ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিনের আমলে কারাগারে বন্দি ছিলেন বিএনপির সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তখন নিজের রোজনামচায় তিনি লিখেছিলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি আর কখনোই সুস্থ ধারায় ফিরবে না। এটি নষ্ট থেকে আরও নষ্টতর হতে থাকবে৷ তার সেই ভবিষ্যদ্বাণী কীভাবে নির্মম সত্যে পরিণত হয়েছে তার প্রমাণ ২০১৪ ও ২০১৯ সালের নির্বাচনে দেশবাসী দেখেছে৷ আওয়ামী লীগ কীভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে গিয়ে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীন সত্তা যেটুকু বজায় ছিল তা-ও নিঃশেষ করে দিয়েছে তা বিস্তারিত লিখেছেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। একইসঙ্গে ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন ঠেকাতে জামায়াতের খপ্পরে পড়ে দল হিসেবে বিএনপি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেই ব্যাখা-বিশ্লেষণও ব্যারিস্টার মওদুদ করেছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের শোচনীয় পতনের পর দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে। কেউ-বা গায়েবি মামলার শিকার। এসব সত্য। কিন্তু তারচেয়ে বড়ো সত্য এই প্রতিহিংসার রাজনীতিকে ২০১৪, ২০১৯ ও ২০২৪ - টানা তিনটি একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দলটি। ব্যারিস্টার মওদুদ শেখ হাসিনার পতন দেখে যেতে পারেননি। এর আগেই মারা গেছেন। তিনি তার বইতে মূলত, ২০০৮ সালের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে কীভাবে আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগকে বিরোধীদল দমনে ব্যবহার করেছে তা নিয়ে লিখেছেন। মনোযোগ দিয়ে পড়লে পাঠক বুঝতে পারবেন ৫ আগস্টের কলঙ্কজনক পতনের পথ কীভাবে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ নিজেরাই তৈরি করেছিল।
মওদুদ আহমদের এই বই ইতিহাসের একটি সময়ের দলিল। যে সময়কে এক ধরনের তমসাচ্ছন্ন যুগ বলা যেতে পারে। একইসঙ্গে এ-ও সত্য ওই যুগের পর যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম তা অধরা রয়ে গেছে। প্রতিহিংসার রাজনীতি পৌঁছে গেছে হিমালয়সম উচ্চতায়। মওদুদ আহমদ বেঁচে থাকলে এই সময়কে কোনভাবে দেখতেন তা জানার খুব হচ্ছে।
রাজনীতিবিদ মওদুদ আহমদের সঙ্গে লেখক মওদুদ আহমদের ফারাক আসমান-জমিন। তিনি যথেষ্ট নিরপেক্ষতা রাখার চেষ্টা করেছেন। নিজ দল বিএনপির আন্দোলনের ভুল কৌশল, বেগম জিয়ার আমলানির্ভর হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভুল প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে 'জ্বালাও-পোড়াও' নিয়ে নিজের অসন্তোষ গোপন রাখেননি।
তবে হ্যাঁ, দিনশেষে তিনি বিএনপির মানুষ। শতভাগ নিরপেক্ষতা আশা করা যাবে না। ঝরঝরে না হলেও সুন্দর গদ্যে লেখা। এটি একবসায় পড়ার মতো বই না। তাই সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে পড়েছি।
বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আগ্রহী যে কোনো পাঠকের জন্য বইটা একটি চমৎকার উপহার হতে পারে।