মানুষ যখন কোনো কিছুর কথা বারবার শুনে, তখন নিজের কল্পনাতে তার এক রূপরেখা তৈরি হয়। হয়তো সেই কারণেই তামিম তার দাদাকে দেখতে পায়। অনুভব করতে পারে। কথা শুনতে পারে। কিংবা হতে পারে তামিমের জন্মের আগে পরলোকগত দাদার সাথে তার এক অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে। যে সম্পর্ক সময়ে অসময়ে আরো পোক্ত হয়। দাদার মোষের পিঠে চরে তামিমও ঘুরে বেড়ায় গ্রাম বাংলার পথেঘাটে। আর দাদার চোখ দিয়ে দেখতে পায় ইতিহাসের এমন এক সময়, সেই সময়কে বাদ দিয়ে বাংলাদেশকে কল্পনা পর্যন্ত করা যায় না!
তামিম স্কুল পড়ুয়া একজন ছেলে। বোন তামিমা আর বাবা-মাকে নিয়ে সুখের সংসার। এই সংসারে এক ঘুঘু দম্পতির আবির্ভাব হয়। তাদের দেখেই দিন কেটে যায় ভাইবোনের। এক জোড়া পাখির প্রতি তাদের নিবেদন, মমত্ববোধ এখানে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। তারই মাঝে তামিম যেন তার প্রয়াত দাদার সঙ্গী হয়ে ওঠে। জানতে পারে সেই মর্মান্তিক ইতিহাস। নিজের দাদার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের কারণ, দাদির করুণ গল্প, দেখা না হওয়া ফুফুর ইতিবৃত্ত।
তামিম বড় হতে থাকে খুব দ্রুত। কিছু ঘটনা তাকে বয়সের চেয়েও পরিণত করে তোলে। নির্বাচনের যে উৎসব, সেই আনন্দকে দুর্বিষহ করার কারিগর যারা, তাদের প্রতি জন্মে তীব্র ঘৃণা। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির এমন অধঃপতন মেনে নিতে পারে না তামিমের বাবা। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের এমন অসম্মান সহ্য করার মতো না। রাজাকারের পরিবার যেন হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের দলের হাতিয়ার। এরচেয়ে নির্মম এর কী হতে পারে!
সময় তো থেমে থাকে না। তামিম স্কুল পেরিয়ে কলেজে দেখে সিঙ্গারা রাজনীতি কীভাবে গ্রাস করে নেয় সমাজকে। এর বিরুদ্ধে গেলেই হয়ে যেতে হয় বিপক্ষ শক্তি। যাকে অপমান করা যায়, গায়ে হাত তোলা যায়। এত ক্ষোভ, এত রাগ, সহ্য করার সীমা অতিক্রম করলে উত্তেজিত তরুণেরা জেগে ওঠে। কারণ, আঠারো বছর যে মানে না বাধা। এভাবেই এই দেশের রাস্তায় একদিন জুলাই নেমেছিল। কে কী পেয়েছিল জানি না, তবে খুনে একদলের হিংস্রতায় অনেকেই হারিয়েছিল আপনজন। বাবা-মা হারিয়েছিল সন্তানদের। কোনো এক সময়ে তাদের দেখাও হয়েছিল এর তাদের প্রিয় মানুষদের কবর হয়েছে নির্জন, নিস্তব্ধ কোনো জায়গাতে!
সাব্বির জাদিদ আমার পছন্দের একজন লেখক। লেখকের “দুই পৃথিবীর সূর্য” এমন এক উপন্যাস, যেখানে মুক্তিযুদ্ধ মিলেছিল জুলাই অভ্যুত্থানের সাথে। একাত্তর না এলে চব্বিশের জুলাই কখনোই এই বাংলার মাটিতে স্থান পেত না। একে অপরের সাথে জড়িয়ে তাদের গল্পটা হয়ে উঠেছিল আবেগের, ভালোবাসার, সম্মানের, মমতার।
তবে প্রথাগত মুক্তিযুদ্ধের গল্প এই বই না। বরং এই গল্পটা তামিমের। তারচেয়েও এই গল্পটা মতিউর সাহেবের। তাকে এত শক্তিশালী চরিত্রে দেখানো হয়েছে, বিষয়টা ভালো লেগেছে। এর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের একাংশ অবমুক্ত হয়েছে। এই অংশটিকে জাদুবাস্তবতার গল্প হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। যেখানে মতিউর রহমান কবর থেকে উঠে আসছে নাতির কাছে। নাতি দেখছে একটি মোষ, যাকে খালিদ বিন ওয়ালিদ নাম দিয়েছিল দাদা। মুক্তিযুদ্ধে এক নিদারুণ অংশের জন্য এই নামকরণ। সেই মোষের পিঠে চরে শিবপুর ঘুরেছে। দেখেছে যুদ্ধের সময়টা। এমন অনেক কিছুই স্পষ্ট জেনেছে, যা তার জানার কথা নয়। তবুও সে জানে। কারণ দাদাকে অনুভব করতে পারে সে।
সে দেখেছে দাদীর সাথে দাদার পরিচয়ের সময়টা। দেখেছে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময়টায় কীভাবে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিতে থাকে এই গ্রাম বাংলার প্রকৃতিকে। হয়তো প্রকৃতিও তাই নিজেরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। নাহলে কেন মোষেরা নিজে এই লড়াইয়ে শামিল হবে? কিংবা মতিউরকে বাঁচাতে শজারু কেন কাটা ছেড়ে দিয়ে আসবে? হয়তো অবাস্তব চিন্তাধারা! কিন্তু প্রকৃতি তাকে রক্ষার জন্য কতটা কী করতে পারে, তার আমরা কতটা জানি!
আমি এখানে লেখক সাব্বির জাদিদের কল্পনার প্রশংসা করতে চাই। তিনি শুরুর দিকে গল্প যেভাবে এগিয়ে গিয়ে গিয়েছেন, দারুণ অনুভূতি ছিল। বিশেষ করে নাতি ও দাদার কথালাপ আমার ভালো লেগেছে। ভালো লেগেছে তামিমের পরিবারের বন্ধন। বিশেষ করে শুরুর দিকে ঘুঘু পাখির বর্ণনা, দুই কিশোর-কিশোরীর উচ্ছ্বাস যেন বেশ উপভোগ্য ছিল। এখানে পারিবারিক শিক্ষা গুরুত্বপুর্ণ।
তামিমের বাবা আজিজুর রহমান মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমানের সন্তান। বাবার সামাজিক অবস্থান, আর্থিক প্রতিপত্তির প্রায় পুরোটা সে পেয়েছে। ফলে সমাজে তারও এক অবস্থান রয়েছে। এই অবস্থানের কারণে তাকে সবাই সম্মান করে, সমীহ করে। কিন্তু যখন কোনো রাজনৈতিক বিষয় এসে যায়, তখন ক্ষমতাসীন দলের অবৈধ কাজকর্মের বিরোধিতা করলে অসম্মান অনিবার্য হয়ে পড়ে। আর এখানেই গল্পটা একটু বাধা পায়। থমকে যেতে হয়। এত নির্মম, রূঢ় বাস্তবতার সাক্ষী হয়তো আর হয়েছে। আর তখন থেকেই ক্ষমতা দখলের আকাঙ্ক্ষা ও মানুষের ক্ষোভ বিপরীতমুখী অবস্থানে দাঁড়িয়েছিল।
গল্প চলাকালীন আমরা জানতে পারি তামিমের এক ফুফুর কথা। পরিচয়ে ফুফু হলেও একজন যুদ্ধশিশুকে অনেক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে হয়। এদিক দিয়ে তামিমের ফুফু অনেক ভাগ্যবতী। মতিউর রহমানের মতো বাবা পেয়েছে। ভেঙে পড়া রহিতন মেয়েকে আগলে রেখেছে। একজন যুদ্ধশিশুকে নিয়ে করে সুখের সংসার দেওয়ার মতো স্বামী পেয়েছে। আর তামিমের মতো ভাতিজা পেয়েছে। যে এই বয়সে সব ভুলে পরিবারের ইতিহাস খুঁজতে খুঁজতে ফুফুকে পেয়ে গিয়েছে। আর যে বন্ধনের সুতো নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল, তারই সেতু হিসেবে আবির্ভাব হয়ে নতুন বন্ধন গড়েছে।
যেহেতু মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস, সে বিষয়ে কথা না বলা ঘোরতর অন্যায়। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষের আবেগের সাথে জড়িয়ে আছে। আমি যখন এ জাতীয় উপন্যাস পড়ি, আমি শুধু পড়ি না। আমি যুদ্ধের দামামা শুনতে চাই। আমি তীব্র আক্রোশে জ্বলতে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের হুংকার শুনতে চাই। আমি পাকবাহিনীর হাহাকার দেখতে চাই। আমি চাই সেই মুহূর্তগুলো চোখের সামনে উঠে আসুক। কিন্তু এই বইয়ের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো কিছুটা হলেও অনুপস্থিত। মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ও সংক্ষিপ্ত ছিল। হয়তো লেখক ইচ্ছে করেই সংক্ষেপ করেছিলেন। কিছুটা খাপছাড়া মনে হয়েছে। আরেকটু জটিল ও রোমহর্ষক ঘটনা আনতে পারলে আবেগের সাথে সংযোগ ঘটতে পারত।
তবে আমার মনে হয়েছে লেখক মুক্তিযুদ্ধের ঘটনায় গুরুত্ব দেওয়ার চেয়ে এর নির্মমতার দিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। নারীদের সম্ভ্রমের সাথে যে অসম্মান জড়িয়ে আছে, বিশ্বাসঘাতক বা রাজাকারদের ছোঁকছোঁক করার কারণে কত মা বোন তাদের সম্মান হারিয়েছে, কত যোদ্ধা শেষ হয়েছে, তারই গল্প যেন লেখক বলতে চেয়েছেন। শুধু যে সম্মানহানি, এমন না! এরপরে তাদের নিজেদের সাথে, সমাজের সাথে যে লড়াই লড়তে হয়েছে তার জন্য সম্মান জানাতেই হয়। আর মতিউর রহমানের মতো কেউ যদি এগিয়ে আসে, তাদের এ লড়াই সহজ হয়ে ওঠে।
যুদ্ধের পরবর্তী সময়টাও কত কঠিন ছিল। যে কারণে দেশ স্বাধীন, তার কোনো কিছুই পূরণ হয়নি। অর্থের অভাব, খাদ্যের অভাব যেন মুক্তিযোদ্ধাদেরও ডাকাত হতে হয়েছে। তখনও মতিউর, রহিতনরা নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছে। প্রকৃতির সাথে মতিউরের এই বন্ধন আমার ভালো লেগেছে। কিছু মানুষ এমন থাকে, যাদের প্রকৃতি আপন করে নেয়। তামিমও মনে হয় সেই ধারার মানুষ।
সাব্বির জাদিদের লেখনশৈলী দারুণ। তিনি আবেগ দিয়ে গল্প বলতে পারেন। ফলে লেখার মধ্যে এক ধরনের ছন্দ প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এই ছন্দের কারণে পাঠ অভিজ্ঞতা বেশ উপভোগ্য মনে হয়। শব্দচয়ন আমাকে মুগ্ধ করে বারবার। তবে কিছুটা অভিযোগ আছে। গল্পের গতিপথ এত দারুণ শব্দচয়নে মাঝেও বিরিয়ানির এলাচির মতো কিছু ইংরেজী শব্দ এসেছিল। সংলাপে এলে ক্ষতি নেই, তবে বর্ণনায় পারিভাষিক শব্দ আছে এমন ইংরেজি শব্দ আমার পছন্দ হয় না। যেখানে এত মায়াময় শব্দের ব্যবহার হয়েছে। তাছাড়া সংলাপের ক্ষেত্রেও কিছু শব্দচয়ন ভালো লাগেনি। আমরা সংলাপে এত কঠিন শব্দ ব্যবহার করি না। তামিম যতই বয়সের তুলনায় পরিণত হোক, তার যেই কৈশোরভাব শব্দচয়নে আসতে পারেনি। বরং যে ভাবগাম্ভীর্য রাখা হয়েছে, তাতে তামিমকে ঠিকঠাক ধরতে পারা যায়নি।
এই বইয়ের অভিযোগ করার জায়গা সবচেয়ে বেশি বোধহয় চরিত্রায়নে। তামিম ও মতিউর রহমান ছাড়া কেউ তেমনভাবে ফুটে উঠল না। এই যেমন আজিজুর রহমানকে শুরুতে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি, সব দিক বিবেচনা করে কাজ করে এমন মানুষ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলেও শেষের দিকে তাকে বৈরাগ্য মানুষ হিসেবে এক জায়গায় বলা হয়েছে। তাছাড়া ইদরিস চাচাকে তার যৌবনকাল থেকে ভালো মতন ফুটিয়ে তুলে বার্ধক্যে গুরুত্ব দিলেও একসময় কোথায় যেন হারিয়ে গেল। তাকে আরেকটু সময় দেওয়া যেত। তাছাড়া তামিমা কিংবা প্রজ্ঞাও খুব একটা জায়গা পায়নি। নাম এসেছে, টুকটাক ভূমিকা এসেছে কিন্তু কিভাবে চরিত্রকে শক্তিশালী করা যায়নি। অথচ মেয়ে দুইটাকেই ফুলের কলি থেকে দারুণভাবে প্রস্ফুটিত করা যেত। সময়ের সাথে সাথে তামিম যেভাবে বড় হয়েছে, তামিমাকে তেমন দেখানো যায়নি। এমনকি প্রজ্ঞাও। ফলে কিছুটা হলেও এসব চরিত্রগুলোর প্রতি সুবিচার করা যায়নি।
তবে আমাকে চূড়ান্তভাবে হতাশ করেছে এর শেষের অংশ, যখন বইয়ের পাতাতে নেমে এসেছিল জুলাইয়ের সময়টা। পুরো বই জুড়ে এত দারুণ গদ্যশৈলীর এমন দুর্বল বর্ণনা মেনে নিতে পারিনি। মনে হলো, লেখক বেশ তাড়াহুড়ো করেছেন এখানে। আরেকটু সময় নিলে, কিংবা আরেকটু বিস্তারিত ঘটনাক্রম সাজাতে পারলে ভালো হতো। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, সোজাসাপ্টা ঘটনার বয়ান না করে কাল্পনিক কিছু চরিত্র অথবা জাদুবাস্তবতার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে পারতেন, তাহলে পাঠক হিসেবে তৃপ্তি পেতাম। যেহেতু লেখক শুরুর অংশে জাদুবাস্তবতা তুলে এনেছিলেন।
শেষের যে পরিণতি লেখক বয়ান করেছেন, তা অনুমেয় ছিল। ঘটনাক্রমে আগেই বুঝতে পারছিলাম এমন কিছু ঘটবে। তবে শেষের দিকে লেখকের বর্ণনা ভালো লেগেছে। একটু হলেও আবেগ ছুঁয়ে যায়। যেখানে কত বাবা-মা তাদের সন্তানকে হারিয়েছে, বোন ভাইকে হারিয়েছে, প্রেয়সী ভালোবাসার মানুষকে হারিয়েছে! এরচেয়ে তীব্র আক্ষেপের এর কী হতে পারে? তবে প্রকৃতি যাকে একবার আপন করে নেয়, তার হারিয়ে যেতে মানা। তারা প্রকৃতির মাঝেই টিকে থাকে।
সেইসব নিকৃষ্ট মানুষ, যাদের পূর্বপুরুষ একসময় মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে ছিল, কিন্তু এখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাদের জন্যই হয়তো বলা হয় — হায় সেলুকাস! তাদেরও একদিন পতন হয়। এই প্রকৃতি অন্যায়কে একটা সময় পর্যন্ত সহ্য করে। এরপর নিজেই নিজেকে বাঁচানোর তাগিদে গল্পের গতিপথ পরিবর্তন করে। তখন সময়ের পালাবদলে কেউ কেউ মতিউর হয়ে ওঠে, ইদরিস হয়ে ওঠে!
▪️বই : দুই পৃথিবীর সূর্য ▪️লেখক : সাব্বির জাদিদ ▪️প্রকাশনী : ঐতিহ্য ▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৩.৭৫/৫
❛ইতিহাস ফিরে আসে। নির্যাতনকারী যুগে যুগে একই থাকে হয়তো নাম, চেহারা পাল্টায়। চরিত্র বদলায় না। কখনো আমাদের ল ড়তে হয় বাইরের শ ত্রুর সাথে। সেখানে স্বান্তনা থাকে সে তো বাইরের। কিন্তু ঘরের শ ত্রুর সাথে লড় তে হলে স্বান্তনা থাকে কি?❜
তামিম আর তামিমা ভাইবোন। শিবপুরের প্রাণবন্ত পরিবেশে তাদের জীবন বেশ যাচ্ছিল। পাখির গান, গাছের ছায়া, মায়ের মমতা সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো সুন্দর ছিল। প্রয়াত দাদার গল্প, তার বীরত্বের কথা, বড় হৃদয়ের কথা জেনে বড় হচ্ছিল তারা। তাদের বাড়ির গাছেই সদ্য নীড় তৈরি করা ঘুঘু পাখিদের নিয়ে দুই ভাইবোনের কী উচ্ছলতা ছিল! তামিম নিজের পৃথিবীতে যেমন উচ্ছল থাকে তেমনি তার তৈরি করা আরেক পৃথিবী আছে। সেটা কল্পনায়। সেখানে আছে তার দাদা। যাকে সে কোনদিন কাছে পায়নি। এর আগেই আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়েছেন তিনি। সেই দাদার সাথে গপ্পো করে তামিম। মোষের পিঠে উঠে, দাদীর সাথে প্রথম আলাপ, সংসার, যু দ্ধের ডামাডোলের কথা শুনে। জানে অনেক অজানা ইতিহাস। সামনেই মেট্রিক পরীক্ষা। ভালো করা চাই। কিন্তু সুন্দর জীবনে ঝড়ের মতো এক ঘটনা ঘটে গেল। ক্ষমতার শান মনে হয় এমনই। যেখানে সম্মানীর সম্মান হেয় হয়ে যায়। এককালের নির্যাত নকারীই ক্ষমতার দাপটে আরো ফুলে উঠে। আঠারো সালের নির্বাচনের দিনটা যেন তামিমের পরিবারে ঝড় হয়ে এসেছিল। ঐ যে সেবার তার কল্পনার পৃথিবীতে দাদা শেষ দেখা দিলেন, তাকে আর পাওয়া গেলনা। পাঁচ বছর পেরিয়ে তামিম বেসরকারি এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো। গায়ের সেই উচ্ছল পরিবেশ ছেড়ে কংক্রিটের দেয়ালের শহর তার নতুন জীবন।
স্বাভাবিক হতে পারতো সব। কিন্তু এরমধ্যেই শুরু হলো কোটা নিয়ে তোলপাড়। দাদার সাহসিকতার গল্প শোনা তামিম কি চুপ থাকবে? বাবা-মা ফোন করে বলেন এসবে যা যেতে। তামিম কি শুনবে এই কথা? ঐ দূর আকাশে এক ফালি মেঘের মধ্যে এতদিন বাদে দফার মুখটা কেন ভেসে উঠলো?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝দুই পৃথিবীর সূর্য❞ সাব্বির জাদিদের উপন্যাসিকা। ঈদ, ২০২৪ এর বণিক বার্তা সিল্করুট ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে এটি। পাড়া গাঁয়ের স্নিগ্ধতায় শুরু হওয়া গল্পটা বেশ লাগছিল। তামিম আর তামিমার ঘুঘু পাখির বাসা, সেখানে ডিম দেখার আকর্ষণ, ঘুঘু পাখির বাচ্চা দেখে আনন্দে আত্মহারা হওয়া এই সামান্য ঘটনাগুলো কী দারুণ ছিল। সাধারণ একটা জীবন তো এমনই হয়। তামিমের কল্পনায় দাদার সাথে বিচরণ, নিজের পরিবারের ইতিহাস আর অজানা কিছু সত্য নিজের উপলব্ধিতে আসা ঘটনাগুলো অলৌকিক লাগছিল। তবে ভালো ছিল। শেষের দিকের গল্পের মোড় আচমকাই ছিল। বাড়ির পূর্বপুরুষের গৌরবের সাথে তৃতীয় পুরুষের গৌরব, সাহসিকতার মিশেল খুব দারুণ ছিল। শেষটা বিষন্ন সুন্দর।
❛ক্ষমতা, গরিমা ঠুনকো জিনিস। সময় ঘুরলেই বদলে যায় হাত। টিকে থাকে সত্য আর বীরত্বের কথা।❜
সাব্বির জাদিদের লেখার শক্তিশালী দিক কল্পনাপ্রবণতাকে ফুটিয়ে তোলা! দুর্বলতা বাস্তবতায়!!
দুই পৃথিবীর সূর্য এবছরই সিল্করুট ঈদসংখ্যায় প্রকাশ হয়েছিল। লেখাটি পড়ে খানিক অসমাপ্ত লেগেছিল। পরবর্তীতে লেখকের থেকে জানতে পারি ঈদসংখ্যায় উপন্যাসটির মাত্র ১৩ হাজার শব্দ ছাপা হয়েছিলো। মূল বই হবে ৬৩ হাজার শব্দের। বইটি ঐতিহ্য থেকে আগামীকালই প্রকাশ হতে যাচ্ছে।
গল্পের প্রথমাংশ পড়ে এককথায় মুগ্ধ হয়েছি। মাত্র এক বছর আগে ঘটে যাওয়া জুলাই আন্দোলন ও আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মিশেলে তৈরি হয়েছে গল্পের প্লট। জুলাই আন্দোলন নিয়ে বেশ অনেকগুলো ছোট গল্প লেখা হয়ে থাকলেও পূর্ণ উপন্যাস সম্ভবত এটাই প্রথম।
গল্পের শুরু শিবপুর গ্রামের রহমান পরিবার থেকে। স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ে তামিম-তামিমাকে নিয়ে ছোট সুখী পরিবার আজিজুর রহমানের। তাদের উঠোনের পাশের লাউয়ের মাচায় সদ্য বাসা বাঁধা ঘুঘু দম্পতির ঘরে আসা নতুন ছোট্ট ঘুঘু সদস্যদের নিয়ে কেটে যায় তামিম-তামিমার সারাদিন। প্রতিদিনের মতো এক শিমুল ফাটা দিনে, স্বপ্নে অথবা জাগরণে, কিংবা জাদুবাস্তবতার আবরণে, তামিম আবিষ্কার করে তার দাদাজানকে, যে দাদাজান তার জন্মের আগেই গত হয়েছেন। অতঃপর মোষের পিঠে চড়ে চাপাইগাছি বিলের পাড় ধরে শুরু হয় দাদা-নাতির এক আধ্যাত্মিক সফর। সেই সফরের সূচনা পর্বেই তামিমের সামনে খুলতে থাকে ইতিহাসের এমন সব অলৌকিক কপাট, যার গায়ে লেপ্টে আছে একাত্তরের গৌরব ও ক্ষতচিহ্ন। ইতিহাসের অনেপনেয় বেদনাকাতর সেই অধ্যায় হতবিহ্বল ও কথাহারা করে তামিমকে। হতবাক তামিম এরপর ক্রমাগত খুঁড়েই চলে নিজের অস্থির সময় এব��� একাত্তরের রক্তাক্ত মাটি। সেই খোঁড়াখুঁড়ির ভেতরই হঠাৎ জুলাই নেমে আসে বাংলাদেশে। শেষ পর্যন্ত, কান্না ও রক্তের কালিদাগ চিরন্তন হয়ে জেগে থাকে।
গল্পের বর্ণনাশৈলীর দুটো দিক চোখে পড়েছে। এক কল্পনা; দুই বাস্তবতা। এখানে বাস্তবতা বলতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অংশটুকু। এছাড়া বাকি পুরোটাই কল্পনা প্রসূত। শুরুতেই লিখেছি "সাব্বির জাদিদের লেখার শক্তিশালী দিক কল্পনাপ্রবণতাকে ফুটিয়ে তোলা। দুর্বলতা বাস্তবতায়!!" অর্থাৎ জুলাই অভ্যুত্থানের যে বাস্তবিক বর্ণনা লেখক গল্পে দিয়েছেন, সে অংশটুকু অনেকটাই দুর্বল লেগেছে। কাঁচা হাতের লেখার মতো লাগছিলো। যেটা কিনা লেখকের স্বভাবসুলভ নয়। অন্যদিকে গল্পের বাকি অংশের বর্ণনাশৈলী অনবদ্য। গল্প পড়তে পড়তে একসময় যেনো নিজেই গল্পের চরিত্র হয়ে গিয়েছিলাম। সেই ঘুঘুর বাসা, সদ্য ফোটা বাচ্চা, নদীর পাশে বসে গল্প করা, দাদাজানের সাথে মোষের পিঠে বসে ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া, সবশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থান, সবটাই ছবির মতো ভেসে বেড়াচ্ছিল চোখের সামনে।
পুরো বই যেহেতু এখনো প্রকাশ এবং পড়া হয়নি, তাই আলোচনাটুকুও লিখিতব্য রইলো। গল্পের প্রথমাংশ পড়া শেষে মন আঁকুপাঁকু করছে বাকিটুকু পড়ার জন্য। বইটা প্রকাশ হলে শীঘ্রই পড়ে ফেলতে হবে। সিম্পল, স্নিগ্ধ, সুন্দর লেখনী যারা পড়তে চান, তারা ট্রাই করতে পারেন।
মূল বইয়ের প্রচ্ছদটা অর্থবহ হলেও আমার পছন্দ হয়নি। ঈদসংখ্যার প্রচ্ছদটা খুব সুন্দর।
২০২৫ রিভিউ বিষয়: বই রিভিউ: ৫৭ বই:দুই পৃথিবীর সূর্য লেখক: সাবির জাদিদ
ভিটেয় ঘুঘু চড়া, সত্যিকার অর্থেই ভালো কিছু? আবার ঘুঘুর বাসার সাথে অন্য কোন রহস্য মিশে আছে, কে জানে? হিস্টোরি রিপিট ইটসেলফ, এই কথাটাই বা কতটুকু সত্য?
দুটো কথা কোন না কোন ভাবে সত্য হয়ে যায়। সে কেন আর কী করে সেটা বিধাতা বৈ কেউ জানে না। তামিম এবারে মাধ্যমিক দেবে, তার ছোট বোন তামিমা। তাদের ঘরের লাউয়ের মাচায় বাসা বেঁধেছে ঘুঘু দম্পত্তি। সেই ঘুঘুর বাসা ঘিরে যেন উৎসব পরিবারে। এটা ২০১৭-১৮-১৯ সালের দিকের এক গল্প।
তামিম ছোট থেকেই একটু আলাদা, তার জন্মের আগেই তার দাদা মারা যান। কিন্তু, তাকে আমরা দেখতে পাই, তামিমের সাথে, মোষ চড়াচ্ছে। নদী থেকে খালে, মাঠ থেকে প্রান্তরে, দাদা নাতি ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেসব কথা তামিমকে কেউ বলেনি, সেই সব কথা দাদা তাকে বলে যান। দাদার কথায় তামিম আম গাছের পোড়া দাগ খুঁজে ফেরে। চমকে যান তামিমের বাবা, এ কথা সে জানলো কী করে? ১৯৭১ সালে যখন এই ঘটনা, সে নিজেও এখানে ছিল না। এমনকি তামিমের মাও জানত না। তবে?
তামিমের বাবা সমাজের গন্যমান্য ব্যক্তি, শত্রু বন্ধু সবাই তার কাছে আসে, কিন্তু একটা ঘটনার জেরে তাকে এক ঘরে ফেলা হয় প্রায়।
অনেক দিনের পথ পার হয়ে আসে। তামিমকে ওর দাদু বলেছিল, তোর কবর তো এখানে হবে না, তামিম দাদার পাশে শায়িত হতে চেয়েছিল।
২০২৪ এর উত্তাল সময়। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তামিম। দেশকে বাঁচাতে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়, ঠিক যেভাবে তার দাদা দেশকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিল।
একদিন লাউয়ের মাচায় থাকা ঘুঘুর দল উড়ে যায়। নিখোঁজ তামিম। বাবা খুঁজতে আসে তাকে। কিন্তু এরপর? শূন্য পড়ে থাকে পাখির বাসা। তামিমের দাদা বলেছিল, এই ঘুঘু সেদিন উড়ে যাবে, যেদিন ………।
অনেকদিন পর এত সুন্দর একটা গল্প পড়লাম। এত বেশি মুগ্ধতা! সব থেকে সুন্দর বিষয় ছিল দাদা-নাতীর গল্পগুলো। একটা ঘোর লাগা সময়। আমাদের দেশের ইতিহাসের দুটো গুরুত্বপূর্ণ অংশকে এত সুন্দর করে এক সুতোয় গেঁথেছেন লেখক!
এই দুইজন মানুষ, ১৯৭১ আর ২০২৪ এর প্রতীক। এরা এ দুই সময়ের, দুই পৃথিবীর সূর্যের মত, গনগণে সূর্যের মত জাজ্বল্যমান হয়ে জ্বলতে থাক,ততদিন, যতদিন এই পৃথিবী টিকে আছে।