Jump to ratings and reviews
Rate this book

দেহেলিজ-এ-দোজখ

Rate this book
*দেহেলিজ-এ-দোজখ*
মহাভারতের আদিপর্বে কৃষ্ণ এবং অর্জুনের দ্বারা ঘটেছিল এক বীভৎস হত্যালীলা; মানুষ তো দূর, না-মানুষেরাও ছাড় পায়নি নর-নারায়ণের অবতারের হাতে। সেই ঘটনার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে যুগে-যুগে, ইতিহাসের প্রতি কালখণ্ডে। মহাভারত থেকে দ্বিখণ্ডিত ভারত, পুরাণ থেকে ইতিহাস অব্দি ব্যাপ্ত এই উপন্যাস আদতে এক বাঁচার গল্প, নিজের হারানো জমি ছিনিয়ে নেওয়ার গল্প; এই গল্প জন্মেজয়ের, এই কিস্যা জাহাঙ্গীরের, এই কাহিনি আস্তিকের, এই দাস্তান বাহাদুর শাহের; সর্বোপরি এ হল দিল-এ-হিন্দোস্তাঁ দিল্লির কথা।

Hardcover

First published December 25, 2023

1 person want to read

About the author

Pradipta Roy Chowdhury Sen

7 books8 followers

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
1 (100%)
4 stars
0 (0%)
3 stars
0 (0%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 of 1 review
Profile Image for Preetam Chatterjee.
7,287 reviews395 followers
June 29, 2025
আলোচনার নান্দীমুখ : দেহেলিজ এ দোজখ: ইতিহাসে উঁকি, পুরাণের কোলে মাথা, সাহিত্যে আগুন

প্রদীপ্তা রায় চৌধুরী সেনের দেহেলিজ এ দোজখ নিছক কোনও উপন্যাস নয়—এ এক ভাষার অগ্নিকুণ্ড, যেখানে পাণ্ডবের খাণ্ডবদাহন আর বাহাদুর শাহ জাফরের নির্বাসনের কান্না একযোগে ধ্বনিত হয়। এটি এক অভূতপূর্ব শব্দমেঘের প্রতিধ্বনি, যেখানে ইতিহাস ও পুরাণ পরস্পরকে ঢেকে রেখে, উন্মোচন করে দেয় সাহিত্যের সেই অনির্বচনীয় গহ্বর—যেখানে রক্ত আর শ্লোক সমান্তরালে প্রবহমান।

এই গ্রন্থ যেন এক সুনিপুণ ফ্রিকোয়েন্সি মড্যুলেশন—প্রযুক্তির ভাষায় বললে, যেখানে ‘কেরিয়ার ওয়েভ’ হল পুরাণ—প্রাচীন, গভীর, অবিনশ্বর—আর তার বুকে জোড়া লেগে থাকা ‘সিগন্যাল ওয়েভ’ হল ইতিহাস—শক্তিশালী, নির্দয়, নিরন্তর পরিবর্তনশীল। একটি ছাতিম, অন্যটি তার গায়ে বেড়ে ওঠা সবুজলতার মতন। একটি হল গর্ভবতী মেঘ, অন্যটি তার অন্তর্নিহিত অশনি। আর দুটির মিলনে যে অনুরণন সৃষ্টি হয়, তা-ই দেহেলিজ এ দোজখ।

এই গ্রন্থের পরতে পরতে ইতিহাসের হিরণ্যগর্ভ থেকে তুলে আনা হয়েছে যেসব কথা, সেগুলি নিছক কালানুক্রমিক নথিপত্র নয়—বরং এক জাতির ক্ষতচিহ্ন, এক সভ্যতার আত্মার আত্মকথা। এখানে ইতিহাস হঠাৎ-ই সরে গিয়ে পুরাণের লজিকাল রি-ইম্যাজিনিং হয়ে দাঁড়ায়, আর পুরাণ আবার ঢুকে পড়ে ইতিহাসের প্রেক্ষিতে, যেন জন্ম নেয় হাইব্রিড একটি বয়ান, যাকে একবাক্যে বলা যায়: mythistoric fiction।

প্রদীপ্তার নির্মাণে দিল্লি কেবল শহর নয়—সে নিজে একটি বহুরূপী চরিত্র। কখনও সে ফিসফিসিয়ে বলে, “আসিতেছে সন্ধ্যা, ইতিহাসের খুন খেলা শুরু হইবে,” আবার কখনও শোনায় মুঘল দরবারের কূটচালের রব—কিংবা চন্দ্রবংশীয় পুরুষদের পা-ফেলা ধ্বনি। শহরের বুকে বয়ে চলে নাগদের বিষ, পাণ্ডবদের অভিশাপ, আমির খসরুর দস্তান, আর পঙ্কজা প্যাটেলের ঠোঁটের দাগ—সবকিছু মিলিয়ে এই উপন্যাস হয়ে ওঠে এক অগ্নিগর্ভ দস্তাবেজ।

এখানে পুরাণ আর ইতিহাস যেন দুই সাপ, যাদের প্যাঁচে বাঁধা পাঠক নিজেই এক বিষাদগাঁথার নায়ক হয়ে ওঠে। কোথাও এক সন্ন্যাসীর চোখে তেজ, কোথাও এক বাদশার ঠোঁটে মদ। সময় এখানে রেখা নয়—sarpa-rashi, এক সর্পিল কাহিনিসূত্র।

এই বইয়ে রক্তের প্রতিটি ফোঁটা সাহিত্যের অক্ষর হয়ে ওঠে। ‘দেহেলিজ’ শুধুই এক সীমানা নয়—এ এক অন্তর্জগত, এক দোজখ, যেখানে পাঠককে নামতে হয় নিজের সম্বল ফেলে। যেমন Milan Kundera বলেছিলেন, “The struggle of man against power is the struggle of memory against forgetting”—এই উপন্যাসও সেই স্মৃতির প্রতিরোধ।

এখানে শাসকের চোখ দিয়ে ইতিহাস লেখা হয় না, লেখা হয় তাদের মুখোশ খসে পড়ার মুহূর্তে। লেখিকার কলম এখানে এক আয়না, যেখানে পাঠক নিজেরই দৃষ্টিকোণ প্রশ্নের মুখে পড়ে।

১) জিহ্বার দুই তটে দুটি সময়: ভাষার মাল্খোষ ও সাংস্কৃতিক সুরলহরী:--

“আওলিয়া সাহাব... সচমুচ খুদার প্যায়ারা...”—এই বাক্যটি নিছক কোনও সংলাপ নয়, বরং এক সমুদ্রস্পর্শী ভাষার ঢেউ, যার প্রতিটি অক্ষরে উছলে ওঠে ইতিহাস, সভ্যতা ও ব্যঞ্জনার অনুনাদ। প্রদীপ্তা রায় চৌধুরী সেনের কলমে এই ভাষা যেন ঘনরসময় এক বর্ণপরশ, যেখানে মুঘলাই উর্দুর তাহযিব, চলিত বাংলার হৃদয়বিস্তার, আর তৎসমের ধ্রুপদী মাধুর্য মিলেমিশে একত্রে গড়ে তোলে এক "সাংস্কৃতিক মাল্খোষ"। এই ভাষা অনুশাসনের দাস নয়, এ এক প্রবাহ—গঙ্গা-যমুনার যুগ্ম জলধারা, যেখানে পদ্মনদীর কূলছাড়া কাকলি ও যমুনার ধ্রুপদী দীপ্তি এক মোহে মিশে যায়।

এই বহুধা-উৎসারিত ভাষার সুর শুনলে মন ফিরে যায় ফিরাক গোরখপুরীর সেই গভীর আক্ষেপে:

"हज़ारों ख्वाहिशें ऐसी कि हर ख्वाहिश पे दम निकले..." (হাজার স্বপ্ন, প্রতিটিই আত্মঘাতী )

বা মোমিন খাঁ মোমিন-এর নিঃশব্দ প্রেমস্বীকৃতিতে: "तुम मेरे पास होते हो गोया / जब कोई दूसरा नहीं होता" (তুমি থাকো আমার এতটাই নিকটে, যেন দুনিয়ায় আর কেউ নেই)

এ ভাষা প্রেমিকের ভাষা, আরোপহীন, অহমবিহীন—যার শিকড় মাটির ভেতর, আর ছায়া ইমারতের গম্বুজে।

প্রদীপ্তার উপন্যাসে ব্যবহৃত এই ভাষা কোথাও এক গভীর ব্যাকরণ-উপেক্ষা করে গীতিকবিতার ভঙ্গিতে চলে যায়, আবার কোথাও সোজাসাপ্টা সংবাদপত্রের হেডলাইনের মতো নির্মম। এই দ্বৈততা, এই ছায়া-আলো, তৈরি করে এক জটিল অথচ সম্মোহিত পাঠ-ভাষ্য, যা একাধারে রাজনীতি ও প্রার্থনার, বিদ্রোহ ও বিনয়ীর, দোস্তি ও দাওয়াতের।

গালিব যেমন একবার লিখেছিলেন: "हम वहाँ हैं जहाँ से हम को भी / कुछ हमारी ख़बर नहीं आती" ("আমরা এমন এক জায়গায় আছি, যেখান থেকে নিজের খবরও আর আমাদের কাছে আসে না।")

কবি এখানে গভীর আবেগগত বা অস্তিত্বগত বিচ্ছিন্নতার এক অবস্থা প্রকাশ করেছেন — এমন এক দূরত্বে, এমন এক হারিয়ে যাওয়ার মধ্যে তিনি অবস্থান করছেন (শারীরিক, মানসিক বা আত্মিক), যেখানে নিজের সঙ্গেও আর যোগাযোগ রাখা সম্ভব নয়। নিজস্ব সত্তা বা অন্তর্জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার এই বোধে ফুটে ওঠে এক নিঃসঙ্গতা, আত্মসমালোচনামূলক উপলব্ধি ও বিচ্ছিন্নতার গভীরতা।

সেরকমই প্রদীপ্তার ভাষা পাঠককে জিজ্ঞাসা করে না সে কোথা থেকে এসেছে, বরং টেনে নেয়—এক অলীক, অথচ সুস্পষ্ট বাস্তবের দিকে।

এই রকম সংকর ভাষা পড়তে পড়তে মনে পড়ে যায় রবি বাবুর নিজের কথাও: “ভাষার ভিতর দিয়েই আমরা বিশ্বকে চিনতে চাই।”

এই উপন্যাসের ভাষা সেই বিশ্ব, সেই ধ্বনি—যেখানে দিল্লি কেবল এক ভূখণ্ড নয়, বরং একটি দীর্ঘ, বহুস্তরবিশিষ্ট ন্যারেটিভের দরজা, যার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস ও পুরাণ, ধর্ম ও রাজনীতি, প্রেম ও প্রতারণা।

সালমান রুশদি যেমন বলেছিলেন: “To understand just one life, you have to swallow the world.”

প্রদীপ্তার এই ভাষা—এই চিহ্নহীন ব্যাকরণের নদী—সে ঠিক সেই কাজটাই করে। সে পাঠককে কেবল শব্দ দেয় না, দেয় অভিজ্ঞতা। এক অদ্ভুত স্নায়বিক, দেহজ, স্মৃতিনির্ভর ভাষা, যা পাঠককে শুধু পাঠ করায় না, বরং ডুবে যেতে বলে। সেই ভাষা শুধু বোঝার জন্য নয়—ভালবাসার জন্য, রক্ত-মাংসে ধারণ করার জন্য।

২) ছায়াপথ এবং আধ্যাত্মিক তন্ত্র: মহাভারতের পুনঃজন্ম:--

উত্তর মহাভারতের খাণ্ডবদাহন—যে অধ্যায়কে সাধারণ পাঠে এক প্রাক্-ধর্মরাজ্য বিস্তার বলেই ধরা হয়—প্রদীপ্তা রায় চৌধুরী সেন সেই আগুনের ভিতর খুঁজে পান এক অন্যতর জাহান্নাম। সেখানে আগুন কেবল বন জ্বালিয়ে দেয় না, জ্বালিয়ে দেয় জাতিস্মর রক্তের বহমান ইতিহাস। এই অগ্নিতে জ্বলে ওঠে নাগদের বসতি, কুরুদের আদর্শ, এবং এক অদৃশ্য কিন্তু নিরবিচারে প্রবাহিত অভিশাপ—যা দেহেলিজ-এ-দোজখ-এর পত্রপুটে ঢুকে পড়ে মুঘল আমলের সিয়াসতেও, বংশের রক্তে, এবং রাষ্ট্রের কুসংস্কারে।

এই ইতিহাস কেবলই গতকাল নয়, সে এখনো প্রবাহিত—রক্তের শিরায়, দোস্তি ও দুশমনের মাঝখানে। এ এক অতীত-প্রবাহ, যা রেশমের মতো নয়, বরং ক্ষতচিহ্নের মতো বর্তমানকে রঙ করে।

এই দ্বৈরথের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়ানো দুই চরিত্র—ঋষি উতঙ্ক ও রাজা জন্মেজয়—তাঁরা যেন ইতিহাসের দু'টি ছায়াপথ, অথবা এক যুগ-সংক্রমণের দুটি বিপরীত মেরু। উতঙ্ক সেই অভিশপ্ত সন্ন্যাসী, যাঁর চোখে ঘুরে বেড়ায় প্রতিহিংসার চূর্ণ নক্ষত্র; আর জন্মেজয়, সেই রাজা যিনি একই সঙ্গে উত্তরাধিকার এবং অপরাধবোধের ভার বয়ে চলেছেন, ধ্বংস আর দায়ের ভেতর দিয়ে।

যখন উতঙ্ক মুখোমুখি হন জন্মেজয়ের, প্রদীপ্তা আমাদের শুনিয়ে দেন এক মহার্ঘ মুহূর্ত। মনে পড়ে যায় জীবনানন্দ দাশের পঙ্‌ক্তি:

"মানুষ মেরেছি আমি—
তার রক্তে আমার শরীর ভরে গেছে—
পৃথিবীর পথে এই নিহত ভ্রাতার ভাই আমি..."


এই কবিতার মতোই, উপন্যাসের এই মুহূর্তও এক ছায়াচ্ছন্ন নীরবতা ছড়ায়। অন্ধকার ক্রমশ মানুষের চারপাশে ঘনিয়ে আসে। যেন রাতের বুকে বসে থাকা এক তন্ত্রসিদ্ধ পৃথিবী—যেখানে আলো নেই, কেবল জিজ্ঞাসা আছে।
এই আলোহীনতা শুধুই হাহাকার নয়, বরং সেই আধ্যাত্মিক ঘূর্ণিপাকে তৈরি হওয়া ঋষি–নায়ক–রাষ্ট্র এর ত্রিধারার সংঘাত, যেখানে প্রতিটি চরিত্রই নিজের ভিতরে বহন করছে নিজের পুরাকাল—এক অভিশপ্ত পুনর্জন্ম, যার উপশম শুধু অগ্নির ভিতরে নিজেকে জ্বালানোতেই।

এই অন্ধকারে গালিব যেমন বলে উঠতে পারেন—

"बस कि दुश्वार है हर काम का आसां होना, / आदमी को भी मयस्सर नहीं इंसां होना..." (সহজ নয় কিছুই—মানুষের পক্ষেও মানুষ হয়ে ওঠা দুরূহ)

এবং ঠিক সেখানেই, প্রদীপ্তার চরিত্ররা হয়ে ওঠে flesh-and-blood myth—পৌরাণিক নয়, পুরাণ-উত্তর—যেখানে প্রত্যেকেই কিছুটা সত্য, কিছুটা রক্ত, কিছুটা দংশন এবং কিছুটা ক্ষমার আর্জি।

এইভাবে দেহেলিজ-এ-দোজখ হয়ে ওঠে এক আধিভৌতিক পুনর্জন্মের নথি—যেখানে অন্ধকার কেবল শেষ নয়, বরং শুরু।

৩) নারী চরিত্র: ইতিহাস ও পুরাণের মিথ:--

দেহেলিজ-এ-দোজখ–এর নারীচরিত্রেরা শুধুই কোনো বিশেষ বর্ণনার অনুষঙ্গ নয়—তারা হয়ে উঠেছে সেই শাশ্বত নারীর প্রতিচ্ছবি, যাঁরা ইতিহাসের গোপন খাতায় এবং পুরাণের অলিখিত সংলাপে রয়ে যান—চুপ, ক্লান্ত, অথচ দ্যুতিময়। পদ্মাবতী, মনসা, দ্যুতি—এঁরা কেউ সোজাসাপটা নায়িকা নন; বরং প্রতিটি স্তরে তাঁরা প্রতিফলিত করেছেন সেই আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব, যার জন্ম ইতিহাসের পাঁজরে, আর যবনিকার পরে তার শেষ সুর বেজে ওঠে পুরাণে।

এই চরিত্রগুলির মধ্যে অদ্ভুত একটা ত্রিমাত্রিকতা আছে—তারা ‘চরিত্র’ হয়েও শুধুই চরিত্র নয়। এরা শরীর, ছায়া ও আত্মার একত্র যাত্রা—যেমন অরুনা, দোর্সিলা কিংবা কুরিয়োল্যানাসের ভোলুমনিয়া; অথবা টনি মরিসনের Beloved-এর সেই বদ্ধ আত্মা, যাকে লজ্জা আর প্রেম সমানভাবে তাড়া করে।

পদ্মাবতী যেন এক অভিশপ্ত সৌন্দর্য, যিনি প্রেমে পোড়েন, ইতিহাসে পুড়ে যান। তাঁর দেহের ভিতর আগুন জ্বলে ওঠে শুধু একজন রতনসিংহের জন্য নয়, বরং সম্মানের এক অন্তহীন প্রতিশ্রুতি রক্ষায়। মনসা, উল্টোদিকে, সেই দেবী, যাঁর ন্যায়চেতনা চিরকাল পুরুষতন্ত্রের ভ্রুকুটি ভেদ করে উঠে আসে—তাঁর কাহিনী ব্রহ্মাণ্ডের আদিতে গেঁথে থাকা নারীর লাঞ্ছনা ও প্রতিশোধের অনন্তসূত্র। দ্যুতি যেন সেই আলো, যা সব জানালায় আসে না, কিন্তু একবার এলে পাঠকের হৃদয় ঘিরে রাখে দীপ্ত অথচ মৃদু কম্পনে।

এই স্তরিত নারীবন্ধনকে নিয়ে চিন্তা করতে করতে মাথায় আসে 'Monsters of Verity duology' নামক বইয়ের লেখিকা Victoria Schwab-এর, "existential crisis" বা অস্তিত্বগত সংকট সংক্রান্ত সেই বিখ্যাত উক্তি:

“I don’t know who I am, and who I’m not, I don’t know who I’m supposed to be, and I miss who I was; I miss it every day, but there’s no place for that August anymore. No place for the version of me who wanted to go to school, and have a life, and feel human, because this world doesn’t need that August. It needs someone else.”

এই উক্তি আকাঙ্ক্ষার নয়, বরং অবচেতন জগতে থেমে থাকা সমগ্র মৃত্যুচেতনারও উপাখ্যান। এখানে নারী শরীর নয়, শরীরের ঐতিহাসিক বোঝা।

ঠিক তখনই ফিরাক গোরখপুরী এসে পড়েন কাঁধে কাঁধ রেখে:

"कुछ तो मजबूरियाँ थीं, कुछ तो नज़ाकतें थीं..." (“কিছু বাধ্যবাধকতা ছিল, কিছু আদবের কোমলতা ছিল…”)

এই নরম রেখায় দেখা যায় ইতিহাসের অভিজ্ঞান। কারণ নারীচরিত্রেরা এই উপন্যাসে মুক্তির প্রতীক হয়ে ওঠেন না, তাঁরা বহন করেন পাপের, পুরুষের, রাষ্ট্রের এবং ধর্মের ছায়া—যা তাঁদের কোনওভাবেই পুরোপুরি মুক্তি দেয় না। তাঁরা যেন সেই ‘মহাকাব্যের প্রান্তিক পঙ্‌ক্তি’, যেখানে দোষ ও গৌরব পাশাপাশি বসে থাকে, নিঃশব্দে।

পুরাণের ভেতরে থেকেও, এই উপন্যাসে নারী কেউ দমে যান না। বরং তাঁরা সেই ছায়াপথের অনুপ্রবেশকারী—যাঁরা পুরুষ-কেন্দ্রিক ইতিহাসে থেকে যান অসমাপ্ত কবিতার মতো। কেবল শব্দ হয়ে নয়, তাঁরা হয়ে ওঠেন তন্ত্র—ঐন্দ্রজালিক, রহস্যময়, এবং প্রতিশোধস্পৃহা।

বলে রাখা দরকার—প্রদীপ্তার কলমে নারী কখনও victim নন, তাঁরা প্রত্যেকে agent of history—নিজের অংশীদার, নিজের শরীর, নিজের বিদ্রোহের। এবং সেই বিদ্রোহ, কোনওদিন ব্যানার ধরে হাঁটে না, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি শোনা যায়, ইন্দ্রপ্রস্থ থেকে ইন্ডিয়া গেট পর্যন্ত।

৪) বিশ্বসাহিত্যের রূপ–সন্ধান ও ইতিহাস–মিথ–অস্তিত্বের সংমিশ্র রূপকল্প:--

দেহেলিজ-এ-দোজখ শুধুই একটি উপন্যাস নয়; এটি সেই পাঠ, যেখানে বিশ্বসাহিত্য হাত ধরে এগোয় পুরাণের প্রেতছায়া আর ইতিহাসের রক্তচিহ্নিত অলিন্দে।

এখানে চরিত্রেরা কখনও যেন এলিয়ট-এর The Waste Land থেকে উঠে আসে:

“April is the cruellest month…”

অথচ দেহেলিজে এপ্রিলে শুধু বৃষ্টি পড়ে না, রক্তও পড়ে। সুতরাং সেখানে যেন নতুন করে লেখা হয়:

“April is the bloodiest month—
Breeding flames out of dead wounds,
Mixing myth with memory…”

বস্তুত, দেহেলিজ ইতিহাস নয়—এটি ইতিহাসের mythography। কিংবা আরও গভীরে গেলে, বলাই যায়: this is not a history book; it is a palimpsest—পুরনো ইতিহাসের ওপরে নতুন রক্তে লেখা প্রতিটি বাক্য, যেন পুনঃপাঠের আয়োজন।

ঠিক সেইখানে এসে দাঁড়ায় মিলান কুন্দেরার The Unbearable Lightness of Being। কুন্দেরা বলেন, “Being light is unbearable only when there is no gravity of consequence.” দেহেলিজে সেই gravitational pull আসে লাল টিপের মতো এক ক্ষুদ্র অথচ মর্মস্পর্শী চিহ্নে—যা একদিকে নারীর অঙ্কুরিত বাসনা, অন্যদিকে ইতিহাসের দেয়ালে রক্তের বাষ্পচিহ্ন। “ভবনের দেয়ালে যে টিপ, তা আসলে প্রেমের ছায়াপাত নয়, রাষ্ট্রদেহে গেঁথে দেওয়া এক প্রাচীন অভিশাপ।”

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ-এর One Hundred Years of Solitude-এর মাকন্দো যেমন হয়ে ওঠে এক বহুমাত্রিক সময়–পরিসর, দেহেলিজের দিল্লিও তেমনই—এক নাগপাশে বাঁধা সময়ের রেখাচিত্র। দিল্লি এখানে নিছক স্থান নয়, বরং এক ক্ষতবিক্ষত সত্তা, যে নিজের শহর হয়েও প্রতিটি শাসক দ্বারা বারংবার প্রতারিত। শহরের কঙ্কালগাত্রে লেগে থাকা রক্ত এখানে কেবল অতীতের নয়, বরং ভবিষ্যতেরও পূর্বাভাস।

এই খণ্ডকালিক নিরীক্ষার মধ্যে, Kazuo Ishiguro-র The Buried Giant–এর সেই নির্ঘুম নিঃসরণ মনে পড়ে, যেখানে একদল মানুষ ভুলে গেছে তারা কেন পরস্পরকে ঘৃণা করত। দেহেলিজে সেই ভুল কখনও আসে না। এখানে সবকিছু মনে রাখা হয়—চোখের পাতা খুললেই ভেসে ওঠে ইতিহাসের শোক-আলেখ্য। আর সেই স্মৃতি কখনও কখনও এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে, যে পাঠক নিজেই ভয় পেতে থাকে নিজের মনস্তত্ত্বের আদলে গাঁথা রাজ্যব্যবস্থাকে।

এখানে রাষ্ট্র কেবল প্রশাসনিক পরিকাঠামো নয়, বরং অস্তিত্বের এক জেনেটিক কোড—যেখানে “খালি কার্তুজের অভাব নেই”, কারণ স্নায়ুর মতন রাষ্ট্রও তার অস্তিত্ব খুঁজে পায় অস্ত্রে, আস্থায় নয়। সেইখানে প্রদীপ্তার লেখনী এক চুম্বকের মতো আমাদের ফিরিয়ে আনে নেপোলিয়নের উক্তির কাছে:

“History is a set of lies agreed upon.” – Napoleon Bonaparte

অথচ প্রদীপ্তা স্পষ্ট উচ্চারণে বলেন: “এখানে ইতিহাস নেই, আছে myth-history।”

এ কথায় ফুটে ওঠে যে ইতিহাস কেবল তথ্যের সমাহার নয়, বরং বিশ্বাস ও বিভ্রমের মিশ্রণ; একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নাট্যমঞ্চ, যেখানে প্রতিটি চরিত্রের মুখে আলাদা স্ক্রিপ্ট, অথচ একই শেষ দৃশ্য—রক্ত, রাজনীতি এবং মৌনতা।

একটা দার্শনিক অনুরণন তৈরি হয় এখানে—যে অনুরণন আমরা পাই জঁ-পল সার্ত্রের ‘Being and Nothingness’-এ, যেখানে অস্তিত্ব নিজেই প্রশ্ন করে নিজেকে: “Who am I if I am built by others’ memory?” দেহেলিজের প্রতিটি চরিত্র যেন এই প্রশ্নই তোলে; এমনকি শহর নিজেও, যেন এক আত্মমগ্ন আত্মপ্রত্যাশী—যার অভিশাপই তার অস্তিত্ব।

এ উপন্যাস পড়তে পড়তে পাঠক অনুভব করে: ইতিহাস, স্মৃতি, ধর্ম, অধিকার—সবই কি সত্যি? না কি শুধু myth–engineered constructs?

দেহেলিজ উত্তর দেয় না। দেহেলিজ শুধুই প্রশ্ন তোলে—আর সেই প্রশ্নের ভার আমাদের নিয়েই চলে যায়, এক রক্তকমলে ভরা স্বপ্নের দিকে, যেখানে ইতিহাস চুপচাপ বসে থাকে এক কোণে, আর কবিতা তাকে চুমু খায়।

৫) গদ্য কাঠামো: ফ্ল্যাশব্যাক, স্ট্রেট ড্রাইভ, রিভার্স সুইপ—উপন্যাসের টেকটোনিক ভার্সো:

প্রদীপ্তা রায় চৌধুরী সেনের দেহেলিজ-এ-দোজখ গদ্যগঠনে এক বিস্ময়কর ক্রিকেটীয়-রূপক নির্মাণ—যেখানে ফ্ল্যাশব্যাক, স্ট্রেট ড্রাইভ এবং রিভার্স সুইপ একত্রে গড়ে তোলে এক মেটা-আখ্যান। ফ্ল্যাশব্যাক ব্যবহার হয়েছে যেন পুরাতনের প্যাপিরাস ভেদ করে এক আধুনিক দৃশ্যপট বেরিয়ে আসে। সেখানে ইতিহাস ও বর্তমান এক বইল-অমন জোড়ার মতো; একটার ব্যাকস্পিনে অন্যটির ফ্লিক।

স্ট্রেট ড্রাইভ এই উপন্যাসে হল ভাষার সেই নৈপুণ্য, যেখানে কথক সরাসরি ছুড়ে দেন কাহিনির হৃৎপিণ্ডে—আর কোন ভণিতা ছাড়াই পাঠক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায় মুঘল রাষ্ট্রের ও কুরুদের পাপপুস্তকের। এখানেই লেখিকার কাঠামোগত স্পষ্টতা এক স্ট্রেইট ব্যাটের মতো, বাহাদুর শাহ জাফরের কাব্যিক ধ্বংস ও জন্মেজয়ের রাজনৈতিক পুনর্জন্ম যেন একই লজিক-লাইনে ধাবমান।

রিভার্স সুইপ, সেই চমকপ্রদ অলীকতা, যার সাহায্যে লেখিকা শেষের সূচনাকে এনে ফেলেন শুরুর শেষরেখায়—সেখানে অতীত কেবল অনুরণন নয়, পূর্বনির্ধারিত ভবিষ্যৎ। এই রচনাকৌশলে পাঠকের চোখ একবার পিছনে, আরেকবার ভেতরে—আর তারপর উপরের দিকে। যেমন Eliot-এর "in my beginning is my end" এর প্রতিধ্বনি এই উপন্যাসের শেষ অনুচ্ছেদে গাঢ় হয়ে ওঠে।

৬) ক্লাইম্যাক্স ও নাট্যঘন মুহূর্ত: সংলাপ, সংঘর্ষ, সম্মোহন:--

একটি উল্লেখযোগ্য পর্ব—উতঙ্ক ও জন্মেজয়ের প্রথম সাক্ষাৎ—যেখানে সংলাপগুলো জৈব ও জ্বলন্ত, যেন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডায়ালগ-প্রক্ষেপণে ধ্বনিত নাট্যমঞ্চ। ক্রমে তা হয়ে ওঠে দর্শনের ধ্রুপদি দ্বন্দ্ব, যেখানে আত্মবিচার ও প্রতিশোধ একে অপরকে গিলে খায়।

পরে রোগশয্যায় হুমায়ুনের বিষক্রিয়ায় বাবরের সেই নির্মম করুণা, যে যেখানে দাঁড়িয়ে শঙ্খ ঘোষ যেন ব্যক্ত করেন:

“এই তো জানু পেতে বসেছি, পশ্চিম
আজ বসন্তের শূন্য হাত—
ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।”

এই পঙ্‌ক্তি শুধু সংলাপ নয়—এ এক ঐতিহাসিক পরম্পরার চূড়ান্ত আত্মাহুতি। এখানে ইতিহাসের শরীর থেকে ঝরে পড়ে শব্দের রক্ত, আর উপন্যাস নিজেই হয়ে ওঠে এক মুক্তিবার্তা—যা ধর্ম, রাষ্ট্র ও জাতিগত সংঘাতের প্রতিটি স্তরকে ছুঁয়ে যায়।

প্রথমত অভিযোগ: নারীরা কোথায়? তারা কি শুধু প্রতীক্ষমাণ?

পদ্মাবতী, বপুষ্টমা, এমনকি মনসা—যাঁদের উপস্থিতি এক ধরনের দার্শনিক অলংকরণ, তাঁদের কাহিনী যেন সম্পূর্ণ হতে পারল না। এই চরিত্রেরা নারী মাত্রে একক নন, বরং তারা এক একটি সংস্কৃতির নারীর মডেল—যে মডেল সাহিত্যে বারবার উপেক্ষিত। তাঁদের জীবন কেটে ফেলা, ভাষাহীন করে রাখা—এই উপন্যাসের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক ‘চুপ’।

এটি সেই একই চুপ, যা দোর্সিলা, অরুণা বা Anna Karenina-র মুখের সামনে ঝুলে থাকে। আবার গালিবের গলায় অনুরণিত হয়:

"हज़ारों ख़्वाहिशें ऐसी कि हर ख़्वाहिश पे दम निकले…"
("হাজার ইচ্ছা, প্রতিটি প্রাণঘাতী")—

এখানে নারীর প্রতি সমাজের মনোভাব যেন প্রতিটি চাহিদাকে এক ধরণের নিষিদ্ধ বাসনায় পরিণত করে। দেহেলিজ এই চিত্র আঁকতে গিয়ে কোথাও কোথাও নিজেই নারীর যন্ত্রণাকে অবলুপ্তির জায়গায় দাঁড় করায়।

তবু, আমরা জানি—এই নৈঃশব্দ্যই ভবিষ্যতের তীব্রতম উচ্চারণ। নারীর ইতিহাস কখনও কেবল কণ্ঠস্বরে লেখা হয় না; তার উপস্থিতি ছায়ায়, আর অনুপস্থিতির ভিতরেই জ্বলতে থাকে। দেহেলিজ-এর এই অনুপস্থিতি হয়ত ভবিষ্যতের পুনঃসংস্করণের আহ্বান।

৭) ভাষার মৃত্তিকা: পূর্বরূপিতা ও পরিমার্জনের অপরিহার্য তাগিদ:--

একটি উপন্যাসের মাটি হল তার ভাষা—সেই মৃত্তিকাতেই জন্মায় আখ্যান, এবং সেখান থেকেই উঠে আসে পাঠকের অনুভব। দেহেলিজ-এ-দোজখ–এ ভাষার বহুত্ব নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর—উর্দু, ফারসি, তৎসম, চলিত বাংলা, এমনকি লোকভাষারও টুকরো টুকরো নকশা ছড়িয়ে আছে চমৎকারভাবে। কিন্তু এখানেই এসে পড়ে সামান্য সংশয়ের জায়গা—ভাষার ভারসাম্য রক্ষা কি সবসময় হয়েছে?

বিদেশি শব্দের উপস্থিতি কখনও প্রয়োজনীয়—মুঘল যুগের আবহে আরবি-ফারসি ছাড়া স্বাদপূরণ অসম্ভব। কিন্তু এই পরিপ্রেক্ষিতে চিহ্নিত করা প্রয়োজন—শব্দচয়নের ভার যেন পাঠকের উপর কেবল শৈল্পিক বর্ণমালা হয়ে না এসে, অসহ্য ভার হয়ে না দাঁড়ায়। পরিমিতিবোধ চাই। পঞ্চাশ শতাংশ বিদেশি টার্মের বেশি ব্যবহারে কোথাও কোথাও ভাষা হয় বর্ণাভরা, আর কোথাও যেন সরাসরি অনুবাদের মতো ফিকে। যেন একরঙা আলতা—জ্বলজ্বলে কিন্তু আত্মহীন।

এই খর্বতাকে অবহেলা না করে বরং পরবর্তী সংস্করণে চিন্তাশীল সম্পাদনার প্রস্তাব দেওয়া যায়। কারণ, যা আছে তা অনবদ্য, কিন্তু যা হতে পারত—তা হয়তো আরও একধাপ পাঠবান্ধব। ভাষার দ্যোতনা তখনই পূর্ণ হয়, যখন তা simultaneously বহুভাষিক এবং অন্তরঙ্গ হয়—যেমন গালিব বলেছিলেন:

"बात करनी मुझे मुश्किल कभी ऐसी तो न थी / जैसी अब है तेरी महफ़िल कभी ऐसी तो न थी" (“বলা আমার পক্ষে কঠিন ছিল না কখনও / তোমার সভা কখনও এত দূরাত্মা ছিল না”)

এই ‘মহফিল’ যদি হয়ে ওঠে কেবল এক শ্রেণির পাঠকের জন্য, তাহলে সেই প্রাসাদে আলো থাকলেও জানালা নেই।

তাই, এই উজ্জ্বল গদ্যের পরবর্তী সংস্করণে চাই—একটি সূক্ষ্ম দৃষ্টি, যা ভাষাকে বর্ণনাভার আর আভিধানিক ছাপ থেকে মুক্ত করে করে তুলবে এক সত্যিকারের বহুজাতিক নাগরিকের কণ্ঠ।

৮) উপসংহার: --

“সত্য দেখতে চাইলে, অতীতের ভয়কে জয় করে দেহেলিজে অবতরণ কর।”

প্রদীপ্তার দেহেলিজ-এ-দোজখ একটি উপন্যাস নয়, এটি এক আখ্যান–চক্র, যেখানে ইতিহাসের ছাইচাপা অগ্নিগর্ভ বীজ হঠাৎ করে পুরাণের শিকড়ে ফেটে পড়ে, আর আমাদের সমকালীন দগ্ধ হৃদয়ে জন্ম দেয় এক অতল প্রতিফলন।

এখানে চরিত্রেরা নিছক গল্পের অনুষঙ্গ নয়—তারা একেকটি ধ্বংসাবশেষ, ধ্যানমগ্ন অভিশাপ, আর অস্তিত্বের খোঁজে চিৎকার করা যন্ত্রণার ভাষ্য। পাঠক এই গ্রন্থে প্রবেশ করেন চোখ মেলে, আর বেরোনো হয় চোখ সাঁঝিয়ে।

ঠিক যেমন ঘালিব হাহাকার করে উঠেছিলেন—

“दिल ही तो है न संग–ओ–ख़िश्त, दर्द से भर न आए क्यों?” (হৃদয় তো ইট-পাথর নয়, ব্যথায় ভরে উঠবে না'ই বা কেন?)

এই উপন্যাসের প্রতিটি পৃষ্ঠা যেন সেই ব্যথারই সংগীত: ভাঙন ও প্রেম, ভুল এবং ক্ষত, আত্মদংশন আর পরিত্রাণের যৌথ রক্তবর্ণ রাগ। এ এক জীপসন ইহ্যালা—একটা হৃদয়ছেঁড়া হেমন্তকাল, যেখানে পাতারা ইতিহাস, আর হাওয়ারা পুরাণ।

তবু এই বই কেবল পড়ে ফেলার জিনিস নয়। এটা আসলে আত্মস্থ করার, পুনঃপাঠ করার, পুনর্জন্মের বই। এ উপন্যাস আমাদের শিখিয়ে দেয়—স্মৃতি কোনও অলংকার নয়, বরং এক রাজনৈতিক লণ্ঠন; প্রেম কোনও বিলাসিতা নয়, বরং যুদ্ধবিধ্বস্ত রাজপথে একমাত্র রক্তে লেখা মানচিত্র।

তাই এই কায়নাত সাহিত্য-র সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের কণ্ঠে প্রার্থনাই উচ্চারিত হয়, আফসোস নয়।
আমরা যেন এই সাহসী নির্মাণে নিজেদের চিনে ফেলি—যেখানে মহাকাল, মহাভারত, মুঘল আর মনোবিশ্ব মিলেমিশে এক মহাকাব্যের মিথ্যেটাকে সত্যের চেয়েও স্পষ্ট করে তোলে।

শেষ করি সেই চিরন্তন বচনে—

"सत्यं ब्रूयात् प्रियं ब्रूयात्, न ब्रूयात् सत्यम् अप्रियम्।" (সত্য বলো, প্রিয় বলো, কিন্তু নিষ্ঠুর সত্যে ক্লিশে করো না)

কিন্তু দেহেলিজ কোনও আপ্রিয় সত্য এড়িয়ে যায় না। বরং সে আমাদের সাহস জোগায় সেই কথাটিই মুখোমুখি বলবার, যা যুগে যুগে ইতিহাস এড়িয়ে গেছে।

এই ছিল দেহেলিজ-এ-দোজখ— একান্ত সাহসী, অপরিসীম ভাষাবান, এবং জ্বলন্ত নির্মাণ।

–– সমাপ্তি নয়। নিশ্চিত ফিরে আসবে। যেমন সব অভিশাপেই থাকে পুনরাবৃত্তির ছায়া।

অলমতি বিস্তরেণ।
Displaying 1 of 1 review

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.