এত দারুণ বইটা কেন আমি এতদিন পড়িনি ভেবে আফসোস হচ্ছে। তবে সেই সাথে আনন্দও হচ্ছে, বইটা আমি পড়ে ফেলেছি বলে।
নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে বইটা কোন প্রেম-বিরহের উপন্যাস নয়। বইটা হতে পারে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ফরাসি স্ত্রী অ্যান ম্যারি ওয়ালীউল্লাহর সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহকে নিয়ে স্মৃতি রোমন্থনের কথা মালা।
প্রিয় পাঠক, আপনি যদি বইটিকে শুধুই স্মৃতিমালা ভেবে থাকেন, তবে নিঃসন্দেহে আপনি ভুল করছেন। এটা ওয়ালীউল্লাহর সাথে তার স্ত্রীর আটপৌড়ে কোন সংসারের কথন নয়। হ্যাঁ, এখানে উঠে এসেছে ওয়ালীউল্লাহ দম্পতির সংসারের কথা। তবে সেই সংসারের আসবাবপত্রের ডিজাইন করতে চাওয়া সৃষ্টিশীল ওয়ালিউল্লাহর মানসিকতাই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। প্রাধান্য পেয়েছে স্বদেশের বহু দূরে থেকেও একজন স্বদেশপ্রেমী মানুষের মনের আকুলতা, জ্ঞানী প্রজ্ঞাময় একজন মানুষের মানবজাতি নিয়ে চিন্তাভাবনার গ্রাফ। বইয়ের নাম 'আমার স্বামী ওয়ালী' হলেও এখানে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ আসলে স্বামী হিসেবে চিত্রিত হননি, হয়েছেন একজন সৃষ্টিশীল, প্রজ্ঞাময়, চিন্তাভাবনায় স্মার্ট মানুষ হিসেবে। তাইতো তিনি লিখতে পেরেছেন, 'আমি তাদের (গ্রামের মানুষ) গোটা জীবন বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতে পারি, আর সেটা পারি আমি গ্রামের মানুষ নই এবং গ্রামে বসবাস করি না বলে'।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহকে আমরা চিনি 'লালসালু'র মত বিখ্যাত গল্প দিয়ে, যেখানে আমরা দেখি মজিদের হঠকারী কর্ম, কিন্তু দেখিনা মজিদের শেষ পর্যন্ত তার আদর্শে অটল থাকার মানসিকতা। হয়তো সেই মানসিকতা অংকন করাটাই ছিলো সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মুখ্য উদ্দেশ্যে। আর এই জন্যেই আমার মনে হয় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ স্রেফ 'লালসালু'র লেখকই নন, তিনি তার চাইতেও অনেক বড় কিছু, যেটা খানিকটা ধরা দিয়েছে অ্যান ম্যারি ওয়ালীউল্লাহর 'আমার স্বামী ওয়ালী'তে। তাই পাঠককে বলবো, 'লালসালু' দিয়ে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মত সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা একটা মানুষকে পরিমাপ করবেন না। তাকে নিয়ে জানুন, আর জানার এই সিঁড়িতে প্রথম ধাপ হতে পারে, আলোচ্য এ বইটি।
পরিশেষে আরেকটা জিনিস না বললেই নয়, আমার ধারণা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর এই চিন্তা-ভাবনা আরো বেশি বিস্তৃত হয়েছে তার সহধর্মিনী ফরাসি নাগরিক অ্যান ম্যারি ওয়ালীউল্লাহর সংস্পর্শে এসে। অ্যান ম্যারি সচেতনভাবে তার নিজেকে নিয়ে এই বইতে কিছুই লিখেননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওয়ালীউল্লাহর চোখে তিনি কেমন সঙ্গী ছিলেন, মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন তা বোঝা যায় নিচের উক্তিটি দেখলেই-
'যখন আমি বলি যে আমি তোমাকে ভালোবাসি, তখন হয়তো কথাটি দিয়ে এই বোঝাতে চাই যে, তোমার কাছে আমি সহজ বোধ করি, স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমি তোমার কথা ভাবি এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আমি ভাবি যে, তোমার সাথে সব কিছু নিয়ে কথা বলা যায়। এটা কি কোন বোঝাপড়া? দুটি মানুষ মানসিকভাবে পরস্পরের কাছে এমন নগ্ন হয়ে ওঠে যে, তারা একে অপরের অবিচ্ছেদ্য হয়ে যায়, মানসিক নগ্নতা থেকে জন্ম নেয় এক ধরণের ঐক্য। আমরা এত সহজে মানসিকভাবে নগ্ন হতে পারিনা...। মনের ওপর একটা পর্দা ঝুলিয়ে রাখার প্রয়োজন হলে বুঝতে হবে তোমার পক্ষে নগ্ন হওয়া সম্ভব নয় এবং সে কারণে ভালোবাসাও সম্ভব নয়।'
একেবারে শেষে, অনুজ রাশেদ স্বপ্নকে ধন্যবাদ, দারুণ এই বইটির সন্ধান দেবার জন্য।