বিমল দে তিব্বত ঘুরে এসেছিলেন সেই ১৯৫৬ সালে। তখন তার বয়স মাত্র ১৫। তার তিব্বত যাওয়া একেবারেই আকস্মিক। বাপ মা মরা বিমল এর মন বাড়িতে টিকতো না, চিরকালই তিনি ঘর পালানো ছেলে।ঘর থেকে পালিয়ে তিনি গিয়েছিলেন গয়ায়। সেখানে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর সাথে তার ঘনিষ্ঠতা হয়। অসুস্থ সন্ন্যাসীটিকে সেবা শুশ্রুষা করে তিনি সুস্থ করে তুলেছিলেন। কিন্তু সন্ন্যাসীদের তো কারো প্রতি আসক্তি থাকে না, তাই কিশোর বিমল এর প্রতি স্নেহশীল এই প্রৌঢ় হঠাৎই বিমলকে রেখে গয়ায় তার সাথে দেখা করতে আসা একদল বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর সাথে গয়া ছাড়লেন, যাওয়ার আগে কেবল বলে গেলেন গ্যাংটক যাচ্ছেন। বিমল বৌদ্ধ সন্ন্যাসীটির সাথে নিজের মনকে বেধে ফেলেছিলেন, একা একা গয়ায় আর তার মন টিকলো না, বাড়িও ফিরলেন না, পাড়ি জমালেন গ্যাংটকেই।তখন সিকিম ভারতের অর্ন্তভুক্ত না হলেও ভারতের আশ্রিত রাজ্যই বলা চলে। তাই সিকিমের রাজধানী গ্যাংটকে পৌছতে সমস্যা হলো না। সেখান থেকে কিভাবে তার পূর্ব পরিচিত বৌদ্ধ সন্ন্যাসীটিকে খুঁজে বের করে, তার সঙ্গে থাকা সন্ন্যাসী দলের সাথে পাড়ি জমালেন তিব্বতে, তিব্বতের বিভিন্ন শহরে, গুম্ফায় তার কি কি অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হলো। তারপর সেই দলকে ছেড়ে একা একাই হিন্দুদের পবিত্র তীর্থ কৈলাস পর্বত আর মানস সরোবর ঘুরে এলেন তা নিয়েই এই বই।কৈলাস আর মানস সরোবরকেই লেখক অভিহিত করেছেন মহাতীর্থ হিসেবে, তিব্বতে চীন অধিকারের পর এরপর দীর্ঘদিন ভারত থেকে তিব্বতে তীর্থযাত্রী যাওয়া বন্ধ ছিলো বলে তিনি নিজেকে অভিহিত করেছেন মহাতীর্থের শেষ যাত্রী হিসেবে। কৈলাশ পর্বতশৃঙ্গ আর মানস সরোবর দুটোই হিন্দুদের জন্য মহা পবিত্র স্থান। কৈলাসে শিব আর পার্বতী বাস করেন বলে পুরাণে উল্লেখ আছে। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে কৈলাস আর মানস সরোবর উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। প্রতি বছর ভারত থেকে প্রচুর তীর্থযাত্রী এই দুটি তীর্থ দর্শনে যেতেন। বৌদ্ধদের কাছেও এই দুটো তীর্থ সম্মানীয় হলেও তাদের কাছে বেশি পবিত্র তিব্বতের রাজধানী লাসায় দালাই লামার পোতলা প্রাসাদটি এবং আরও অনেক বৌদ্ধ মন্দির বা গুম্ফা। ভারত থেকে তিব্বতে তীর্থযাত্রীরা যেতেন মূলত আলমোড়া থেকে গার্বিয়াং হয়ে লিপুলেখ পাস হয়ে তিব্বতের তাকলাকোটের পথে। কিন্তু বিমল দে’রা পাড়ি দিয়েছেন অন্য পথে, গ্যাংটক হয়ে। তীর্থযাত্রীর দলটি ছিলো মূলত নেপালের বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের।ভারত হতে চীনে তখন তীর্থযাত্রী যাতায়াত বন্ধ ছিলো। নেপাল থেকে তীর্থযাত্রী যাওয়ার ব্যাপারে এই নিষেধাজ্ঞা ছিলো না।বিমল দে কেও নেপালী বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হিসেবে তীর্থযাত্রীর দলে অর্ন্তভুক্ত করা হয়। চীন যদিও তখন তিব্বতের শাসনযন্ত্র পুরোপুরি দখল করে নি, তবুও মোটামুটি পুরো শাসন ব্যবস্থা ছিলো চীনের দখলেই। অনেক সন্দেহ, সাক্ষাতকার এর মুখোমুখি হয়েও কোনক্রমে বিমল তিব্বতে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তার বৌদ্ধ সন্ন্যাসী গুরুদেব এর বুদ্ধিমতো তিনি ছিলেন মৌনী সন্ন্যাসীর ভূমিকায়, অর্থাৎ যে সন্ন্যাসী নিজ গুরু বা অন্য কোন বড় লামার সামনে ছাড়া মুখ খোলেন না। পরে অবশ্য তাকে একটি বৌদ্ধ গুম্ফায় বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষাও দেয়া হয়, তিনি পরিচিত হন একজন শিক্ষার্থী সন্ন্যাসী বা ত্রাপা হিসেবে। তারপর তিব্বতের নানা শহরে, গ্রামে গুম্ফায় ঘুরে তারা পাড়ি দেন রাজধানী লাসায়। সেখানে কয়েকদিন কাটিয়ে সন্ন্যাসীদলটি ফেরার পথ ধরে। তিব্বতের প্রধান লামা মূলত দালাই লামা, তখনও পর্যন্ত তিব্বতের বেশিরভাগ অংশের শাসনযন্ত্রের ভার ছিলো দালাই লামার হাতে, যদিও চীন তখনই তিব্বতের শাসন ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করেছে। আর পাঞ্চেন লামার অধীনে ছিলো গীয়াৎসে, সীয়াৎসে প্রভৃতি শহর ও এলাকা। এই দুই প্রধান লামা ও তিব্বতের আরও অনেক প্রধান লামার নির্বাচন পদ্ধতি অভিনব, তিব্বতিদের বিশ্বাস এনারা বারবার পুর্নজন্ম নেন তিব্বতে, কখনো মৃত্যুর পূর্বে ভূতপূর্ব লামা বলে যান তিনি এরপর কোথায় জন্মাবেন অথবা তার মৃত্যুর পর অন্য লামারা খুঁজে বের করেন কোথায় তার পুর্নজন্ম হলো, এটা করতে করতে বেশ কয়েকবছরও চলে যেতে পারে। তিব্বতের চতুর্দশ দালাই লামা তখন ছিলেন বিশ বাইশ বছরের তরুণ, অন্য প্রধান লামারা তাকে শাসনকাজে সহায়তা করতেন। লাসায় তার রাজপ্রাসাদ পোতলা কিংবা গ্রীষ্মাবাসে গিয়ে একাধিকবার তাকে দেখার সুযোগ কিশোর বিমলের হয়, যদিও কথা হয় নি। পরবর্তীতে পাঞ্চেন লামার দেখাও পান তিনি। দালাই লামা ১৯৫৮ সালে সদলবলে ভারতে পালিয়ে আসেন। সঙ্গী তীর্থযাত্রীদের যাত্রা শেষ হলেও বিমল একাই পাড়ি দেন কৈলাস আর মানস সরোবরের পথে। পথে দেখা পান তীব্বতী এক বিচিত্র ওঝা বা যাদুকরের, এক জ্ঞানী বৃদ্ধের আর শেষে এক ভারতীয় হিন্দু সন্ন্যাসী এমনি অনেক মানুষের। বিশেষত ভারতীয় হিন্দু সন্ন্যাসীটি তার মতে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী এবং তার নিরাপদে কৈলাস ও মানস সরোবর ভ্রমণ ও ভারতে ফিরে আসার পিছনে এনার যথেষ্ঠ ভূমিকা আছে। কিভাবে অনেক বিপদের মুখেও অসমসাহসী বিমল সেই দুর্গম পথে বৈরী আবহাওয়ার তিব্বতে তার যাত্রা শেষ করেন তার বর্ণনা আছে এই বইয়ে। তিব্বতের ইতিহাস, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মানুষ নিয়ে অনেক বিশদ বিবরণ পাওয়া যাবে এই বইয়ে যা আগের কোন কৈলাস ভ্রমণ কাহিনীতে পাই নি। বইয়ের পরিশিষ্টে লেখক ২০০০ সালে তার লাসা ভ্রমণের বর্ণনা লিখেছেন, সেই ১৯৫৬ সালের লাসা এখন আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। বর্তমানে চীন সরকারের সাথে যৌথভাবে উদ্যোগ নিয়ে ভারত থেকে তীর্থযাত্রীরা কৈলাস ও মানসে যেতে পারে এটাও ঠিক কিন্তু বর্তমানের ভ্রমণ কাহিনীতে তিব্বতের এতো বিশদ বিবরণ পাওয়া যাবে না যা আছে মহাতীর্থের শেষ যাত্রী বইটিতে। তিব্বত ভ্রমণ নিয়ে আমার পড়া সবচেয়ে বিশদ ও তথ্যবহুল বই এটি।