সত্যজিৎ রায় লিখেছেন, ‘…কামুর বিচিত্র কীর্তিকলাপের কথা লিখতে গেলে একটা পুরো বই হয়ে যায়’। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তেমন কোনো বই এর আগে কেউ লেখেননি। কাজেই এটাই কামাখ্যা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় ওরফে কামুকে নিয়ে লেখা প্রথম বই।
কামুর জীবন নির্ভর এই উপন্যাসের প্রতিটি পর্বে রয়েছে তাঁর বিচিত্র কীর্তিকলাপ, হিউমার, স্যাটায়ার এবং পানিং-এর গল্প। যা তাঁর জীবন এবং অভিনয় দক্ষতার দলিলসম। এই লেখা পড়তে পড়তে পাঠক বুঝতে পারবেন অল্প কিছু সিনেমার পার্শ্ব-চরিত্রে অভিনয় করেও কেন কামু আপামোর বাঙালি মনে পাকাপাকি জায়গা করে নিয়েছেন। মানুষ কামু মুখার্জিকে এই বই সকল পাঠকের হৃদয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে দেবে।
ম্যাজিক হলেও সত্যি: কামু মুখোপাধ্যায়ের বর্ণময় আখ্যান লেখক: দীপারুণ ভট্টাচার্য | প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৪ | ২০০ পৃষ্ঠা
সত্যজিৎ রায় নিজে লিখে গিয়েছিলেন যে কামুর কীর্তিকলাপ নিয়ে লিখতে গেলে পুরো একটা বই হয়ে যায়। অথচ এত বছরেও সেই বইটা কেউ লেখেননি। দীপারুণ ভট্টাচার্য সেই শূন্যস্থানটা ভরাট করলেন।
কামাখ্যাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, যাঁকে সবাই চেনেন 'কামু' নামে, তিনি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক অদ্ভুত চরিত্র। সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে যিনি আপামর বাঙালির মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। 'নায়ক'-এ প্রীতিশ সরকার, 'সোনার কেল্লা'-তে মন্দার বোস, 'হীরক রাজার দেশে'-তে সেই দারোয়ান, যে পরোয়ানা দেখতে চায়। অল্প কয়েক মিনিটের স্ক্রিন টাইম, কিন্তু দর্শক মনে রাখে যুগের পর যুগ।
এই বই সেই মানুষটার গল্প বলে। তাঁর হিউমার, স্যাটায়ার, অদম্য সাহস আর অবিচার সহ্য করে টিকে থাকার আখ্যান।
বইটির মূল শক্তি হলো এর প্রতিপাদ্য। এটা শুধু একটা জীবনী নয়, এটা একটা প্রশ্ন। প্রতিভা থাকলেই কি স্বীকৃতি মেলে? যে মানুষটা সারাজীবন অন্যকে হাসিয়েছেন, তাঁর নিজের জীবনে কতটুকু আলো ছিল?
সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুর পর কামু মুখোপাধ্যায় আর তেমন সুযোগ পাননি। বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ তখনই হারিয়ে ফেলল এই প্রতিভাবান অভিনেতাকে, যিনি বারবার দুঃখবোধ করেছেন স্বচ্ছন্দে জায়গা না পাওয়ার জন্য।
এই বেদনার আখ্যানটাই বইটির কেন্দ্রে। লেখক হিউমার এবং ট্র্যাজেডিকে পাশাপাশি রেখেছেন, যেটা পড়তে পড়তে একটা অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করে। হাসির মধ্যে হঠাৎ বুকটা ভারী হয়ে যায়।
দীপারুণ ভট্টাচার্য পর্বে পর্বে গল্পটা সাজিয়েছেন। প্রতিটি পর্বে কামুর একটা বিচিত্র ঘটনা বা কীর্তি। এই পদ্ধতিটা কার্যকর, কারণ বইটা কখনোই একরৈখিক জীবনীর ভার বহন করে না।
কামু একদিন হুট করে মাণিকদার বৈঠকখানায় গিয়ে বলে বসেছিলেন, 'আমি আপনার ছবিতে অভিনয় করতে চাই।' এই ধরনের সাহসী, অবিশ্বাস্য মুহূর্তগুলোকে লেখক যেভাবে পরিবেশন করেছেন, সেখানে একটা উষ্ণতা আছে। রচনাশৈলীতে কামুর নিজস্ব pun আর humor-এর আভাস লেখক বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন, যেটা বইটির একটা আলাদা মাত্রা দেয়।
তবে বইটি মাত্র ২০০ পৃষ্ঠার। এটা একদিক থেকে বইয়ের শক্তি, অন্যদিক থেকে একটা সীমাবদ্ধতাও। পাঠক স্বাভাবিকভাবেই আরও বেশি চাইবেন। কামুর জীবনের কিছু পর্ব হয়তো গভীরতার সাথে খোঁজা যেত।
কামু নিজেই বইটির সবচেয়ে জীবন্ত চরিত্র। লেখককে আলাদা করে চরিত্র নির্মাণ করতে হয়নি, কারণ ইতিহাস ইতিমধ্যে কাজটা করে রেখেছে। চারুলতায় কম স্ক্রিন প্রেজেন্স নিয়ে দুঃখ করলে সত্যজিৎ রায় তাঁকে বুঝিয়েছিলেন যে কম সময়ে মুন্সিয়ানা দেখানোই আসল কথা। এই ছোট ছোট ঘটনাগুলোতেই কামুর মানসিক জটিলতা, তাঁর অভিমান এবং তাঁর স্বপ্নের আভাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বইটা পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়: এই মানুষটার প্রতি বাংলা সিনেমা ন্যায়বিচার করেনি। সেই অনুভূতিটা পাঠকের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী হয়, যেটাই একটা ভালো বইয়ের আসল লক্ষণ।
এটা একটা জরুরি বই। বাংলা সিনেমার ইতিহাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এতদিন অলিখিত ছিল। দীপারুণ ভট্টাচার্য সেই কাজটা করলেন। কামুভক্ত বাঙালির কাছে এই বই নিঃসন্দেহে হৃদয়ের কাছের হবে।
তবে যাঁরা গভীর গবেষণানির্ভর জীবনী খুঁজছেন, তাঁরা হয়তো একটু অপ্রাপ্তিবোধ করবেন। বইটা narrative জীবনীর পথে হাঁটে, একাডেমিক বিশ্লেষণে নয়। সেটা দোষ না, শুধু প্রত্যাশা সেভাবেই রাখা দরকার।
কামু মুখোপাধ্যায়ের জীবন সত্যিই জাদুর মতো। সেই জাদু এই বইতে ধরা পড়েছে, কিছুটা হলেও।
কামুর মতো একজন মানুষের জীবন এমন দু:খের কেন? মানুষ কেন তার প্রতিভার যথাযথ দাম পায় না ? কেউ কেউ এত দুর্ভাগ্য নিয়ে কেন আসে পৃথিবীতে? অথচ অন্য মানুষকে সবসময় হাসিঠাট্টায় ডুবিয়ে রাখে? অদ্ভুত অবিচার।