগুলো পড়া যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি এই বইটাও পড়া।
লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী সাহিত্যের ইমিরেটাস অধ্যাপক,বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য প্রবন্ধ ও গবেষণাধর্মী লেখক।তবে এই বই আসলে সবার পাতের ডাল-ভাত হতে পারবেনা।ব্যক্তিগতভাবে আমার ভালো লেগেছে,যথেষ্ট enriching.তবে প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণ বলেই শেষ করতে সময়ও লেগেছে। যুগে যুগে বিখ্যাত সাহিত্যের নায়িকাদের চুলচেরা আলোচনা করেছেন।ফেমিনিস্টদের অবশ্যই পছন্দ হবে কারণ লেখক এমন এমন দৃষ্টিভঙ্গিতে নায়িকাদের তুলে ধরেছেন যা হয়তো পড়ার সময় বেশিরভাগ পাঠকেরই মাথায় আসেনি। বইয়ে আছে হোমারের হেলেন,রামায়ণের সীতা,মহাভারতের দ্রৌপদী,শকুন্তলা,আনা ক্যারেনিনা,রবীন্দ্রনাথের নায়িকারা প্রমুখ।
বইয়ের নেগেটিভ যদি কিছু থেকে থাকে তবে বলতে হয় যে একটু অতিই নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি।সবক্ষেত্রে নারী যেমন ভিক্টিম নয়,সবক্ষেত্রে নারী নির্দোষও নয়।লোভের বশবর্তী হয়ে প্রবঞ্চনা করা কখনোই নারীবাদীতা না আর সমাজ ও পরিস্থিতিকে একাধারে দোষ দিয়ে পার পাওয়াও উচিত নয়।Sometimes what's wrong is wrong and the only way to redemption is owning upto your mistakes.