'জলসাঘর', তারাশঙ্করের ১২টি ছোটগল্প সমাহারে একটি সংকলন। এর মধ্যে 'জলসাঘর'-এর খ্যাতিই বোধহয় বেশি, বিশেষত তা নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের ছবি বানানো উপলক্ষ্যে। জমিদার রায় বংশের ক্ষয়িষ্ণু দশা ও বিশ্বম্ভর রায়ের তিরোধানে সে বংশের ইতি। রায় বংশের পূর্বপুরুষ রাবণেশ্বর রায়কে নিয়েও সংকলনের শেষে 'রায় বাড়ি' গল্প রচিত হ'য়েছে। সামন্তবাদের প্রতিভূ জমিদার রায়দের প্রতি যেন লেখকের একটা মায়া কাজ করেছে, কিন্তু তা সদ্য গজিয়ে ওঠা বণিক বা বুর্জোয়াদের প্রতি নেই- 'জলসাঘর'-এর মহীম গাঙুলীকে রীতিমত কটাক্ষ করা হ'য়েছে। এটা লেখকের ব্যক্তিগত Bias- উভয় সম্প্রদায়ই যে শোষণকারি তা যেন তারাশঙ্কর এড়িয়ে গেছেন।
গল্পগুলো রাঢ় বাংলার বৈষ্ণব, শাক্ত, তান্ত্রিকদের নিয়ে। সবচেয়ে ভালো লেগেছে- 'পদ্মবউ' ও 'তারিণী মাঝি'। প্রথমটায় গ্রামের দারিদ্র্য অত্যন্ত হৃদয়বিদারকভাবে উপস্থাপিত হ'য়েছে আর সংকলনের শ্রেষ্ঠ গল্প, 'তারিণী মাঝি', মানুষের অস্তিত্বের নিমিত্তে স্বার্থপরতা বা যে কোন মূল্যে বেঁচে থাকার চেষ্টার এক চমৎকার নমুনা। অন্য গল্পগুলোও মানসম্পন্ন যদিও 'ট্যারা' বা 'প্রতীক্ষা' কিছুটা দুর্বল কিন্তু 'খাজাঞ্চিবাবু', 'ডাক হরকরা', ও 'মধুমাস্টার' বেশ ভালো। 'টহলদার' গল্পে তারাশঙ্কর বিবেক ও মূল্যবোধকে খোরাক ক'রেছেন, 'রাখাল বাঁড়ুজ্জে' গল্পে গ্রাম্য টাউট রাখালের চরিত্র রূপায়ণ ও সংলাপ রচনায় দারুণ দক্ষতা দেখিয়েছেন লেখক।