নূরজাহানের বড় হয়ে ওঠা, বিয়ে, দুর্ভাগ্য, ভন্ড ফতোয়াবাজদের হাতে অপমানিত হওয়া এবং শেষমেশ আত্মহত্যার করুণ কাহিনীর পাশে লেখক এক গ্রামীণ জনপদের মানুষের নিখুঁত জীবনচিত্র এঁকেছেন। অসামান্য ‘নূরজাহান’ উপন্যাসে নির্যাতীতা মেয়েটির আত্মহত্যা প্রতিটি হৃদয়ে যে-আগুন জ্বালে, সমাজের শুদ্ধিকরণে সে-আগুন চিরজাগরূক।
ইমদাদুল হক মিলন-এর জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৫৫, ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে। পৈতৃক গ্রাম— লৌহজং থানার ‘পয়শা’। ঢাকার গেন্ডারিয়া হাইস্কুল থেকে এস এস সি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে অনার্সসহ অর্থনীতিতে স্নাতক।প্রথম রচনা, ছোটদের গল্প ‘বন্ধু’, ১৯৭৩ সালে। প্রথম উপন্যাস যাবজ্জীবন। ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে। প্রথম গ্রন্থ ভালবাসার গল্প (১৯৭৭) থেকেই তিনি বিপুলভাবে সংবর্ধিত, পাঠকপ্রিয়। ১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কার। এ ছাড়া পেয়েছেন বিশ্ব জ্যোতিষ সমিতি পুরস্কার(১৯৮৬), ইকো সাহিত্য পুরস্কার(১৯৮৭), হুমায়ূন কাদির সাহিত্য পুরস্কার(১৯৯২), নাট্যসভা পুরস্কার(১৯৯৩), পূরবী পদক(১৯৯৩), বিজয় পদক(১৯৯৪), মনু থিয়েটার পদক(১৯৯৫), যায় যায় দিন পত্রিকা পুরস্কার (১৯৯৫)। ২০১১ সালে ‘নূরজাহান’ উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন আই আই পি এম সুরমা চৌধুরী স্মৃতি আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কার।
হুমায়ুন আজাদের একটা বিখ্যাত প্রবচন আছে যার ভাবার্থ অনেকটা এরকম " সত্য বারবার বললে মিথ্যার মতো শোনায় আর মিথ্যা বারবার বললে সত্যের মতো শোনায়।" এর হুবহু প্রয়োগ দেখা যায় "নূরজাহান" বইয়ের ক্ষেত্রে। প্রথম খণ্ডটা ভালো ছিলো। গ্রামীণ পটভূমি, গ্রামের হারিয়ে যেতে বসা অনেক প্রথা, প্রকৃতি ও ভাষা পশ্চিমবঙ্গের সমালোচকদের আকৃষ্ট করে। হুমায়ূন আহমেদের একটা নিবন্ধে আছে যে তিনি "দেশ" পত্রিকায় "নূরজাহান ১" এর ভূয়সী প্রশংসা পড়ে ঈর্ষা বোধ করেছিলেন। এই কলকাত্তাইয়া প্রশংসাকে পুঁজি করে মোটামুটি মানের দ্বিতীয় খণ্ড আর একেবারেই অখাদ্য তৃতীয় খণ্ডকেও ইমদাদুল হক মিলন আর তার "কালের কণ্ঠ" গোষ্ঠী নিজ দায়িত্বে মহান বানানো শুরু করে। "নূরজাহান" কে তারা ক্লাসিক হিসেবে প্রচার করতে থাকে। সেটা এতো বেশি মাত্রায় যে অনেক পাঠক কৌতূহলী হয়ে "ক্লাসিক" নূরজাহান পড়তে শুরু করে।(আমিও সেই পাঠকদের একজন।) আনন্দ পাবলিশার্স "নূরজাহান- অখণ্ড" প্রকাশ করলে তামাশা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। কোনো বই ক্লাসিক হবে কি না তা নির্ধারণ করে সময়, পাঠক বা সমালোচকরা। লেখকের প্রোপাগান্ডা কিছুদিনের জন্য সফল হলেও সময়ই প্রকৃত উত্তর দেবে।
আমি ক্লাস ওয়ানে থাকতে সোনা ফুপির তাক থেকে লুকিয়ে চুরিয়ে পড়েছিলাম ' ভালবাসা কারে কয়?। লেখক জনাব ইমদাদুল হক মিলন। ঐ বয়সে আমি যা পেতাম তাই পড়তাম। কি বুঝতাম না বুঝতাম তা জিজ্ঞেস করবেন না , নিজেই লজ্জা পেয়ে যাবেন আসল কথা বললে। আবার আমাকেই ডেঁপো ভাববেন। তা যাই হোক। সেই পরিচয়ের পর হক সাহেবের ছোটদের লেখা বাদে তেমন কিছু পড়েছি বলে মনে পরে না, ঈদ সংখ্যার দুই একটা গল্প উপন্যাস ছাড়া।
নূরজাহান পড়ে কেমন লাগলো জানাই। যেন বাইরে ৩৯ ডিগ্রী তাপমাত্রা আর আমি ঘরের টবে শুষ্ক নয়নতারার গাছ। বাড়ির লোকে নিজে গরমে অতিষ্ঠ, আমার গায়ে পানি ঢালবার কথা কারো মনে থাকে না। আর আমি নিরুপায় কিছু বলতে পারিনা। তারপর ঝুপ করে একদিন বৃষ্টি এলো। টানা দুই দিন দুই রাত বৃষ্টি। সেই পানি পেয়ে নয়নতারার যেমন লাগে, প্রায় ঝরে যাওয়া কলি ফুটিয়ে ওঠে, তেমন লাগলো আমার।
দিদার বয়মের আচার যেমন একটু রেখে ঢেকে লুকিয়ে খাই যাতে সহজে শেষ না হয়, সেভাবে অনেক সময় নিয়ে পড়েছি। আহা। কি সুখ, আবার কি কষ্ট। গল্প শুধু নূরজাহানের থাকেনি, আমাকে জড়িয়েছে উপন্যাসের অন্য সব চরিত্রের সাথে। বিয়ের রাতে নূরজাহান যখন মনে মনে 'মজনু মজনু' বলে ওঠে, আমার ভিতরটা টনটন করে, গলার কাছে কি যেন দলা পাকিয়ে যায়। আহাগো!
এই বইয়ের সমাদর কতটুকু হয়েছে কেউ জানলে বলেন। আমার নিজের খুঁজে দেখতেও ভয় লাগছে যদি আশাহত হই।
The longest novel in Bengali literature. Writer didn't compromise quality for the quantity. He equally balanced quality and quantity. The book is based on the lifestyle of people of Bikrampur. But mainly it reflects on how women in rural Bangladesh leads their lives. It shows how pathetically a girl named "Nurjahan" lived her life as long as she lived. The book has a strong storyline and writer has a good storytelling technic. It represents the lifestyle and struggle throughout all their lives of most rural women of Bangladeh. Loved the book.
বই নেমঃ- নুরজাহান ( তিন খন্ড একত্রে) লেখকঃ- ইমদাদুল হক মিলন জনরাঃ- সমকালীন উপন্যাস পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ- ১২৬১
বিক্রমপুর বছরের প্রথম উত্তুরে শীতল হাওয়া গতরে লাগতেই দবির গাছির মন আনচান করে ওঠে। অবশেষে সুদিন ফিরে এলো। খাজুর গাছ থেকে রসে টইটুম্বুর মাটির ঠিলা নামিয়ে গুড় বানানোর সময় তার। শিরশির করে ওঠে বউ হামিদার শরীর। অভাবের দিন ফুরোলো অবশেষে। বালিকাচা বের করে দায়ে ধার দিতে বসে দবির গাছি। নুরজাহান গেছে নয়া সড়ক দেখতে। নুরজাহান, দবির গাছির একমাত্র আদরের মেয়ে। সারাক্ষণ হাসিখুশি পাড়া বেড়ানো মেয়ে নুরজাহান। সেই সাথে প্রচণ্ড প্রতিবাদী মেয়ে। বাপকে দউবরা বলায় মাওলানাকে তুই রাজাকার বলে গালি দেয়া নুরজাহান। নুরজাহানের সারা শরীরে ফুটে ওঠা যৌবনের লক্ষণগুলো দেখে শিহরণ জাগে কন্ট্রাক্টর আলী আমজাদের শরীরে। যে করেই হোক তাকে বিছানায় পেতে চায় আলী আমজাদ। শিহরণ জাগে মজনু মিয়ার শরীরেও। মজনু, মাতৃহারা ছেলে, বাপ থেকেও নেই। জন্মের পর থেকেই মানুষ বিধবা মরনি খালার কাছে। নিঃসন্তান মরনি মজনুকে কোলেপিঠে করে মানুষ করছে আপন পোলার মতো করে। ছনুবুড়ির স্বভাব হলো এর ওর বাড়ির বাগান থেকে এটা ওটা চুরি করা আর যারতার নামে কুটনামি করা। পোলার বউ খাওন পরন দেয়না। তাই পেটের জ্বালায় চুরি করে বেড়ায়। তার মরার পরে জানাজা পড়াতে রাজি নয় মন্নান মাওলানা। মন্নান মাওলানা, গ্রামের প্রভাবশালী ব্যাক্তি। একাত্তরে ছিলেন রাজাকার আর পুত্র আতাহার চরিত্রহীন মাতাল। মাওলানা চায় নুরজাহানকে ন্যাংটো করে উদোম পাছায় চাবুকপেটা করতে। তছি পাগলনী, ব্লাউজ পরেনা, গতরের কাপড় ঠিক থাকেনা। যখন দৌড়ায় বুকের কাপড় পড়ে যায়। আশেপাশের পুরুষগুলা হা করে তাকিয়ে থাকে তার উদোম বুকের দিকে। একদিন এক রিকশাওয়ালা তাকে ভুলিয়েভালিয়ে নিয়ে যায় ছাড়াভিটার নির্জন বাগানে। আদিলউদ্দিন, ছেলেরা বাড়ি থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছে। নয়া সড়কে এসেছে মাইট্টাল হইতে। মজনুকে দেখলেই মনটা কেমন উদাস হয়ে যায় তার। খিদার জ্বালায় স্বামীর সংসার ছেড়ে চলে আসা কুট্রি আর আলফু জড়িয়ে আছে একে অপরের ভাগ্যের ফেরে। আজিজ গাওয়াল আর বউ বানেছা। বছর বছর বাচ্চা পয়দা করে কিন্তু বড়ি খেতে চায়না বানেছা, পুরুষ মানুষের পদ্ধতিতেও আপত্তি বানেছার। তাতে করে মজা পাওয়া যায়না। পারুর সম্পর্ক স্বামীর সাথে যতটা না বেশী, তার চেয়ে বেশী গভীর সম্পর্ক মাতাল দেবর আতাহারের সাথে।
আ মাস্টারক্লাস ক্লাসিক উপন্যাস। প্রেম, ছ্যাঁকা, ধোকা, প্রতিশোধ, দুঃখ, বেদনা, হাসি, কান্না, সব মিলিয়ে প্রায় তেরোশো পৃষ্ঠার এক মহাকাব্যিক আখ্যান। সত্য ঘটনা নিয়ে লেখা অসাধারন এক বই। রেটিং ৫/৫