ফোকলোর বা ফোকটেল বাংলায় লোকসাহিত্য একটি দেশ বা সমাজের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। কিংবদন্তি অথবা লোকসাহিত্যের মাধ্যমেই জানা যায় সেই দেশ বা সমাজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। যা শুধু লোক মুখে মুখে যুগ যুগ ধরে সেই দেশের গ্রাম বাংলায় মানুষের মাধ্যমে ছড়িয়ে আছে। পরিনত হয়েছে কিংবদন্তিতে। হয়তো সেইসব ঘটনার সাথে বাস্তব ঘটনার অনেক তফাৎ। এইসব কিংবদন্তীর কোন কোনটির হয়ত বাস্তব ভিত্তি নেই। আবার কোন কোনটির সাথে সেই দেশের অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা জড়িত। বিদেশে খুব গুরুত্বের সাথে নিজ নিজ ফোকলোর গুলো তারা সংরক্ষণ করে। কিন্তু আফসোস আমাদের দেশে কখনোই এই কাজটি করা হয়নি। যার কারণে এই দেশের বুকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজার হাজার ফোকলোর আজ প্রায় হারিয়ে গিয়েছে। আমরা বঞ্ছিত হচ্ছি এল অমূল্য সম্পদ থেকে। দুই একজন লেখক যারা তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে চেষ্টা করেছেন এই অপার সম্পদ থেকে কিছু মনি মুক্তো আমাদের সামনে তুলে ধরতে তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন ডক্টর আশরাফ সিদ্দিকী। পেশাগত কারণেই হোক বা অন্যান্য কারনেই হোক তিনি মলাটবন্দি করেছেন বাংলার অসামান্য কিছু কিংবদন্তি। যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে গ্রাম বাংলার লোকজনের মুখে মুখে। " কিংবদন্তির বাংলা " ঠিক তেমনই একটি সংকলন।
ফোকলোর বা ফোকটেল আমার খুব প্রিয় একটি জনরার মধ্যে অন্যতম। তাই যেখানে যা পাই তাই সংগ্রহের চেষ্টা করি। তা যে দেশের হোক না কেন। আর নিজ দেশের হলে তো কথাই নেই। কিছুদিন আগে এই রকম একটি বইয়ের রিভিউ প্লাস পিডিএফ গ্রুপের মেম্বারদের জন্য দিয়েছিলাম। ঠিক একই রকম একটি বই পেলাম দুইদিন আগে। বলাবাহুল্য এই বইটিও একটি মাস্টারপিস। মন্ত্রমুগ্ধের মত বইটি পড়ে শেষ করলাম।
বইটিতে তেইশটি গল্প আছে। লেখকের বাড়ি টাংগাইল হওয়াতে এই বইয়ের বেশিরভাগ গল্পই টাংগাইল বা এর আশপাশের জেলার। অন্যভাবে বইটিকে টাংগাইল জেলার কিংবদন্তিও বলা যেতে পারে। বইয়ে উল্লেখিত প্রতিটি কিংবদন্তিই ভালো। তার মধ্যে আমার বেশি ভালো লেগেছে বখতিয়ার খাঁর দীঘি, রতন রাজার হাট, গ্রামের নাম ব্রাক্ষণশাসন, ফুল কুমারীর ভিটে, এগারো সিন্দুক, কিল্লাতাজপুরের মাঠ, নদী নয় নদীর নারীর নাম ভাগীরথী, তরলা সুন্দরীর বিল, নই রাজা, মালঞ্ছমালার দীঘি।
বখতিয়ার খাঁর দীঘি - আসল নাম বক্তার খাঁ। স্বাধীনচেতা বক্তার খাঁ সুবে বাংলায় এসেছিল স্বাধীনভাবে থাকবে বলে। টাঙ্গগাইল জেলার কালিহাতী থানার আটিয়া পরগনায় নিজের রাজ বসালেন। নিজের সৈন্য সামন্ত গড়লেন। টনক নড়ল মুঘল বাদশাহের। গৌড়ের সুবেদার কে পাঠালেন শায়েস্তা করতে। কিন্তু ধূর্ত বক্তার খাঁকে ধরা কি এতই সোজা? শেষ পর্যন্ত কি হয়েছিল তার ভাগ্যে ? তার সাথে দীঘির কি সম্পর্ক? জানতে হলে পড়তে হবে এই গল্পটি।
গ্রামের নাম ফালদা - কথিত আছে ফালদা গ্রামের কেউ যদি মাটি খুড়ে আর সে যদি হাড়ি ভর্তি মোহর বা মূল্যবান কিছু না পায় সে একটা বলদ। গল্পের ভাষায়
"গ্রামের নাম ফালদা
হাল বাইতে যে টাকা না পায়
সে বেটা এক বলদা......."
কেন গ্রামের যে কোন জায়গায় মাটি খুড়লেই পাওয়া যাবে মূল্যবান কোন ধনরত্ন ? কি সেই রহস্য? তার সাথে চন্দ্রনবংশীয় রাজা যশোধরের কি সম্পর্ক ?
রতন রাজার হাট - টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ছিল এক রাজা। নাম তার রতন। রাজ্য ছিল, সৈন্য ছিল, হাতি -ঘোড়া, পাইক সব ছিল। গৌড়ের রাজা ছিলেন তার বন্ধু। গৌড় আক্রমণ করল শত্রুপক্ষ। বন্ধুর বিপদে এগিয়ে এলেন রতন রাজ। যাওয়ার সময় রাণীকে বলে গেলেন। যদি আমি হেরে যাই তবে বন্দী হওয়ার আগে প্রাণ দিব তার আগে ছেড়ে দিব আমার পোষা কবুতর। তা দেখে বুঝবে আমি হেরে গিয়েছি। তুমি তখন রাজকুমার আর সবাইকে নিয়ে আত্নহত্যা কর। ভয়ঙ্কর অপমানের চেয়ে আত্নহত্যা ভাল। যুদ্ধে গিয়ে তুমুল যুদ্ধ করে জয়ী হলেল রতন রাজ। কিন্ত ভূলক্রমে কবুতরের খাচাঁ খুলে গেল। কি ভুল করেছেন বুঝতে পেরে নিজের ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন? তারপর .........
ফুল কুমারীর ভিটে - পাটনীর মেয়ে ফুলকুমারী আর জমিদারের ছেলে সোনা মিয়ার অমর প্রেমের কাহিনী এটি। এই অনবদ্য কাহিনী আপনার চোখে জল এনে দিতে বাধ্য ।
এগারো সিন্দুক - ঐতিহাসিক এগার সিন্দুকের মাঠ। যেখানে সংগঠিত হয়েছিল ঈসা খাঁ আর মানসিংহের মধ্যে দন্ধযুদ্ধ।
কিল্লাতাজপুরের মাঠ - বীরাঙ্গনা সখিনার কথা আমরা কে না জানি। কিন্তু সম্পূর্ণ ঘটনা কি আমারা জানি? না জানলে জেনে নিন এই অমর প্রেমকাহিনী।
নদী নয় নদীর নারীর নাম ভাগীরথী - ভাগীরথী নদীর নাম আমারা সবাই জনি। কিন্তু কিভাবে এই নাম এল তা কি আমরা জানি? বস্তুত আমিও জানতাম না। যদি না জেনে থাকুন আসুন জেনে নিন মুক্তিযুদ্ধের এক বীরাঙ্গনার বীরত্ত্বের কথা।
তরলা সুন্দরীর বিল - এই গল্পটি ভালো লেগেছে।
বইয়ের প্রতিটি গল্পই ভালো লেগেছে। সবগুলোর কথা তো বলা যায় না। তাই অল্প কয়েকটির নাম উল্লেখ্য করে সার সংক্ষেপ দিলাম।
রেটিং - রেটিং দিয়ে এই অসাধারণ বইয়ের মান ক্ষুন করতে চাই না। এই বই রেটিং এর উর্ধ্বে ।