ডেডউড গালশে দ্বিতীয়বার মেয়েটাকে দেখেই এরফান তার জীবনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। রাকা ওয়েষ্টও তার বাবার সাথে সোনার খোঁজে বিগ হর্নসে যাচ্ছে শুনে বিপদের গন্ধ পেয়েও কিছু লোকের আপত্তি উপেক্ষা করে গায়ে পড়েই সে ঐ ওয়াগন ট্রেইনে যোগ দিল। শুরু হলো অভিনব বিপদসঙ্কুল এক যাত্রা।
কাজি মাহবুব হোসেনের লেখা দিয়ে ওয়েস্টার্ন সিরিজের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৩ সালে। কাজি মাহবুব হোসেন ওয়েস্টার্ন সিরিজ ছাড়াও পিশাচ কাহিনী ও অনুবাদের বেশ কিছু বই লিখেছিলেন যা অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। এবং তাঁর প্রথম বই অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯৮২ সালে।
ওয়েস্টার্ন কোনোকালেই আমায় টানেনি। গল্পগুলো সব থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড় মনে হতো। এ নিয়ে ওয়েস্টার্ন ফ্যানদের সাথে বচসা ও হয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর কী মনে করে আবার একটা ওয়েস্টার্ন পড়লাম। এবার বেশ ভালোই লাগলো। বুনো পশ্চিম,উত্তপ্ত পরিবেশ,গান ফাইট আর বিপদের ঘ্রাণ মিলিয়ে উপভোগ্য ছিল সময়টা। এরফান জেসাপ, দেখা হচ্ছে আবারও।
বাংলা ভাষার প্রথম ওয়েস্টার্ন কাজি মাহবুব হোসেনের আলেয়ার পিছে, প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে, পরিচয় করিয়েছিল এরফান জেসাপ নামক এক ইস্পাত কঠিন একই সাথে পিস্তল হাতে বিদ্যুতের মতো ক্ষিপ্র এক অসাধারণ চরিত্রের সাথে। ঘোড়ার পিঠে ধাবমান নায়ক, পিছনে তাড়া করে আসা পসী বাহিনী, রুক্ষ বিরাণ প্রান্তর, ধু ধু তেপান্তর, ঘোড়ায় চড়ে নিখুঁত ল্যাসো ছুড়ে মারা, স্টাম্পিড, ডুয়েল ফাইট, বিস্তৃত প্রেইরি, স্বর্ণকেশী লাস্যময়ী তরুনী, র্যাঞ্জার, শেরিফ আর সংগ্রাম করে টিকে থাকার সেই নিষ্ঠুর পশ্চিমের সাথে পরিচয় ঘটেছিল 'আলেয়ার পিছে'-র হাত ধরে। ওয়েষ্টার্নকে ভালোবাসার জন্য এই একটি বই পড়াই যথেষ্ঠ।
বাঙালি পাঠকদের ওয়েস্টার্ন নামের সম্পূর্ণ নতুন এক মাদকতাপূর্ণ ঘরানার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন কাজি মাহবুব হোসেন 'আলেয়ার পিছে' বইয়ের মাধ্যমে। সেই থেকে বুনো পশ্চিমের রুক্ষ সৌন্দর্যে বুঁদ হয়ে আছি আমরা ওয়েস্টার্ন পাগলারা। সেদিন আবার বইটা রিভাইজ দিচ্ছিলাম; পড়া ইচ্ছা হইল দুই-একটা কথা লিখতে।
আমাগো গল্পের নায়ক এরফান জেসাপের শিকড় কিন্তু এই বাংলায়। ওর দাদা সেই কবে ওয়াইল্ড ওয়েস্টে গিয়া ঘাঁটি গাইড়া বাঙালি পতাকা উড়াইছিল। স্লেচ্ছদের দেশে থাকতে থাকতে কবে আমাগো নায়কের নাম এরফান ইউসুফ থিকা এরফান জেসাপ হয়া গেছে বেচারা নিজেও জানে না।
যাউকগা, আমাগো নায়ক কিন্তু দুর্গার দশ হাতের মত বহুমুখী প্রতিভা নিয়া ঘুরাঘুরি করে। সেরা পিসতলবাজ তো বটেই, দারুণ প্রেমিকও। সুযোগ পাইলে ফিলোসোফিও কপচায়। এই যেমন ধরেন ,মানুষ, ভয়-ডর আর মৃত্যু নিয়া কি সুন্দর একটা দর্শন ঝাইড়া দিল রাকারে- 'সব সময়ই আমরা আমাদের নিজস্ব গুরুত্ব আর প্রয়োজনীতাকে বড় করে দেখতে চাই। কিন্তু আসলে আমরা প্রত্যেকেই আমাদের বাইরের খোলসের নিচে ভীতসন্ত্রস্ত আওহজ সরল অসহায় মানুষ। আমাদের জীবনে ব্যথা আনবে বা আমাদের জীবন কেড়ে নেবে এমন হাজারও কিছুর ভয়ে আমরা অস্থির।' :3
ভ্যাগাবন্ড এরফান যখন ডেডউডে রাকা ওয়েস্টরে দেখল তহন ওর পেটের ভিতরে 'হাজারো প্রজাপতি ডানা ঝাপটাইতে শুরু করল'। বুইঝা গেল ইনিই তিনি ;) । এরে ছাড়া তার চলব না। তাই রাকার বাপ জ্যাক ওয়েস্টের দলে যোগ দিয়া বিগ হর্ন্সে চলল সোনার খোঁজে (কিয়ের সোনা, পোলায় তো ইটিশ-পিটিশ করবার তালে আছে :v )।
ব্যাপার কি এত্ত সহজ!! উঁহু পাকা ধানে মই দেওয়ার লাইগা তো ছাগলের তিন বাচ্চা সব সময়ই থাকে। এইবার আমগো তিন নাম্বার ছাগল ছানা হইল রাকার বাপের কাছের লোক নিক উলফ। হেতেরও যে রাকার দিকে নেক নজর :3 । নিক আবার দুনিয়ার যত লুইচ্চা, চোর, বাটপার আইনা হাজির করছে বিশাল ওয়্যাগন ট্রেইনের নিরাপত্তার লাইগা। ব্যস! এরফানের মনে লাইগা গেল পেচগি - কিছু নিরীহ সংসারী গৃহপালিত লোকজনরে পাহারা দেওয়ার লাইগা এমন গুণ্ডাপাণ্ডার দরকারটা কী! (প্যাচ তো লাগতেই হইব, হ্যায় নায়ক না? :v )।
এরফান হিসাব কইরা দেখল ওয়্যাগন ট্রেইনে মোট তিন লক্ষ ডলারেরও বেশি মালামাল আছে। এইদিকে এরফানের নামে রাকার কানে বিষ ঢাইলা যাইতেছে কে যেন! কি করবে এরফান? সামনে ভয়াবহ বিপদ। আস্ত পৌঁছাতে পারব তো বিগ হর্নসে? নাকি তার আগেই সবাই মিল্যা ফুট্টুশ?
বইটা বাংলা সাহিত্যের প্রথম ওয়েস্টার্ন - মাইলস্টোন। কাজি মাহবুব হোসেনের জাদুকরি লেখনীতে সরস হয়ে ওঠেছে বইটা। স্পেশালি, একদম শুরুতেই এরফানের লগে চালু চাক্কার মারারামি! আহ! সে এক জিনিস মাইরি! চালু চাক্কার উদ্যত পিস্তলের সামনে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জে দাঁড়ায় থাইকা সহজ ভঙ্গিতে যেমনে হাঁটতে হাঁটতে সোজা ওর গালে থাপড়া মারল, মনে হইলেই হা হা কইরা হাইসা উঠি। তারপর সে কি প্যাঁদানিটাই না দিল ওরে, মাইরি! আর সে কি বর্ণনা! ভাষার জোরে, শব্দ চয়নের জোরে দিব্য চোখে দেখতে পাইতেছিলাম সিকুয়েন্সগুলা। অ্যাকশন সিকুয়েন্সগুলা এত্ত জীবন্ত যে মনে হয় পড়তেছি না, দেখতেছি। প্রথম ওয়েস্টার্ন বলে বোধ হয় মাঝে মাঝে কিছু শব্দ চয়নের ক্ষেত্রে রিপিটেশন চলে আসছিল একই বাক্যে। এইটা কোন ব্যাপার না! সব মিলিয়ে দারুণ এক উপভোগ্য বই 'আলেয়ার পিছে'।
বংশানুক্রমে বাংলাদেশী এরফান ইউসুফ কবে যে এরফান জেসাপ হয়ে গিয়েছে তা সে নিজেও জানে না। রুক্ষ পশ্চিমের আর সব দুঃসাহসী মানুষের মতোই তার জীবন কাটে কখনও সোনার সন্ধানে, কখনও ডুয়েল লড়ে, কখনও রেড ইন্ডিয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আবার কখনও ঘোড়ার পিঠে দিগন্তব্যাপী সবুজ পাড়ি দিয়ে। কিন্তু এরফানের এবারের অভিযানটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেননা এবার যতটা না সে নিজের তাগিদে যাচ্ছে তার চেয়ে যে বেশি যাচ্ছে রাকা ওয়েস্টের জন্য! রাকা সেই মেয়ে যাকে প্রথম দেখাতেই ফিদা হয়ে গিয়েছে এরফান। ও হ্যাঁ ,আরেকটা কারনে এবারের অভিযানটা ভিন্ন। এবারের অভিযানের শেষেই যে সে র্যাঞ্চ গড়ে শুরু করতে চাচ্ছে নতুন জীবন।
ওয়াগন ট্রেন অভিযানটার মূল পরিকল্পনাকারী জ্যাক ওয়েস্ট যে কি না রাকার বাবা। উদ্দেশ্য খুব সহজ বুনো পশ্চিমের এক অঞ্চলে গিয়ে সোনা উত্তোলন করা। কিন্তু যাত্রাপথটা গিয়েছে সাদাদের চিরশত্রু রেড ইন্ডিয়ানদের এলাকা দিয়ে। তাইতো প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নগরীর নামকরা সব বন্দুকবাজকে সাথে নিচ্ছে জ্যাক ওয়েস্ট। বিশাল বহরে যাচ্ছে শ'খানেক ওয়াগন, প্রচুর ঘোড়া, গোলাবারুদ আর খাদ্যশস্য। এ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল কিন্তু যাত্রাপথে দলের নিরাপত্তার নামে যে দশজনের দল গড়া হলো সেখান থেকেই অভিযানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছে এরফান। কেননা সেখানে যে রয়েছে নিক উলভস, হিরাম ম্যাক্সওয়েল, চালু চাক্কার মতো দুর্ধর্ষ সব অপরাধী। সহজ পথ ছেড়ে পানিহীন পথে যাওয়া, নিরাপত্তার অজুহাতে সবার কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা – এসব দেখে এরফান নিশ্চিত কোনো ঘাপলা আছে দলের ভেতরে।
আমি ঘরকুনো, ভেতো বাঙালি কিন্তু তবু কেন যেন টান টান উত্তেজনাকর বুনো পশ্চিমের প্রতি আমার একটা আকর্ষণ আছে! ধূ ধু প্রান্তরে ছুটে চলা, প্রতি মুহূর্তে বিপদের ছাতছানি, ডুয়েলের অনিশ্চয়তা – এসব একধরনের শিহরণ জাগায় নিজের অজান্তেই! আর এই মুগ্ধতা শুধুই কিছু ওয়েস্টার্ন মুভি দেখার ফল কেননা এটাই যে আমার পড়া প্রথম ওয়েস্টার্ন বই!
নিজের নায়কোচিত কাজকর্মের মাধ্যমে এরফানের রাকার মন জয় করা, দলের শত্রু লোকটিকে খুঁজে বের করার দুরূহ কাজ, প্রতি মুহূর্তে রঙবদল, দু-দুটি ডুয়েলের উত্তেজনাকর মুহূর্ত, ঘোড়ার পায়ের ছাপ দেখে পিছু নেওয়াসহ বেশ কয়েকটি দারুণ ব্যাপার আছে বইটাতে। আর লেখকের ভাষা খুবই সাবলীল ফলে পড়তে কোনো সমস্যাই হয় না। বর্ণনাগুলো এত বিস্তারিতভাবে দেওয়া যে মনে হয় বই পড়ছি না ব���ং মুভি দেখছি! তো, সবশেষে বলা যায় প্রথম ওয়েস্টার্ন পাঠ শেষে আমি সন্তুষ্ট এবং এরফান ভাইয়ের বাকি বইগুলো পড়তেই হবে।
আলেয়ার পিছনে: রুক্ষ পশ্চিমে এক দুরন্ত ও বিপদজনক স্বর্ণসন্ধানের যাত্রা গল্পের শুরুতেই এরফান জেসাপের সাথে দেখা হয় রাকা ওয়েস্টের, আর তাকে অনুসরণ করতে গিয়েই এরফান জড়িয়ে পড়ে এক বিশাল ওয়াগন ট্রেইনের স্বর্ণসন্ধানী যাত্রায়। গন্তব্য বিগহর্ন্স—কিন্তু পথটা মোটেও নিরাপদ নয়।
ট্রেইনে ওঠে শুধু স্বপ্নবাজ মানুষই নয়, এরফানের পুরনো শত্রু হিরাম ম্যাক্সওয়েল ও নোয়েল স্পাইকের মতো বিপজ্জনক বন্দুকবাজও। এমনকি যাত্রা শুরুর আগেই এরফানকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ভাড়া করা হয় লোক। নিরাপত্তার নামেই দলে ভিড়েছে দাগী অপরাধীরা। আর তাদের নেত্বতে আছে নিক।
পঞ্চম দিন থেকে শুরু হওয়া বিশৃঙ্খলা পুরো দলটাকে টেনে নেয় এক অজানা আতঙ্কের দিকে। শেষ প্রশ্নটি থেকে যায়—স্বর্ণ কি সত্যিই তাদের অপেক্ষায়, নাকি তারা ধেয়ে চলছে এক মরীচিকার ফাঁদে?
পর্যালোচনা: প্রথমেই বলেই রাখি আমি ওয়েস্টার্ন গল্পের খুব একটা বড় ভক্ত নই। হাতে গোনা কয়েকটি ওয়েস্টার্ন গল্পই আমার পড়া হয়েছে। কিন্তু আমি চোখ বন্ধ করে বলতে পারি, সেই অল্প কিছু বইয়ের মধ্যে কাজী মাহবুব হোসেনের লেখা “আলেয়ার পিছনে” আমার কাছে সেরা লেগেছে।
আমার কাছে এই বইটির সবচেয়ে বড় শক্তিশালী দিক ছিল লেখকের সাবলীল লেখনী। কাজী মাহবুব হোসেন এত মসৃণভাবে গল্পটা লিখেছেন যে, একটানা পড়ে শেষ করা যায়। গল্পের বর্ণনা ছিল পরিমিত; কোথাও অকারণে টেনে লম্বা করা হয়নি বা বাড়তি ডিটেইলস ঢুকিয়ে বিরক্তি সৃষ্টি করা হয়নি। অ্যাকশন, সাসপেন্স আর ওয়েস্টার্ন জনরার রুক্ষতা—সবকিছুই পরিমিত মাত্রায় ছিল।
তবে, আমার মনে হয়েছে গল্পের শেষটা কিছুটা তাড়াহুড়ো করেই শেষ হয়েছে। মনে হলো যেন লেখক দ্রুত গল্পটিকে গন্তব্যে পৌঁছাতে চেয়েছেন, যার কারণে ক্লাইম্যাক্সের পর একটা হালকা অপূর্ণতা রয়ে গেল। নেটে ঘাটাঘাটি করে জানতে পারলাম, কাজী মাহবুব হোসেনের লেখা এই ওয়েস্টার্ন উপন্যাসটি নাকি বাংলা ভাষার প্রথম ওয়েস্টার্ন!
সামগ্রিকভাবে, 'আলেয়ার পিছনে' গল্পটি দারুণ। ওয়েস্টার্ন গল্পের প্রতি আমার বিশেষ টান না থাকা সত্ত্বেও, এই বইটি আমাকে মুগ্ধ করেছে। লেখার গুণে বইটি নিঃসন্দেহে দারুণ, কিন্তু শেষের তাড়াহুড়োর কারণে আমি এটিকে তিন তারার বেশি রেটিং দিতে পারছি না। তবুও, এটি একটি অবশ্যপাঠ্য ওয়েস্টার্ন, বিশেষ করে বাংলা সাহিত্যে ওয়েস্টার্ন জনরার সূচনা হিসেবে।