একটা ভেঙে পড়া টাউন। জঙ্গলের ভেতর চার্চ। কিছু ভাঙাচোরা মানুষ। রহস্যময় এক জলাভূমি। বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক শিশু সেখানে মাঝে মাঝে দেখা দেয়। অলৌকিক আখ্যান হতে পারে, হতে পারে রহস্যকাহিনি, অথবা কিছুই নয়। হয়ত শুধুই বেদনার।
তনয়া কি পারবে এই আখ্যানের ভেতর লুকিয়ে থাকা সত্যিটা খুঁজে বার করতে?
'শেষ মৃত পাখি'-র মতন অমন অনবদ্য, শুধু সাম্প্রতিক নয়, বাংলায় লেখা তাবৎ গোয়েন্দাসাহিত্যে এক আশ্চর্য ব্যতিক্রমী সংযোজনের পর, সেই একই সিরিজের প্রকাশিতব্য উপন্যাস সম্বন্ধে তার রচয়িতার কাছে প্রত্যাশা ও শেষমেশ নিরাশ হওয়ার আশঙ্কা–দুটিই খুব উঁচুতারে বাঁধা থাকে। ইতিমধ্যে শাক্যজিতের লেখা অনেকগুলি ছোটোগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধনিবন্ধ পড়ে ফেলি এবং মনে ভরসা জাগে যে, 'শে-মৃ-পা' অসময়ে উল্কাপাতের মত আকস্মিক কোনো দৈব অঘটন নয়–বরং একজন নিষ্ঠাবান গদ্যশিল্পীর দীর্ঘ অনুশীলন ও প্রস্তুতির যথাযোগ্য ফসল। এও বুঝতে পারি যে, সাহিত্যগুণের বিচারে, পশ্চিমবাংলার একালের গোয়েন্দাসাহিত্যে এক রাজর্ষি দাশ ভৌমিক ছাড়া শাক্যজিতের সমকক্ষ কেউ নেই। কাজেই প্রত্যাশা আরো প্রশ্রয় পায়।
আপাতত 'নৈশ অপেরা' পড়ে আমি যুগপৎ বিস্মিত ও বিহ্বল। এ-কাহিনি কি কেবল 'শে-মৃ-পা'-র যোগ্য উত্তরপর্ব, নাকি সাহিত্যগুণে তার চেয়েও স্বতন্ত্র ও উৎকৃষ্ট–তার বিচার হয়তো এই বিহ্বলদশা কাটলে করাই ভালো। এটুকু বলাই যায়– শাক্যজিতের গদ্যের কাব্যময় কারুকার্য; আখ্যানকে বিচিত্র শাখাপ্রশাখায় বিন্যস্ত করে স্থান ও কালের মাত্রায় বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত সুদূরবর্তী সূত্রগুলোকে পরস্পরের কাছাকাছি আনার সাবলীলতা; উপরন্তু ঘনবাস্তবের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার মধ্যে দিয়ে ঘটনাপরম্পরায় ছন্দ, দ্রুতি, গভীরতা এবং চরিত্রদের প্রতি সমবেদনা রাগ দুঃখ দ্বেষের স্ববিরোধী রসায়নকে গাঢ় করে আনার যে নৈপুণ্য দেখিয়ে শেষ মৃত পাখি আমাদের আবিষ্ট করেছিল–তা 'নৈশ অপেরা'তেও স্বমহিমায় বহাল। যদিও, উত্তমপুরুষে একই চরিত্রের বিভিন্ন বয়েসের কথন-কে কোনো অধ্যায় বা পরিচ্ছেদে ভাগ না করে যেভাবে কুরুশের মতই বুনে দেওয়া হয় পরপর–তাতে 'শে-মৃ-পা'-র তুলনায় ‘ডেরেক এখানে বসে আছে’-র কথাই মনে আসে বেশি।
বিষয়বস্তুর নিরিখে মোটা দাগের মিল রয়েছে 'একানড়ে', 'শে-মৃ-পা' এবং 'ডেরেক'-এর সঙ্গে('বীরেশ্বর সামন্ত হত্যারহস্য' এখনও পড়িনি)–মেট্রোপলিস থেকে দূরে ক্ষয়িষ্ণু জনপদে কয়েক দশক আগে ঘটে যাওয়া অপরাধ–পুলিশ যার মীমাংসা করতে পারেনি–এবং সেই অমীমাংসিত অপরাধের প্রায়শ্চিত্তকল্পে এবং পরোক্ষ পাপবোধ-জনিত আত্মক্ষয়ে একটি গোষ্ঠীর বিভিন্ন মানুষ অকালে জরাপ্রাপ্ত হন, স্বাভাবিক জীবনস্রোতের বাইরে ছিটকে পড়েন, অথবা উন্মাদ হয়ে যান। শাক্যজিতের এই লেখাগুলির থিম হিসেবে যদি কয়েকটি শব্দ বেছে নিতে বলা হয় তবে আমি বলব–স্মৃতিভার, নৈরাশ্য, গিল্ট, রিপ্রেশন। স্মৃতির বিশ্বাসঘাতকতা এবং পাপীর নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা–এই দুয়ের সঙ্গে যুঝে সত্যকে বের করে আনতে প্রয়োজন ইতিহাসবিদ, মনোবিশ্লেষক অথবা চিহ্নতাত্ত্বিকের দৃষ্টি ও হেঁশেলে ঢোকা বিড়ালের ক্ষিপ্রতা।
মিথ্যে ও কল্পনার গাদায় ছানবিন করে সত্যকে খুঁজে বের করাই তো হুঁশিয়ার গোয়েন্দার কাজ– কেবল এটুকু ধরলে ধ্রুপদী গোয়েন্দাকাহিনির সঙ্গে শাক্যজিতের উপন্যাসের মিল খুঁজে পাওয়াই স্বাভাবিক–কিন্তু একটা বড় পার্থক্য, যেটা শাক্যজিতের লেখার একটি দার্শনিক এবং রাজনৈতিক প্রস্থানও হয়তো–তা হল, গোয়েন্দাপ্রবর হোমস, পোয়ারো, ফেলুদা, ব্যোমকেশ বা হাল আমলের অনেক সত্যান্বেষীরা (কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে) যখন রহস্যভেদ করেন তখন তার সুফল হিসেবে সংসারে ভারসাম্য ফিরে আসে, একটি ছোট্ট সমস্যার যুক্তিসম্মত সমাধান আমাদের আন্তরিক তৃপ্তি দেয়, তার নেপথ্যে ঢাকা পড়ে যায় সভ্যতার সামূহিক সংকট, সমাজ-ইতিহাসের ক্ষতবিক্ষত প্রেক্ষিত।
এদিকে শাক্যজিতের উপন্যাসে যখন রহস্যভেদ হয় তখন সংসারে কোনো ভারসাম্য তো ফেরেই না, বরং উপন্যাসের সব চরিত্র এবং পাঠক স্বয়ং যেন শেষ অবলম্বনটুকু হারিয়ে দিশেহারা বোধ করে। নরহত্যার যে অপরাধ, তার কালপ্রিট-কে খুঁজতে গিয়ে যে মর্মান্তিক বিপর্যয়ের ইতিহাস বেরিয়ে পড়ে বীভৎসতা ও কারুণ্যে মথিত হয়ে, তা দেখে আর নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা জোগায় না; দ্বিগুণ পাপবোধ, বিলাপ, হা-হুতাশ এসে গিলে খায় মনের চরাচর। পাঠক হিসেবে যদি বলি মীমাংসা না হলেই বোধহয় ভালো হত – তা হলে মিথ্যে বলা হবে। কিন্তু সত্যান্বেষণের ঠেলায় যে পরিমাণ ঘৃণা, অপমান ও অত্যাচারের যন্ত্রণা প্রকাশ হয়ে পড়ে, তা অসহনীয়, কারণ পাপী ও অপাপবিদ্ধ সব চরিত্রই ততক্ষণে আমাদের চোখে রক্তমাংসের মানুষ–তাদের শরীর বা আত্মার মৃত্যু ও পচন দেখে আমরা আর নির্বিকার থাকতে পারি কই? (বস্তুত, নৈশ অপেরার প্রথম পর্বের কিছুটা পড়ে মনে হয়েছিল এই চরিত্ররা আসলে সকলেই হয়তো মরে ভূত হয়ে গেছে কিন্তু সেটা এখনও তাদের অজানা–হুয়ান রুলফোর 'পেদ্রো পারামো' উপন্যাসের সেই আগন্তুকের মত) রহস্যসমাধানের সাফল্যেও তাই কোনো তৃপ্তি পাওয়ার কথা নয়। হয়তো সেজন্যই সিরিজের দুটো উপন্যাসেই শেষমেশ তনয়া, যিনি সত্যান্বেষী, তিনি যেন অকুস্থল থেকে বেরোতে পারলে বেঁচে যান!
শাক্যজিতের সব লেখাই যেন এক চরাচরব্যাপী শোক আর তাকে মুছে ফেলার সিসিফীয় প্রয়াসের ধারাবিবরণী; পরিত্রাণহীন নিরীশ্বর এই পৃথিবীতে নশ্বর মানুষের হাহাকারের নথি–যা আমাদের বিহ্বল ও নিরুপায় করে ছাড়ে। এখানে যদি কোনো আশার ঝলক থাকে, তবে তা রহস্য সমাধানের সম্ভাবনায় নেই; তা আছে (পাকেচক্রে) গোয়েন্দা তনয়ার চরিত্রচিত্রণে – তার মানবিকতায় – অপরাধের নির্মম সত্যকে খুঁজে বের করে, অপরাধীর ইতিহাস জেনে যাওয়ার পরেও তার প্রতি সমব্যথী হওয়ার অমূল্য সংবেদে।
'নৈশ অপেরা' সেই অনেকদিন আগে হাতে এলেও অখণ্ড অবসর না মেলায় পড়া হয়ে ওঠেনি। তবে কপাল ভালো, বই নিয়ে মানুষ সিনেমা/সিরিজের মত এতটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে না। তাই স্পয়লার, নিদেনপক্ষে একটা শব্দ না জেনে বই পড়ার যে শখ আমার, সেটা এ বইয়ের ক্ষেত্রে পূরণ হয়েছে।
একটা ভেঙ্গে পড়া টাউন (না গঞ্জ!) এর গল্প 'নৈশ অপেরা'। গল্প বলতে সে টাউনের মাঝেই বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক শিশুকে কেন্দ্র করে গল্পের আবর্তন। অ্যাংলো পরিবারের ৩ বছরের শিশু ক্রিস হারিয়ে গিয়ে সে পরিবার, আশপাশের পরিবার, তদন্তকারী পুলিশসহ আরো অনেক মানুষকে আটকে ফেলে সময়ের খাঁজকাটা চাকার এক খাঁজে। উপরন্তু সেই শিশুকে মাঝে মধ্যে দেখা যায় তার বাড়ির পেছনের বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে। দার্জিলিং এর অমিতাভোর কেস সমাধান করা জার্নালিস্ট তনয়া না চাইতেও জড়িয়ে যায় ক্রিস এর অন্তর্ধানের সাথে। নেমে দেখে, হারিয়ে যাওয়ার তালিকায় শুধু ক্রিস নয়, আরো একজন আছে। তার নাম অ্যাগনেস। ক্রিসের চাইতে তার অন্তর্ধান কম রহস্যময় নয়। ক্রিসকে খুঁজতে গিয়ে জায়গায় জায়গায় পাওয়া যায় অ্যাগনেসের সম্পৃক্ততাকে। অল্প সময়েই তনয়া বুঝে ফেলে, ক্রিসের ব্যাপারে জানতে হলে জানতে হবে অ্যাগনেসের ব্যাপারে। কিন্তু ৩ যুগ আগের সব ঘটনা কী চাইলেই জানা যায়? জানা গেলেও সেটা কী ঠিক হবে?
ওয়েল, এ বই কেমন লেগেছে সেটা এক কথায় বলা মুশকিল। বিস্তারিতই বলতে হবে। প্রথমত লেখকের লিখনশৈলী যে ভিন্নরকম সুন্দর সেটা 'শেষ মৃত পাখি'তেই প্রবলভাবে টের পাওয়া গেছে। সেটার অ্যাডভান্সড লেভেল দেখা গেছে লেখকের 'এখানে ডেরেক বসে আছে' বইতে। সেখানে ভীষণ রকমের অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন লেখক। আর এ বইটাতে সে অস্বস্তিকর, গুমোট পরিবেশ আরো আরো অনেক প্রকটভাবে দেখা গিয়েছে। সাথে দেখা গিয়েছে অনেক বেশি হেড হপিং। হেড হপিংকে কুরুশ বুনন ধরলে মনে হবে এই অমুকের POV এর সাদা সুতোর গল্প-বুনন দেখছি তো খানিক বাদে চোখে পড়বে আরেকজনের লাল সুতোএ POV। এই যে কোনোরকম পূর্বাভাস ছাড়াই POV, সিন বদলে গিয়ে কম্পলেক্স, প্যাটার্নলেস কালারফুল একটা ডিজাইন দাঁড়াচ্ছে, এটা বোঝা, এটাতে বেগ পাওয়া বেশ কষ্টকর একটা ব্যাপার হবে। খানিকটা বিরক্তিকরই বটে। 'শে-মৃ-পা' দুজনের বয়ানে, একটা লিনিয়ার ব্যাপার। 'নৈশ অপেরা' লিনিয়ার তো নয়ই বরং খাপছাড়া। তনয়া সিরিজের বই হলেও মিল বরং বেশি পাওয়া যায় 'এখানে ডেরেক বসে আছে'র সাথে।
তবে এর চাইতেও বেশি হতাশ হয়েছি সেই একই স্মৃতিভার, গিল্টিনেস, কুশীলবদের সময়ে আটকের যাওয়ার পুনরাবৃত্তি দেখে। 'শেষ মৃত পাখি'তে ছিলো, 'এখানে ডেরেক বসে আছে'তেও ছিলো আবার 'নৈশ অপেরা'তেও আছে। লেখক অবশ্যই পাঠকের চাহিদামতো লিখবেন না, তবে আই থিংক সেই সাথে এটাও মনে রাখা দরকার যে, বিষণ্ণণতা, সময়ে আটকে থাকা ব্যাপারে যে রোমান্টিসিজম উনি লালন করেন, পাঠকও বারংবার সেই একই জিনিস সাদরে গ্রহণ করতে পারবে।
তবে ক্যারেক্টার তৈরীতে শাক্যজিৎ যে তনয়াকে অতিমানব বানাননি, এটা বেশ প্রশংসাযোগ্য। শেষের দিকে এসেও আমরা তনয়াকে ফিল করতে দেখি কিছু জিনিস যে সে মিস করেছে সেটা পুরোপুরোভাবে তার হাইপোথিসিসকে নসাৎ করে দিতে পারে। এ ভুল মানুষেরই হয়। তবে আলফ্রেডের চরিত্রটা শুরুতে গুরুত্ব না পাওয়াটা একটা ড্রব্যাক মনে হয়েছে। এক্সক্লুসিভ লেগেছে, রহস্য বুননে। এ ধরণের গল্পে আমরা দেখি রহস্য উদঘাটনের পর গল্প, গল্পের চরিত্ররা ক্লোজার পায়৷ এখানে সেটা হয় না। হারানো ক্রিসের, অ্যাগনেসের ঘটনার চার দুয়ে দুয়ে মিললেও কুশীলবরা আসলে কোনো ক্লোজার পায় না। তার আটকে থাকে জলাভূমিতে, তাদের মনের ভেতর যেটা থেকে আসছে সেই ৩ যুগ বা তারও বেশি সময় ধরে।
তবে তারা ক্লোজার না পেলেও আমি পাঠক হিসেবে প্রায় পরিপূর্ণ ক্লোজার পেয়েছি। অনেক অনেক প্রশ্ন তৈরী হলে প্রায় সবগুলোর জবাবই পেয়েছি স্রেফ হিল্ডার চরিত্রটা ছাড়া। এটা কে, কেন বইতে এসেছে আমি বুঝতে পারিনি। ভালো লেগেছে দুয়েকটা অনুমান মিলে যাওয়াতে। সবমিলিয়ে ৪১০ পৃষ্ঠার এ সুবিশাল উপন্যাসটা আমার খারাপ লাগেনি, আবার অনেক যে ভালো লেগেছে এমনটাও নয়। মাঝামাঝি সেফ জোন যদি মনে হয়, তাহলে বলবো, ভালো লাগার পাল্লাই বেশি ভারী।
রেকমেন্ডেশন? উহু, এইটা কাউকে করবো না। এ বই নিজ দায়িত্বে পড়বেন। কেন বললাম? কারণ আমার ধারণা এ বইটা খুব কম মানুষেরই ভালো লাগবে। এমন না যে, এটা ভালো লাগাতে হলে খুবই উচ্চমার্গীয় সাহিত্যজ্ঞান থাকতে হবে। এটা ভালো লাগাতে হলে এ বইয়ের ভেতরে ঢুকতে হবে পুরোপুরি। তারপরও লাগবে কিনা আমি শিওর না। তাই চেষ্টা করলে নিজ দায়িত্বে করুন। তবে যদি উপন্যাসটা ভালো লাগে তাহলে বই শেষ করে চট করে ইউটিউবে ঢুকে মেঘদলের 'এসো আমার শহরে' শুনবেন। আই থিংক ভালো লাগবে।
ঝিঁঝির অবিশ্রান্ত আওয়াজের মাঝে সেই স্মৃতি ছিঁড়েখুঁড়ে পাল্টাতে থাকে, বেরিয়ে আসে হেঁচকির মত। তখন চল্লিশ বছর আগের কোনও ঘটনা পরিষ্কার বোঝা যায় না। পরস্পরবিরোধী কথা জমতে থাকে, মল্লযুদ্ধ করার জন্য উদ্যত হয়।
"নৈশ অপেরা"-এর মূল রহস্য সমাধানে তনয়ার ("শেষ মৃতি পাখি"-এর প্রোটাগনিস্ট) কাছে সবথেকে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এই স্মৃতির ক্ষয়। তামাদি দুটো কেস, যার ক্রুশ এখনও কিছু লোক বয়ে বেড়াচ্ছে, সেই দুটি কেসের সমাধান বার করা খুব একটা সহজ নয়।
স্মৃতির মত ঝাড়খণ্ডের এই টাউনও ক্ষয়ে গেছে। এককালের হর্তাকর্তা, অ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা প্রায় সকলে এলাকা ছাড়া। শূন্য কটেজগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, কারণ নতুন ট্যুরিস্ট লজ বা শপিং সেন্টার খোলা হবে নাকি।
এইরকম প্রেক্ষাপটে, এমন থিম নিয়ে রহস্যগল্প বাংলা ভাষায় খুব একটা পড়ি নি (ট্রু ডিটেকটিভের তৃতীয় সিজনে ডিমেন্সিয়ার ব্যবহারের কথা খুব মনে পড়ছিল)। নন-লিনেয়ার ভাবে, অগোছালো স্মৃতিঝিঁঝির মত, গল্পের প্লট এগোতে থাকে। বহুবছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক কিশোরী আর দুইবছরের এক ছেলের সাথে বর্তমানের একটা খুনের কোনোও সম্পর্ক রয়েছে কিনা, সেটা নিয়েই পুরো উপন্যাস।
প্লট নিয়ে কপচাই না, এখানেও কপচাবো না। কিন্তু লেখনীর ধরণ নিয়ে দুই কথা বলব। উপমাবহুল লেখা শাক্যজিৎ বাবুর একটা USP, বুঝতে পারছি। এইরকম বিষাদের স্বাদ "শেষ মৃত পাখি" আর "একানড়ে"-এর প্রতিটা পাতায় পাতায় ছিল। কিন্তু সেই লেখনীই উপন্যাসের মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রথমত, উপন্যাসের অনেকগুলো অধ্যায় উপমার ভারে একদম দাঁড়িয়েই গেছে। একই স্মৃতির কথা একই উপমার মাধ্যমে যদি বারবার ফিরে আসে দুঃস্বপ্নের মত, তাহলে পাঠকের মনে একটু ফ্রাস্ট্রেশন তো আসবেই। জানি, গল্পের মূল থিম জীবনের বৃত্তাকার রূপ আর স্মৃতির অনির্ভরযোগ্যতা, তবু উপন্যাসের মাঝামাঝি আসার পর এই উপমাদের ভিড় আমার বিরক্তির উৎপাদন যে করে নি, তা বললে মিথ্যে বলা হবে।
দ্বিতীয়ত, গল্পের বিভিন্ন কথকের tone। "শেষ মৃত পাখি" তে মূল দুইজন কথক রয়েছে: তনয়া নিজে আর পুরনো এক কবি। এখানে দুই কথকের মধ্যে পার্থক্য সুবিশাল। কবি অমিতাভ মিত্রের ভাষায় ফুটে ওঠে অতৃপ্ত কবিসত্তা আর তপ্ত অনুভূতির জোয়ার। অন্যদিকে তনয়ার ভাষা বিষাদময়ী আর বুদ্ধিদীপ্ত। "নৈশ অপেরা"তে বেশ অনেকজন কথক ভিড়েছে, তারা সবাই নিজেদের কথা উগলে দিয়ে আবার চলে গেছে। কিন্তু tonally এদের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। এই সমস্যাটা সবথেকে ভাল ভাবে বোঝা যায় ইনস্পেকটর অবিনাশ আর আলফ্রেডের জবানি পড়ার সময়। দুইজনের কথা বলার ধরণ এতটাই সদৃশ, যে মনে হবে একই লোকের দুটো ডপলগ্যাঙ্গার। এইরকম চরিত্রাঙ্কনের জন্য আমার মনে হয়েছে পুরো উপন্যাস জুড়ে শুধু তনয়ার নানা রূপের জবানি শুনছি, আর কিছু নেই, যেন ওই ভূতুড়ে টাউনে তনয়া ছাড়া আর কেউ নেই।
"শেষ মৃত পাখি"-এর মত ততটা ভাল না লাগলেও "নৈশ অপেরা"-এর সৌন্দর্য্য আমি উপেক্ষা করতে পারি না। সামাজিক বৈষম্য আর ধর্মীয় গোঁড়ামির কথা ফিসফিস করে বলে এই উপন্যাস। সেইসকল সমস্যার মাঝে রহস্য ফিকে হয়ে যায়, কিন্তু তবু হাতছানি দিয়ে শেষ পাতা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়।
দরকার থেকে বেশি কথা, কিছুক্ষণ বর্তমান নিয়ে কথা, কিছুক্ষণ অতীতের কথা, সব মিলিয়ে মাঝে তো হারিয়ে ফেলেছিলাম যে আসলে এই গল্পের লক্ষটা কি?!
যদি এটা হতো, কিন্তু এটা কিভাবে হলো? এমনটা নাও হতে পারে! তবে মনে হয় এটাই কারণ।।
উফফফ, রহস্য কাহিনী আমি পড়ছি, আমি পাঠক। এই সকল প্রশ্ন আমার মাথায় আসতে পারে.. কিন্তু এইখানে গল্পকথক নিজেই এই সকল প্রশ্ন করে করে আরো বেশি বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে দিয়েছে পাঠক মনে।
শেষ মৃত পাখি আমার কাছে দুর্দান্ত একটি রহস্য কাহিনী লেগেছিল। সেই লোভে এই বইটিও পড়ার প্রতি আগ্রহ অনেক বেশি ছিল। তবে আমি হতাশ 🙂
"নৈশ অপেরা" লেখক : শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য, প্রকাশক : সুপ্রকাশ প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ : জুন, ২০২৫, প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী , পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৪১০, মুদ্রিত মূল্য : ৫৪০ টাকা।
গতকাল বইটি পড়া শেষ করেছি। এখনও তার রেশ কাটেনি। উপন্যাস শেষ, রহস্য উন্মোচিত কিন্তু তবু যেন আমি দুপাশে জঙ্গলঘেরা ডেগাডেগি নদীর ধারে নির্জনে একাকী বসে আছি। উপন্যাসের স্থানীয় চরিত্রগুলো আমার চারপাশ দিয়ে ছায়া আবছায়ার মতন ঘুরে বেড়াচ্ছে। কখনও নিঃশব্দে পাশে এসে বসছে। কখনও পিছনে এসে দাঁড়াচ্ছে। কখনও কারো গলার আওয়াজ শুনে সেরকমই কোনো ছায়ার পিছু পিছু আমি হয়তো জঙ্গলে ঘেরা উঁচু নিচু পথ দিয়ে পাড়ি দিয়েছি তিতিরকান্না মাঠের দিকে। আমি বাকিদের মতন উদ্ধৃতি তুলে তুলে গতে বাঁধা নিয়মে পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখতে পারিনা। আমার নিজের বক্তব্যই যতটা সংক্ষেপে হয় লিখে বোঝাতে চেষ্টা করি। স্পয়লার যাতে না দিয়ে ফেলি সেই দিকেও সর্বদা সতর্ক থাকতে হয়। লেখকের লেখা আরেকটি রহস্য উপন্যাস দার্জিলিং এর পটভূমিকায় "শেষ মৃত পাখি" পড়ে শিহরিত হয়েছিলাম। থ্রিলার পড়ে যদি thrilled ই না হলাম তো সেই থ্রিলারের সার্থকতা কোথায়? কিন্তু না। শাক্যজিৎ বাবু সেক্ষেত্রে কোনো অভিযোগের জায়গা রাখেননি ওই উপন্যাসে। এমন অদ্ভুতভাবে রহস্যকাহিনী টি উপস্থাপিত হয়েছিল যে সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে। তবে এই উপন্যাসটি, মানে "নৈশ অপেরা" কি সেই থ্রিল ধরে রাখতে ব্যর্থ হোলো? সেকথায় পরে আসছি। আমি আবারও ফিরে যাচ্ছি ঝাড়খণ্ডের ডেগাডেগি নদীর তীরে সেই ভেঙে পড়া টাউনটিতে। ভাঙাচোরা বাড়ি। ভেঙে পড়া কিছু মানুষ। ভগ্নপ্রায় চার্চ। আর একটি অর্ধ ভগ্ন কটেজ। প্রকৃতির যে বর্ণনা লেখক দিয়েছেন, যেভাবে দিয়েছেন, পড়তে পড়তে প্রতি মুহূর্তে ওই জায়গার সাথে একাত্ম হয়ে যেতে হয়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখা পড়ে প্রকৃতির সাথে বারংবার একাত্ম হয়েছি পূর্বে। বুদ্ধদেব গুহর লেখাতেও এই ছোটনাগপুরের মালভূমি অঞ্চলের প্রাকৃতিক বর্ণনা উঠে এসেছে । সেই বর্ণনায় একাত্ম হয়েছে প্রেম ও প্রকৃতি। কিন্তু এই উপন্যাসের প্রাকৃতিক বর্ণনার পরতে পরতে রয়েছে শিহরণ। হরর ছায়াছবিতে পরিচালক যেমন দর্শকদের ভয় দেখানোর আবহ তৈরি করার প্রভূত সুযোগ পান। কেউ ভয় দেখাতে পারেন কেউ পারেন না। কিন্তু লেখনীর মাধ্যমে গা ছমছমে আবহ তৈরি করা কিংবা এমন একটা আবহ তৈরি করা যেটা পড়ে মুহূর্তে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে এমনটা কিন্তু সবাই পারেন না। শাক্যজিৎ পেরেছেন এবং সফল ভাবেই পেরেছেন । সূচনা থেকেই সেই আবহ তৈরি করতে তিনি সক্ষম হয়েছেন। পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রাকৃতিক বর্ণনা এবং তার সাথে একটা অজানা ভয়ের আশঙ্কা। অদ্ভুত একটা গা শিরশিরানি অনুভূতি তিনি ধরে রাখেন সমগ্র প্রথম পর্ব জুড়ে। প্রথম পর্বে গল্প এমন জট পাকায় পাঠকের একসময় মনে হবে একটা লুপের মধ্যে যেন হারিয়ে যাচ্ছেন ক্রমাগত। চোরাবালিতে গেঁথে যাওয়ার মতন। মনে হবে এই রহস্যের সমাধান কি আদৌ সম্ভব? কীকরে সম্ভব? যেখানে ঘটনা ঘটে গেছে বহু বছর আগে। তার অনেক ক্লু অনেক সাক্ষ্য প্রমাণই হারিয়ে গেছে। তার পরেও কি তনয়া পারবে এই রহস্যের কিনারা করতে? হ্যা তনয়া। তনয়া ভট্টাচার্য। "শেষ মৃত পাখি" উপন্যাসের সেই সাংবাদিক আবারো ফিরে এসেছেন এই রহস্য কাহিনী তে। পেশায় তিনি গোয়েন্দা নন কিন্তু পূর্বের হত্যা রহস্যের সফলতায় তার উপর এখন মানুষের আস্থা বেড়েছে। তাই তাকে না চাইতেও জড়িয়ে পড়তে হয় কাহিনীর মায়াজালে। জড়িয়ে পড়তে হয় বারবারা, অ্যারন, এডওয়ার্ড, মনীষা, জেনিফার, ডলোরেস, মার্গারেট, ফ্রেডরিক, অবিনাশ, রেভারেন্ড সবার সাথে। আরো দুটি চরিত্র না থেকেও তনয়া কে ঘিরে ছিল সর্বদা, সেই ক্রিস এবং অ্যাগনেস। উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্বে জট ছাড়ানোর পর্ব চলে। এই পর্বটি প্রথম পর্বের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ছোট কিন্তু উত্তেজনার মাপকাঠি একই ছিল। অন্তত আমার কাছে তাই ছিল। "শেষ মৃত পাখি" - র সাথে সবকিছু তুলনা করলে হবে কেন? দুটো উপন্যাস তো একই রকম ভাবে এগিয়ে যেতে পারেনা। তাহলে আর পাঠকরা গ্রহণ করবেন কেন? এই উপন্যাসের ক্ষেত্রে তনয়া শেষ অবধি যেই সিদ্ধান্তে আসেন সেটা একান্তই তার ব্যক্তিগত অভিমত। এই রহস্যের সমাধান কেউ অন্যরকম ভাবে করলেও করতে পারত সেটাও যে ঠিক বলতে পারি তা নয়। কারন পরে আমরা পাঠকরা জানতে পেরেছি তনয়া সত্যসন্ধানী হিসেবে কতটা সঠিক ছিল। তবু তার কাছে শেষ অবধি এক দুটো জিনিস অধরা রহস্য হয়েই থেকে যায় যেটা আমরা পাঠকেরা শেষে গিয়ে জানতে পারি কিন্তু তনয়া জানতে পারেন না। এটাই ওনার জন্যে একটু আক্ষেপ। কিছু ক্ষেত্রে না পাওয়া টাও হয়তো অনেক বেশি পাওয়া হয়ে যায়। যাদের কথা ভেবে তনয়া দিবারাত্র এক করেছে তারা তনয়া কে কাছে টেনেও ভুল বুঝে দূরে সরিয়েছে বারংবার। আর আগনেস? সেই কিশোরীটির কথা ভেবে হৃদয় মুচড়ে ওঠে প্রতি মুহূর্তে। কি পেলো মেয়েটি তার সারা জীবনে? এত আঘাত এত কষ্ট কি সত্যিই তার প্রাপ্য ছিল? কোথাও গিয়ে যেন অ্যাগনেসের এই ব্যথা এই যন্ত্রণা তনয়াকে ছুঁয়ে যায়। "হা হা বাতাস , শাল সেগুনের প্রহরা ও নির্জন টিলা তোমাকে মনে করাবে মৃত সমাধিদের কাহিনী।" সত্যিই এই উপন্যাস শেষ করার পরেও মনে করাতে থাকে সেই গঞ্জ, সেই sanctuary homestay , সেই তিতিরকান্নার মাঠ, রহস্যঘেরা জলাভূমি ও জোহার হালে। তনয়া কে আমরা নিশ্চই খুব শিগগিরই আবার পাবো শাক্যজিতের পরবর্তী রহস্য কাহিনী তে। কিন্তু "নৈশ অপেরা" - এই আবহ , এই মায়া কিন্তু আরো কিছুদিন ছড়িয়ে থাকবে দেহ মনে।
একটা ভেঙে পড়া টাউন, জঙ্গলের গভীরে লুকিয়ে থাকা চার্চ, চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ভাঙাচোরা মানুষ। এর ভেতরেই আছে এক রহস্যময় জলাভূমি, যেখানে বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক শিশুর ছায়া মাঝে মাঝেই ভেসে ওঠে। এ কি কেবলই লোককথা? নাকি এর পেছনে আছে কোনো অলৌকিক আখ্যান?
বলছিলাম শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের লেখা রহস্য উপন্যাস 'নৈশ অপেরা'-র কথা। লেখক পুরো উপন্যাস এমনভাবে লিখেছেন যেখানে স্পষ্ট উত্তর নাই। একবার মনে হচ্ছে, ঠিক পথে এগোচ্ছি। আবার, একটু গিয়েই সব যেনো কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে বলেও মনে হয়। একবার মনে হচ্ছিলো এ কি রহস্য উপন্যাস? নাকি হরর? সত্যি বলতে অনিশ্চয়তাই হচ্ছে এই বইয়ের মূল উপাদান।
আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে এই বইয়ের মুড। পুরোটা জুড়েই যেনো এক দমবন্ধ ব্যাপার ছিলো। ধোঁয়াশা ধোঁয়াশা ব্যাপারটা আসলেও জোশ।
বইটা ধরার আগেই এক ধরনের ভয় কাজ করছিলো। ভেবেছিলাম, বইটা হয়তো আমার ভালো লাগবে না। বেশকিছু নেগেটিভ রিভিউ দেখেই এহেন মনে হয়েছিলো। কিন্তু শেষ করার পরে আমি ৫/৫ দেয়া থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারিনি, এতোটাই জোশ লেগেছে আমার কাছে।
হ্যাঁ, একটা জিনিস অবশ্যই বলা উচিত। ম্যাক্সিমাম পাঠক পাঠিকার কাছেই 'নৈশ অপেরা' অনেক বেশি ভালো লাগতো যদি লেখাটা আরো স্পষ্ট হতো। 'শেষ মৃত পাখি' যেমন ছিলো তার তুলনায় বলতে গেলে 'নৈশ অপেরা' অনেকের চোখেই অষ্পষ্ট বলে মনে হবে।
তবে, আমি খুব বেশিই উপভোগ করেছি। ইনফ্যাক্ট, 'শেষ মৃত পাখি'-র থেকেও বেশি ভালো লেগেছে। ৫/৫ তো আর এমনি এমনি দেইনি। তাই না? শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত একটা ভার বুকের ভেতর থেকে গেছে, বইটা শেষ করার পরেও মনে হচ্ছে সেই রেশ কাটেনি। চমৎকার লেগেছে। ব্রাভো শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য! ব্রাভো!!
অনেক ছোটবেলায় সরস্বতী পূজায় একবার নিথর শিশু কোলে এক মা এর পাথর ফাটানো কান্না শুনেছিলাম। এই উপন্যাস টা পড়ে সেই গুমরে ওঠা বীভৎস দলাপাকানো বিষন্নতা কিছু টা ফিরে পেলাম।
এটা ঠিক গোয়েন্দা অপরাধী খুন সাজানো টানটান থ্রিলার নয়। মানব হৃদয়ের বহুস্তরীয় অন্ধকারের সাগর মন্থন করে তোলা হাহাকারের আর্তনাদ কে নিখুঁত পুরেছেন লেখক রহস্য কাহিনীর মোড়কে। শেষ মৃত পাখি মন জিতে নিয়েছিল, আর এবার মন হারিয়ে ফেললাম। অসাধারন।
পৃথিবীর এই সব উঁচু লোকদের দাবি এসে সবই নেয়, নারীকেও নিয়ে যায়।
—-১৯৪৬-৪৭,জীবনানন্দ দাশ
… সুতরাং কিশোরী অ্যাগনেস ও’ব্রায়েন-কেও একদিন হারিয়ে যেতে হয়।
এবং এডওয়ার্ড ব্রাউন খুন হয়,ক্রিস ব্রায়ান অপহৃত হয়,মুন্না মারা যায় বা নিরুদ্দেশ হয়ে যায়,ডেভিড ব্রাউন ও মনীষা ব্রাউন আত্মহত্যা করে। এবং ‘শেষ মৃত পাখি’র ব্রিলিয়ান্ট ডেবিউর তিনবছর পর তনয়ার সঙ্গে পাঠকের অপেক্ষিত দ্বিতীয় সাক্ষাৎটি ঘটে ঝাড়খণ্ডের টিলা-ঝোরা-জঙ্গল-ঘাসবন ও অরণ্যের ঝাঁঝরা অশেষ মৃতদেহ সম্বলিত গঞ্জের জীবন্ত ফসিলের অভয়ারণ্যে। তনয়া আসেন,ছেড়ে যান এবং ছেড়ে গিয়েও আবার ফিরে আসেন গঞ্জের নন-লিনিয়ার সময়প্রদেশে ক্রমাগত মানুষের নেই হয়ে যাওয়ার সত্যি খুঁড়ে বের করতে।
অতিপ্রাচীন মালভূমি ও উপত্যকা যারা মহাদেশের জন্ম দেখেছে,যেখানে প্রাগৈতিহাসিক গাছেদের প্রেতশিকড়ের গা বেয়ে সবুজ অন্ধকার ওঠে মাটি ফুঁড়ে,সেখানের ফ্লাকচুয়েটিং স্মৃতি ও আচ্ছন্ন জনমানস,অসুখাক্রান্ত শৈশব ও বিক্ষত বেঁচে থাকা এবং অনস্তিত্বের আশ্চর্য পৃথিবী উপন্যাসের প্রথম পর্ব জুড়ে প্রত্যেকের দিন রাত্রি গোধূলি ও শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষায়। আবহ নির্মাণ এত সাবলীল যে অনায়াস নিরাবেগে নিশির ডাকের মতো হাতছানি রেখে যায়। যেহেতু তনয়া শুরু থেকে শেষ অবধি মূলত সন্ধানী,অকাট্য ঈশ্বর হওয়ার দায় তাঁর নেই,সেই কারণে বারবারা-অ্যারন-জেনিফার-অবিনাশ যাদব-আলফ্রেড হেমব্রম ও গঞ্জের অন্যান্যদের মতো তনয়াও ‘নৈশ অপেরা’র অন্যতম ন্যারেটর। কাহিনীর দূর অতীত,অনতিদূর অতীত ও বর্তমান আসলে এদের বিবিধ ন্যারেটিভ,প্রত্যেকের আলাদা আলাদা অনুভূতি অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি। পাঠক এদের সঙ্গে সামিল হয়ে পড়ে গঞ্জের গোলকধাঁধার মতো অ্যানাটমির ভিতর। সময়ের পেটের ভিতর আরেক সময়,তার ভিতর আরেক। ষাটের দশক-আশির দশক,যখন গঞ্জের অ্যাংলো কমিউনিটির ভালো সময়,পঁচাশি সাল থেকে নব্বইয়ের দশক,যখন অ্যাগনেস ও ক্রিস হারিয়ে যায় এবং কমিউনিটির উপসংহারের শুরু হয়,আরও যা শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দেয়,এই সব আলাদা আলাদা কালখণ্ড,এমনকি অ্যাগনেসের নিজের সময়ও অ্যাগনেসের অনস্তিত্বের ভার বহন করে,যা তার উচ্ছলতার আনন্দের বিষাদের একদিন দু’দিন কিংবা কয়েক মাস পরের ঘটনা,অ্যাগনেসের হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা,কিন্তু যে কোনো সময়ে দাঁড়িয়ে মনে হয় ঘটে গেছে,ঐ একটি ঘটনাই চিরকালের মতো ঘটে আছে। ‘নৈশ অপেরা’র সময় আদতে ভাঙনের দিকনির্দেশ। প্রথম পর্বে যদিও গা-ছমছমে রহস্য,তবু তলায় তলায় স্রোত বয় অনপনেয় শোকের। তনয়া নির্ধারণ করেন তিনি কী খুঁজবেন — যারা হারিয়ে যায় তারা কেন হারিয়ে যায়। অ্যাগনেস হারিয়ে গিয়েছিল বলেই কি ক্রিসকেও হারিয়ে যেতে হয়?
লীন হয়ে গেলে তারা তখন তো — মৃত। মৃতেরা এ পৃথিবীতে ফেরে না কখনো। মৃতেরা কোথাও নেই; আছে? — ১৯৪৬-৪৭,জীবনানন্দ দাশ
মানুষের ইতিহাসে এমন অতীত নেই যখন সবলের মুঠো দুর্বলের শ্বাসরোধ করেনি। গঞ্জের নিজস্ব জাতিবৈষম্য শ্রেণিবৈষম্য লিঙ্গবৈষম্য ইত্যাদি যাবতীয় অসাম্যের সমীকরণ উপাদান সেই প্রাথমিক অপরাধেরই,কারণ সব অপরাধ শেষমেশ একটি গল্পেরই পুনরাবৃত্তি। সবল বনাম দুর্বল এই সমীকরণ লক্ষ বছরেও বদলায়নি,বদলে যায় শুধু অবস্থান। প্রশ্ন রয়ে যায় — শুরু কোথায়? শুরু না জানলে নির্ধারণ করা যায় না অন্যায়কারী কে,প্রতিশোধ কার। দ্বিতীয় পর্ব সেই উৎসের দলিল এবং যেহেতু তনয়া শুরু থেকে শেষ অবধি সন্ধানী,ফলত তনয়া ধূসর ভঙ্গুর যে সূত্রগুলো ক্ষয়ের ডিপ্রেসিভ গন্ধ ছাড়ে,সেগুলোকে মিলিয়ে সম্ভাব্য সবথেকে সহজ কার্যকারণ দাখিল করেন। আমরা পাঠকরা,যারা ‘শেষ মৃত পাখি’র সেরিব্রাল উজ্জ্বলতায় বিস্মিত হয়েছিলাম,তাদের কাছে ‘নৈশ অপেরা’র সমাধান তুলনায় সহজ ও অনুত্তেজক লাগতে পারে। মনে হতে পারে যেসব হারিয়ে যাওয়ার বিষ-অভিঘাতে গোটা গঞ্জ ও তার প্রজন্মরা দীর্ঘ পরিণতিহীন মৃত্যু পেতে পারে,সেই সব নিরুদ্দেশের ‘কীভাবে’ ও ‘কেন’ আরও শকিং হল না কেন। বুদ্ধির খেলা শুরু হওয়ার আগেই যেন মঞ্চে পর্দা পড়ে গেল। কিন্তু আমরা কি জানি না,যে সমাজ জানে না মেয়েদের কীভাবে হ্যান্ডল করতে হয়,সেই সমাজে অ্যাগনেসরা কেন হারিয়ে যায়। আমরা তো জানি অ্যাগনেস প্রথম নয়,তার আগে ও পরে মানুষের পদচিহ্নের আদি থেকে আজ অবধি অনেকানেক মেয়েদের নেই হয়ে যাওয়াই প্রথা। যে অপরাধ নতুন নয় এবং যার উপশম নেই,সেই অন্যায়ের স্মৃতি আমাদের অবচেতনে বয়ে এনেছি, ‘নৈশ অপেরা’ সেই সুতোয় টান দেয় অনাড়ম্বরে,শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের পরিচিত নির্মোহতায়। স্তব্ধ হয়ে ভাবি,এই উপন্যাসের আঘাত আমি হৃদয়ে বয়ে বেড়াব ভাস্কর্যের মতো। অ্যাগনেসের জন্য যতবার বেদনা অনুভব করব,মনে হবে একটি রহস্য কাহিনি আমায় জীবনানন্দের আরেকটু কাছে পৌঁছে দিয়েছিল।
তনয়ার দায় নেই অকাট্য ঈশ্বর হওয়ার,সুতরাং উপন্যাসের উপসংহার জানান দেয়,তনয়া একশো শতাংশ সঠিক নাও হতে পারেন। পাঠক হিসেবে আমি চাই,গঞ্জের অমীমাংসিত রহস্যগুলোর অন্তত একটি ���মাধানে তাঁর সিদ্ধান্ত ভুল হোক। তনয়া ঘোষণা করেন,অ্যাগনেস নেই। অ্যাগনেসের ভূত আসলে মাস হ্যালুসিনেশন কিংবা সাজানো ভূত। পাঠক হিসেবে আমি জানি, ‘নৈশ অপেরা’র ক্ষয় শাপ ও শোকের ক্রনিকলে অ্যাগনেসের ভূত আমার সালভেশন। কারণ,ক্রমাগত অন্যায় অবিচার ও অত্যাচার তাকে নিঃশেষে মুছে দিল,এর চাইতে বিধ্বংসী অন্যায় আর কিছু নেই।
‘মৃতেরা কোথাও নেই; আছে?’ উপন্যাস কোথাও কি লুকনো নীরব প্রশ্ন রেখে যায়?
সৌজন্য চক্রবর্ত্তীর প্রচ্ছদ প্রশংসনীয়। মুদ্রণ-প্রমাদ নগণ্য। পরিশেষে লেখককে অভিনন্দন। তনয়া আবার ফিরবেন এবং আরেকটি দুর্দান্ত মানবিক কাহিনি পাঠককে উপহার দেবেন অপেক্ষা রাখি।
বইটি চার দিনে টানা পড়ে শেষ করলাম । ৪১০ পাতার বাংলা রহস্য-উপন্যাস আগে পড়েছি বলে মনে পরছেনা। সুবৃহৎ পরিসরে রহস্যের ডালপালা ছড়িয়ে, গল্পের শেষ পর্যন্ত suspense বজায় রেখে তা আবার সুচারু রুপে গুটিয়ে আনা কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয় । লেখক এই জায়��ায় কিন্তু একশ শতাংশ সফল ।
শাক্যজিৎ এর শেষ মৃত পাখি পড়ে বেশ ভালো লেগেছিলো। তাই নৈশ অপেরার কথা জানার পর থেকেই বেশ আগ্রহ ছিল। কিছুদিন পর বইটা কিনেও ফেলি। সত্যি বলছি, প্রথম দশ পৃষ্ঠা পড়ার পর আর পড়তেই পারিনি। বুক শেলফে ধুলো জমাচ্ছিলো। কেন পড়তে পারিনি সেটাই প্রথমে বলি।
আগের বইটিতে দার্জিলিং এর আবহে যেই কাব্যিক বর্ননা ছিল, নৈশ অপেরাতে এসে তা পূর্ণরূপ ধারণ করেছে। বইটা এমনিতেই দীর্ঘ। তার ওপর নানা উপমায় ভরপুর এবং বর্ণনার বেশিরভাগ জুড়েই তা। যেটুকু লেখা একপৃষ্ঠায় শেষ করা যায় সেটাই বর্ননার খাতিরে হয়ে গেছে পাঁচ পৃষ্ঠা।বই এর ষাটভাগ জুড়েই কাব্য, চল্লিশভাগে আসল গল্প। প্রতিটা ক্যারেক্টার খুবই হেয়ালিতে কথা বলে, সাধারণ কথাও ঘুরেফিরে বড্ড পেঁচালো হয়ে ঠেকে। মানতেই হয়, কিছুক্ষেত্রে বেশ বিরক্ত হয়েছি।
দ্বিতীয়ত কিছুক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার অভাব গুরুতর। প্রথম পুরুষে একজন এক প্যারায় এক সময়ের কথা বলছেন, পরের প্যারাতেই অন্য মানুষ অন্য সময়ে অন্য কথা বলছেন।যেহেতু তাদের নামধাম বা সময়ের বদলে সরাসরি প্রথম পুরুষে বর্ণনা, পাঠক মনোযোগ না দিলে কনফিউজড হতে বাধ্য। আসলে কী বলা হচ্ছে বোঝা খুব কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।
আমি কবিতা কম বুঝি, আমাকে অত টানেও না। তাই আবার বলছি, কিছুক্ষেত্রে বেশ বিরক্ত হয়েছি। আমি বলবো, ব্যস্ততার চক্রে বাধা থাকলে এবং শতভাগ মনোযোগ না দিতে পারলে এই বই পড়বেন না বা কিনবেন না। শুধুই সময় আর অর্থের অপচয় বলে মনে হবে, বেশিদূর পড়তেই পারবেন না।
কিছুদিন হল বই পড়ার ঝোঁক আবার উঠেছে তাই এই বইটা হাতে নিলাম। মনে হয়েছিলো, পড়লে এখনই পড়তে হবে, নাহলে আর কখনোই পড়তে পারবো না। সঠিক সিদ্ধান্তই ছিল। গত চব্বিশ ঘন্টায় খাওয়া, ঘুম আর সাংসারিক কাজ বাদে এই বই পড়া ছাড়া আর কোন কাজে সময় অপচয় করিনি। তাই কিছুটা জেদ আর চেষ্টায় ৪০০ পৃষ্ঠার এই বই আটঘন্টায় পড়ে শেষ করলাম।
এবং একবার বইটা পড়া শুরু করবার পর শেষ করার আগে পর্যন্ত চোখের সামনে থেকে যে সরাতে পারছিলাম না আর সারাক্ষণ বইটা মাথায় ঘুরছিলো, এর কৃতিত্ব এই বইটাকে দিতেই হয়। কাব্য আর হেঁয়ালির ছড়াছড়ি একবার সয়ে গেলে বোঝা যায়, বইটা হাইলি ইন্টারেস্টিং। পদ্য আর গদ্যের এই অদ্ভুত এমালগামেশন বর্তমানে আমি কোন লেখকের লেখায় পাইনি। কিন্তু ভালোভাবে পড়া শুরু করবার পর মনে হলো, বইটা এভাবেই লিখতে হতো। অন্য কোনোভাবে লিখলে আসলে ভালো লাগতো না।
প্রায় তিরিশ বছরেরও আগে গ্রামের সবচেয়ে সুন্দরী পাগল কিশোরীটি একদিন হঠাৎ করেই হারিয়ে যায়। যেমন করে হারিয়ে যায় অনেক মানুষ। এর ঠিক ছয় বছর পর শহরের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত পরিবারের শিশুটি সবার চোখের সামনে থেকে হারিয়ে যায়। ধীরে ধীরে ভেঙ্গে পড়ে টাউন।সবাই চলে যায় ধীরে ধীরে।যারা থেকে যায়, তারা মনে রাখে এই দুই গল্প। কারণ এই দুই গল্পের হারিয়ে যাওয়া মানুষদের দেখা যায় বনে বাদাড়ে। ছুটি কাটাতে আসা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট টিনাও দেখতে পায় শিশুটিকে। কিন্তু কেন তারা হারিয়ে গেলো, দুটি কেসের কী সম্পর্ক কেউ জানেনা। অথবা জানলেও বলতে চায়না। না চাইলতেও জড়িয়ে পড়ে তনয়া ওরফে টিনা। যখন সত্যটা বের হয়, তখন মনে হয়। রহস্যই বরং ভালো ছিলো।
কাব্য বাদে সাধারণভাবে বিশ্লেষণ করতে গেলে বলতে হয়, লেখক সুন্দরভাবে ধরে রেখেছেন গল্প। সুতো ছেড়েছেন নিজের মতন করে। তবুও শেষ পর্যন্ত রহস্য বোঝা যায়না। পড়তে পড়তে অনেক থিওরীই মাথায় আসে কিন্তু লেখক যেভাবে শেষ করেছেন তার টিকিটি কল্পনা করা বেশ কঠিনই। এখানেই তার স্বার্থকতা। হাইলি ইনজয়েবল আর রিওয়ার্ডিং।
কিন্তু দিনশেষে নৈশ অপেরা রহস্য নয়, বরং চরম মন খারাপ করে দেয়া দুঃখের একটা গল্প। প্রচন্ড মায়া জন্মায় আগনেস এর জন্য। বর্ণনার খাতিরেই হয়তো, বইটা শেষ করার পরেও বেশ কিছুক্ষণ ছুঁয়ে থাকে মনখারাপের মেঘরা। ফিকশনাল ক্যারেক্টার এর জন্য এতটা খারাপ লাগবে ভাবিনি। কিন্তু সব ফিকশনের আইডিয়াই তো জন্ম নেয় কোন না কোন বাস্তব থেকে। চরিত্রদের কার্যকারণ, তাদের ইনস্পিরেশনের পটভূমিও বাস্তব। সেই উপলব্ধি থেকেই মন খারাপ ছুঁয়ে যায়। কত ক্রিস, কত এগনেস তো সত্যিই থাকে আমাদের মাঝে। লেখক এরই মাঝে বই এর পাতায় তুলে এনেছেন দুজনকে। তাই অন্যদের প্রতিহিংসার বলি হওয়া এই চরিত্রদের কথা মাথায় ভাসে।যেখানেই থাকুক, ভালো থাকুক ওরা। জীবিতরাই ভুতের মতন বয়ে বেড়ায় সেই হারিয়ে যাওয়া রহস্য।
হাইলি ইনজয়েবল রিড। দুঃখের বই পড়েও প্রচুর আনন্দ পেয়েছি এই অর্থে যে এই লেখাটা খেলো নয়। আপনার যেই মনোযোগ ও সময় আদায় করে এই বই, একটা গল্পের তৃপ্তি হিসেবে তা ফিরিয়েও দেয়। তবু বলবো এই বই সবার জন্য না। লেখক নিজেও সেটা হয়তো জানেন। তবুও সাহস করে লিখে গেছেন তাই সাধুবাদ। যদি শুধু একটা গল্প না, বরং একটা ভালো বই পড়ার ও বোঝার ধৈর্য আপনার থাকে, তাহলে মনে হয় নিরাশ হবেন না।
ভালো plot, কিন্তু খুব খাটুনি দিয়েছে। বার বার page turn করে দেখতে হয়েছে, google করতে হয়েছে। আমি সাবলীল লেখা পছন্দ করি। যারা আমার মত বা নুতন রহস্য গল্প পড়ছেন তাদের জন্য অবশ্যই নয়। যারা একটু জটিল কিছু খুজছেন, তাদের ভালো লগবে হয়তো 🙏
একটা মৃতপ্রায় টাউন, ভেঙে পড়া চার্চ আর কিছু অতীত আঁকড়ে বেঁচে থাকা মানুষ। বছর পাঁচেকের ব্যবধানে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এক কিশোরী ও এক বালকশিশু; এবং এরও ৩০ বছর পর ঘটে যাওয়া এক নৃশংস হত্যার তদন্তকাহিনী। যে তদন্তের ফলশ্রুতি একটা এমন সত্যিকে খুঁড়ে তোলে যা দগদগে ঘায়ের মতো বাকি জীবন বয়ে বেড়াতে হয়। পাপ এবং তার শাস্তিই মূলত এই উপন্যাসের উপজীব্য। বারে বারে ফিরে আসা বাইবেলের রেফারেন্স, এবং বাইবেলের বিভিন্ন উদ্ধৃতি অনুসারে কাহিনীর বুনন বেশ অন্যরকম একটা মাত্র যোগ করেছে। দ্বিতীয় পর্বে গিয়ে উপন্যাসটি প্রচুর গতি পেয়েছে, কিন্তু প্রথম পর্ব বেশ শ্লথ। যে কারণে ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, প্রথম পর্বে বিল্ড আপের অধ্যায়টি আরো কিছুটা ছোট করলে ব্যাপারটা আরো জমাট হতে পারত।
বছরের ২৯ নম্বর উপন্যাস, সুলেখক শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য এর লেখা তনয়া সিরিজ এর দ্বিতীয় বই, প্রথম বই ২০২২ সালের আমার পড়া সেরা রহস্য উপন্যাস ছিল "শেষ মৃত পাখি"।। তারপর এর মধ্যেকার সময়ে লেখকের একটি বই পড়েছি, ২০২৫ সালে নৈশ অপেরা এর প্রকাশের খবর পেয়েই বইটি বুক করি, হাতে পাওয়া মাত্র পড়া শুরু করেছি।। বইটির প্রচ্ছদ, পাতার মান খুব ভালো, বইটি পড়তে পড়তে বুঝেছি এই বই ঝড়ের গতিতে পড়ে ফেলার উপন্যাস নয়, সময় নিয়ে রসস্বাদন করার বই।।
একটা ভেঙে পড়া টাউন।। জঙ্গলের ভেতর চার্চ।। কিছু ভাঙাচোরা মানুষ।। রহস্যময় এক জলাভূমি।। বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক শিশু সেখানে মাঝে মাঝে দেখা দেয়।। অলৌকিক আখ্যান হতে পারে, হতে পারে রহস্যকাহিনি, অথবা কিছুই নয়।। হয়ত শুধুই বেদনার।। তনয়া কি পারবে এই আখ্যানের ভেতর লুকিয়ে থাকা সত্যিটা খুঁজে বার করতে?
ঝাড়খণ্ডের একটি ছোট্ট টাউন নাম গঞ্জ, এক বিত্তশালী আংলো পরিবারের এক ছোট্ট শিশু হঠাৎ করেই হারিয়ে যায়।। ঘটনাটি ঘটার প্রায় ৩০ বছর পর ২০২২ সালে সেই শহরে আসেন তনয়া ভট্টাচার্য্য।। আস্তে আস্তে পরিচিত হতে থাকেন এই মৃত শহরের কিছু মানুষ এর সঙ্গে।।পাঠক হিসেবেও আমরা পরিচিত হতে থাকি বারবারা ব্রাউন, এডওয়ার্ড, মনীষা, অ্যারন, জেনিফার, অবিনাশ যাদব, কিটি গোমস এর মত চরিত্রদের সাথে।। পেঁয়াজের খোসার মতো আমাদের সামনে পরতে পরতে উন্মোচিত হতে থাকে এক ভৌতিক রহস্য কাহিনী।। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই ৩০ বছরের পুরনো অমীমাংসিত রহস্যের সাথে জড়িয়ে পড়েন তনয়া।। জানতে পারা যায় হারিয়ে যাওয়া এই শহরে নতুন কিছু নয়।। এই শহরে আগেও কিছু মানুষ হারিয়ে গেছে, কিন্তু আগেই বলেছিলাম এই শহর ভৌতিক।। তাই হারিয়ে যাওয়ার পরেও ছোট্ট ক্রিসকে ৩০ বছর ধরে এক রহস্যময় জলাভূমির ওপর ঘুরতে দেখেন তার পিসি বারবারা।। আরো একটি মেয়ে যে হারিয়ে গেছিল সেই অ্যাগনেসকে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে দেখতে পায় বিভিন্ন মানুষ।। লেখকের লেখনীতে তৈরি হয় অদ্ভুত কিছু দৃশ্য কল্প।। একটি মেয়ে যাকে তনয়া জিপসিদের রাজকন্যা বলতো সে শহরের বিভিন্ন জায়গায় সাদা রঙের একটি জামা আর মাথায় একটি মুকুট পড়েঘুরে বেড়াত, রেভারেন্ড গরম্যান কে আমরা প্রথম দৃশ্য দেখতে পাই একটি জঙ্গলের মধ্যে খালি গায়ে একটি ফোনের রিসিভারকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছেন।। একটি মৃত শহর, ভেঙে পড়া সাহেবী আমলের বাংলো, জঙ্গলের মধ্যে এক ভাঙ্গা রহস্যময় চার্চ এবং হারিয়ে যাওয়া কিছু মানুষ, এই নিয়ে প্রথম পর্বে লেখক সময় নিয়ে বুনেছেন রহস্যের জাল, সেখানে রহস্যের সাথে সাথে রেখেছেন ভৌতিক কিছু উপাদান।। গল্পের প্রথম ভাগ যেখানে শেষ হচ্ছে অর্থাৎ রহস্য এবং প্লট যেখানে ফাইনালি গঠন করে ফেলেছেন লেখক, সেই জায়গায় এসে রয়েছে গল্পের এমন এক টুইস্ট যা সত্যিই আনএক্সপেক্টেড।।
এরপর শুরু হয় গল্পের দ্বিতীয় ভাগ অর্থাৎ যেখানে রহস্য উন্মোচনের পালা।। বিশেষ এক কারনে তনয়াকে এই রহস্য অমীমাংসিত রেখেই সেই সময়ে মানে ২০২২ সালে গঞ্জ থেকে ফিরে আসতে হয়।। কিন্তু তিন বছর পর তনয়াকে আবার ফিরতে হয় এই গঞ্জে একটি বিশেষ ঘটনার জন্য।। দ্বিতীয় ভাগে সেই ফিরে আসা এবং রহস্য উদঘাটন।। পাঠক হিসেবে এরকম বহুস্তরীয় মনস্তাত্ত্বিক রহস্য উপন্যাস বাংলায় আমি অন্তত আগে পড়িনি।।অপরাধ একটা ছিল না, ছিল বেশ কয়েকটা অপরাধ যা ঘটেছিল বেশ কিছু বছর ধরে।। যেটা তনয়ার আগে অবিনাশ যাদব ধরতে পারেননি তা হল এই অপরাধগুলোর মধ্যে কিছু কানেকশন ছিল।। তনয়ার মাধ্যমে রহস্যের আংশিক উন্মোচন সম্ভব হয় এবং বাকিটা পাঠক হিসেবে আমরা জানতে পারলেও তা তনয়ার কাছে অজানাই থেকে যায়।।
পাঠ প্রতিক্রিয়া -
আমি কোনরকম তুলনা তে যাবো না, কোন বইটি ভালো বেশি ভালো লেগেছে।। শেষ মৃত পাখি পারফেক্ট ক্রাইম নিয়ে আমার পড়া সেরা একটি উপন্যাস, নৈশ অপেরা অনেক বেশি সিনেমাটিক এখানকার প্রত্যেকটি দৃশ্য লেখক এত সুন্দর ভাবে বর্ণনা করেছেন, মনে হচ্ছিল পাঠক হিসেবে আমি জোহার হালে তে দাঁড়িয়ে আছি অথবা তনয়ার সাথে জঙ্গলে রাস্তা হারিয়েছি, অথবা জলাভূমি ওপর প্রান্তে এম্বাসেডর গাড়িটি আমিও দেখতে পারছি।। পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করেছেন প্রতিটি দিককে অথচ একটা সূক্ষ্ম শিহরণ ঢেলে দিয়েছেন কাহিনীতে, আর এটাই আমার মনে হয়েছে শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য্য এর ইউএসপি।। পুরো দিকটাই তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন পাঠক প্রতিটি চরিত্রের মানসিক টানাপোড়েনের সঙ্গী হতে পারে শেষ অব্দি।। চরিত্রগুলোর সাথে খুব সহজে মিশে যাওয়ার যে প্রবণতা সেটা হয়ত লেখকের গল্প বুননের সার্থকতা।। লেখক গল্পের প্রথম পর্বে জটিলতা, গঞ্জের পরিবেশ এবং জীবিত ও ভৌতিক চরিত্রগুলো পাঠক এর সামনে এমন ভাবে তুলে ধরেছেন যাতে পাঠক প্রথম থেকেই একটা মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যে বিভ্রান্ত হোন, উপসংহারে পৌঁছে তনয়া, বারবারা অথবা অ্যারন এর মত পাঠকদের ও মনে হবে এই রহস্যের উন্মোচন হওয়া কি সত্যিই প্রয়োজন ছিল।। যদিও সব রহস্যের কোনো যথার্থ কারণ থাকতে নেই, কিছু রহস্য হয়ত না খুঁজলেও চলে।।
আবারো, আবারো এবং আবারো একটা কিছু ঘটবে৷ নৈঃশব্দ দুপুরে ক্ষুধার্ত ভিখারি দুয়ারে দাড়িয়ে অন্নের আবদার করবে৷ কিন্তু আমি? তাকে পাওয়ার আবদার আমি কার কাছে করবো? কার কাছে? কীসের জন্য এত শোকার্ত লাগছে৷ আদৌও দুঃখবোধে অংশ নিচ্ছি কী না সেটাও প্রশ্ন বটে৷ জলাভূমির পাশে বসে আকাশ দেখা ছাড়া কী ই বা করা যেতে পারে৷
আমি কার কথা বলবো৷ কীভাবে বলবো৷ ঠিক কার জন্য হাহাকার লাগছে আমার? প্রচন্ড বৃষ্টির ভিতরও ঝাপসা গরমের অনুভূতি৷ গলার কাছে আটকে যাওয়া কথাটা বুকে এসে ধাক্কা দিচ্ছে৷
ঠিক কত বছর অপেক্ষা করে মানুষ? পাঁচ, দশ, পনেরো, ত্রিশ না কি তারও বেশি?
সন্তানের জন্য অপেক্ষা হোক কিংবা প্রেমিকার জন্য৷ কতটুকু অপেক্ষা করা যায়?
শেষ মৃত পাখি পরে মুগ্ধ হয়েছিলাম, তাই এই বই টার বেপারে শুনার পর থেকে খুবি এক্সাইটেড ছিলাম । প্রথমেই বলে দি এই বই টা কিন্তু একটু ডিফিকাল্ট বই । Japanese রহস্য গল্পের মতো লেয়ারেড স্টোরি, অনেক গুলো দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা, অনেক বিব্লিক্যাল শব্দ আর অনেক কষ্ট । সাক্যজিৎ এর লেখা ফাটাফাটি 👌, কিন্তু আমার মাঝে একটু মনে হয়ছিল যে গপ্পটা কে টানা হচ্ছে, অতিরিক্ত স্লো বার্নার। কিন্তু প্রথম অধ্যায় শেষে আর পুরো দ্বিতীয় অধ্যায় টা দুর্দান্ত লেখা । বই টা অনেক মিক্সড রিভিউজ পেয়েছে কিন্তু আমার পড়তে ভালোই লেগেছে বিশেষ করে last ১০০ pages । (৩.৮ কারণ আমি শেষ মৃত পাখির সাথে তুলনা করছি
শেষ মৃত পাখির 'পরে লেখকের তনয়াকে নিয়ে দ্বিতীয় উপন্যাস এটি,প্রথমে যেটা বলতে হচ্ছে তাহলে লেখকের চরিত্র নির্মাণ, উপন্যাসের প্রত্যেকটি চরিত্র এত ভালোভাবে গঠন করা হয়েছে যে সত্যি কথা বলতে প্রত্যেকটি চরিত্র যেন উপন্যাসের সঙ্গে মিলেমিশে গেছে। তার সাথে লেখকের সৃষ্ট কিছু অলৌকিক রহস্য সেগুলোও সত্যি কথা বলতে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়, এক কথায় অসাধারণ একটি উপন্যাস, তবে একটা কথা বলব একটু ধৈর্য নিয়ে পড়বেন কারণ আমার মাঝেমধ্যে পড়তে পড়তে বিশেষ করে প্রথম পর্বে, কে কথক সেটা বুঝতে সময়ে একটু সময় লেগেছিল,
শেষ মৃত পাখি পড়ে শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের লেখনী আর স্টোরিটেলিং এর ফ্যান হয়েছিলাম। নৈশ অপেরাতেও তার অসামান্য লেখনীর ছাপ পেলাম। তবে গল্পটাকে টেনে হিঁচড়ে একটু বেশিই লম্বা করা হয়েছে মনে হলো। বিশেষ করে প্রথম পর্বটা অতিরিক্ত শ্লথ লাগছিল। তার তুলনায় দ্বিতীয় পর্ব যথেষ্ট টানটান। শেষে সব চরিত্রের জট খুললেও হিল্ডার চরিত্রের গুরুত্বটা বুঝতে পারিনি। ধৈর্য দিয়ে পড়ে বইয়ের শেষপর্যন্ত আসতে পারলে সবার ভাল লাগবে বলে মনেহয়। তবে তুলনায় আনলে অবশ্যই 'শেষ মৃত পাখি'র চেয়ে এটা পিছিয়ে থাকবে। লেখকের জন্য শুভকামনা!🖤
বাস্তব পরাবাস্তবের আলো আঁধারিতে ঘেরা এক অনবদ্য মানবিক আখ্যান। গতিময় ঘটনাবহুল রহস্য কাহিনীর ধারণার বাইরে গিয়েও যে পাঠক মনকে আবিষ্ট রাখা যায় তার প্রমাণ এই উপন্যাস। চরিত্রদের বিশ্বাস, অবিশ্বাস, বেদনা, মায়া, প্রতিশোধস্পৃহার সাথে কখন যে পাঠক একাত্ম হয়ে যায় বোঝাই যায় না। শুধু কাহিনীর শেষে একখণ্ড জোহার হালে পাঠকের মননে মিশে যায়।
একটা মেয়ের হারিয়ে যাওয়ার পাপ বোধহয় পুরো টাউনকে খেয়ে ফেললো। অবসাদ আর বেদনাময় অন্য ধরনের রহস্য গল্পঃ। আগনেসের জন্য কষ্ট হচ্ছে। আমার পরম আত্মীয়র মতো। কিছুটা অতিকথন আছে ঠিকই। কিন্তু বিষাদের ছবি তুলতে একটু প্রয়োজন ছিল। আমার মতে অবশ্য পাঠ্য। ৫ তারা।
Nazimuddin Chaap kichu Bangladeshi chara ar jekono byaktir ei boi ta darun laga uchit, asadhan lekhoni fatafati storyline ebong prochondo fast...hats off to you sakyajit sir