গল্প অনেক রকম হয়। কিছু গল্পকে তুলনা করা চলে খোদিত প্রস্তরমূর্তির সাথে, যাকে খনন করে বের করে আনতে হয় আরো অনেক কিছু সরিয়ে। কিছু গল্পকে তুলনা করা চলে পাললিক কাঠামোর সাথে, যাকে একটু একটু করে ঘূর্ণায়মান গল্পযন্ত্রে ফেলে হাতের স্পর্শে গড়ে তুলতে হয়। কিছু গল্প আকাশে ভাসমান ড্রাগনমূর্তির মতো, তার সবটুকুই পাঠকের মনে, গল্পকারকে কেবল আকাশের পটভূমিটুকু রচনা করতে হয়।
"আশাকর্পূর"-এ গল্পকারের প্রচেষ্টা চলমান সময়কে গল্পের ছাঁচে ধরে রাখার। সে কাজে কখনো কখনো স্যাটায়ার বা বিদ্রুপরচনাকে বেশি উপযোগী মনে হওয়ার কারণে সংকলনের পর দেখা গেছে, সে ধরনের গল্পের সংখ্যা অজান্তেই বেড়ে উঠেছে। সমকাল এ গল্পকারের মনে যে উদ্বেগ আর আক্রোশের জন্ম দিয়েছে, তা যৌগ হয়ে শ্লেষরূপেই অনেক গল্পে স্থান করে নিয়েছে।
আশাকর্পূরে মোট ১১টি গল্প। 'খুব রগুড়ে', 'গরুটারই চরিত্র ভালো নয়', 'হন্তদন্ত তদন্ত প্রয়োজন', 'আশাকর্পূর', 'সমর্থক', 'নৈনং ক্লেদয়ন্তি', 'হাদুল্লাপুরে ওম শান্তি', 'ফাঁস', 'হস্তীমূর্খ', 'ইবরাহিমের ছুরি' আর 'সর্বোচ্চ দেশপ্রেম'।
প্রথম গল্প "খুব রগুড়ে"র অনেক বচন ও পর্যবেক্ষণ সত্যি হলেও বামপন্থীদের একচেটিয়া সমালোচনা ভালো লাগেনি। দ্বিতীয় গল্প "গরুটিরই চরিত্র ভালো নয়" এতো মজার কিন্তু এর অন্তর্নিহিত বার্তা স্তব্ধ করে দ্যায়। দেখা যাচ্ছে, গুরুতর গল্পের চাইতে স্যাটায়ার লেখাতেই আজাদের দক্ষতা বেশি। হাস্যরসাত্মক হোক বা গুরুগম্ভীর - গল্পগুলো পড়তে পড়তে নামকরণের সার্থকতা টের পাওয়া যায়। "আশাকর্পূর",আমাদের সব আশা কর্পূরের মতোই উবে যাচ্ছে।
সৃজনশীল কাজে আমার প্রতিভা কখনোই খুব একটা ভাল নয়। কিন্তু সপ্তাহ দুয়েক আগে বিশেষ এক পদ্ধতিতে (পদ্ধতির বর্ণনা খুবই লম্বা, তাই বাদ দিলাম) সৃজনশীল প্রতিভার স্ফুরণ ঘটলো এবং আর্গানাইজার নোটবুকটিতে পেন্সিল দিয়ে একখানা গল্প লিখে ফেললাম। দিনে দুইএকবার খুলে রাবার দিয়ে দুই এক জায়গা ঘষামাজা করি আর চিন্তা করি, না খারাপ না, পাবলিশ করাই যায়। সমকালীন গল্পের যে অবস্থা, তাতে এটা পাবলিশ করতেই পারি। কোনো ব্লগে পাবলিশ করবো? আমি যে ব্লগে লিখতাম (পড়ুন 'মন্তব্য' করতাম) সে জায়গা আর আগের মত না থাকায় দুই-তিন বছর হয়ে গেছে লগইন করি না। নতুন কোথাও আইডি খুলতে হবে এ আলসেমিতে পড়ে রইলো গল্পখানা।
আশাকর্পূর পড়ে প্রথম যে কাজটা করলাম সেটা হল নিজের পুরো গল্পখানার উপর রাবার চালিয়ে ফেললাম। এটা যদি সমকালীন গল্পের স্ট্যান্ডার্ড হয় তাহলে আমার গল্পটার যোগ্য জায়গা ইরেজারের গুড়োই।
আমি সচলায়তনের নিয়মিত পাঠক নই, কেউ লিংক দিয়ে পড়তে বললে গিয়ে পড়ে আসি, তাই বেশীরভাগ গল্পই আমার কাছে নতুন। গল্পগুলো খুব যত্ন করে লেখা। অনেক যত্ন করে করে একেকটি শব্দ বাছাই করে, তার যথোপযুক্ত স্থান বাছাই করে লেখক গল্পগুলো লিখেছেন। আর স্যাটায়ার! যে স্যাটায়ার বিষণ্ণতা ঢুকিয়ে দেয়। গল্পগুলো কল্পনা জগতের মত রঙিন নয়, বাস্তবতার মত ধূসর বা মেটে রংয়ের কখনো বা শুকিয়ে যাওয়া রক্তের রংয়ের।
তবে আমারও এই রিভিউটির মত মনে হয়েছিল এত সুন্দর গল্পগুলোর ক্লাসিক হয়ে ওঠার পিছে বাধা রয়েছে। জানিনা, এ বাধা কাটিয়ে ওঠার উপায় কী। কিছুদিন আগেই তারাস বুলবা পড়তে গিয়ে এই বাধার মুখোমুখি হয়েছিলাম। যে লেখক এত সুন্দর গল্পগুলো লিখেছেন, তিনি যদি চান তাহলে তিনিই বাধা কাটিয়ে ওঠার রাস্তা খুঁজে বের করবেন।
বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন "যদি মনে এমন বুঝিতে পারেন যে, লিখিয়া দেশের বা মনুষ্যজাতির কিছু মঙ্গল সাধন করিতে পারেন, অথবা সৌন্দর্য সৃষ্টি করিতে পারে, তবে অবশ্যই লিখিবেন।" মাহবুব আজাদ 'অথবার' ডানপক্ষ এবং বামপক্ষ একই সাথে করতে সক্ষম হয়েছেন। সাধুবাদ... :)
[পরিশিষ্ট ১ঃ বইটির প্রিন্টিং এবং বাইন্ডিং এ বেশ নতুনত্ব আছে। বইটা পেপারব্যাক হলেও পেপারটা যথেষ্ট হার্ড। কভারের এ্যাশ কালারটা সূর্যের আলোতে সাদা দেখায়। ব্যাপারটা মজার দিনে মনে হয় কভারটা সাদা আর রাতে ছাই রংয়ের (অথবা আমি দিন কানা)। খুব সম্ভবত অভ্র কিবোর্ড এবং কালপুরুষ ফন্ট ব্যবহার করা হয়েছে ছাপার কাজে। পাতা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বেশ ভালমানের কার্টিজ পেপার। এই প্রথম আমি কার্টিজ পেপারে কোনো বই পড়লাম। কার্টিজ পেপার এমনিতে আমার অনেক প্রিয়।
পরিশিষ্ট ২ঃ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে শুধু আমার-ই ঝামেলাপূর্ণ মনে হয় না, আরও একজন এটলিস্ট আছেন যার আবদেল আবু সাঈদী হুজুর এর মাঝে গড়বড় চোখে পড়েছে... শুধু এটার জন্যই দেশে আসলে লেখকের থেকে একটা অটোগ্রাফ নিবো। :D ]
মাহবুব আজাদের ‘আশাকর্পূর’ পড়া যেন ধীরে ধীরে পুড়ে যাওয়া ধূপকাঠির অভিজ্ঞতার মতো, গন্ধটা ছড়ায় নিরবধি, অথচ চোখে পড়ে না ঠিক কখন ধোঁয়াটা মনটাকে জড়িয়ে ধরেছে।
এই বইয়ের উপক্রমণিকা পড়তে যেয়ে শুরুতেই চোখ আটকে যায়। জার্মানির কাসেল শহর থেকে ২০১৪'র শীতের মৌসুমে লেখক লিখছেন- 'কিছু গল্পকে তুলনা করা চলে পাললিক কাঠামোর সাথে, যাকে একটু একটু করে ঘূর্ণায়মান গল্পযন্ত্রে ফেলে হাতের স্পর্শে গড়ে তুলতে হয়। কিছু গল্প আকাশে ভাসমান ড্রাগনমূর্তির মতো, তার সবটুকুই পাঠকের মনে, গল্পকারকে কেবল আকাশের পটভূমিটুকু রচনা করতে হয়।'
এই বইয়ে স্থান পাওয়া এগারোটি গল্পের সবকটাই লেখা হয়েছে গত দশকের একদম শুরুরদিকে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে কিছু কিছু গল্প দারুণভাবে প্রাসঙ্গিক। গল্পগুলোর আঙ্গিক ও বিশ্লেষণের মতো নামগুলোও চমৎকার। নামগল্প ছাড়াও এতে আছে 'খুব রগুড়ে', 'নৈনং ক্লেদয়ন্তি', 'হন্তদন্ত তদন্ত প্রয়োজন', 'হাদুল্লাপুরে ওম শান্তি', 'গরুটারই চরিত্র ভালো নয়' এর মতো ব্যতিক্রমধর্মী শিরোনামের গল্প।
মাহবুব আজাদের দুটো বই (একটি ছোটদের, অন্যটি ভ্রমণকাহিনী) আগে পড়া ছিল। তার লেখার হাত চমৎকার, এটা জানা থাকলেও তীক্ষ্ণ হিউমার আর স্যাটায়ারে ভরপুর এই গল্পগ্রন্থ আমাকে এতটা মুগ্ধ ও বিস্মিত করবে তা অনুমেয় ছিল না। এই ভদ্রলোকের লেখার একটি বিশেষ দিক হলো তিনি চরিত্রদের খুব জোরে না ঠেলে, হালকাভাবে তুলে দেন পাঠকের সামনে। যেন কেউ ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখছে, একটা ছেলে সিগারেট ধরাচ্ছে, এক বয়স্কা মহিলা পিঁয়াজ কাটতে কাটতে নিজের কথা ভাবছে, কেউ হঠাৎ থেমে দাঁড়িয়ে গেছে কারও অপেক্ষায়। তাদের জীবন গল্প হয়ে ওঠে কেবল লেখকের চোখে নয়, পাঠকের স্পন্দনে।
সবশেষে বলি, এই গল্পগ্রন্থের প্রতিটি গল্প যেন আশার ছদ্মবেশে লুকানো কর্পূর; জ্বলেই মিলিয়ে যায়। কিন্তু সেই জ্বলা একটুখানি আলো রেখে যায় পাঠকের ভেতরে।
(করোনায় গৃহবন্দী থাকাকালীন সময়ের কোনো এক দিনে সাহিত্য ও সিনেমা নিয়ে টুকরো কথোপকথনের এক পর্যায়ে বইটা আমাকে সাজেস্ট করেছিলেন প্রিয় লেখক ও মানুষ জাহিদ হোসেন ভাই। তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।)
মাহবুব আজাদ-এর গল্পগ্রন্থ "আশাকর্পূর" এর পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখতে বসে প্রথমেই আগামী পাঠককে সাবধান করাটা দায়িত্ব মনে করি, যাঁরা ফুল ফল লতা পাতাসমৃদ্ধ গোল গোল ভালো ভালো গল্প পড়তে আগ্রহী, এই বই তাঁদের জন্য না। যাঁরা 'মানী লোকের মান সম্মান' বজায় রেখে সমঝোতা আর শান্তির গল্প পড়তে আগ্রহী, "আশাকর্পূর" তাঁদের জন্যও না। খাদি পাঞ্জাবি আর মোটা চশমায় সাজানো মূর্তির আড়াল থেকে খুঁড়ে আনা সত্য প্রাণীকে দেখে যাঁরা 'সবকুছ ঝুট হ্যায়' বলে এড়িয়ে যেতে আগ্রহী, মাহবুব আজাদের গল্প তাঁদের জন্যও না। আলো জ্বলা রঙ্গমঞ্চে যে চমৎকার রূপকথাটি মঞ্চস্থ হয়, মাহবুব আজাদের গল্প সেখানে না; তাঁর গল্প শুরু হয় কুশীলবদের মেকাপ তোলার পর থেকে।
আশাকর্পূরের গল্পগুলোর প্রথম বৈশিষ্ট্য ভাষার সাবলীলতা। একই সঙ্গে মসৃন ও শক্তিশালী। এ দুইয়ের মিলন ঘটতে খুব কম দেখা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মসৃন হতে গিয়ে ভাষা হয়ে যায় পলকা, নয়তো শক্তি দেখাতে গিয়ে ভাষা হয়ে যায় দুর্বোধ্য। মাহবুব আজাদ এক্ষেত্রে বাঘ আর মহিষকে এক ঘাটে জল খাইয়ে ছাড়েন তাঁর গল্পে। কুইনাইন ট্যাবলেটের মতো তেতো তীব্র কঠিন বক্তব্যটিও রসগোল্লার ভেতরে ঢুকিয়ে পাঠককে গিলিয়ে দিতে পারেন, পাঠক মিঠা স্বাদ পায়। দীর্ঘ বাক্যগুলোও অবোধপাঠ্য হয় না। অদ্ভুত নতুন সব উপমা সংযোগে গল্পপাঠ দারুণ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
মাহবুব আজাদের বেশিরভাগ গল্পই যেন সরাসরি সম্প্রচারিত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি ঘটনাই একটি পূর্ণাঙ্গ গল্প। ঘটনাটি যতক্ষণ ঘটছে, চরিত্ররা যতোক্ষণ কথা কইছেন, সেটাই গল্প, ততোক্ষণই গল্প। অনেকাংশেই সংলাপ নির্ভর, গতিশীল। একটা দু'টো অনুপ্রসঙ্গ ধরে পাঠক পরিস্থিতি আর চরিত্রগুলো আন্দাজ করে নিতে পারেন সহজেই, শুরুতেই। তারপর চরিত্ররাই নিজেদের কথাগুলো বলে বলে যায়। পড়ায় তৈরি হয় চলচ্চিত্রের আবেশ, দৃশ্যকল্পগুলো চমৎকার ফুটে ওঠে।
আশাকর্পূরে মোট ১১টি গল্প। 'খুব রগুড়ে', 'গরুটারই চরিত্র ভালো নয়', 'হন্তদন্ত তদন্ত প্রয়োজন', 'আশাকর্পূর', 'সমর্থক', 'নৈনং ক্লেদয়ন্তি', 'হাদুল্লাপুরে ওম শান্তি', 'ফাঁস', 'হস্তীমূর্খ', 'ইবরাহিমের ছুরি' আর 'সর্বোচ্চ দেশপ্রেম'।
কখনো গল্পের বিষয় দেশের বামপন্থা রাজনীতির বিকলতা, কখনো গ্রাম্য সালিশ, কখনো পরিবার, কখনো বেদনায় ভরে ওঠা স্কুলের আকাশ বাতাস। মাহবুব আজাদ গল্পকে কখনো নিয়ে যান ফ্লাড লাইটের আলো ঝলমলে স্টেডিয়ামের ক্রিকেট খেলায়, কখনো হতাশার ঘরে। কখনো আন্দোলনের নামে জ্যন্ত পুড়িয়ে মারা মানুষগুলোর আত্মীয়রা গ্যালন হাতে রাজপথে নেমে আসেন, কখনো রাজনীতির আড়ালের শ্বাপদেরা হয় গল্পের চরিত্র। এরকম অসংখ্য বিষয় আর বৈচিত্রময় চরিত্র নিয়ে ১১টি গল্পে ভরপুর "আশাকর্পূর"।
মাহবুব আজাদের গল্পের চরিত্র আর ঘটনাগুলো আমরা চট করে চিনে ফেলতে পারি। আমাদের খুব সমসাময়িক তারা। এই চেনা জানা চরিত্র আর ঘটনাগুলোকে তীব্র বিদ্রুপ করে মাহবুব আজাদ সাজান তাঁর গল্পগুলো। আমরা পড়ি, মজা পাই, বাহবা দেই। বইয়ের শুরুতে উপক্রমণিকায় লেখক নিজেই বলেছেন "গল্পকার হিসেবে আমার প্রচেষ্টা চলমান সময়কে গল্পের ছাঁচে ধরে রাখার।" সমকালীন ঘটনা আর চরিত্রগুলো নিয়ে গল্প বলেই ভয় থাকে অসমকালে এই গল্পগুলোর আবেদন থাকবে তো? যে বাস্তব ঘটনা গল্পটির জন্ম দিয়েছে, সেই ঘটনা জানা না থাকলে বা সেই চরিত্রটি পাঠকের চেনা না থাকলে পাঠক কি গল্পের রস আহরণ করতে পারবেন? ফিরে তাকাই গল্পগুলোর দিকে।
'খুবরগুড়ে' জুড়ে যে চরিত্রগুলো বিরাজ করে, নাম পড়লেই চট করে মনে পড়ে আমাদের চেনা বিপ্লবীদের নাম। আর সঙ্গে সঙ্গে আমরা সেই বাস্তব চরিত্রটির সঙ্গে মিলিয়ে চিন্তা করতে শুরু করি। কিন্তু চরিত্রগুলোর নাম যদি অ আ ক খ হতো তাহলেও কী চিনতে খুব অসুবিধে হতো? সারাবিশ্বেই সমাজতান্ত্রিক স্বপ্ন বিফলের কারিগরদের চেহারায় কি খুব পার্থক্য? অথবা গরু ধর্ষনের গ্রাম্য সালিশের বাস্তব ঘটনা না জানলেই কি 'গরুটারই চরিত্র ভালো নয়' গল্পটি পাঠকের কাছে অবোধ্য হয়ে উঠবে? দশ বছর পরের পাঠক যদি অবলা গরুকে 'অবলা নারী' রূপে কল্পনা করে গল্পটি পড়ে, এরচেয়ে বেশি তীব্রতা নিয়ে গল্পটি কি তখন পাঠকের মনে আঘাত করবে না? আমাদের স্মৃতিতে রানা প্লাজার ঘটনা জ্বলজ্বলে; অধরচন্দ্র মডেল হাই স্কুলের মাঠে সকালে ঘুমঘুম চোখে সারি বাঁধা ছেলেমেয়েদের সামনে দপ্তরীর হাতের দায়সারা টানে আকাশে এক মন্থর ভূবনচিলের মতো যখন ডানা মেলে সবুজের মাঝে লাল একটি বৃত্ত, সহকারী প্রধান শিক্ষকের গম্ভীর আদেশের পর অনেক বিপথগামী কণ্ঠের মাঝে পাশের আমগাছের পাতায় যখন কাঁপন ধরায় কী শোভা কী ছায়া গো কী স্নেহ কী মায়া গো... তখন হয়তো তাদের নাকে ভেসে আসে শবের গন্ধ, বাতাসে ভাসে কর্পূরের গন্ধ। 'আশাকর্পূর' গল্পের বিবরণ আমাদেরকে নিয়ে যায় অধরচন্দ্র মডেল হাই স্কুলের বিশাল মাঠে। কিন্তু গল্পে আমরা কোথাও রানা প্লাজা খুঁজে পাই না, খুঁজে পাই না অধরচন্দ্র মডেল হাই স্কুলকেও। এ যেন বাংলাদেশের যে কোনো এক স্কুলের মাঠ, আমাদের অবহেলা আর লোভের বলি হয়ে যেখানে জমে উঠছে লাশের স্তুপ! ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, লঞ্চডুবি, ভূমিকম্প, ভবনধ্বসে যখনই জমে উঠবে লাশের পাহাড়; আমরা দেখবো ঈশ্বর ক্রমশ সরে যাচ্ছেন আরো দক্ষিণে! আমাদের ক্রিকেট মাঠে যতোদিন আমরা গালে চানতারা এঁকে 'ম্যারি মি আফ্রিদী' বলবো, ততোদিন 'সমর্থক' গল্পটি প্রাসঙ্গিক। গল্পে ইলিয়াস থাকলেও, ইলিয়াসের গায়েব হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও অপরাজনীতির বলি হওয়া এই সাধারণ মানুষের গল্প যতোদিন ফুরিয়ে যাবে না, ততোদিন 'নৈনং ক্লেদয়ন্তি' আমাদের গল্প হয়ে থাকবে। পেট্রোল বোমা হামলায় মানুষ পোড়ানোকে যে আমরা উৎসবের মর্যাদা দিয়েছি! প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা না জানলেও খাদ্যে ভেজাল, দূর্ণীতি আমাদের গলায় ফাঁস হয়েই থাকবে। শাকের ভাইরা দিনে দিনে অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠবেন আমাদের রাষ্ট্রে আর বদলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন আনিসুল হাই এবং আবদেল আবু সাঈদীরা।
মনে রাখতে হবে বইয়ের একেবারে শুরুতেই লেখা আছে 'এ গ্রন্থে বর্ণিত সকল ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। বাস্তবের সঙ্গে সাদৃশ্য কাকতালমাত্র।' গল্পগুলো পড়তে পড়তে মনে হয়েছে সাদৃশ্য খুঁজতে যাওয়ার চেষ্টাটা ভুল। মনের ভেতর উঁকি দেওয়া সাদৃশ্যগুলো সরিয়ে গল্পগুলো পড়তে পারলেই কেবল গল্পগুলোর প্রকৃত শক্তি বোঝা সম্ভব।
তবে মনে প্রাণে চাই এমন দিন আসুক, যেদিন এই বাংলাদেশে এরকম ঘটনা আর ঘটবে না। যেদিন এই গল্পগুলো সত্যিই অপ্রাসঙ্গিক মনে হবে। সেই দিনটি আসুক। মাহবুব আজাদের গল্পভরা বিদ্রুপের উদ্দেশ্যও বোধহয় তাই।
জার্মান কবি এবং নাট্যকার বের্টোল্ট ব্রেখট বলেছিলেন “নিকৃষ্টতম অশিক্ষিত হচ্ছে সে, যে রাজনৈতিকভাবে অশিক্ষিত। সে শুনতে চায় না, বলতে চায় না, রাজনৈতিক বিষয়ে অংশগ্রহণ করে না। সে জানে না জীবনের মূল্য, ধান-মাছ আটা-বাসা ভাড়া-জুতা বা ঔষুধের দাম -- সবকিছু নির্ভর করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। এই রাজনৈতিক অশিক্ষিত এতই মূর্খ যে, বুক ফুলিয়ে গর্ব করে বলে, রাজনীতিকে ঘৃণা করি ! এই নির্বোধ জানে না, তার রাজনৈতিক অজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয় পতিতা, পরিত্যক্ত সন্তান এবং সবচেয়ে নিকৃষ্টতম ভণ্ড রাজনীতিবিদ, দুর্নীতিবাজ এবং দেশি-বিদেশি কর্পোরেট কোম্পানির ভৃত্য দালাল। "
বের্টোল্টে ব্রেখটের এই কথাগুলো কে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিরন্তন সত্য মনে হয়। আমরা, আমাদের চারপাশের দিকে তাকালে দেখতে পাই এখানকার বেশিভাগ মানুষ রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করে না, রাজনীতি নিয়ে জানতে আগ্রহী না। অথচ রাজনীতি মানেই অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের যোগসূত্র। রাজনৈতিক বিমুখতার জন্যেই আমাদের এখানকার মানুষ ইতিহাস অজ্ঞ কিংবা শুনা কথায় বিজ্ঞ হয়ে উঠে । এখানে মানুষ খেলাধুলা, নাচ-গান, শিল্প-সাহিত্য কোন কিছুর সাথে রাজনীতি মিশাতে চায় না। অথচ সবকিছুর সাথে রাজনীতি, তথা দেশ ও তার ইতহাস জড়িত। আমাদের শিল্প সাহিত্য চর্চায় সচেতন ভাবে রাজনীতি কে এড়িয় যাওয়া হয়। ফলে নাটক, ছিনেমা, সাহিত্য কোথাও রাজনীতি তথা সমসমায়িক বাস্তবতার উপস্থিতি দেখা যায় না । রয়েসয়ে সবাই কে খুশি রেখে, সত্যের মুখোমুখি দাঁড় না করিয়ে কাউকে কোন আঘাত না দেওয়ার মাধ্যমে এখানে সৃষ্টি হয় শিল্পকর্ম, সাহিত্য কর্ম। ফলে রাজনীতি বিমুখ মানুষদের কাছে খুব সহজে বাস্তবতা বিবর্জিত সাহিত্য রচণাকারী-রা জনপ্রিয় এবং প্রধান সাহিত্যিকের মর্যদা পায়!
আজ হতে শত বছর পরে একজন পাঠক আজকের সাহিত্য পাঠ করে যদি আমাদের এই সময়টাকেই দেখতে না পারে, আমাদের সমাজ ব্যবস্থা, রাষ্ট্র ব্যবস্থা সহ মানুষের জীবন যাপনের সীমাবদ্ধতা, সংকীর্ণতা, সফলতা না জানতে পারে তবে তার সে পাঠ তার জন্য দুআনা স্বার্থক হবে না। আমরা আজও শরৎচন্দ্রের ’মহেশ’ পড়ে সেই সময়ের নিপীড়িত ভূমিহীন সহায়সম্বলহীন পরিবারের উপর সমাজপতিদের শোষন দেখতে পাই, শহিদুল জহিরের ’জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ পড়ে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বদলে যাওয়া রাজনীত দেখতে পাই, আনোয়ার পাশার ’রাইফেল রোটি আওরাতে’ মুক্তিযুদ্ধ সময়কালী বিভীষিকা আর অত্যাচারের ভয়াবহ চ��ত্র দেখতে পাই। সময় কে ধারণ করা সাহিত্য সব যুগের সব মানুষের গুরুত্বপূর্ণ। যে সাহিত্য, সাহিত্যটি রচনাকারীর সময় কে উপস্থাপন করে না সে সাহিত্যের সাথে চটকদার চানাচুরের কোন পার্থক্য থাকে না।
সম সাময়িকের বাংলাদেশে যারা সাহিত্য চর্চা করেন, গল্প-উপন্যাস লিখেন তাদের মাঝে নিজের সময়টিকে তাদর লেখায় ধরে রাখার দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। মাহবুব আজাদের “আশাকর্পূর’ নাম গল্পগ্রন্থটি পড়ার পরে মনে হলো সেই প্রথাগত ধারা থেকে তিনি বেরিয়ে এসেছেন এবং এই বিষয়টি আমার কাছে পাঠ প্রতিক্রিয়াতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। আশাকর্পূর বইটিতে মোট ১১টি গল্প আছে, সে সব গল্পের সবগুলো চরিত্র, গল্পের পটভূমি আমাদের চেনা-জানা। চরিত্রগুলো কখনো রাজনৈতিক, কখনো পারিবারিক, কখনো বা সুশীল বুদ্ধিজীবি ভিত্তিক। আর সেই চরিত্রগুলো কে লেখক এঁকেছেন কখনো বিদ্রুপ করে, কখনো জীবনের ঘরে সীমাহীন ব্যর্থতা দিয়ে আর কখনো বা হাস্যরসে। যাই এঁকেছেন তার কোন কিছুই বাস্তবতা থেকে একবিন্দু বিচ্যুতি সরে আসেননি। চরিত্র আর তাদের পটভূমির গল্প এত সাবলীল ভাষায় উঠে এসেছে যে পড়ার সময় পাঠকের কোথাও এতটুকু ক্লান্তি আসে না। নতুন নুতন শব্দের ব্যবহার, বাক্যের বিন্যাস ও গভীরতা প্রতিটি গল্পকেই নিয়ে গেছে অন্য এক উচ্চতায়।
প্রথম গল্পটি বাংলাদেশে পথভ্রষ্ট বামপন্থি রাজনৈতিক দলের কথা উঠে এসেছে। বাংলাদেশের বামপন্থি দলগুলো তাদের মূল আদর্শ থেকে সরে গিয়ে আজ কি তুচ্ছতায় মেতে আছে সেই গল্প বলেছেন লেখক। দ্বিতীয় গল্পটির নাম ‘গরুটারই চরিত্র ভালো নয়’ , শুধু মাত্র নাম দিয়েই বুঝা সম্ভব এই গল্পের মূল বক্তব্য কি হতে পারে। গরুর জায়গা নারী কে বসিয়ে দিলেই পাঠক বুঝতে পারে বাংলাদেশে ধর্ষণের পর কিভাবে ’সহি মানুষজন’ সেই ধর্ষণকে শেষ পর্যন্ত নারীর পর্দা, ভেষ-ভূষা, চলন-বলন-কথনের উপর চাপিয়ে দেয়। আর সেই চাপিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া কিভাবে হয় তার উৎকৃষ্ট দৃশ্যায়ণ করেছেন লেখক এ গল্পে। সবগুলো গল্প নিয়ে পৃথক পৃথক আলোচনা করলে এ পাঠপ্রতিক্রিয়া অনেক দীর্ঘ রচনা হয় যাবে। তাই গ্রন্থটি তে নিজের সবচয়ে ভালোলাগা গল্পগুলোর কথাই বলি।
আশাকর্পূর গল্পগ্রন্থে আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্প ‘নৈনং ক্লেদয়ন্তি, আশাকর্পূর এবং ইব্রাহিমর ছুরি।’ নিরীহ মানুষ পুড়িয়ে মারার যে বিভীষিকাময় সময় কে আমরা দেখেছি ২০১৩ সালের শেষের দিকে, যেখানে মনির-রা পুড়ে অঙ্গার হয়েছে কোন এক রাক্ষুসের ক্ষমতার তৃষ্ণা মিঠাতে। মাহবুব আজাদের আগে সেই নিরীহ মানুষগুলোর গল্পকে এমন বেদনাকাতর শব্দমালায় এর আগে কেউ গাঁথেনি, রাক্ষুসের তৃষ্ণার কথা জানায়নি, আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া একজন বাস চালকের পরিবারের নির্মম বেদনার গল্প, ক্রোধের গল্প, অসহায়ত্বের গল্প এমন অশ্রুসিক্ত হয়ে আগে আমাদের কাছে আসেনি। এ গল্প ইতিহাস ভুলে যাওয়া মানুষদের পুরানো ইতিহাস জানাবে, বদ্ধ বিবেকের মানুষ কে ও আয়নার সামনে দাঁড় করাবে।
যে গল্পের নাম দিয়ে বইটির নামকরণ করা হয়েছে সেই আশাকর্পূর গল্পটি দু পৃষ্ঠার মাত্র। এ দু পৃষ্ঠার গল্পে যতগুলো শব্দ, বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে গল্পটি পাঠের পর তারচেয়ে বেশি শব্দ আর বাক্য এবং অব্যক্ত হাহাকার পাঠকের মনের ঘরে জেগে ওঠে। আমাদের জাতীয় সংগীতের দুটো লাইন যে এত মর্মস্পর্শী, এতো বেদনা জাগাতে পারে এই গল্প না পড়লে কারো পক্ষে বোধহয় অনুধাবন করা সম্ভব না। যে স্কুলের মাঠে শিশুরা একদিন ’মা তোর বদন খানি মলিন হলে, আমি নয়ন, ও মা আমি নয়ন জলে ভাসি’ গাইতো সেই স্কুল মাঠেই একদিন একবুক বেদনা আর চোখ ভরা সত্যিকার জল নিয়ে হারিয়ে যাওয়া মা কে খুঁজে! সারি সারি লাশের স্তুপ এসে জমে স্কুলের মাঠে, বিগলিত, পঁচে যাওয়া লাশের মাঝে ’আমি কী দেখেছি মধুর হাসি কে খুঁজে বেড়ায়’ পৃথিবীর নিষ্ঠুরতার সাথে অপিরিচিত শিশুরা। নানান দুর্ঘটনায় স্বর্গরাজ্য আমাদের এই দেশে এ চিত্র নিত্যদিনকার ঘটনা, কখনো সেটি রানা প্লাজায় ঘটে, কখনো সেটি নৌকা ডুবিতে ঘটে, কখনো বা সেটি ঘূর্ণিঝড়, সড়ক দূর্ঘটনায় ঘটে।
ইব্রহিমের চুরি গল্পটি পড়ে মনে হয়েছে লেখকের বোধ শক্তি কত প্রখর হলে একটি গল্পের নামকরণ শুধু একটি মাত্র বাক্যের মাঝেই স্বার্থক ভাবে জন্ম নিতে পারে। এই গল্পে কোথাও ইব্রাহিম নামের কেউ নেই, নেই কোন চুরির কথাও! বরং আমাদের দেশে কোন লেখক অসুস্থ হলে আমাদের সীমাহীন সীমাবদ্ধতা, লোক দেখানো শ্রদ্ধা প্রদর্শন আর নানান ভন্ডামোর যে চিত্র দেখা যায় সেই গল্পই উঠ এসেছে। তাহলে প্রশ্ন হলো এ গল্পের সাথে ইব্রাহিম আর তার চুরির কি সম্পর্ক? সেই সম্পর্কের কথা বলতে চাইছি না, আমি চাই পাঠক নিজে গল্পটি পাঠ করেই সেই সম্পর্কটুকু দেখে চমকে উঠে নীরবে কিছু দীর্ঘশ্বাস ফেলুক।
মাহবুব আজাদ তার গল্পে ’যে সময়ের বাংলাদেশ’ কে তুলে এনেছেন, সেই সময় যদি সত্যি কোনদিন হারিয়ে যায় তাহলে আলোকিত সময়ের মানুষেরা জানতে পারবে আমরা কি দু:সময়ের অন্ধকারে বেঁচে ছিলাম, কাদের ছায়াতলে বেড়ে উঠেছিলাম। ’আশাকর্পূর’ তাই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকুক অনাগত কোন সময়র কাছে।
আমার একটা প্রশ্ন আছে যেটা বইটা পড়ার সময় বার বার আমার মনে উদয় হয়েছে। আজ থেকে ১০/১৫/২০ বছর পর এই গল্পগুলো পড়লে একজন পাঠক কি গল্পগুলো একইভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারবে? আবেদন কি আজকের মতোই থাকবে? এমনকি আজকে যদি এই গল্পগুলোকে অন্য কোন ভাষায় অনুবাদ করা হয় তাহলে কি গল্পগুলোর আবেদন (অনুবাদজনিত ক্ষতি স্বীকার করে) একই প্রকার থাকবে? এই বিবেচনায় মনে হয় কোন কোন গল্পে পটভূমিটা উল্লেখ করা প্রয়োজন ছিল। সেই উল্লেখটা ঘটনা বিশেষ নয়, বরং কালোত্তীর্ণ সাধারণ ঘটনাপ্রবাহ হিসেবে দেখাতে হতো।
উপমা, অনুপ্রাস ইত্যাদি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কালের পরিক্রমায় সেটা পাঠকের বোধগম্য বা সেটা পাঠকের কাছে আবেদনপূর্ণ থাকলো কিনা সেটা বিবেচনায় থাকা দরকার। এ'সব ক্ষেত্রে লোভ সম্বরণ করাটা জরুরী।
এই গল্পগুলোর সবচে' শক্তিশালী দিক হচ্ছে কাহিনী, চিত্রকল্প, দৃশ্যকল্প এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে চরিত্রচিত্রণে এতো ডিটেইলে বর্ণনা দেয়া হয়েছে যে সেখান থেকে পাঠক অনায়াসে যথাযথ কল্পনা করতে পারবেন। গল্পের ভাষা শক্তিশালী, এটা আরেকটা প্লাস পয়েন্ট। গল্প পড়ে প্রায়ই যে মিশ্র অনুভূতি হয়েছে সেটাই আমাকে ৫ তারা দিতে বাধ্য করেছে।
ব্লগের সুবাদে সংকলনের অনেকগুলো গল্পই আগে পড়া। তারপরেও ভালো লেগেছে, কারণ প্রতিটি গল্পই সমকালকে পট করে লেখা। উইট আর স্যাটায়ারের দারুণ সব বিজ্ঞাপণ বহন করা এই সংকলনে, একটু আলাদা বলেই কী না কে জানে, 'সমর্থক' আর 'ইবরাহিমের ছুরি' গল্পদ্বয় বেশ মনে রাখার মতো।
মাহবুব আজাদ এমন এক ভাষায় লেখেন যে ভাষায় লিখতে গেলে আমাকে কয়েকবার জন্ম নিতে হবে। তবুও আমার মনে হয় না তার সহজাত উইট কিংবা হিউমার আয়ত্ত্বে আনা সম্ভব...he is that good!
বইয়ের বাজার ভর্তি বিখ্যাত লেখকের অখাদ্য বইতে। পরিচিতি বিখ্যাত লেখকদের বই আমরা চোখ বন্ধ করে কিনি। অপরিচিত বা নতুন লেখকের বই কিনি না। সে বই ভালো হলেও। ভালো কিনা জানতে হলে বইটা কিনে পড়তে হয়। আমরা সেটা করি না। করি না বলে নতুন লেখকদের উঠে আসতে খুব কঠিন সময় পাড়ি দিতে হয়। নতুন লেখকের ভালো বইটি যেখানে বাজার পায় না সেখানে বিখ্যাত লেখকের অখাদ্য বইও বহুগুন বেশী বিক্রি হয়।
অনেক প্রতিষ্ঠিত লেখকের গল্পের প্রবেশপথেও প্রথম পৃষ্ঠা কিংবা প্রথম একটি প্যারাকে অতিক্রম করার পর গল্পে ঢোকা যায়। অন্ততঃ একটি পাতা পড়ার পর সিদ্ধান্ত নেয়া হয় গল্পটি পড়বো কি পড়বো না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই প্রথম পাতাটি আনন্দদায়ক হয় না। পাঠের আনন্দ শুরু হয় প্রথম পাতাটি শেষ হবার পর।
কিন্তু মাহবুব আজাদ সেই বিরল গল্প বলিয়েদের একজন যার প্রথম বাক্য পড়েই আনন্দের যাত্রা শুরু হয়। হ্যাঁ আবারো বলছি - প্রথম বাক্য। এই গুনটি অতি বিরল। ফলে তাঁর গল্প পড়তে শুরু করলে শেষ লাইন পর্যন্ত পৌঁছে যেতে কোন বেগ পেতে হয় না। পাঠকের মনে বিরক্তি উৎপাদন না করে শেষ পর্যন্ত টেনে নিতে পারার মধ্যে যে লেখক স্বার্থকতা মাহবুব আজাদের মধ্যে তার সম্পূর্ণ উপস্থিতি আছে। তাঁর লেখনীর তীক্ষ্ণ রসবোধ সমসাময়িক প্রতিষ্ঠিত লেখকদের মধ্যেও বিরল। সরস লেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে পরিমিতিবোধ সেটি তার মধ্যে যথেষ্ট পরিমান উপস্থিত।
মাহবুব আজাদের বৈচিত্রময় সরস গদ্যের সাথে প্রথম পরিচয় ঘটেছিল সচলায়তনে। তাঁর অধিকাংশ গল্পের সাথে সমসাময়িক প্রেক্ষাপট এত গভীরভাবে যুক্ত যে পাঠকমাত্রেই সেই সময়ের একটি রূপক চিত্র পেয়ে যান তাৎক্ষণিকভাবে। গদ্য ব্যাপারটাকে আনন্দদায়ক করে তোলার জন্য যে শৈল্পিক দক্ষতা দরকার তা তাঁর মধ্যে সম্পূর্ণভাবেই উপস্থিত এবং সেটাকে একটা সহজাত প্রবণতা বলে মনে হয়।
একটি স্বার্থক কবিতা লিখেও যেমন কবি অমর হতে পারেন তেমনি মনে রাখার মতো একটি সময়োত্তীর্ণ গল্প লিখলেও একজন লেখকের জন্ম স্বার্থক হতে পারে। মাহবুব আজাদ কী সেই গল্পটি লিখে ফেলেছেন? সেই জবাবটি অনাগত ভবিষ্যতের হাতে রেখেও পাঠক হিসেবে আমি তেমন সময়োত্তীর্ণ গল্পের স্পষ্ট ছায়া দেখতে পাই মাহবুব আজাদের কলমে। 'ছায়াগোলাপ' কিংবা 'আশাকর্পূর' তেমন কিছু ছায়া।
তবে তিনি খুব কম লেখেন- কম লিখছেন আজকাল। অথচ তাঁর লেখনীশক্তির পূর্ণ ব্যবহার করলে বাংলা সাহিত্য উপকৃত হতো। প্রতিষ্ঠিত লেখকদের হাবিজাবি লেখার চেয়ে তাঁর মতো সৃজনশীল লেখকদের লেখা অনেক বেশী প্রয়োজন।
উৎকৃষ্ট সাহিত্য সময়কে অশ্মীভূত করে, আর সময়টা সমকাল হলে তো কথাই নেই। এই গল্পগ্রন্থের প্রত্যেকটি গল্পের বিষয়বস্তু ভিন্ন, মেজাজও ভিন্ন, কিন্তু গল্পগুলোর কাল একই ও বর্তমান। কখনও ব্যঙ্গরস, কখনও গাম্ভীর্যের রঙে অঙ্কিত হয়েছে সমসাময়িক রাজনীতি ও সমাজ। শক্তিশালী শব্দচয়ন ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বর্ণনা-ঢঙে বইটি সমকালের একটি চমৎকার দর্পণ হয়ে উঠেছে।
জীবাশ্মের মতই এই নাতিদীর্ঘ গল্পগ্রন্থের আনাচেকানাচে থেকে বুদ্বুদ হয়ে বের হয় ইতিহাস। ভবিষ্যত প্রজন্ম জানবে আমরা কোন, বা কাদের সময়ে বেঁচে ছিলাম।
আশাকর্পূর এর গল্পগুলোকে আমি আসলে গল্প বলি না। এগুলো কোন বানোয়াট কিছু নয়, কোন অপর বাস্তব নয়। এগুলো আমাদের এই সময়ের চিত্র। প্রতিটা গল্পে ফুঁসে ওঠা ক্ষোভ আছে, যা প্রহসনের মধ্যে দিয়ে এসেছে। পচে গলে যাওয়া বোবায় ধরা মানুষের স্তব্ধতা, বধিরতা, স্থবিরতা-কে আঘাত করাই গল্পগুলির প্রচেষ্টা।
আশাকর্পূরের গল্পগুলো যদিও আগেই পড়া ছিল সচলায়তনের মাধ্যমে তারপরেও কাগজের পাতায় ক্ষুদে অক্ষরগুলো পড়ে যে আরাম পাওয়া যায় সেটা কখনও পাওয়া যায় না কম্পিউটারের মনিটরে। সেজন্যই বইটা কিনে ফেললাম। গল্পগুলোও পড়ে ফেললাম আবার। বারবার পড়লেও পুরনো হয়না গল্পগুলো। লেখকের লেখুনি নিয়ে কিছু বলার যোগ্যতা আমার নেই। অসাধারণ গল্প বলা। খুব সাধারণ কথাও লেখুনির গুনে অসাধারণ উপমা হয়ে ওঠে যেমনঃ "তিনি একটা আলতো হাত রেখেছেন শাকের ভাইয়ের হাঁটুর ওপরে, যেভাবে টলোমলো শিশু টেবিলের নিচে ঢুকলে তার মাথার ওপরে একটা হাত ভাসিয়ে রাখে তার মা"। চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনাবিহীন ঘটনাগুলোকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে আমাদের উদ্বুদ্ধ করে। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমাদের হিপোক্রেসিগুলো।
মাহবুব আজাদের গল্পগুলো দুধারী তলোয়ারের মতো। সাহিত্যপঠন আর স্যাটায়ারের এমন যুগলবন্দির সহসা দেখা মেলে না। এই বইটির গল্পগুলো বেশিরভাগই অন্তর্জালে পূর্বে প্রকাশিত, সেই সূত্রে একরকম চর্বিতচর্বণই বলা যায়। তবে দুই মলাটে তারিয়ে তারিয়ে পুনর্পাঠ উপভোগ্য বৈকি। শব্দ নিয়ে খেলা করা, শব্দগুলো কড়কে দেওয়ার সুযোগ লেখক সানন্দেই নিয়েছেন গল্পগুলোতে। সঙ্গে সঙ্গে চাবুকও মেরেছেন নানা অসঙ্গতিকে। তারপরও কয়েকটি গল্প পড়ে একটু খেদ রয়ে যায়, হয়তো সেগুলোর কোনোটি আরেকটু ঘষামাজায় আরও সপ্রাণ হয়ে উঠতে পারত। তারপরও, আশাকর্পূর পড়ে আশা কর্পূরের মতো উবে যায় না, থিতিয়ে থাকে ভরা নদীর পলিমাটির মতো।
"... শূকর জিতে গেলেও শূকরই রয়ে যায়। আর বাঘ হেরে গেলেও থেকে যায় বাঘ।..."
আশা কর্পূর বইটার 'সমর্থক' গল্পের এই লাইন দুটো আমার মনে গেঁথে গেছে। যখন-ই বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা দেখে মর্মাহত হই, অন্যরা যখন ক্রিকেটারদের গালির বন্যায় ভাসিয়ে দেহ, তখন মনে মনে এই লাইন দুটো উচ্চারণ করি।
সাম্প্রতিক কালের ছোট গল্পের লেখকদের মাঝে মাহবুব আজাদ এর লেখাগুলো আমার অসম্ভব ভাল লাগে। এই লেখক ছাড়া আমি অন্যদের মাঝে বর্তমানের বিভিন্ন ঘটনাকে গল্পের ভাঁজে প্রকাশ করতে দেখি না। তবে অনেক সময়ই মনে হয় আজ থেকে ২০ বছর পর কোন পাঠক কি এই লেখাগুলোর কনটেক্সট ধরতে পারবে? সাথে সাথে মনে হয় যারা ধরতে পারার তারা ঠিকই পারবে, গল্পগুলো তাদের-ই জন্য। শুভ কামনা রইল এই ছোট গল্পের জাদুকরের জন্য।
গল্পগুলির পটভূমি আমাদের আশে পাশের ঘটনাবলির ছায়া অবলম্বনে তৈরি । এমনিতেই লেখনী খুবই ঝরঝরে কিন্তু যদি গল্পগুলির পটভূমি জানা থাকলে হয়ে ওঠে অসাধারণ। Sometimes it's full of sarcastic humor that leaves a sharp sense of epiphany, other times the harsh truth keeps old but necessary wounds bare enough that you would not get forget it. This is the most relevant contemporary writing that you need to read now.
পত্রিকার পাতার পরিসংখ্যান আর রক্ত-মাংসের মানুষের মধ্যে পার্থক্য হল একটা গল্প। এই গল্পগুলো সেইধরনের। বেশিরভাগই আগে পড়া ছিল। তবে ছাপার অক্ষরে পড়া স্ক্রিনে পড়ার থেকে সব সময়ই সুখকর। কিছুদিন পর গল্পগুলো আরেকবার পড়ার কারণে ঘটনাগুলো আরেকবার মনে পড়ল। না হলে হয়তো ভুলেই যেতাম। আমাদের স্মৃতিও কর্পুরের মতই।
গল্পগুলি এত বেশিই সমকালাক্রান্ত যে কালোত্তীর্ণ হয়ে ওঠা হয়ত এই বইয়ের পক্ষে সম্ভব হবে না। কিন্তু সমকালের এমন সাহিত্যিক সার্থক প্রকাশের প্রয়োজনও এখন নেহায়েত কম নয়। এই বইয়ের পাঠকসংখ্যা যত বৃদ্ধি পাবে, ততই তা দেশের জন্য শুভ হবে, এ কথা তাই নির্দ্বিধায় বলতে পারি।