কৃষ্ণ কি স্বয়ং ভগবান ? না বিরাট মাপের এক ব্যাক্তিত্ব, সামান্য এক গোপপল্লী থেকে বিস্ময়কর একক কৃতিত্বে যিনি সমগ্র ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ?
মহাভারতের যুদ্ধ কি শুধুই কুরুপাণ্ডবদের যুদ্ধ, নাকি ভারতের পূর্ব-দক্ষিণ শক্তির উপর উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় শক্তির আধিপত্য বিস্তারের জন্য সারা ভারতবর্ষ জুড়ে সেকালে যে রাজনৈতিক তথা কূটনৈতিক যুদ্ধ হয়েছিল, তারই ইতিবৃত্ত ?
নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর লেখার সঙ্গে যাঁদের পরিচয় রয়েছে তাঁরা সকলেই জানেন যে, সংস্কৃত সাহিত্যে তাঁর অধিকার কত গভীর ও সুবিস্তৃত । এবং এও তারা লক্ষ করেছেন যে, নৃসিংহপ্রসাদের কোনও কথাই কল্পনাপ্রসূত নয় । তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে তিনি সবসময়ই তুলে আনেন মূল সংস্কৃত সাহিত্যের প্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি, যথাসম্ভব অবিকৃত অবস্থায় জুড়ে দেন তার বাংলা অনুবাদ কি ব্যাখ্যা । তা সত্ত্বেও প্রতিটি রচনাতেই তিনি যে হয়ে ওঠেন চমকপ্রদ - কি তথ্যে, কি ভাষ্যে - তার কারণ, সম্ভবত, নৃসিংহপ্রসাদের অপূর্ব দৃষ্টিকোণ ।
Nrisingha Prasad Bhaduri (Bengali: নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি Nr̥sinha Prasād Bhāduṛi; born 23 November 1950) is an Indologist and a specialist of Indian epics and Puranas. He is also a writer.
নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর জন্ম ২৩ নভেম্বর, ১৯৫০ অধুনা বাংলাদেশের পাবনায়। কৈশোর থেকে কলকাতায়। মেধাবী ছাত্র, সারা জীবনই স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা। অনার্স পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে পেয়েছেন গঙ্গামণি পদক এবং জাতীয় মেধাবৃত্তি।কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃত সাহিত্যে এম-এ। স্বর্গত মহামহোপাধ্যায় কালীপদ তর্কাচার্য এবং সংস্কৃত কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ অধ্যাপক বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্যের কাছে একান্তে পাঠ নেওয়ার সুযোগ পান। নবদ্বীপ বিদ্যাসাগর কলেজের অধ্যাপনা দিয়ে কর্মজীবনের সূচনা। ১৯৮১ থেকে ২০১০ পর্যন্ত অধ্যাপনা করেছেন কলকাতার গুরুদাস কলেজে। বর্তমানে মহাভারত-পুরাণকোষ সংক্রান্ত গবেষণায় ব্যাপৃত। ১৯৮৭ সালে প্রখ্যাত অধ্যাপিকা সুকুমারী ভট্টাচার্যের তত্ত্বাবধানে গবেষণা করে ডক্টরেট উপাধি পান। বিষয়— কৃষ্ণ-সংক্রান্ত নাটক। দেশি-বিদেশি নানা পত্রিকায় বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত। ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’, ‘দেশ’ ও ‘বর্তমান’ পত্রিকার নিয়মিত লেখক। প্রিয় বিষয়— বৈষ্ণবদর্শন এবং সাহিত্য। বৌদ্ধদর্শন এবং সাহিত্যও মুগ্ধ করে বিশেষভাবে। বাল্যকাল কেটেছে ধর্মীয় সংকীর্ণতার গণ্ডিতে, পরবর্তী জীবনে সংস্কৃত সাহিত্যই উন্মোচিত করেছে মুক্তচিন্তার পথ।
পুরাণ, শাস্ত্র, বিশেষত মহাভারত নিয়ে সারস্বত ও যৌক্তিক চর্চার ক্ষেত্রে নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী এই মুহূর্তে বাংলায় অদ্বিতীয়। তাঁর বহু বই পাঠকসমাজে আদৃত। তবে আলোচ্য বইটি লেখকের যাবতীয় সাহিত্যকীর্তির মধ্যে তো বটেই, বাংলা সাহিত্যেই এক অতি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। 'আনন্দবাজার পত্রিকা'-র বার্ষিকী ও পূজাসংখ্যায় প্রকাশিত দু'টি বৃহৎ প্রবন্ধের সংকলন হল এই বইটি।
প্রথম প্রবন্ধ 'কৃষ্ণ'। নৃসিংহপ্রসাদের লেখনীর শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন হিসেবে এই প্রবন্ধটিকে চিহ্নিত করা চলে। এতে লেখকের লক্ষ্য ছিল একটিই— মহাভারতের নানা পর্যায়ে উল্লিখিত কৃষ্ণের নানা রূপ ও আচরণের মধ্যে আপাত অসঙ্গতির কারণ খুঁজেও তাঁকে একজনই মানুষ (আজ্ঞে হ্যাঁ, অবতার বা দেবতা নয়) হিসেবে তুলে ধরা। এই দুঃসাধ্য যৌক্তিক সমরে তাঁকে যে সংশপ্তক বাহিনীর সম্মুখীন হতে হয়েছিল তাদের কোনোটির প্রবক্তা কোনো বিদেশি বিশেষজ্ঞ, আবার কোথাও স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র! সবধরনের পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থেকেছেন নৃসিংহপ্রসাদ। আদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেননি তিনি। বরং পুরাণ থেকে ইতিহাস— যাবতীয় উপাদানের নির্মোহ বিশ্লেষণ করে এগিয়েছেন লেখক। পুরাণোক্ত বিভিন্ন বংশের ইতিহাস বিচার করে তিনি আমাদের দেখিয়েছেন, ঐশ্বরিক লীলাখেলার বদলে স্রেফ ষড়রিপুর দংশনে কীভাবে বাঁক নিয়েছে ঘটনাক্রম। অবশেষে লেখক দেখিয়েছেন, ক্ষমতার লড়াইয়ে নানা গজ, ঘোড়া, নৌকো, এমনকি মন্ত্রী বিসর্জন দিয়েও কীভাবে কৃষ্ণ ভারতজুড়ে যদুবংশের কার্যত একাধিপত্যের সম্ভাবনা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু সেই রণ-রক্ত-সফলতার শেষে যদুবংশের কী পরিণতি হয়েছিল— তাও দেখাতে ভোলেননি লেখক। আর ঠিক ওই জায়গাতেই এই প্রবন্ধটি 'কৃষ্ণচরিত্র'-তে কৃষ্ণের মাধ্যমে একটি আদর্শ স্থাপনের চেষ্টা ছাপিয়ে, যথার্থভাবে আধুনিক হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয় প্রবন্ধ 'মহাভারতের ভারতযুদ্ধ'। মহাভারতকে আমরা কৌরব ও পাণ্ডবদের মধ্যে একটি সিভিল ওয়ার হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত। লেখক এই প্রবন্ধের মাধ্যমে আমাদের ভুল ভাঙতে চেয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, আদতে এই যুদ্ধ ছিল যযাতির বংশের নানা শাখাপ্রশাখার মধ্যে একাধিপত্যের লোভে এক চরম লড়াই। ভারতের অবশিষ্ট রাজন্যবর্গ এই লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন ভয়ে, লোভে, বা দায়বদ্ধতার খাতিরে। প্রতিটি বংশের মধ্যে স্থাপিত বৈবাহিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। গীতা-য় যে বর্ণ-শংকর জন্মানোর আশঙ্কায় অর্জুন শিহরিত হয়েছেন, সেই ভাবনার প্রতি কার্যত অট্টহাস্য করে লেখক দেখিয়েছেন, কীভাবে যযাতির সময় থেকেই ভিন্ন বর্ণের রক্ত মিশেছে এতে। তারই পাশাপাশি তিনি দেখিয়েছেন, শুধু বংশগত রেষারেষি নয়— এই যুদ্ধের পেছনে পূর্ব-মধ্য ভারত এবং উত্তর ভারতের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বও ছিল অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ। সব শেষে তিনি চিহ্নিত করেছেন এই যুদ্ধের দুই প্রকৃত যুযুধান শিবিরকে। এইসব দীর্ঘমেয়াদি কার্য ও কারণের পর প্রায় অনিবার্যভাবেই চিহ্নিত হয়েছে যুদ্ধের তাৎকালিক কারণটিও। নৃসিংহপ্রসাদ প্রমাণ করেছেন, এই ভারতযুদ্ধের একটিই ফলাফল হতে পারত। অভিশাপ, দিব্যাস্ত্র, আকাঙ্ক্ষা— সবকিছু তুচ্ছ করে সেই পরিণামটিই দেখা দিয়েছিল।
'গ্রন্থকারের নিবেদন' অংশে লেখক অকপটে জানিয়েছেন, আলোচনাকে সূচিমুখ অথচ সহজবোধ্য করার তাগিদেই দু'টি প্রবন্ধে কিছু পুনরুক্তি ঘটেছে। কিন্তু পড়তে শুরু করলে সে-সবের দিকে নজর যায় না। বরং অজস্র চরিত্র, নাটকীয় ঘটনাক্রম, রাজনীতির সূক্ষ্ম ও স্থূল প্রয়োগ, অস্ত্রের ঝনঝনা, কাতর আর্তি থেকে বীভৎস উল্লাস— সবকিছু মিলে এক বিশাল নাটকের আয়োজন করে। আমরা জানতে পারি অনেক কিছু, বুঝতে পারি তার এক ক্ষুদ্র অংশই। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহ থেকে যখন বেরোই, তখন আমাদের চেতনা জুড়ে থাকে সেই মহাকাব্য— যার মধ্যে ধ্বনিত হচ্ছে আমাদের অতীত, বর্তমান, হয়তো ভবিষ্যৎও। বইটি অবশ্যপাঠ্য। দয়া করে পড়ুন।
মহাভারতের ভারতযুদ্ধ এবং কৃষ্ণ এই বইটি মূলত দুইভাগে ভাগ করা। একটিতে কৃষ্ণ চরিত্র আরেকটি হল মহাভারতের যুদ্ধ। প্রথমেই কৃষ্ণ চরিত্র নিয়ে লেখক এগিয়েছেন। এই চরিত্র জল্পনা কল্পনার শেষ নেই। কত গবেষণা যে হয়েছে তারও ইয়াত্তা নেই। আমরা সবাই কৃষ্ণের কাহিনী জানি। অত্যাচারী মামা কংসকে হত্যা করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন কৃষ্ণ। কিন্তু এই ঘটনার পেছনে যে কত অঘটন রয়েছে সেগুলা লেখক বের করে আনার চেষ্টা করেছেন। লেখকের প্রায় সব তথ্যেরই উৎস হরিবংশ পুরাণ। শুরু করেছেন কৃষ্ণ শব্দের অর্থ এবং বিভিন্ন শাস্ত্রে কৃষ্ণকে নিয়ে মতবাদ দিয়ে। এক্ষেত্রে ছান্দোগ্য উপনিষদকে নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। কালক্রমে কৃষ্ণ কিভাবে ইন্দ্রের স্থান দখল করে ফেলেছেন সেটারো নাতিদীর্ঘ একটা আলোচনা রয়েছে। এর পরেই লেখক এসেছেন ইন্টারেস্টিং পয়েন্টে। কৃষ্ণের মুলযুদ্ধ কংসের সাথে হলেও পরে তা ছড়িয়ে যায় প্রবল পরাক্রমশালী মগধরাজ জরাসন্ধের সাথে। কারণ জরাসন্ধের দুই মেয়ের সাথে কংসের বিয়ে হয়েছিল। কংসবধের পরে জরাসন্ধ কৃষ্ণকে আক্রমণ করলে মথুরা ছেড়ে কৃষ্ণ পালিয়ে যান দুর্ভেদ্য দ্বারকাতে। পরে এই জরাসন্ধকে সরাতেই কৃষ্ণ কূটচাল দেয়া শুরু করেন। হাতের ঘুটি হিসেবে ব্যাবহার করতে থাকেন কুরু বংশের পঞ্চপান্ডবকে। এর জন্য সম্পর্কে বোন হওয়া সত্ত্বেও সুভদ্রাকে তুলে দেন অর্জুনের হাতে।
এই প্রবন্ধের সবচে ইন্টারেস্টিং পার্ট আমার কাছে লেগেছে বংশলতিকার বর্ণনা। সব রসুনের কোয়া যেন একখানেই। এই যেমন ধরেন যাযাতির পুত্র হল যদু, যার নামেই যাদব বংশ। যযাতির আরেকছেলে ক্রোষ্টুর তিন নাতি। অন্ধক, বৃষ্ণি আর দেবমীঢুষ। এই অন্ধক-বৃষ্ণি বংশই পরে কৃষ্ণ আমলে খুব নামকরা হয়ে যায় এবং কৃষ্ণের পক্ষেই থাকে। আবার এই অন্ধক বংশে পরবর্তীতে কুকুর নামের একজন খুব নাম করেন। তার ছেলে হল আহুক, আহুকের ছেলে উগ্রসেন এবং উগ্রসেনের ছেলে কংস। আবার হরিবংশে কংসকে দানবরাজ দ্রুমিলের ঔরসজাত বলা হয়েছে। এইবার আসি ক্রোষ্টুর তিন নাম্বার নাতির কাছে। এই দেবমীঢুষের বংশে শূরসেন জন্মান, শূরসেনের পুত্র হলেন বসুদেব আর বসুদেবের পুত্র হল কৃষ্ণ। বসুদেবের আরেক বোনের ছেলে হল শিশুপাল। এর মানে শিশুপাল এবং কৃষ্ণ আপন মাস্তুতু ভাই। মজার ব্যাপার হচ্ছে যযাতির বংশেই জন্মগ্রহন করেন কুরু যিনি কিনা কৌরবগনের আদিপিতা। যাই হোক অনেক ক্যাচায় ফেললাম। সবমিলিয়ে লেখক বলতে চেয়েছেন কৃষ্ণ জরাসন্ধ এবং তার মিত্রদের ভারতবর্ষ থেকে নাশ করার জন্য বিরাট পলিটিক্স করেছেন। সেজন্য তিনি বিভিন্ন কূটকচাল চেলেছেন আর ব্যাবহার করছেন সবাইকে ইচ্ছামত। নিজের জীবনেও বহুনারীর প্রতি আকর্ষন এবং বহুবিবাহও করেছেন। সবমিলিয়ে একজন ব্যাপক ভিলেনের ক্যারেক্টার আমি পেলাম। যদিও এইখানে লেখক অত্যাচারী কংসের চরিত্র ও তার কৃষ্ণবিদ্বেষ টেনেছেন খুব অল্প। যার ফলে কৃষ্ণের কূটনীতির ফলে উনাকে সঠিক ভিলেনের রূপদান হয়েছে স্বার্থকভাবেই।জরাসন্ধের সাথে কৃষ্ণের শত্রুতাও কংসবধেরই কারণে হয়।
দ্বিতীয় প্রবন্ধ লেখা মহাভারত নিয়ে। কৃষ্ণের বংশলতিকা জানা থাকলে আসলে ঘটনা বুঝতে বেশ সুবিধা হবে। লেখক মহাভারতের যুদ্ধকে ভিন্ন আংগিকে দেখিয়ে এর রাজনীতিকে অন্যদিকে নিয়ে গিয়েছেন। মহাভারতের রাজনীতিকে যুক্ত করেছেন কুর���-পাঞ্চাল-যাদবদের নিজেদের ক্যাচালের মধ্যে।।
এবার আসেন দেখে নেই কৌরবদের পূর্বপুরুষের নাম। এবার আমি যযাতির আগে থেকে শুরু করি। পুরুরবা-আয়ু-নহুষ-যযাতি-পুরু। পুরু বংশে পরে জন্মান বিখ্যাত দুষ্যন্ত যার জন্ম পুরু বংশে হলেও পালিত হন তুর্বসুর বংশের রাজা মরুত্তের কাছে। সূর্যবংশীয় মান্ধাতার কাছে চন্দ্রবংশীয় পুরু বংশধরেরা রাজ্য হারাতে শুরু করেন যা আবার পরে দুষ্যন্ত অধিকার করে নেন। দুষ্মন্তের ছেলে হল বিখ্যাত সম্রাট ভরত। যার নামেই নামকরণ ভারতবর্ষের। ভরত নিজে যোগ্যতা অনুযায়ী রাজশাসনে বিশ্বাস করতেন। যার ফলে উনি নিজ সন্তানের বদলে পালক হিসেবে নেন মহর্ষি ভরদ্বাজকে (বৃহষ্পতির পুত্র), যার পুত্র হল বিথত। বিতথের ছেলে ভুমন্যু আর তার বংশে জন্মান হস্তী। যিনি হস্তিনাপুরের প্রবর্তক। হস্তীর বড় ছেলে অজমীড়। অজমীড়ের বংশে জন্মান ঋক্ষ, তার ছেলে হল সংবরন এবং সংবরণের ছেলে হল কুরু। কুরুর চার পুত্রের মধ্যে দুই পুত্রের বংশ নিয়ে কথা বলি। এক বংশ শান্তুনু এবং অন্য বংশের ছেলে উপরিচর বসু যিনি পরে চেদী রাজ্য দখল করে নেন। উপরিচর বসুর ছেলে বৃহদ্রথ আর তার বংশে জন্ম নেয় জরাসন্ধ। সেই অর্থে জরাসন্ধও হলেন কৌরব। জরাসন্ধ প্রবল ক্ষমতাবান সম্রাট ছিলেন যার রাজ্য ছিল মগধ। জরাসন্ধবধের পরে তার এক মেয়ের সাথে বিয়ে দেয়া হয়েছে পান্ডবপুত্র সহদেবের। আবার শিশুপালবধের পরে তার মেয়ে করেণুমতির সাথে আরেক পান্ডব নকুলের বিয়ে হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল জরাসন্ধপুত্র ধৃষ্টকেতু আর শিশুপালপুত্র সহদেব কুরুযুদ্ধে পান্ডবপক্ষ গ্রহন করেন।
এখন মহাভারত যুদ্ধের রাজনীতি বুঝতে হলে আরেক বংশ দ্রুপদের পাঞ্চাল বংশের খোঁজ রাখা লাগবে। অজমীড়ের কথা আগেই বলা হয়েছে। এনারই এক ছেলের বংশে জন্ম নেন পাচজন বিখ্যাত ভাই। যারা পাঞ্চাল হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। পাঞ্চালরা কুরুবংশের সংবরনকে হস্তীনাপুর থেকে তাড়িয়ে দেয় এবং পরে মহর্ষি বশিষ্ঠ সংবরনকে পুনরায় রাজত্য লাভে সহায়তা করেন। এই পাঞ্চালের বংশধরই হল দ্রুপদ। দ্রুপদ ভরদ্বাজের কাছে শিক্ষালাভের সময় দ্রোণাচার্যকে পান বন্ধু হিসেবে। সেসময় দ্রোণকে রাজ্য দেবার শিশুসুলভ প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব দানের জন্য যখন দ্রোণ অনুরোধ করেন তখন দ্রুপদ তা প্রত্যাখ্যান করেন। যার ফলে দুজনের মধ্যে তিক্ততা শুরু হয়ে যায়৷ দ্রোণ আশ্রয় নেন পাঞ্চালদের চিরশত্রু কুরু বংশের কাছে। এবং পরে কুরু-পাণ্ডবের সাহায্যে দ্রুপদের অর্ধেক রাজত্য দখল করে নেন দ্রোণ। সুতরাং কুরু-পাঞ্চালের যে একটা প্রবল দ্বন্দ্ব ছিল তা এসব থেকেই প্রকাশ পায়। কিন্তু ভীষ্ম কেন কৌরব পক্ষ গ্রহন করেন? এর কারণ হচ্ছে কাশীরাজ। এই কাশীরাজের কন্যাত্রয়কে ভীষ্ম তুলে এনেছিলেন বিয়ে দেবার জন্য শান্তনুপুত্রের সাথে। এর মধ্যে এক কন্যা বিয়ে না করে তপস্যা করে প্রাণ ত্যাগ করে যে পরে শিখন্ডী হিসেবে ভীষ্মের হত্যাকারী হিসেবে দ্রুপদের ঘরে। কাশীরাজ পান্ডবপক্ষ গ্রহন করার ফলে ভীষ্ম কৌরবপক্ষে ছিলেন।
এখন কথা হচ্ছে কৃষ্ণ কোন পক্ষে এবং কেন। আমরা ইতিমধ্যেই জেনে গেছি যে পান্ডবদের মা কুন্তী কৃষ্ণের বাবার বোন। সে হিসেবে পঞ্চপাণ্ডব আর কৃষ্ণ ভাই ভাই। আর যেহেতু কৃষ্ণের যাদব অন্ধক এবং বৃষ্ণি বংশে বিশাল প্রতিপত্তি ছিল সেজন্য এনারা সবাই পান্ডবপক্ষেই ছিলেন।
আরেক ক্ষমতাধর রাজা বিরাটও পান্ডবপক্ষে অংশ গ্রহন করেন কারণ তার মেয়ে উত্তরার সাথে অর্জুন-সুভদ্রার পুত্র অভিমন্যুর বিয়ে হয়। বর্তমান জয়পুর পিংকসিটিই হল বিরাটের রাজ্য মৎসদেশ।
আরেকটি ইন্টারেস্টিং পার্ট লেখক মহাভারত থেকে টেনেছেন তা হল আমাদের বংগদেশের উৎপত্তি। বৃহষ্পতির এক অন্ধ পুত্র ছিল। যার নাম ছিল দীর্ঘতমা। এই মুনীর কামভাব বেশী থাকার কারণে তার পরিবার তাকে নদীর পানিতে ভাসিয়ে দেয়। পরে তাকে যযাতির ছেলে অনুর বংশধর বলি রাজা নদী থেকে উদ্ধার করে নিয়ে এসে নিয়োগ করেন সন্তান উৎপাদনে। এর মাধ্যমে পাচ ছেলে লাভ করেন রাণী। যাদের নাম অংগ,কলিংগ, পুন্ড্র, সুক্ষ আর বংগ। ইনারাই ভারতের বংগ অঞ্চলের রাজা হন।
এবার বাকী রইল বলরাম। বলরামের মা রোহিনী কুরু রাজা শান্তুনুর ছোট ভাই বহ্লিকের মেয়ে। সেই হিসেবে বলরামের কৌরবদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব থাকলেও কৃষ্ণের কারণে সেই পক্ষ অবলম্বন করতে পারেননি। সে হিসেবে উনি কোন পক্ষ অবলম্বন করেননি।
সবশেষে সারাংশ করতে গেলে বলা যায় কৌরব-পান্ডবের যুদ্ধ আসলে কুরু আর পাঞ্চাল বংশের যুদ্ধ। এখানে কৃষ্ণ নিজের পিসির জন্য পান্ডবপক্ষ অবলম্বন করেন। পুরো রাজনীতির নাটাই ঘুরিয়েছিলেন কৃষ্ণ আর কুরুপক্ষ যারা ছিলেন সবাই ছিলেন জরাসন্ধের অনুরক্ত রাজা। আর সে যুদ্ধে প্রাণ হারান তৎকালীন ভারতের শ্রেষ্ঠ নৃপতিরা।
মাত্র ২টি বড় প্রবন্ধ নিয়ে এই বই। প্রথমটির নাম কৃষ্ণ, যেখানে বসুদেবপুত্রের রাজনৈতিক, কূটনীতিক ও যুদ্ধবুদ্ধির বিষয়ে প্রধানত আলোকপাত করা হয়েছে৷ কৃষ্ণের ভগবত্তার কারণে যে অংশটা মূলত আড়ালেই থেকে যায়। এইজন্য এটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। দ্বিতীয় প্রবন্ধ হচ্ছে, মহাভারতের ভারত যুদ্ধ। তৎকালীন ভারতের ইতিহাস, রাজনীতির ধারায় শেষ পর্যন্ত কীভাবে কুরুক্ষেত্রের ময়দানে পুরো ভারতবর্ষ একত্র হলো সেটাই এসেছে।
শ্রীকৃষ্ণ, যিনি পুরাণ পুরুষোত্তম, কপট চূড়ামণি কিংবা ভারতীয় রাজনীতির প্রথম সূত্রধর। নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী কৃষ্ণের অনুসন্ধান করেছেন মহাভারতের পাতায় পাতায়, দেবতা হওয়ার আগে মানব কৃষ্ণকে খুঁজেছেন পুরাণের কোণে কোণে।
নির্মোহ দৃষ্টিতে শ্রীকৃষ্ণকে বিচার করেছেন ভাদুড়ী মশাই। বঙ্কিমচন্দ্রের মহামতি কৃষ্ণের বাইরেও অনেকগুলি চরিত্র ছিল যাদব কৃষ্ণের। প্রেমিক, কূটনীতিক কিংবা কপট সম্রাট কৃষ্ণকে দারুণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। মহাভারতের কৃষ্ণ এবং হিন্দু পুরাণের কৃষ্ণকে নিয়ে আগ্রহীরা পড়তে পারেন।
খারাপ নয়। দুটি প্রবন্ধ এখানে রয়েছে। 'মহাভারতের ভারতযুদ্ধ' যথাযথ হলেও, 'কৃষ্ণ' সম্পর্কে লিখতে গিয়ে কোথাও যেন পাকেচক্রে ঘুরে মরেছেন। কৃষ্ণের অতিমানবিক চরিত্রের কাছে ওনার অভিভূতি যেন অত্যন্ত বেশি হয়ে গেছে। ফলে সেই পর্যায়ে লেখাটা আর হয়ে ওঠেনি।
অন্য দৃষ্টিতে মহাভারতকে দেখা।কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুধু কুরু পান্ডব দের যুদ্ধ না,বরং এর পিছনে আছে বিশাল জিও পলিটিক্স। মহাভারতকে বুঝতে হলে,বইটি অবশ্যপাঠ্য।আর লেখকের বিশ্লেষণ সত্যিই অসাধারণ। কৃষ্ণকে নিয়ে লিখা বিশাল ও কমপ্লেক্স প্রবন্ধটি প্রশংসার দাবি রাখে।মহাভারত নিয়ে এত যুক্তিপুর্ণ লিখা আগে পড়েছি বলে মনে হয় না।কিন্তু এত চরিত্র ও সবার ফ্যামিলি ট্রি মাথায় প্যাচ লাগিয়ে দিবে।
দুটো প্রবন্ধ আছে। কৃষ্ণ আর মহাভারতের ভারতযুদ্ধ। একটা কৃষ্ণের ধূমকেতুসুলভ উত্থান নিয়ে আর একটা কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের 'কালমিনেশন' নিয়ে। ছোট বই কিন্তু খুব তাৎপর্যপূর্ণ। এই বইটা বছর পাঁচেক আগে পড়েছিলাম। আবার ঋঋড্ করলুম। এই বইটা ভাদুড়ি মহাশয়ের ম্যাগ্নাম ওপাস্। পরের বইসমূহ যা আছে, তা হয় এই স্তরের, অথবা এর থেকে কম ভাল। যাঁরা মহাভারত নিয়ে পড়াশোনা করতে চান, অতি অবশ্যই এই বই শুরুর দিকে পড়ুন।
কৃষ্ণ কি স্বয়ং ভগবান? না কি বিরাট মাপের এক ব্যক্তিত্ব, সামান্য এক গোপপল্লী থেকে বিস্ময়কর একক কৃতিত্বে যিনি সমগ্র ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছিলেন? প্রাচীন কালেই তাঁকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে বহুবার। মামাকে মারার অভিযোগ, গোপরমণীদের মনে প্রেমের লালসা জাগিয়ে শেষে নিজেই পালিয়েছে, পরস্ত্রী অপহরণের কাজ - আরো প্রচুর অভিযোগ। ব্যাক্তিগত চরিত্র ছাড়াও নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য যুদ্ধের অভিযোগ। যুধিষ্ঠিরকে সামনে রেখে রাজনীতির সমস্ত কল্প একে একে প্রয়োগ করেছেন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত। ভীম পুত্র ঘটোৎকচের মৃত্যুতে কৃষ্ণের সেই ধেই ধেই করে নাচতে থাকার কারণ, কর্ণের জন্ম রহস্য কর্ণকে বললেও যুধিষ্ঠিরকে কেন বলল না কৃষ্ণ - যুদ্ধ যাতে থেমে না যায় এটাই চেয়েছিলেন কৃষ্ণ? সম্পূর্ন ভারতযুদ্ধের দায়ও তাঁর ওপর এবং তার জন্য তাঁকে অভিশাপ গ্রহণ করতে হয়েছে গান্ধারীর কাছ থেকে। যে অভিশাপের ফলে, কৃষ্ণের চোখের সামনে তার যদুবংশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। প্রথম পর্ব ১২০ পাতা জুড়ে, "কৃষ্ণ" নাম দিয়ে চমৎকার ব্যাখ্যা, তথ্য, ভাষা - তার কারণ, সম্ভবত, নৃসিংহপ্রসাদের অপূর্ব দৃষ্টিকোণ।
বইয়ের দ্বিতীয় পর্ব - মহাভারতের ভারত যুদ্ধ
অর্জুনের ধারণা - বর্ণসংকর ঘটলে জাতিধর্ম, কুলধর্ম - সব উচ্ছন্নে যাবে আর এই উচ্ছন্নে-যাওয়া পুরুষদের যে চিরকালের নরকবাস অবধারিত -সে ব্যাপারে অর্জুন একেবারে নিঃসন্দেহ। লেখক সেই কথার সূত্র ধরে দেখিয়েছেন পান্ডব-কৌরবের রক্তে অসুরের রক্ত, ঋষির রক্ত, রাজার রক্ত, বেশ্যার রক্ত, সবই আছে। ব্রাহ্মণ শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানীর সাথে যযাতি রাজার বিয়ে হয়। দানব-রাজার রুপসী কন্যা শর্মিষ্ঠার সাথে সহবাগ করে। শুক্রাচার্যের অভিশাপে যযাতি জরা গ্রস্থ হয়। শর্মিষ্ঠার শেষ সন্তান পরু পিতার জরা গ্রহণ করে বাবাকে তার নিজের যৌবন দিয়ে দেয়, তার প্রতিদানে যযাতি পরে তার ছোট পুত্রকে রাজ্য দিয়ে দেয়। ধৃতরাষ্ট্র এবং পান্ডুর মধ্যে যে ছোটভাই রাজা হলেন-এটাও তাহলে নজিরবিহীন কোন ঘটনা নয়। গীতার মধ্যে বর্ণসংকর নিয়ে অর্জুন যত মাতামাতি করেছেন, সেটা নিতান্তই বালকসুলভ, কারণ তাঁরই পূর্বতন রাজচক্রবর্তী পুরু মহারাজের কথা তাঁর জানা ছিল। যযাতি রাজার বংশধরদের দিয়েই ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাস পরিষ্কারভাবে তৈরী হয়ে যায়।
নৃসিংহপ্রসাদের বাকি বইগুলোর মতোই বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধ৷ দুটো মাত্র প্রবন্ধ নিয়ে এই বইটি; কৃষ্ণ এবং মহাভারতের যুদ্ধ।
কূটনীতিক এবং রাজনীতিবিদ হিসেবে কৃষ্ণ চরিত্রটি নিয়ে আগ্রহ আগে থেকেই। চক্রবর্তী সম্রাট হিসেবে রাজক্ষমতা যুধিষ্ঠিরের হাতে থাকলেও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন দ্বারকার রাজা কৃষ্ণ। নৃসিংহপ্রসাদ এখানে চরিত্রটির পূর্ণ বিশ্লেষণ করেছেন। একটু সময় নিয়ে পড়লে বিশ্লেষণগুলো বেশ চমকপ্রদ হয়ে ধরা দেয়।