-: পাঠ প্রতিক্রিয়া :-
অম্বুবাচি ট্রিলজি - মধুমিতা সেনগুপ্ত
আমার খুবই পছন্দের একটি সিরিজ। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী প্রাচীন বাংলার খুবই সাদামাটা একটি কাহিনী। তবে প্রতিটি চরিত্রই অসাধারণ এবং অত্যন্ত সুন্দর। বিম্ববতী এবং কুমুদ, এদের দুটি পরিবারের গল্প নিয়েই মূলত অম্বুবাচির প্রেক্ষাপট। গল্পের মূল চরিত্র দুটি, অত্যন্ত মিষ্টি এবং প্রাণোচ্ছল দুটি চরিত্র। আর ওদের সম্পর্কও ঠিক ওদের মতোই মিষ্টি মধুর। এই গল্পে ওরা দুইজন যতবার হেসেছে আমিও ওদের সাথে মিলে ততবারই হেসে উঠেছি, এবং ওদের চোখে যতবার জল এসেছে, নিজের অজান্তেই আমার চোখেও জল চলে এসেছে। এরা ছাড়াও আরও অনেক চরিত্রই মনে দাগ কেটেছেন, যাদের কথা একেবারে না বললেই নয় তাদের মধ্যে রয়েছেন, বিম্ববতীর বড়দাদা, সূর্য, কামিনী এবং অন্যতম হলেন কুমুদের বড়মা, এই চরিত্রটি কি অসম্ভব স্নেহ, মায়া এবং মমতায় জড়ানো তা পড়ে অনুভব না করলে এভাবে লিখে বোঝানো অসম্ভব। এইরকম পরম মমতাময়ী চরিত্রের আজকের যুগে বাস্তবের সাথে সাথে গল্পেও বিরল সাক্ষাৎ মেলে, এই চরিত্রটি কোথাও গিয়ে মূল চরিত্রদুটিকেও ছাপিয়ে গিয়েছে, আমার পড়া এবং পছন্দের চরিত্রগুলির মধ্যে ইনি অন্যতম হয়ে রইলেন। গল্পের শুরুতেই এক অম্বুবাচির দিনে বিম্ব তার বাড়িতে বসে বড়দের সাথে অম্বুবাচির কারণ সমূহ নিয়ে আলোচনা করছে, এর মধ্যে খবর আসে, কুমুদ অর্থাৎ তার স্বামীর বড়মার হঠাৎ শরীর অসুস্থ হতে তিনি তার আদরের ছোট নাতবৌকে দেখতে চেয়ে ডেকে পাঠিয়েছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিম্ব এবং কুমুদের বাল্যবিবাহ হয়েছিল, প্রাচীন বাংলায় বাল্যবিবাহের চল ছিল। এখন বাল্যবিবাহ আইনত নিষিদ্ধ। মূল বিষয়ে ফিরে আসা যাক, কুমুদ এবং বিম্বের বাল্যবিবাহের ফলে, তারা তাদের জীবনের প্রথম অনেকখানি সময় একসাথে কাটায়, এবং এর ফলে তারা প্রথমে একে অপরকে অপছন্দ করলেও, নিজেদের অজান্তেই তারা কখন একে অপরের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায় তা তারা নিজেরাও বুঝতে পারেনা। যখন এই বিষয়টি তারা বুঝতে পারে তখন তারা একে অপরের পাশে যাতে সারাজীবন একইভাবে থাকতে পারে তারই সুপরিকল্পনা এবং সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করার জন্য বদ্ধপরিকর হয়। বিম্ব এবং কুমুদ ছাড়াও এই গল্পে আরও কয়েকটি যুগল রয়েছেন, যারা একে অপরকে যারপরনাই ভালোবাসেন। এনাদের সম্পর্ক সম্পর্কিত বিবরণগুলিও অতি মিষ্টি মধুর, যারফলে গল্পে একঘেয়েমি একদমই স্থান করে নিতে পারেনি।
গল্পে ভালোবাসা যেমন রয়েছে, স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়কার কাহিনী হওয়ার সুবাদে ইংরেজদের অমানবিক অত্যাচারের কিছু অংশও উঠে এসেছে গল্পে এবং তার সাথে অবধারিত ভাবেই বাংলার বিপ্লবীদের দুঃসাহসিক কার্যকলাপও গল্পে সংযুক্ত হয়েছে।
গল্পের প্রেক্ষাপট অতিসাদামাটা দুটি পরিবারের চিত্র দিয়ে শুরু অতিসাধারণ কিছু চরিত্রের সঙ্গে, কিন্তু গল্পে পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে খাপ খাওয়াতে গিয়ে প্রায় প্রতিটি চরিত্রই অসাধারণ হয়ে উঠেছে।
আমার এই গল্পটি ভালো লাগার মূল কারণ, গল্পে অকারণ জটিলতা নেই এবং প্রত্যেকটি প্রধান চরিত্র সংবেদনশীল, মমতায় জড়ানো এবং পরিবারের প্রতি কর্তব্যপরায়ণ। কারণে বা অকারণে তারা কাউকেই দুঃখ দিতে অনাগ্রহী এবং একে অপরের অনুভূতিগুলিকে সম্মান,মর্যাদা এবং মূল্যবোধ তারা কখনও ফিকে হতে দেয়নি, যা অতুলনীয় এবং অসম্ভব সুন্দর একটি বিষয়।