হায়াৎ মামুদ (জন্ম : ৩ জুন ১৯৩৯) বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান লেখক। তিনি একজন আধুনিক কবি, প্রবন্ধকার , অনুবাদক ও অধ্যাপক । মৃত্যুচিন্তা রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য জটিলতা তার বিখ্যাত গ্রন্থ যা ১৯৬০-এর দশকে প্রকাশিত হয়ে সাড়া জাগিয়েছিল । তিনি শিশুদের জন্য অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন । তার অনূদিত মাক্সিম গোর্কি বিরচিত চড়ুইছানা সকলমহলে উচ্চ প্রশংসা লাভ করেছে ।
ড. হায়াৎ মামুদের জন্ম ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ২ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলায় । তার ছেলেবেলা কেটেছে পশ্চিমবঙ্গে-ই । ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর তারা পশ্চিবঙ্গেই থেকে গিয়েছিলেন । কিন্তু ১৯৫০-এর হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি পিতার সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন । কর্মজীবনের শুরুতে কিছুদিন চাকুরি করেন বাংলা একাডেমিতে । ১৯৭৮ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত দীর্ঘকাল তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্বদ্যিালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন ।
হাসান আজিজুল হক কে নিয়ে রচিত তার জীবনীগ্রন্থ উন্মোচিত হাসান একটি প্রামাণিক গ্রন্থ । তিনি রুশ ভাষা থেকে বহু গল্প বাংলায় অনুবাদ করেছেন । শিশু-বিশোরদের জন্য জীবনীগ্রন্থ রচনা ছিল তার প্রিয় বিষয় ।
হায়াৎ মামুদ এর লেখনী জাজ করার ক্ষমতা বা ইচ্ছা কোনটাই আমার নাই। বাংলা সাহিত্যের একটা অমূল্য সম্পদ হইলো মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য ওরকম কঠিন কঠিন বাংলা শব্দ একদমই হজম হচ্ছিল না। একটু পর পর অভিধান উল্টিয়েও সুবিধা করতে পারছিলাম না। সেখানে এই দারুণ গদ্যরূপ মন্ত্রমুগ্ধের মত পড়েছি। আমার কাছে রাম লক্ষণকে কখনোই ভালো লাগে নাই, মেঘনাদবধ কাব্য পড়ে বরং রাবণ, ইন্দ্র আর ইন্দ্রের স্ত্রীর প্রতি আগ্রহ আরও বেড়ে গেল।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম (এবং সম্ভবত একমাত্র) সার্থক মহাকাব্য মেঘবাদবধ কাব্য। এর সাথে আমার প্রথম পরিচয় বেশিদিন আগে হয়নি। উচ্চ মাধ্যমিকের শ্রেণিপাঠ্য বাংলা সংকলন হাতে পেয়ে অভ্যাসবশত সবটা একবার পড়তে শুরু করলাম। গদ্যাংশ শেষ করে পদ্যাংশ শুরু করতে গিয়েই আটকে গেলাম "বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ" শিরোনামে মেঘনাদবধ কাব্যের একটি অংশে। যেসব শব্দের ব্যবহার করেছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত তা বোঝার সাধ্য আমার কোনোকালেই ছিল না, এখনও নেই।
আমাদের পাঠ্য হিসেবে প্রথম পদ্য হওয়ায় কয়েকদিন পরেই ক্লাসে বোঝানো হল এটা। প্রথমদিন স্যার বললেন রামায়ন আর মেঘনাদবধ কাব্যের কাহিনী। পরের দিন শব্দ ধরে ধরে বোঝালেন পাঠ্য অংশটুকু। আমি মুগ্ধ হলাম, রামায়ণের গল্পকে এতটা মানবিক ঢঙে ধর্ম আর দেবত্বের বাইরে নিয়ে এসেও দেশপ্রেমের আবরণে বলা যায়! আর যেসব দাঁতভাঙা শব্দ আমাকে আটকে দিয়েছিল, সেসব শব্দ বোঝার পর তাদের প্রয়োগেও মুগ্ধ হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না আমার। সিদ্ধান্ত নিলাম, পুরো মেঘনাদবধ কাব্যই পড়ব। যোগাড়ও করে ফেললাম।
কিন্তু মাইকেলীয় শব্দ প্রয়োগের কারণে ছোট অংশটুকুই যেখানে পড়তে পারলাম না, সেখানে এত বড় মহাকাব্য পড়ার সাধ্য কই আমার? তাই সাধ থাকলেও সাধ্যের অভাবে আমার মেঘনাদবধ কাব্য পড়া হল না। দেখতে দেখতে দিন গেল। এইচএসসি পরীক্ষা ঘনিয়ে এল। সাতদিনও নেই, এমন সময় হাতে পেলাম হায়াৎ মামুদ স্যারের দেয়া মেঘনাদবধ কাব্যের গদ্যরূপ।
পরীক্ষা তো থাকবেই, তাই বলে কী মেঘনাদবধ কাব্য পড়া হবে না? হবে। হতেই হবে। শুরু করলাম। যে শব্দগুচ্ছের জন্য পড়তে পারছিলাম না, সেই শব্দগুলোকেই মিস করছিলাম। এ যেন এক ট্রাজেডি, এইসব অপ্রচলিত শব্দ বোঝার ক্ষমতা আমার নেই, আবার তাদের ছাড়ার ইচ্ছেও নেই।
যাই হোক, কিছু পেতে গেলে কিছু দিতে হয়। আমিও দিলাম। দিয়ে পড়া শুরু করলাম। হায়াৎ মামুদ স্যার তার অসাধারণ গদ্যশৈলীতে সহজেই মধুসূদনের মূল লেখা পড়তে না পারার খারাপ লাগা কমিয়ে আনলেন। যে মুগ্ধতা নিয়ে পড়া শুরু সেই মুগ্ধতা বাড়তেই থাকল।
রামের চেয়ে রাবণ, লক্ষ্মণের চেয়ে মেঘনাদ আমার কাছে আগে থেকেই প্রিয়। এবার প্রিয়দের ঐ তালিকায় যোগ হলেন মেঘনাদপত্নী প্রমীলা। দেবী সীতা যেখানে বন্দী হয়ে দেবতাদের লীলা দেখার বসে বসে চোখের জল ফেলছিলেন, সেখানে প্রমীলা স্বামীর সাথে দেখা করতে যুদ্ধসাজে বেরিয়ে পড়লেন, অসীম তেজে গিয়ে দাঁড়ালেন রামচন্দ্রের বাহিনীর সামনে। সতী সীতার অগ্নিপরীক্ষার চেয়ে এই তেজী বীরাঙ্গনার বীরত্বের পরীক্ষা আমাকে অনেক অনেক বেশি মুগ্ধ করেছে।
বিভীষণ আমার পাঠ্য অংশটুকুর বড় চরিত্র। তাই তার প্রতি মনোযোগ ছিল আলাদা। তার ধর্মে মতি আমার কাছে বরং সুবিধাবাদ আর শঠতা বলেই মনে হয়েছে। তার স্বজাতির পক্ষত্যাগ রামচন্দ্রের প্রতি ভক্তির চেয়ে অনেক বেশি সিংহাসনের প্রতি লোভ থেকে হয়েছে বলে মনে হয়েছে আমার।
মেঘনাদবধ কাব্য— নামই বলে দেয় মেঘনাদ বধ হবেন এতে। ধীরে ধীরে সেই জ্ঞাত ট্রাজেডির দিকে এগিয়ে যায় গল্প, সাথে সাথে বিষাদে ভরে উঠতে থাকে মন। মেঘনাদের মৃত্যুর সময় তাও একটা দিক ভেবে ভাল লাগছিল, দেবতাদের সব ষড়যন্ত্রের পরও মেঘনাদ সামনে দিকে আঘাত পাননি লক্ষ্মণের কাছ থেকে। কাপুরুষ শত্রুর পেছন থেকে করা আঘাতে মারা যান বীর মেঘনাদ।
এই ধরনের মহাকাব্যের নায়ক বিবেচিত হন সাধারণত দুই বিবেচনায়— ধর্ম আর বীরত্ব। ধর্মের বিবেচনায় রামায়ণে বাল্মীকি রামকে নায়ক বানিয়ে সম্ভবত ভুল করেননি, কিন্তু দেবতারাও যেখানে রিপুগ্রস্থ, সেখানে ধর্মের চেয়ে বীরত্বকেই বড় করে দেখে মধুসূদন সম্ভবত আরো বেশি ঠিক কাজটি করেছেন।
যাই হোক, আমার মত মূর্খ পাঠকেরও উপযুক্ত করে মেঘনাদবধ কাব্যকে উপস্থাপনের জন্য হায়াৎ মামুদ স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞতা। কবিতার মাধুর্য গদ্যে আনা অসম্ভব। তারপরেও হায়াৎ মামুদ স্যার তার অসাধারণ দক্ষতায় যতটুকু এনেছেন, সেটা মুদ্ধ করার মতই। আরো বেশি মুগ্ধ হবার লোভে মধুসূদনের মূল কাব্যটাও কোনো এক সময়ে বুঝে পড়ার ইচ্ছা রাখি।
বাল্মীকি রচিত রামায়নে যেভাবে সবকিছু দেখানো হয়েছে তার অনেকটাই ভিন্নভাবে মেঘনাদবধ কাব্যে দেখিয়েছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। মূলত মেঘনাদবধ কাব্যে রাবনের দিক থেকে দৃষ্টিপাত করেছেন তিনি। আরও স্পষ্টভাবে বলতে গেলে রাবনের কনিষ্ঠপুত্র, ইন্দ্রজয়ী মেঘনাদকে কেন্দ্র করেই লেখা এই মহাকাব্য। সেই মহাকাব্যকেই সহজ ভাষায় রিটোল্ড করেছেন হায়াৎ মামুদ। মেঘনাদবধ কাব্যে নায়ক অথবা খলনায়ক সবাইকেই নিরপেক্ষভাবে তুলে এনেছেন মধুসূদন দত্ত। এটা পড়ে বন্দিনী সীতার অসহায়ত্বের কারণে পাঠকের যেমন খারাপ লাগবে ঠিক একইভাবে মন খারাপ হবে রাবন ও মেঘনাদের পরিণতি দেখে। এখানে রাবনকে রাক্ষস নয় বরং একজন রাজা, সর্বপরি বাবা হিসেবে তুলে ধরেছেন কবি। এছাড়াও দেখাতে চেয়েছেন রামের সরলতা, দেবতাদের পক্ষপাতিত্ব, লক্ষনের চতুরতা, দেবরাজ ইন্দ্রের সূক্ষ্ম রাজনীতি, ভক্ত রাবনের প্রতি শিবের কোমল দিক।
সবমিলিয়ে কালজয়ী মহাকাব্য মেঘনাদবধ কাব্যের সংক্ষেপিত সংস্করণ দারুণ উপভোগ্য। এর সকল ক্রেডিট হায়াৎ মামুদ স্যারের।
অনেক দিন আগে কলকাতার একটা সংস্করণ পড়েছিলাম, হায়াৎ মামুদেরটা বাকি ছিল। ...মেঘনাদের জন্য খারাপ লাগছিল, এভাবে কাপুরুষের মতো মেরে ফেলাটা একেবারেই মেনে নিতে পারি নাই। তখনো না, এখনো না। ছোটবেলায় অনেক ছোটখাটো ডিটেইলস লক্ষ্য করি নাই। এবার চোখে পড়লো।
'মেঘনাদবধ কাব্য' বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহাকাব্য এবং মাইকেল মধুসূদন দত্তের (১৮২৪-১৮৭৩) সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি। মূলত এটি 'রামায়ণ'-এর পৌরাণিক কাহিনী অবলম্বনে অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত। একে মীর মশাররফ হোসেন রচিত 'বিষাদ সিন্ধু' মহাকাব্যের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। 'বিষাদ সিন্ধু'-তে যেমন হাসান-হোসেনের পরিবর্তে এজিদকে নায়ক বানানো হয়েছে, ঠিক তেমনি 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এ রাম-লক্ষণকে চক্রান্তকারী এবং মেঘনাদ তথা ইন্দ্রজিৎকে বীর হিসেবে দেখানো হয়েছে। কাব্যটিকে তাই কখনোই ইতিহাস হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
'মেঘনাদবধ ���াব্য' ১৮৬১ সালে দুই খন্ডে প্রকাশিত হয়। কাব্যটি যেভাবে লেখা হয়েছে তা বর্তমান যুগের সাধারণ পাঠকদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় পাঠ���দের কথা বিবেচনা করে বেশ অনেকজন লেখক কাব্যটিকে গদ্য কাহিনীতে রূপান্তর করেছেন। আমি যে বইটি পড়েছি, সেটি হায়াৎ মামুদ কর্তৃক গদ্যে রূপান্তরিত হয়েছে। 'মেঘনাদবধ কাব্য'-কে সহজ ভাষায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে তিনি এর পূর্বকাহিনী যোগ করেছেন, যা মূল কাব্যটিতে অনুপস্থিত। কিন্তু এই পূর্বকাহিনী জানা ছাড়া কাব্যটি গোলমেলে লাগবে। এছাড়াও বইটির শেষে বইটির অপ্রচলিত ও কঠিন শব্দের অর্থ ও টীকা এবং নানা নামে পরিচিত একই চরিত্রদের তালিকা যুক্ত করা হয়েছে, যা পাঠকের খুব কাজে লাগবে।
মধুদা! শুধুই মধুদা! ছলনা দিয়ে শুরু আর শেষ করে মধুদা রামকে ভীরু আর দুর্বল রূপে এঁকেছে। এতদিনের রাম রাবণে থিতু হয়ে খুব একটা খারাপ লাগেনি এই নতুনত্ব। তবে ঘোর ধর্মিয় দৃষ্টিকোণে অনেকেরই পছন্দ হবে না এটা। সে যাইহোক, ভিন্ন ভাবে আরেকবার এই দুইচরিত্রকে পড়তে ভালো লেগেছে। সর্বপরি হায়াৎ মামুদের শ্রম সার্থক হয়েছে আমার দিক থেকে। আমি পদ্য আর রূপান্তর গদ্য উভয় ই পড়েছি।
মেঘনাদবধ কাব্য' আমার প্রিয় একটা জিনিস। ষড়যন্ত্র, কূটকৌশল অবলম্বন করে মানুষকে ধ্বংস কিংবা পরম বন্ধুর ও বিশ্বাসঘাতকতা এতে দেখা যায়। আবার স্ত্রীর কাছে সব পুরুষ কতটা ধরাশায়ী তাও এতে পরিলক্ষিত।
রাম-রাবণের যুদ্ধকে বিশ্বসাহিত্যে এত সুন্দর করে কেউ তুলে ধরতে পারবে না যেমন করে, মাইকেল মধুসূদন দত্ত তুলে ধরেছেন। দশানন রাবণ যে কতটা ব্যথিত ছিল তা শুধু যেন লেখকেই স্পর্শ করেছে। তিনি তাই সমগ্র জাতিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, কেমন ছিল সেই যুদ্ধ? কে কতটা মহান ছিল।
মেঘনাদ আমার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র। তার মুখনিঃসৃত কথা গুলো যখন পড়তেছিলাম, নিজের মাঝে ঝড় অনুভব করেছি। এতটা আস্পর্ধা আর সাহসী বীরকে ছলনা দিয়ে মারার জন্য সত্যই ধিক্কার দিচ্ছি লক্ষ্মণকে। লক্ষ্মণ যখন পিতৃহারা রাবণের হাতে মারা যায়, আমি খুব খুশী হয়েছিলাম। যখন, দেবতারা তাকে আবার জীবিত করে তাকে, বুকের ভেতরটা যেন কেউ দুমড়ে মুছড়ে ফেলে।
বিভীষণ যখন মেঘনাদের মৃত্যুর পর কান্না করে তখন আমি তার বিশ্বরূপ দেখেছি ভালবাসার।।না হলে তার মত নীচ ব্যক্তিকে কিছুই বলার নেই। আর প্রমীলা যাকে সৌন্দর্যের গড়া দিয়ে তৈরী করেছে সে যখন সহমরণে যায়, আমার পৃথিবীটা কেউ যেন কেড়ে নিয়েছিল। নিজেকে ধিক্কার দিতে শুরু করলাম, আমি কেন ছিলাম না সে যুদ্ধে।
আবেগ নয়, সকল ষড়যন্ত্র শুধু কি মহাবীরের জন্য ছিল? দেবরা সবাই কেন তাদের হাত গুটিয়ে নিল? সে বীরের নাম ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদ সে অস্ত্র তুলতে পারবে না, কিসের তাহলে যুদ্ধ ?
পৃথিবীটা যে ধোঁকার মায়াজাল আর মানুষের মত দেবরাও যে ছলনা দিয়ে গড়া লেখক তা তুলে ধরেছেন।
বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ মেঘনাদবধ কাব্য। স্বামী বিবেকানন্দ মেঘনাদবধ কাব্যকে 'বাংলা ভাষার মুকুটমণি' বলেছিলেন। কলেজে থাকতে 'বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ' পড়তে গিয়ে বুঝেছিলাম আসল মেঘনাদবধ কাব্য পড়ার সাধ্যি আমার নেই। আর কবিতাটার মানে আত্মস্থ করতে পারার পর বুঝেছিলাম মেঘনাদবধ কাব্য না পড়তে পারলে বাঙালী হয়ে জন্মানো এক অর্থে বৃথা। তাই হায়াৎ মাহমুদের এই গদ্য কাহিনী-রূপান্তর কেনা একটা মধ্যস্থা ভেবে। তাও পড়ি পড়ি করে পড়া হচ্ছিল না। 'আদিপুরুষ' ভাল কিছু না করলেও রামায়ণের ইস্যুটাকে লাইম লাইটে আনলে ভাবলাম যাই মাইকেল মধুসূদনের মহান কীর্তির একটু স্বাদ নেয়া যাক। অন্তত দু্ধের সাধ ঘোলে মিটানো চেষ্টা চালানো যাক। মেঘনাদবধ এমন এক সোর্স ম্যাটেরিয়াল যার কোন এডাপশনই খারাপ হওয়ার সুযোগ নেই। এর আলোচনা নিয়ে একটা প্রবন্ধ পড়েছিলাম। সেটাকেও একটা সাহিত্যিক সম্পদের দর্জা দেয়া যেতে পারে। হায়াৎ মাহমুদের কাজও অনেক ভাল হয়েছে। পড়ার সময়ে চোখের সামনে দৃশ্যগুলো অত্যন্ত সুন্দরভাবে ভিজুয়ালাইজ করা যাচ্ছিল। এটা থেকে স্টোরিবোর্ডিং কাজ করা যেতে পারে অনেক সুন্দর ভাবে।
রামায়ণ পড়া নেই, মাইকেলের মেঘনাদবধ কাব্যও নয়। কিন্তু বইটা পড়বার পর দুটোই পড়ার তুমুল আগ্রহ হচ্ছে। এ থেকেই আন্দাজ করা যায় লেখক কী ভীষণভাবে সফল। যেহেতু মূল দুটো পড়া নেই তাই কোন বিশ্লেষণও করা যাচ্ছে না, তবে রাম-রাবণের কাহিনীর স্বাদ যে পেয়েছি তা বলাই বাহুল্য। এমনকি ভাষায় দিকটাতেও হায়াৎ মামুদ মধুসূদনের ব্যবহৃত ভাষাটাকেই তুলে আনতে চেয়েছেন বলে মনে হল, আর সেটাই আমার অসাধারণ লেগেছে।